সালমার পোষা প্রাণীরা
১)
‘এইটা কি রকম বাসায় আনছেন?খালি ইন্দুর আর ইন্দুর!!!’
ইচ্ছা করে স্ত্রীর গালে কষে একটা চড় দিতে,তবু বহু কষ্টে নিজেকে সামলায় মনির।মেয়ে মানুষ,বুদ্ধিকম-এইসব বুঝিয়ে নিজেকে ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করে।সারাদিনে কেবল এই দুপুর বেলাটাই আরাম করে ভাত খায় সে।নির্বোধ মেয়ে মানুষের জন্যে সেই আনন্দ মাটি করার কোনো মানে হয় না।
‘এই বাসায় আমি থাকতে পারবো না।আপনে অন্য বাসা দ্যাখেন।’
পুটি মাছের ভাজাটা এবার বিস্বাদ ঠেকতে শুরু করে মনিরের মুখে। ‘আজাইরা কথাবার্তা বলবা না,সালমা।ঢাকা শহরে যে মাথা গুঁজার মতো ভদ্র একটা ঠাঁই পাইসো,তাতেই আল্লাহ পাকের শুকরিয়া আদায় করো।যে দিনকাল পড়ছে,কত ভালো ঘরের মানুষেরা বস্তিতে গিয়া সংসার পাততেছে জানো?’
‘আমি ওইসব বুঝি না।এই বাড়ি ভরা ইন্দুর ;সারা রাত খুটুর-খুটুর করে,দৌড়াদৌড়ি করে।আপনে থাকেন না বাড়িতে,ভয়ে আমি সারা রাইত ঘুমাইতে পারি না।আপনে বাসা বদলের ব্যবস্থাা করেন।’
‘আবার সেই বেকুবের মতন কথা!এত বড় মানুষ তুমি.. .. ..ইন্দুর কি খাবে তোমারে?নাকি খাইতে পারবে?ইন্দুরে মানুষ খায়?’
‘আমার মনটা জানি কেমন কেমন করে এইখানে.. .. ..আপনে দ্যাখেন না একটু চেষ্টা কইরে,যদি অন্য একটা বাসা.. .. ..’
‘তোমারে তো আগেই বলছিলাম,গেরাম থেইকে আসার দরকার নাই। মাইয়া মানুষ,শহরে তোমার কাম কি?আজাইরা আমার যন্ত্রণা বাড়াইতে আসছো।’
কথাটা অবশ্য ঠিক।মনির সত্যিই স্ত্রীকে গ্রাম থেকে আনতে চায়নি। তাছাড়া শুধু আনলে তো হয় না,ঢাকা শহরে জীবন যাপনের একটা বাড়তি খরচও তো আছে।এজন্যই হয়তো ঠিক পছন্দ হয় না সালমার।মুখ কালো করে স্বামীর পাতে মিষ্টি কুমড়ার চ্চচড়ি তুলে দেয় সে।
‘আপনেরে ঠিক বুঝাইতে পারবো না.. ..আমার কিন্তুক সত্যিই অনেক ভয় করে।মনে হয় এই গুলান ইন্দুর না,অন্য কিছু।’
জবাব দেয় না মনির।গম্ভভীর মুখে বলে,‘ডাউল দিয়া ডাঁটার তরকারীটা ভালো হইছে।কালকে আরেকবার রানবা।’
‘.. .. ..আপনের আল্লাহর দোহাই,আমার কথাটা একটু শোনেন।এই বাসায় থাকলে আমি ভয়েই মইরে যাবো।.. .. .’
এবার হতাশায় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনির।বলা ভালো,ফেলতে বাধ্য হয়।একটা মার্কেটে নাইট গার্ডের চাকরী করে সে।সেই বেতনে তো আর সংসার চলেনা,অগ্যতা দুপুরের পর একটা মুদী দোকানে কাজ করে সে।এগরোটা পর্যন্ত দোকান করে তারপর আবার ডিউটি দিতে যায় মার্কেটে।তারপর যদি বাসায় এসে শুনতে হয় এই সব অর্থহীন প্যাচাল.. ..
