ইদানীং নিজে নিজেই ভাবি, ঘুমাতে যাবার আগে দুঃচিন্তার মতো জানতে চাই-প্রেম কী ?
ইদানীং নিজে নিজেই ভাবি, ঘুমাতে যাবার আগে দুঃচিন্তার মতো জানতে চাই-প্রেম কী ? মাথায় হাত বুলাতেই চমকে উঠি, তালুটা ইট ভাটার চুল্লীর মতো গরম মনে হয়। তার আমেজেই সিদ্ধ হচ্ছে প্রেমসহ মস্তিষ্কের কিলবিলে পোকাগুলো। রাত দিন ভেবেও ভালোবাসার এস্কুল-ওস্কুল করতে পারি না। ভাবতে ভাবতে আমি দার্শনিকের মতো চুল-দাড়ি-গোঁফ রাখতে শুরু করেছি কবে থেকে তা নিজেই জানি না। 'সবুরে মেওয়া ফলে' জাতীয় কথাবার্তা আর ভালো লাগে না। বন্ধুদের ধমকে উঠে বলি- এই চুপ থাকবি ? ওরা চুপ মেরে যায়। আমার প্রেম গবেষণা শেষ হতে হতে হয় না। বসন্তের দিন শেষে গ্রীষ্মের বাতাসে আমের মুকুল গন্ধ ছড়ায়। বন্ধুদের দু'একজন বলতে চেষ্টা করে, 'অবন্তীকে কথাটা বলে ফেললেই পারিস। ওদের কথা শুনে নিজের ভেতর রাগ দেবতাকে ধরে রাখতে চেষ্টা করি। মিন-মিন করে বলি, ইস্ কেমন বুদ্ধি দিতে শিখেছে। আমি তো কথাটা বলতে গিয়ে কতবার যে বলতে পারিনি তা বন্ধুরা জানতেও পারেনি। ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ালে স্যারের সামনে পড়া বলতে দাঁড়ানোর মতো সব ভুলে যাই!! কি মুছিবত! ওকে দেখলেই হাত পা কাঁপে, হৃদস্পন্দন থেমে যায়। মাঝে মাঝে ভাবি, এই অনুভূতির নামই কি প্রেম? আমার বোধগম্য হয় না। বাসাই যাই; বউ জিজ্ঞেস করে-'শরীর খারাপ? আমি ডানে বামে মাথা নেড়ে বলি- কই নাতো! শরীর খারাপ বললে মুন্নী আবার কী করে বসে তা নিয়ে এক রকম ভয়েই থাকি। একবার হাতে কী করে যেন ব্যথা পেয়েছিলাম, হাতে ব্যান্ডেজ বাঁধানো দেখতেই আয়োজন করে কান্নাকাটি শুরু হয়ে গেলো। আমার হাত ভাঙ্গেনি, যেন আমি মারা যাওয়ার পথে। রাতে শোবার আগে ঠোটে আলতো করে চুমো খেয়ে বললো- এখন কেমন লাগছে? আমি নির্বাক হয়ে যাই। ইচ্ছে করে মুন্নীকে ক'টা কথা শুনিয়ে দেই। কথা শুনে ও আবার কেঁদে কেটে চোখ ফোলাবে এই ভয়ে কিছু বলি না। মাঝে মাঝে ভাবি, ওরই বা কি দোষ?
