আমার ইত্তেফাক
'৯৪ সালে একটা লেখা লিখে পাঠিয়ে দিলাম বাই পোস্ট, ইত্তেফাকের ঠিকানায়। তারপর প্রতিদিন সকালে পত্রিকা আসার সময় হলে দরজার সামনে দাঁড়ায়ে থাকি, খুজিঁ আমার লেখা ছাপা হইছে কী না... হয়না।
দুই সপ্তাহ পর যখন আশা ছেড়েই দিছি, তখন একদিন দেখি ইত্তেফাকের তরুণকণ্ঠে আমার লেখাটা ছাপা হইছে। লেখকের নামের জায়গায় আমার নাম। আমি থরথর কইরা কাঁপলাম। বিশ্বাস হইলো না। কারণ তখন ইত্তেফাক দেশের সেরা ব্র্যান্ড। সেখানে আমার মতো এক সদ্য স্কুল পাশ পোলার লেখা ছাপা হইছে! তাও আবার চিঠিপত্র বিভাগে না, ফিচারে!
সাহস করে লিখে ফেললাম আরেকটা... পাঠায়ে দিলাম। পরের সপ্তাহেই ছাপা হইলো। তারপর একদিন টিএসসিতে রেজানুর রহমানের লগে সাক্ষাতে কইলাম আমিই সেই পাপীষ্ঠ নজরুল ইসলাম। প্রথমে বিশ্বাস করলো না [তিনি ধারণা করছিলেন আরো বড়টর কেউ হবে হয়তো], তারপর আদেশ- এখন থেকে রেগুলার লিখতে হবে।
শুরু হইলো আমার নতুন জীবন।
বাউণ্ডুলে আমি এই এক ধাক্কায় ফ্যামিলিতে ব্যাপক গুরুত্বপূর্ণ হয়া উঠলাম। লেখক মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হইলো। পড়ালেখার বই বাদ দিয়া দুনিয়ার অন্য সব বই পড়াটা যে আসলে জ্ঞানের লক্ষণ, এবং আমি একজন জ্ঞানী ব্যক্তি- হুট করেই সবাই তা বুঝতে পারলো। 'আউট বই' পড়ার অপরাধে যে স্যার কানমলা দিতো, সেও দেশ রাজনীতি নিয়া পরামর্শ করতে শুরু করলো আমার সাথে। মহল্লায় আড্ডা মারতে বাইরইলে মুরুব্বীরা পর্যন্ত আলাদা খাতির করতো। বাজারে গেলে আমার লগে দেখা হইলে নানাবিধ সমস্যার কথা বলা শুরু হয়ে গেলো। এলাকার কোন সমস্যা হলে সেটা ইত্তেফাক পর্যন্ত কীভাবে দেওয়া যায় এসব বিষয়েও...
সব মিলায়ে আমি বেশ একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হয়ে গেলাম।
এইচ এস সিতে ভূগোল প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষা। তখন আমার পিঠ পর্যন্ত ছড়ানো লম্বা চুল, রোগা পটকা চেহারা। ভূগোল বিভাগীয় প্রধান আপা আমারে দেখে প্রথম প্রশ্ন করলো আমি আদৌ ঢাকা কলেজে পড়ি কী না? কারণ কোনদিন তিনি আমার চেহারার কাউরে ক্লাসে দেখেন নাই।
আমি বললাম কলেজেরই, কিন্তু ক্লাশ করা হয় না।
পরের প্রশ্ন আমি মাস্তানী করি কী না?
এর উত্তর দিলাম না সূচক।
পরের প্রশ্ন 'তাইলে আমি কী করি?'
জানাইলাম লেখি।
কোথায় লেখ?
ইত্তেফাকে...
ইত্তেফাকে কী লেখো?