ভালো লাগে?না লাগানো যায়?
আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সালমার স্বামী মনির।এখন তো মনে হচ্ছে এই ইদুরের সমস্যা দীর্ঘকাল ভোগাবে!
২)
অবশ্য কেন জানি মনিরের দুঃশ্চিন্তা বাস্তবে রূপ নেয় না।কয়েকদিন খ্যাচখ্যাচ করে বটে সালমা,তবে একসময় জগতের নিয়ম মেনে সমঝোতাও করে নেয় পরিস্থিতির সাথে। ইদুরের কথা জানতে চাইলে এখন বলে-“আপনে কিছু চিন্তা কইরেন না।এরা আমার পোষ মানানো।”
ইদুরকে কিভাবে পোষ মানায় আল্লাহ-মাবুদ জানেন।তবে সত্যি কথা বলতে কি-মাঝেমাঝে দুএকটাকে দৌড়ে যেতে দেখেছে বটে,কিন্তু এমন আহামরি কোনো ইদুর মনিরের কখনও নজরে পড়েনি।
‘আপনে বাসায় থাকেন যে চোখে পড়বে?’স্বামীর প্লেটে ভাত তুলে দিতে দিতে বলে সালমা।মুখ টিপে হাসে একটু।‘আমার কথা তো আপনের মনেই পড়ে না।সকাল বেলা আইসে ঘুম দ্যান। দুফুরে উইঠে গোসল কইরে ভাত খান। তারপরে তো আবার হাওয়া। দুইটা সুখ-দুঃখের কথাও তো আপনের সাথে কইতে পারি না।’
‘লবণ দ্যাও সালমা.. .. ..কি করবো কও!আমারও তো ইচ্ছা করে তোমার সাথে থাকতে।’লবণে ভাত মাখতে মাখতে বলে মনির।‘কিন্তু কামাই না করলে খাবা কি?একটা চাকরিতে এখন আর সংসার চালানো যায় না।’
আঁচলের কোণে চোখ মোছে স্ত্রী,স্বামীর পাতে তুলে দেয় ডালের বড়া।‘আমি জানি,আপনে অনেক কষ্ট করেন।এই জন্যে আরও কষ্ট লাগে।’
‘মন খারাপ করবা না।জীবনে টাকা কামাইতে গেলে কষ্ট তো করাই লাগে।.. .. ..ভেন্ডির এত ভালো চচ্চড়ি তুমি কই শিখলা?’
‘ভালো হইছে?’
‘খুবই ভালো হইছে,সুমিরের মা।’
খুশিতে ঝলঝল করে ওঠে সালমার চেহারা।কোন কারণে খুব খুশি হলে তাকে “সুমিরের মা” ডাকে মনির।মানুষটার বড় শখ- একটা ছেলে হলে তার নাম রাখবে “সুমির”.. .. ..মনিরের ছেলে সুমির।
‘রান্নাটা পাশের বাড়ির তানিয়ার মা শিখাইছে। কেমনে করতে হয় জানেন?.. ..ভেন্ডিরে বড় বড় টুকরা কইরে নিতে হয়।তার সাথে এক মুঠ ডাউল, হলদি,লবণ আর পানি দিয়া চুলায় বসায় দিতে হয়।সেই সাথে দেওয়া লাগে বেশী কইরে পিঁয়াজ। যখন পানি শুকায় আসে,কাঁচা মরিচ দিয়ে নামায় নিতে হয়।’
‘তোমার রান্ধার হাত ভালো।আমার আম্মার মতন ভালো।একদিন তোমারে সিনেমা দেখাইতে নিয়া যাবো।’
‘সত্যি নিবেন?’
‘জানো তো,আমাদের কোনো ছুটি নাই।তারপরেও ছুটি চাবো।কোনখানে যাবা কও-সিনেমা দ্যাখবা,না শিশুমেলায় যাবা?’
ছোট মানুষের মতো খিলখিল করে হাসে সালমা।‘দুই খানেই যাবো।.. .. ..এখন বলেন চিংড়ি মাছ কেমন হইছে?ঝাল ঠিক আছে?’