মুন্নীর সাথে বিয়ে হওয়াটা ছিলো কাকতালীয়। বাবা জোর করে বিয়ে করালেন। বললেন- আর ক'দিন বা বাঁচবো, তোর বউটাকে দেখে যেতে পারলে কবরে গিয়ে কলিজাটা পচবে! এক কথায় বাবা জোর করেই বিয়েতে রাজি করালেন। তাই বাসর রাতে বিড়াল না মেরে গুটিশুটি মেরে বসে থাকা নববধূটিকে বলে দিলাম, আমার নিজস্ব একজন পছন্দের মানুষ আছে! তোমাকে আমার জীবনের সাথে বৃথা জড়িও না। অথচ আমি জানি, ওকে আমিই আমার জীবনের সাথে সবেমাত্র জড়িয়ে ফেলেছি। বিয়েটা ছেলেখেলা নয় তা আগেই জানতাম। তাই বলে আমার ব্যক্তিগত চাওয়া পাওয়াকে তো আমি বিসর্জন দিতে পারি না। আমি ভেবেছিলাম, বাসর রাতে স্বামীর মুখ থেকে এ ধরনের কথা শুনে বউটি হয়তো সারা রাত কেঁদে কেটে হুলুস্তূল কাণ্ড বাধিয়ে বসবে। আমাকে অবাক করে দিয়ে সে সত্যিই হুলুুস্তূল বাধিয়ে ফেললো। বলল, তুমি আরো পাঁচটা প্রেম করো তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই। তবে মাঝে মাঝে খেয়াল রেখো ঘরে তোমার বউ আছে। আড়চোখ একবার আমার দিকে নিজের লালশাড়ির আঁচল খুটতে খুটতে যেন আপন মনেই নিজেকে প্রবোধ দিলো, এমএ পাস করে ভেবেছি স্বপ্নের মত স্বামী পাব, গোছানো ছিমছাম সংসার হবে, হয়তো এখন সেই স্বপ্নটা পূরণ নাইবা হবে। সব স্বপ্ন কি সত্যি হবার কথা আছে? তার ইমোশনাল প্রশ্নের জবাবে আমি বিছানার মাঝ বরাবর কোলবালিশ দিয়ে একপাশে শুয়ে পড়ি। মুন্নীর বাসর রাত নির্ঘুম কাটলো। সকালে ঘুম থেকে ওঠে দেখি ওর চোখ মুখ ফোলা। সারারাত হয়তো নির্ঝরে কেঁদেছে মুন্নী।
মুন্নীর উপর আমার কোনো আকর্ষণ নেই তার একমাত্র কারণ অবন্তী। অবন্তীর ভালো লাগে সেই কলেজ জীবন। কিন্তু ওকে কখনো সেই ভালোলাগার কথাটা দুই বছরেও বলা হয়নি কিংবা বলতে পারেনি।
বন্ধুদের আজকাল বাসায় নেই না। সফিক, আজহার বাসায় যাওয়ার কথা বললে বলি, নাহ! আজ থাক। মুখ ফুটে বলি না, দোসত্দ আমি বিয়ে করে ফেলেছি। চল তোর ভাবিকে দেখে আসবি! কথাটা জানাজানি হলে অবনত্দীকে আর পাওয়া হবে না; তাই কাউকে বলতে পারি না। অবনত্দী প্রায়ই একটা আকাশি শাড়ি পড়ে অফিসে আসে। তার শাড়ি পরা মুখ দেখে ইট-কংক্রিটের অফিসটা যেনো মুহূর্তেই কর্মচঞ্চল হয়ে যায়। আমার মতো অনেকেই দরকারে বীনা দরকারে ওর টেবিলের সামনে আম ঝুলে থাকার মতো ঝুলে থাকে। ও আজ কালো রঙের শাড়ি পরহিতা। ওর সামনে গিয়ে বসি। অফিসে তেমন কাজ নেই। তাই কথাবার্তা হয়। না বলা কথাটা ইঙ্গিত দিতে চাই। ও শুনে চোখ কপালে তোলে। ভ্রু কুঁচকে বলে,
: সত্যি? আশ্চার্য ! আগে যে বলেন নি?
: মুন্নী এমনই। এমএ পাস মেয়ে। বাবার বেশ অর্থকড়ি আছে। একবার যা বলবে তা তার করা চাই-চাইই। কিন্তু আমার যে তাকে পছন্দ নাও হতে পারে সেদিকে তার খেয়াল নেই। কোথাও বেড়াতে যাবে, আমাকে ফোন করে বলে, আফজাল কোন্ শাড়িটা পরব ? বলেন দেখি, তখন কেমন লাগে?
: তাই? তবে বিয়ে করছেন না কেন? ওকে বিয়ে করে ফেলুন, রাজকন্যাও পাবেন রাজত্বও পাবেন!
: ওকে বিয়ে করতে বলছেন? তা আমার কথা না হয় থাকলোই বা। আপনি বিয়ে করছেন না যে?
: আমি? আগে প্রেম তারপর বিয়ে! কী বলেন প্রেম করে বিয়ে!
আমি মিনমিন করে বলতে চেষ্টা করি, তুমি কী এখনো বুঝোনি আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি? কিন্তু অবনত্দী বুঝে না। সে কেবল মিটিমিটি হাসে। সেই হাসি আমার চোখে গেঁথে থাকে। ইচ্ছে হয় অফিস ছেড়ে দূর কোনো শালবনে অবনত্দীকে নিয়ে জোছনা দেখে আসি। ওর হাতে হাত রেখে জোছনা গায়ে পাতা ঝরা পথে হাটি। বিবর্ণ পান্ডুর পাতায় ছড়িয়ে দেই একঝাঁক প্রেমের জোছনা। দক্ষিণা বাতাসে ওর চুল এসে আমার গা ছুঁয়ে যাবে। পরশ চাইবে যেন! ওর মুখে হয়তো কোনো গানের সুর তুলবো। কথা বলবে ওর আত্মা মানবী। আমি হয়তো মরিয়া হয়ে বলবো,
: আমাকে বাঁচাবে না?