আমি জানাইলাম। তা শুনে ভদ্রমহিলার বিরাট মোটা চেহারা ভর্তি বিস্ময়। কারণ আমার লেখা তিনি নাকি নিয়মিতই পড়েন ইত্তেফাকে। এবং তার ভালো লাগে। তার এক ছাত্রই যে এই লেখক তা জেনে তিনি যারপরনাই উল্লসিত।
ভূগোল প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষায় ভৌগলিক কোন প্রশ্নই আর হইলো না। আমি কীভাবে ইত্তেফাকের লেখক হয়ে উঠলাম, আর কী কী করি না করি এইসব জাইনা টাইনা ছাইড়া দিলো। [বলা বাহুল্য, ভূগোল নিয়া জিগাইলে একটারও উত্তর দিতার্তাম্না]
কলেজ পাস দেওনের পরে বড় ভাই ভর্তি করায়ে দিলো পজিট্রন কোচিং সেন্টারে। ক্লাস তো আমি সারাজীবনের মতোই করি না। তবে পজিট্রনের সামনের গলিতে বসে আড্ডা মারাটা রেগুলার। অনেক সুন্দর সুন্দর মেয়ে দেখা যায়।
এরই মধ্যে একদিন এক পিয়ন আমারে ডেকে নিয়ে গেলো অফিসে। পজিট্রনের মালিক সাহেব নাকি আমারে ডাকছে। আমি তো টাশকিত।
তিনি শুনেছেন তাদের কোচিংয়ের এক ছাত্র ইত্তেফাকে লেখে। পজিট্রন একটা পাক্ষিক পত্রিকা শুরু করতে যাইতেছে 'অন্যদিন' নামে, তাদের ইচ্ছা আমি যেন সেই পত্রিকায় যোগ দেই।
আমার তখনো চাকরীর নামে চাকর হওনের ইচ্ছা নাই বিধায় না জানায়ে দিলাম। এমনকি লেখতেও রাজী হইলাম না। [আমি ইত্তেফাকের লেখক, এসব নতুন পত্রিকায় লেখা কি আমারে মানায়
]
সেই অন্যদিন এখন বিরাট প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান, বইমেলা মানেই অন্যপ্রকাশ...
এরকম আরো অনেক ঘটনা... সব মহলেই আমার একটা আলাদা খাতির... কারণ আমি ইত্তেফাকের নিয়মিত লেখক একজন।
তাই শুধু না। ইত্তেফাক থেকে লেখক সম্মানী বাবদ তখন প্রতিমাসে প্রায় ছয় থেকে আটশো টাকা পাইতাম। তখনকার আমলে এইটাই আমার কাছে বিরাট ব্যাপার। পত্রিকায় লেইখা আমি কলেজে থাকতেই স্বাবলম্বী হয়া গেলাম। ইত্তেফাক একই সঙ্গে আমারে দিলো অর্থ আর সম্মান, আর স্বনির্ভরতা আর আরো অনেক কিছু।
গত পনেরো বছর ধরে আমি শুধু লিখেই খাই। এটাই পেশা। হয়তো ইত্তেফাকে লেখাটা না ছাপা হলে আমার জীবনটাই অন্যরকম হতো। আমিও হয়তো কোনো কেরাণী জীবনই বাইছা নিতে বাধ্য হইতাম।
ইত্তেফাক তাই আমার কাছে অনেক বড় একটা স্মৃতি। অনেক বড় একটা কিছু। আমার জীবনের অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট ইত্তেফাক। এখন আর ইত্তেফাক বাড়িতে রাখি না। কিন্তু ইত্তেফাক হাতে এলে প্রথম যে অনুভূতিটা আমার জাগে, সেটা এক অদ্ভুত অনুভূতি। বলে বোঝানো সম্ভব না কাউকে।
আমার বাবারও পত্রিকা জীবনের শুরু ইত্তেফাক দিয়েই ছিলো। সেটা বাংলাদে স্বাধীন হওনের আগের ঘটনা।





মাসুম ভাইয়ের ইত্তেফাক বিষয়ক লেখাটায় মন্তব্য করতে বসে কখন যে এতো বিরাট একটা লেখা লিখে ফেলেছি নিজেও খেয়াল করিনি। শেষ করে চেক করতে গিয়ে দেখি বিরাট কাহিনী।
আমার নিজেরও অনেক আবেগ মিশে থাকায় মন্তব্যর ঘর বাদ্দিয়ে নিজের ব্লগেই প্রকাশ মেরে দিলাম...
আমি একজন হিটাকাঙ্খী ও মন্তব্যাকাঙ্খী ব্লগার। আমার পোস্টের মন্তব্য নিজের ব্লগে প্রকাশ করা খুব খ্রাপ।
আপনারে একটা গাত্তা মাইনাস। মানে ছোট কিন্তু বলিষ্ট মাইনাস।
ইত্তেফাক নিয়া কথা তাইলে পড়ে কই।
পড়ে আরাম পাইলাম
স্টুডেন্ট পড়ানো বাদে ট্যাকা কামানো হইলো না এই জীবনে! এইটাও হইতো না যদি না স্টুডেন্ট নিজেই আমার ঘাড়ে পড়তো!