‘সব ঠিক আছে।খুবই ভালো হইছে তোমার রান্না।.. ..আচ্ছা,একটা কথা শোনো-বাড়িত যাইবা?বলো তো তোমারে কয়দিনের জন্যে দিয়া আসি। শ্বশুড় বাড়ি,বাপের বাড়ি দিয়া বেড়ায় আসো।’
এবার মুখটা আরিক অর্থেই অন্ধকার হয়ে আসে সালমার।‘আপনেরে ছাইড়ে যাইতে তো মন করে না।কি খাইবেন না খাইবেন.. .. কিন্তুক বাড়িত যাওয়াও দরকার।শুনছি আমার মা নাকি খুব অসুস্থ।’
‘আম্মা অসুস্থ?কে বলছে তোমারে?’
‘ইন্দুরেরা বলছে!’খুুুব আস্তে আস্তে জবাব দেয় সালমা।শোনা যায় না,এমন নিচু স্বরে।
এই এক নতুন যন্ত্রণা!
মাঝে মাঝে অদ্ভভুত অদ্ভভুত কথা বলা শুরু করেছে সালমা।বলে- তাকে নাকি এইসব তার পোষা ইদুরেরা বলেছে।কখনও মায়ের অসুখ, কখনও নতুন রান্না, কখনও নতুন কোনো হুজুর সাহেবের ঁেখাজ. .. ..ইত্যাদি ইত্যাদি।
বরাবরের মতোই আজও পাত্তা দেয় না মনির,নীরবে ভাত খেয়ে যায়। বান্জা মেয়ে লোক,সারাদিন একলা থাকে বাসায়। না আছে সন্তান,না আছে কথা বলার একটা মানুষ।নিজের কল্পনাতেই হয়তো ইদুর গুলোর সাথে কথাবার্তা বলে সে। মনের ভ্রম আরকি!
‘.. .. ..আপনেরে যেই পীর সাহেবের কথা বলছিলাম,গেছিলেন তার কাছে?.. ..’নীরবতাকে সম্মতি ধরে নিয়ে গল্প শুরু করে সালমা।‘.. ..সময় কইরে একটু যান না একদিন।আমি শুনছি তিনি অনেক কামেল পীর। ইন্দুরেরা বলছে.. .. ’
৩)
সপ্তাহে আসলে একটা দিন ঠিকই ছুটি পায় মনির।শুধু সে না,পালাক্রমে সকলেই পায়।ছুটি ছাড়া কি কাজ করতে পারে মানুষ?
ছুটি পায়,কিন্তু বাড়িতে আসে না সে।কালে ভদ্রেও কোনো দিন আসে না।আজ কি মনে করে সন্ধ্যা না হতেই চলে এসেছে।বাইরে ঘোর বর্ষন, দোকান বন্ধ করে মালিকও চলে গেছে বাসায়।
ঝাল করে পেঁয়াজু বানাতে বলেছে সালমাকে।সাথে ছোলা ভাজি,মুড়ি, কড়া লিকারের চা।আর রাতে করতে বলবে খিচুড়ী।ঘি,আলু আর মুগের ডাল দিয়ে নরম খিচুড়ী।দমে দেয়ার সময় ওপরে কয়েকটা লাউপাতা বিছিয়ে দিয়ে ঢাকনা দিয়ে রাখতে হবে দশ মিনিট।আর সাথে যদি কয়েকটা পুটি মাছের ভাজা হয়.. ..
মজার ব্যাপার হলো,আজ ঘন্টা খানেকের মাঝেই বেশ কয়েকটা ইদুরকে দৌড়ে যেতে দেখেছে মনির।বেশ বড়সড় তাদের সাইজ,ঘরের এপাশ থেকে ওপাশ দৌড়ে যায় চোখের পলকে।
সমস্যা কি আজকে?রাতের বেলা বলে বেশী চোখে পড়ছে?নাকি বৃষ্টি বলে?.. .. ..হ্যা,সেটাই হবে হয়তো। বৃষ্টি পড়ছে,এদের থাকার র্গতগুলো পানিতে ভরে গেছে।সব এসে উঠেছে এই বাসায়।
সালমা মনে হচ্ছে ঠিক অভিযোগই করেছিল!