: তুমি কী মরে যাচ্ছো?
: বাঁচার ঔষধ যে তোমার কাছে!
: আমাকে পেতে চাও?
: হ্যা!
: শুধু আমাকেই চাইবে, প্রেম চাইবে না?
: চাইবো!!
জবাবে অবনত্দীর লাল ঠোটের ছোঁয়া আমাকে উষ্ণ করে যায়। আমি ঝরা পাতা ! কত দিন পর কোকিলের ডাক শুনলাম জীবনের এতগুলো বসনত্দ পেরিয়ে! হাতছানি দিয়ে ডাকে সমুদ্র। উন্মত্ত আহ্বান। আমি আর অবনত্দী সমুদ্রের কাছে ছুটছি। হাত ধরে ছুটে চলা। পেছন থেকে অজ্ঞাত ডাক ভেসে আসে। আফজাল ! আফজাল আমার! ফিরে তাকাই। চোখ স্থির হয়। দাঁড়িয়ে থেকে কালো দুটো চোখের ছুটে আসা দেখি। তিরষ্কার মাখা সে মুখটি আমার সামনে এসে অবনত্দীর মুখপানে তার থমকে দৃষ্টি স্থির হয়। চোখময় অবনত্দী এসে অভিমানভরা প্রশ্ন করে- আমাকে নেবে না? অবনত্দী মুন্নীর দিকে একপলক তাকায়। আমার হাত ধরে শক্ত টান দিয়ে বলে, 'চলো'। মুন্নীর কান্না ভেজা চোখ দুটো মাড়িয়ে আমি ছুটে চলি কাঙ্ক্ষিত বাহুবন্ধনের টানে। কিছু কেনাবেচা করব আজ!
যেখানেই মুন্নীকে নিয়ে হারিয়ে যাবার কথা, সেখানেই মুন্নী যেন ইঁদুর বিড়াল চালটা চেলেছে। কল্পনার জগত থেকে নীড়ে ফিরে ভাবছি কালকেই অবনত্দীকে কথাটা বলে দিবো।
আজ রোববার। গায়ে পারফিউম লাগিয়ে অফিসের দিকে পা বাড়িয়েছি। সে কোথায় থেকে যেন এসে হাজির। মুন্নীকে এত সকালে উঠতে দেখিনি কখনো। মনে হলো সে প্রাতস্নান করে ফিরেছে। চুলগুলো ভেজা। তাকে কেমন যেন দেবী দেবী মনে হয়। দেবী বললেন-
: খিচুড়ি রেঁধেছি! খেয়ে যাও।
ভেবে রেখেছি আজ অবনত্দীকে নিয়ে থাই রেস্টুরেন্টে ব্রেকফাস্ট করবো।
: ক্ষিদে নেই।
: এত কষ্ট করে রাঁধলাম.....জানো, আজই প্রথম আমি খিচুড়ি রাধলাম। ইয়ে...বলছিলাম কী, রাতে ঘুমের ঘোরে দেখলাম শালবন, জোছনা জোছনা করে বিড় বিড় করছো ! অফিস থেকে একটু তাড়াতাড়ি ফিরলে আমরা দু'জন কী শালবনে জোছনা দেখতে পারি না?
মাথাটা আচমকাই বিগড়ে গেলো। মুন্নীকে হতবাক করে চড়ের শব্দটা দূরে কোথাও মিলিয়ে গেলো। ওর দিকে না তাকিয়ে অফিসের দিকে ছুটলাম। নিজের কাছেই কেমন যেন তৃপ্তি লাগছে। আশ্চার্য! কাউকে মেরে এমন কখনো কী তৃপ্তি পেয়েছি আমি?
অফিসে গিয়ে দেখি আমার আগেই অবনত্দী এসে পড়েছে। ভনিতা না করে সোজা কথায় বললাম, চলেন থাই রেস্টুরেন্টে গিয়ে ব্রেকফাস্টটা সেরে আসি। সাথে নিরিবিলি কিছু কথাও বলা যাবে।
: বাহ! আমিও তো আপনাকে নিয়ে রেস্টুরেন্টে যাওয়ার কথা ভাবছিলাম ! অনেকদিন ধরেই কিছু কথা জমা আছে । বলব! বলব! ভাবছিলাম। আপনি আবার মাইন্ড করেন কী না তাই বলতে পারিনি। কিন্তু আজ আপনাকে না বলে উপায় দেখছি না !