খাইছে, নজু ভাই।... ইত্তেফাক দেখি আসলেই আপনের জীবনের একটা মাইলফলক/টার্নিং পয়েন্ট/অনুপ্রেরণা... পুরা সিস্টেমে ফেলায়া দিছে আপনেরে
কত সুন্দর স্মৃতি নজু ভাই এর। ইত্তেফাক তো নজু ভাই রে লেখক বানিয়ে দিলো।
এই লেখা থেকে বহুদিন পর আউট বই কথাটা মনে পড়লো।
জয়িতার কথাই আমার কথা
ইত্তেফাক নিয়ে স্মৃতিকথন পড়ে খুবই ভালো লাগছে । আপনি আসলেই ভাগ্যবান গো ভাইডি ! সব সময়ই ভাগ্য আপনাকে এভাবেই সঙ্গ দিক । শুভ কামনা ।
বিনীতভাবে বলছি , ১৯৯১-২০০১ সময়কালে ইত্তেফাকে আমার প্রকাশিত লেখার সংখ্যা হাজারের বেশি হবে। ইত্তেফাকের সব বিভাগেই ছিল আমার বিচরণ । মাসুম ভাইয়ের সম্পাদিত অর্থনীতি পাতাতেও আমার কয়েকটি লেখা লিড হিসেবে ছাপা হয় । মজার ব্যাপার হল- ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত ইত্তেফাকের সম্পাদনা বিভাগের কেউই আমাকে চিনতেন না , আমি বরাবরই আড়ালে থাকি , সম্পাদকদের টেবিলে চুপে চুপে লেখা দিয়ে চলে আসতাম । ওই সময়কালে দেশের প্রায় সব জাতীয় দৈনিকেই আমার লেখা নিয়মিত ছাপা হত এবং প্রায় প্রতিদিনই আমাকে একাধিক পত্রিকা কিনতে হত । ইত্তেফাকের হিসাব বিভাগের লোকজন অবশ্য আমাকে চিনত কারণ ইত্তেফাক নগদ সম্মানি দিত । জনকণ্ঠ, মুক্তকণ্ঠ, যুগান্ত্রর ইত্যাদি চেক প্রদান করত ।
আমি বিভিন্ন পত্রিকায় স্বল্পকালের জন্য পেশাগত সাংবাদিকতায় ছিলাম বটে কিন্তু ইত্তেফাকে কখনো চাকরি করিনি । তবু আজো আমাকে অনেকে ইত্তেফাকের সাংবাদিকই মনে করে ।
আজকাল অনেকের কাছে শুনি পত্রিকায় লেখা ছাপা হওয়া নাকি অনেক ঝক্কি । হয়ত সত্যি । কিন্তু বাংলাদেশের প্রায় সকল জাতীয় দৈনিকের নিয়মিত লেখকের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, কারো লেখা যদি প্রকাশযোগ্য তবে ইত্তেফাক সেটা যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে ছাপে ।
ও, আপনি তাইলে সেই মানিক ভাই।
হ, আমিই সেই পুরানপাপী ।
ভালো তো কিছু লিখতেও পারিনা , আর যা লিখি কোথাও দিতে ভয় লাগে তাই শেষ মেশ এই ব্লগ ।
তবে ভুলে গেছি এই নামে কারো লেখা পড়তাম নাকি ইত্তেফাকে
ইত্তেফাকের যত ভক্ত দেখছি আমার বড়মামা তার মধ্যে সেরা। তিনি বেঁচে থাকতে ইত্তেফাক বাদে অন্য কোন পত্রিকা তার বাসায় ঢুকতে পারেনি। আমাদেরকে সবসময় উপদেশ দিতেন ইত্তেফাক পড়ার জন্য।
১৯৯১ সাল। তখন আজকের কাগজ বেরিয়েছে মাত্র। আমি ইত্তেফাক বাদ দিয়ে আজকের কাগজ রাখা শুরু করেছি। বিজ্ঞাপনের উৎপাতে ইত্তেফাক ভালো লাগতো না তখন। মামা একদিন বাসায় এসে দেখলেন আমি আজকের কাগজ পড়ছি। মামাকে দেখেই আমি পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যাই। আমাকে না পেয়ে মামা আমার মাকে ডেকে এমুন ঝাড়ি দিল যে আজেবাজে পত্রিকা পড়তে দিয়ে ছেলেমেয়েকে মানুষ করতে ব্যর্থ হচ্ছে বলে।
এরকম অন্ধভক্ত আমি আর দেখিনি। আমরা বলতাম, ইত্তেফাকের উচিত মামাকে গোল্ড মেডেল দেয়া।
ভাল লাগল। এই বিষয়টা নিয়া একটা সিরিজ লিখতে পারেন।
বাহ দারুন স্মৃতিচারন। ভাল লাগলো।
ও...............এতদিন পরে আইসা বুঝলাম যে,
লাইগা থাকলে আপনের মত শুধু লেইখাই
জীবনটা কাটাইতে পারতাম.... আফসুস !!