বাড়ি বলতে একটা মাত্র ঘর শুধু,সাথে বাথরুম আর ঘুপচি এক রান্নাঘর।খাটে শুয়েই সালমাকে দেখতে পায় মনির-পিঁয়াজু ভাজছে,ছ্যাক ছ্যাক শব্দ হচ্ছে তেলের মাঝে পিঁয়াজু ছাড়ার।মনে হচ্ছে ঠোঁটজোড়া যেন নড়ছে তার,বিড়বিড় করে কথা বলছে কারও সাথে।ভাজা-ভাজির শব্দে আওয়াজটা ঠিক এসে পৌছাচ্ছে না এতদূর।তবু আবছা আবছা কিছু শুনতে পায় মনির.. .. ..
‘.. ..যা,আইজকে বিরক্ত করিস না তো!.. ..আরে দিবো তো খাবার ।দিবো না বলছি?.. ..একটু আগেই না দিলাম!.. .. রান্নাটা তো সাইরে নেই।.. ..মানুষটা অপো করতেছে।.. ..’
‘কার সাথে কথা কও,সালমা?আমারে ডাকো নাকি?’
একটা ডাকেই থেমে যায় কথাবার্তা,জবাব আসে না কোনো।তবু আরেকটু
গলা চড়ায় মনির।
‘শুনতেছো,সুমিরের মা?.. ..শুনতেছো?’
‘হু.. ..বলেন।’
‘বাসা বদলানো নিয়া ঘ্যানঘ্যান তো কম করলা না.. ..আমি ভাবলাম এই বার বাসাটা বদলায়েই ফেলি।দুই গলি পরে একটা বাসা দেখছি।এই রকম এক রূমই,কিন্তু সাথে বাড়তি একটা বারান্দা আছে।.. ..শুনতেছো?’
‘হু.. ..’
‘বারান্দাটা খুব সুন্দর!তোমার অনেক পছন্দ হবে।বিকাল বেলায় বইসে থাকতে পারবা,গাছ-গাছালিও লাগাইতে পারবা।যাবা নাকি একদিন দেখতে?.. ..যাবা সুমিরের মা?’
‘যাবোনে।’
‘ভাড়াও কিন্তু বেশী না।এইটার চাইতে তিনশো টাকা বেশী মাএ।কিন্তু শোয়ার ঘরটা বড় অনেক।’
খাবার গুলো নিয়ে এসে বিছানায় বসে সালমা।একটা বাটিতে ছোলা,মুড়ি,পিঁয়াজু একসাথে মাখায়। সাথে সরিষার তেল,শশা,কাঁচা মরিচ,পিঁয়াজ।আর একটু চানাচুর।প্রতিটি নাড়াচাড়ার সাথে সাথে রিনঝিন শব্দ তুলতে থাকে হাতের চুড়িগুলো।
‘একটা বলবো আপনেরে?’
‘ওই পীর সাহেবের কথা তো?.. ..বিশ্বাস করো,সময় পাইতেছি না।সময় পাইলেই যাবো।তোমাওে সাথে নিয়া যাবো।’
‘আমি এই বাড়ি ছাইড়ে যাবো না।এই খানেই থাকবো।’
এরকম জবাবই আশা করেছিল মনির,তাই বিস্মিত বোধ করে না।তবে ভান করতেও ভুল করে না।
‘এইটা এখন কি বলো সালমা?প্যানপ্যান কইরে তো অস্থির কইরে ফেলছিলা আমারে।এত কষ্ট কইরে বাসা যোগাড় করলাম,এখন তুমি বলো যাবা না।এগুলি কেমন কথা?.. ..তাছাড়া বাসা ভরা তো ইন্দুর দেখতেছি। এর মধ্যে থাকবা কিভাবে?’