আমার হৃদয়ে যেন ছলাৎ ছলাৎ ঢেউ উঠলো। অনেক দিন পর মনে হয় প্রেম নামক ক্যামেস্ট্রিটা আমি ভালোভাবেই ধরতে পেরেছি। খুশি মিশ্রিত আর প্রাপ্তির কল্পনা নিয়ে রেস্টুরেন্টে পৌঁছলাম। সামনা সামনি হেলানো চেয়ারে বসে স্যুপ খেতে খেতে অবনত্দীর দিকে তাকালাম। আজ তাকে বড় সুন্দর লাগছে। কেমন যেন লাজুক লাজুক চেহারা। কত মায়াবী! খাবার খাওয়ার ফাঁকে খোঁচা দিলাম- কী যেন বলবেন বলছিলেন? প্রশ্নটা শুনে অবনত্দী দ্বিধা নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। যেন কথাটা বলবে কিনা, তা নিয়েই বড্ড সংশয়ে আছে যেন সে। অবশেষে দীর্ঘতার লগ্ন কাটিয়ে সে বললো, 'কিবরিয়া স্যারকে বিয়ে করে ফেলেছি!! বাসাই কী করে জানাই বলেন তো ?'
হঠাৎই মুখে দেয়া স্যুপ গলায় আটকে যায়। আচমকাই ঘোড়ার লাগামটা শক্ত করে টেনে ধরি। সামনের দিকে তাকাই। অবনত্দীর চোখে চোখ পড়ে। মরা মাছির চোখে মতো তাকে নিসপ্রভ মনে হয়। জানালার বাইরে অসংখ্য ঝরা পাতার উড়া উড়ি। বাইরের দিকে তাকিয়ে ভাবি, কিবরিয়া স্যারকে বিয়ে করলো অবনত্দী? প্রায় পঞ্চাশ বছর ছুঁই ছুঁই কিবরিয়া স্যারকে! শুধু টাকা পয়সা দেখে একাজ করতে পারলো সে?
এক ঝাক হতাশা উড়িয়ে অবশেষে অবনত্দীর কথা শেষ হয়। অফিস না করেই বাসায় ফিরি। বুকটা কেমন যেনো শূন্য শূন্য লাগছে!
গালে পাঁচ আঙ্গুলের দাগ নিয়ে দরজা খুলে দেয় মুন্নী। ওর রক্তময় মুখে রাজ্যের শঙ্কা দেখি। গলা ছেড়ে ডাকি-
: মুন্নী! কই খিচুড়ি দাও। তুমিও কী আমার সাথে খেতে বসবে? আমরা কী একসাথে খেতে পারি না?
সোফায় বসে থাকা মুন্নী আমার দিকে চোখ পিট পিট করে তাকায়। আমি তার চোখে জীবনত্দ অবিস্বাস দেখি। ওর কাছে গিয়ে ওর তুলতুলে হাতটা বুকের কারে ধরি। ওকে বুকে জড়িয়ে বলি, তুমি রেডি হয়ে নাও। সন্ধ্যায় শালবন যাব। হাতে হাত রেখে জোছনা দেখাটা কত মজারই না হবে একবার ভেবে দেখেছো কী ! আমার আলগা বাধনের ভিতর মুন্নীর নরম দেহটা তিরতির করে কাঁপে। আমি জানি, এই অনুভূতি আনন্দের। রাজ্য জয়ের প্রাপ্তির!
নিজের কাঁধের উপর মুন্নীর হাতের ছোঁয়া অনুভব করি। ভাবি, অবশেষে বোধহয় প্রেম নামক রসায়নটা আবিষ্কার করতে পেরেছি!





বিবাহোত্তর ছ্যাঁকা কাহিনী পড়ে হৃদয় বিদীর্ণ হয়ে গেল। এই দুঃখ আমি রাখি কি
বহুত খো—ভাল লাগল, সাবলীল লেখা।
আপনার স্ত্রীর নিখাদ ভালবাসারই জয় হল।
তাই
কিস্মত সে হায় তোমকো মিলিহো
কেয়ছে ছোরেংগে হাত,
হাম না...... ছোরেংগে।
টুকরে দিলকে হাম দু মিল্কে
ফের সে জোড়েংগে হায়......
হাম না ছোড়েংগে
গলপ হিসেবে দারুন
মন্তব্য করুন