ভাল লাগলো পড়ে.।.। মজাও পাইলাম .।আচ্ছা নজু ভাই তুমি ভাল আছিলা কবে সেইটা কওতো একবার। ভাল কিছু শোনাও। তোমার ফাজিল মার্কা গল্প শুনতে শুনতে ভাল মানুষ আর কইতে পারতেছি না । তুমি অন্যের ব্লগের কমেন্ট আইনা নিজে পোষ্ট দিতাছো। তার উপর পড়া শোনা বাদ দিয়া রাস্তায় আড্ডা মারা, মাইয়া মানুষ দেখা।।
ইত্তেফাকের সাথে আমারও মেলা মধুর স্মৃতি মিশে আছে। মনে পড়ে ক্লাস ওয়ানে পড়ার সময় ইত্তেফাকে টারজান কমিক ছাপা হইত। আমার কাজ ছিল সেই কমিক কাইটা কাইটা পেপার ক্লিপ বানানো। বিশাল মোটা এক পেপার ক্লিপের খাতা বানাইছিলাম। পরে আমার পিতৃদেব বদলি হইবার পর বাসা বদলের সময় খাতাটা হারাইয়া ফেলি। বেদনাময় সেই স্মৃতি আজও আমার হৃদয়ে বিষের বীণ বাজায় :(। মনে পড়ে আমার প্রথম প্রেমও হইছিল ইত্তেফাকের মাধ্যমে। আঁখি মিলন সিনেমার বিজ্ঞাপনে অঞ্জু ঘোষের ফটুক অবলোকন করে হয়েছিল আমার প্রথম প্রেম।
আঁখি মিলন ছবিতে অঞ্জু ছিল না, ছিল সুচরিতা ও ইলিয়াস কাঞ্চন। এখন ঠিক কইরা কন কার প্রেমে পড়ছিলেন?
আর অঞ্জুর প্রেমে পড়লে এরম একটা থ্যাবরা নাকের মাইয়ারে কেমনে পছন্দ করছিলেন। নাকি চোখ মুখ পর্যন্ত যাইতো না?
ডিসক্লেইমার: এই ব্লগে আবার অঞ্জুর আত্মীয় আছে। তারে কিন্তু কিছু কই নাই।
তাইলে ঐটা অন্য কোন সিনেমা হইবে। জলকুমারী অথবা গাড়িয়াল ভাই হৈতারে সিনেমার নাম ঠিক মনে নাই তয় ঐটা ডফিনেটলি অঞ্জু ঘোষ ছিল। আর থ্যাবড়া নাকের কথা কি বলিব। পিরিতের পেত্নীও ভাল
আঁখি মিলন ছবিতে অঞ্জু ঘোষ ছিলেননা, ছিলেন সুচরিতা, রানী আর ইলিয়াস কাঞ্চন এবং সম্ভবত প্রবীর মিত্র। এই ছবির একটা গান এখন চরম হিট- আমার গরুর গাড়ি্তে বৌ সাজিয়ে…
প্রবীর মিত্র না, বড় ভাই ছিল মিঠুন।
ছুটুবেলায় বাসায় ইত্তেফাক রাখতো, তখন এডগার রাইজ বারোস এর টারজান ছাপা হইতো দ্বিতীয় পৃষ্ঠার এক্কেরে উপ্রে। পেপার হাতে নিয়া সেইটাই পড়তাম তারপর ভাজ কইরা রাইখা দিতাম।
ইত্তেফাক বুড়াদের পত্রিকা
দারুন স্মৃতিচারন। ভাল লাগলো।
ভালো তো কিছু লিখতেও পারিনা , আর যা লিখি কোথাও দিতে ভয় লাগে তাই শেষ মেশ এই ব্লগ ।
তবে ভুলে গেছি এই নামে কারো লেখা পড়তাম নাকি ইত্তেফাকে..:
আমি কই নাই সাঈদ ভাই কইছে
ব্যাপক ইতিহাস দেখি ইত্তেফাকের সাথে। মাসুম ভাই, আপনে।
আরো লেখবেন নাকি এইটা নিয়া?? আরো কোন কাহিনী??
স্মৃতিচারণের লিগ্গা একখানা মেগা সাইজ ধইন্যাপাতা ।:)
মন্তব্য করুন