‘ইন্দুরা আমার পোষ মানছে।এদের নিয়া কোনো সমস্যা নাই।আপনের কোনো সমস্যা থাকলে বলেন।আপনে বললে তো অন্য বাসায় যাইতেই হবে।’
‘না,তোমার কোনো অসুবিধা না থাকলে আমি কথা করয়ার কে?কিšক—ু জানো,অনেক কষ্ট কইরে বাসাটা তোমার জইন্যে খুঁইজে বাইর করছিলাম।’
এবার একটুখানি হেসে ফেলে সালমা।‘আপনে কি আমারে খুশি করার জইন্যে কথাগুলা বলতেছেন?আর মিথ্যা বলার দরকার নাই,আমি খুশি হইছি।’
যেন আকাশ থেকে পড়ে মনির।‘মিথ্যা কি বললাম?আমি সত্যিই বাড়ি দেখছি।’
‘না,দ্যাখেন নাই।আমারে ওরা বলছে।’
‘কারা বলছে?’
‘ইন্দুররা.. .. ..’
মনিরকে হতভম্ব করে দিয়ে খিলখিল শব্দে হাসতে শুরু করে সালমা।হাসতে থাকে.. .. ..
আর হাসতেই থাকে!
৪)
খাওয়ার সময়েও মুখ টিপে হাসে সে,আঁচলে মুখ লুকিয়ে হাসতে থাকে অকারণেই।
খিচুড়ী খুব ভালো হয়েছে। সাথে আরও বেশ কয়েকটা আইটেম করেছে সালমা।কালিজিরার ভর্তা,বেসন দিয়ে ডিমের বড়া,রসুন আর সরিষার তেল দিয়ে শুকনা মরিচের ঝাল,বেগুনের ভাজা।এমন কিছু আহামরি খাবার নয়,তবে মনিরের অতিপ্রিয়।
কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে সবই বিস্বাদ ঠেকে আজ জিহবায়।এক লোকমা খিচুড়ী মুখে দিয়েই খাওয়ার উৎসাহ হারিয়ে ফেলে মনির।এমন না যে রান্না খারাপ হয়েছে।সমস্যা হলো-কোনো একটা কারণে তেতো হয়ে আছে মনের ভেতরটা।
‘খাইতে ইচ্ছা করতেছে না,সালমা।বমি বমি আসতেছে।’
‘খাইবেন না ক্যান?রান্না খারাপ হইছে?’
‘না.. .. তোমার রান্না কি কোনোদিন খারাপ হয়?আমার ক্যান জানি ভালো লাগতেছে না।’
‘শরীর খারাপ লাগতেছে?’
‘হু.. ..জ্বর-টর হবে মনে হয়।’
জবাবে খাবারের প্লেট সরিয়ে নেয়ার বদলে স্বামীর পাতে বরং সবগুলো আইটেম যতœ করে তুলে দিতে থাকে সালমা।
‘শুনেন,আপনের কিছুই হয় নাই।কোনো করণে আপনে ভয় পাইছেন,তাই খাইতে ইচ্ছা করতেছে না।কি কারণে আপনে ভয় পাইতেছেন,সেইটাও আমি জানি।’
‘কি আবোল-তাবোল কথা কও তুমি?মাথা কি খারাপ হয়ে গেছে?আমি ভয় পাবো কি নিয়া?’
‘আমারে নিয়া পাবেন.. ..কিন্তুক ভয় পাইয়েন না।’ষড়যন্ত্রীদের মতো গলা নিচু করে বলে সালমা।‘আপনে যেইটা নিয়া ভয় পাইতেছেন,সেইটা আমি আগে থেইকে জানি।’
‘এই সব কি বলতেছো তুমি,সালমা?’
‘বললাম তো,ভয় পাইয়েন না।আমি সব জানি,আর আমার কোনো আপত্তি নাই।আপনে যা করছেন,ঠিকই করছেন।নিজের সুখের কথা চিন্তা করছেন আপনে-এত কোনো দোষ নাই।’
‘কিসে দোষ নাই?কি করছি আমি?’চরম আতঙ্কিত হয়ে বলে মনির।
জবাবে আাঁচলে মুখ ঢেকে হাসতে শুরু করে সালমা।‘আপনে যে আরেকটা বিয়া করছেন,সেইটা জানি আমি।আমি গেরামে থাকতেই যে করছেন,তাও জানি।’
‘আজাইরা কথা বন্ধ করো!’ধমকে ওাার চেষ্টা করে স্বামী।‘এইসব হাবিজাবি মিথ্যা কথা কে বলছে তোমারে?’
‘আমার পোষা ইন্দুরেরা বলছে.. ..তারা কোনোদিন মিথ্যা বলে না।’
‘তোমার যে মাথা খারাপ হয়ে গেছে-এইটা কি বুঝতেছো?’
আবার শব্দ করে হাসতে থাকে সালমা।‘ইন্দুরের সাথে কথা বলি,মাথা তো অবশ্যই খারাপ।ছেলে-পেলে ছাড়া মাইয়া মানুষের মাথা একটু খারাপই হয়।.. ..কিন্তুক আপনে চিন্তা কইরেন না।আপনের দ্বিতীয় বউরে নিয়া আমার কোনো আপত্তি নাই।বয়স হইতেছে আপনের,পুলা পানের বাপ-ও তো হওয়া লাগবো।’
হঠাৎ করেই আবার শান্ত হয়ে যায় মনির।যেন বুঝতে পারে উত্তেজিত হয়ে লাভ হবে না কোনো।মিটবে না সমস্যা।
‘কাজটা অন্যায় করছি।তোমারে কওয়া উচিত ছিল।কিন্তুক ভয় পাইছি।মনে হইছে সব জানলে আমারে ছাইড়ে চইলে যাবা তুমি।’
‘অত সাফাই দেওয়া লাগবে না।আপনে খাওয়া শুরু করেন তো!খিচুড়ী ঠান্ডা হয়ে গেলে খাওয়া যায় না।’
‘আমারে মাফ কইরে দ্যাও তুমি।অনেক বড় অন্যায় কইরে ফেলছি তোমার সাথে।সন্তাণ পেটে না থাকলে আইজকেই তালাক দিতাম ওই বেটিরে আমি।’
‘তালাক দিবেন ক্যান?তার কি দোষ?.. ..সে কি আমার কথা জানে?’
‘না.. ..মানে...’
‘থাক,জানানোর দরকার নাই।পোয়াতী মানুষ,শেষে একটা বিপদ হইয়ে যাবে।.. ..আপনের আর কষ্ট পাওয়া লাগবে না।খাওয়া শুরু করেন তো!!’
বাধ্য ছেলের মতো খাওয়া শুরু করে মনির।এবং আজব ব্যাপার হলো এবার আর বিস্বাদ লাগে না কোনো কিছু।আরাম করে খেতে শুরু করে সে।
‘তুমি কি জানো সুমিরের মা-কত ভালো মেয়ে তুমি?’
আগের মতোই মুখ টিপে হাসছে এখনও সালমা।‘কি রকম ভালো?রূবির চাইতে বেশী ভালো,না কম ভালো?’
‘তার নাম তোমারে কে বলছে?’সহজ সুরেই প্রশ্ন করে মনির।‘কে বলছে তোমারে সব কথা?’
‘বলছি না -ইন্দুরেরা বলছে আমারে!’
‘কি যা-তা বলো?’
মনির কে অবাক করে দিয়ে আবার হাসতে শুরু করে সালমা।কষ্ট গোপনের হিসাবি হাসি নয়,আনন্দ মাখা বেহিসাবী হাসি।কিংবা.. .. .
একজন অপ্রকিতস্থ মানুষের হাসি!!
৫)
ঘুমটা কেন ভাঙলো,ঠিক বুঝে উঠতে পারে না মনির। খানিকণ চোখ পিটপিট করে অবস্থাটা ঠাহর করার চেষ্টা করে।
রাস্তার লাইটপোস্টের কারনে ঘরে আলো আছে যথেষ্ট।সেই আলোতেই দেখে যে সালমা নেই পাশে।রান্ন্ ঘরে গেছে বোধহয় পানি-টানি খেতে.. ..
‘উহ!!!’
ব্যথায় চমকে উঠে পা ঝাড়া দেয় মনির।কি যেন একটা কামড়ে দিয়েছে বুড়ো আঙুলে.. .. ..ইদুর নয়তো?
ভয়ের এটা শীতল স্রোত বয়ে যায় মনিরের শরীর বেয়ে,যখন ভালো করে তাকিয়ে দেখে যে বুড়ো আঙুলটা রক্তে মাখামাখি।এবং ভয়াবহ ব্যাপার হলো বিছানার চাদর বেয়ে ঝুলে রয়েছে বড়সড় কয়েকটা ইদুর,ওপরে ওঠার চেষ্টা করছে.. ..
ঘর ভরে গেছে ইদুরে.. ..
নিজেদের সমস্ত লুকানো জায়গা থেকে ক্রমশ বের হয়ে আসছে তারা। ছোট-বড়-মাঝারি.. ..নানান আকারের ইদুর।ধূসর-কালো,লোমশ তাদের শরীর।চোখগুলো টকটকে লাল.. ..
ইদুরের চোখ কি লাল হয়??
স্মরণ করার চেষ্টা করে মনির।আর সেই ফাঁকে কয়েকটা উঠে পড়ে গায়ের উপর।ধারালো দাঁতে কামড়ে দেয়ার চেষ্টা করে।
চিৎকার করে ইদুর গুলোকে ঝেড়ে ফেলে সালমার স্বামী।আতঙ্কে অবশ হয়ে আসতে শুরু করে শরীর।এত গুলো ইদুরের প্রত্যেকে যদি একটা করেও কামড় দেয় তার দেহে.. .. ..
বিছানা থেকে নামতেও সাহসে কুলায় না।কেননা ঘর ভরে গেছে ইদুরে,মেঝেতে গিজগিজ করছে অসংখ্য লোমশ শরীর।ক্রমশ এগিয়ে আসছে তারা.. .. ..
মনিরের দিকে এগিয়ে আসছে!!!
সালমা কই??সালমা??
গলা উচিয়ে স্ত্রীকে বারকয়েক ডাকে মনির।ভয়ে হাত-পা কাঁপতে শুরু করেছে তার,কণ্ঠ-ও জড়িয়ে আসছে।এই ইদুর গুলি কি সত্যি সত্যিই কামড়ে দেবে তাকে?ইদুরে কি মানুষ খায়?
একমাত্র সালমাই বোধহয় পারবে এদের থামাতে।এরা নাকি সালমার পোষ মানানো.. ..
মনির তখনও জানে না যে সালমার মৃতদেহ পড়ে আছে রান্নাঘরের স্যাতস্যাতে মেঝেতে-বিষ খেয়েছে সে।এবং আরও অদ্ভভুত ব্যপার হলো,কয়েকটা আকৃতির ইদুর শান্ত ভাবে বসে আছে সেই মৃতদেহকে ঘিরে।
যেন পাহাড়া দিচ্ছে!
পরিুশষ্ট :
চরম আতঙ্কিত হয়ে দেখে মনির.. .. ..
ইদুরগুলো অবশেষে উঠে পড়েছে তার বিছানায়।
চিৎকার করে ওঠে সে,যখন কতগুলো ইদুর ঝাঁপিয়ে পড়ে তার শরীরের ওপর।একটি ছোট আকারের ইদুর ঢুকে যায় তার মুখ গহবরে.. .. ..
বন্ধ করে দেয় চিৎকার!!!
!





একটানে পড়ে ফেললাম গল্পটি। পড়তে গিয়ে বারবার মনে হচ্ছিলো আমি হুমায়ূন আহমেদের কোন গল্প পড়ছি! সংলাপ চয়ন অনেকটাই সেই ঘরানার, সম্ভবত তাই।
এবিতে স্বাগতম আপনাকে। বেশি বেশি লিখুন, নিয়মিত লিখুন।
স্বাগতম
দুর্দান্ত লাগলো গল্পটা। দারুণ।
বানানের কিছু সমস্যা আছে। ঠিক করে দিয়েন পারলে। সম্ভবত আগে বিজয়ে লিখে ইউনিকোডে কনভার্ট করেছেন। তাই কিছু টাইপো রয়ে গেছে।
আর বিরাম চিহ্নের পর একটা স্পেস দিলে পড়তে আরাম লাগতো।
সবশেষে আবারো বলি, গল্পটা দারুণ হয়েছে। একদমে পড়লাম।
অসাধারন
সুন্দর গল্প
আপুমনি কি সজ্ঞানে হুমায়ূন আহমেদের ষ্টাইল ফলো করলেন না অজ্ঞাতে। আপনার গল্পের যে ধার, আপনার নিজস্ব ষ্টাইলেও কিন্তু মারাত্বক হতো বলে আমি মনে করি।
শুভকামনা। আরো অনেক গল্প পড়তে চাই
অন্য কারো মত না, নিজের মত লিখুন। সুন্দর গল্পটা।
গল্পটা সুন্দর ।আমারো হুমায়ুন আহমেদের কথা মনে পড়েছে।
লিখতে থাকেন একদিন নিজের স্টাইল বের হইয়ে যাবে। আর গল্পের মধ্যে এত খাওয়া দাওয়া না দিলেই পারতেন বিশেষ করে ঘি,মুগের ডাল কারন নাইটগার্ড এর বাড়ি এই সব একটু বাড়াবাড়ি।
"রুমানা বৈশাখী'' স্বনামেই খ্যাত এবং শক্তিশালী গল্প উপহার দেবার মত পারঙ্গম গল্পকার। রুমানা আপু, খুব ভাল লাগছে আপনাকে এখানে দেখে, একথাটি প্রথম কমেন্টে বলা হয়নি।
দুর্দান্ত একটা গল্প! শেষে একটু চমক ছিলো।
হুআ'র দ্বারা প্রভাবিত মনে হয় কারন গল্পে প্রচুর জিভে জল ঝড়ানো খাবার দাবারের কথা এসেছে। রান্নায় দ্রৌপ্রদী স্টাইল......।
বাহ্ বেশ ভয় ধরানো গল্প! একটানে পড়ে ফেললাম।
ভয়ের গল্প লেখা সহজ না...আমি ভয় পাই নাই
ভাল লেগেছে। ঢাকা শহরের জীবন!
বাহ। একটানে পড়ে ফেললাম। থুবই ভাল লাগছে।
এবিতে স্বাগতম।
দারুণ লাগলো গল্পটা পড়ে।
স্বাগতম এ বি তে।
গল্প পড়ে ভালো লাগলো। হুমায়ুন আহমেদ ফলোর বিষয়টা জানি না। আমার কাছে ওরকম মনে হয় নি। আপনি কি সাঈফ আলী খানের বিং সাইরাস মুভিটা দেখেছেন?
ব্লগ পড়ার সবচেয়ে পজেটিভ সাইডের উদাহরন এ গল্প শেষে পাঠক-মন্তব্যগুলো।
হুমায়ুন আহমেদের একটা উপন্যাস আছে (দুঃখিত নামটা মনে আসছে না) যেখানে প্রধান নারী চরিত্রটি আশ্রিত বাড়ির কুকুর লেলিয়ে দিয়ে হত্যা করে voyeur দারোয়ানকে। তারা স্বামী-স্ত্রী সে বাসায় কেয়ারটেকার হিসাবে থাকে এবং স্বামীটি বাড়ির মালিকের আগমন নিয়ে দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকে। যদিও স্ত্রীটি স্বামীকে এগুলো নিয়ে ভাবতে মানা করে। কারন সে আগে থেকেই জানে (!) বাড়ির মালিক ফিরবে না।
আর উর্মিলা মাতোন্দকর-সাইফ আলী খান অভিনীত 'এক হাসিনা থি' ছবিতে উর্মিলা সাইফ কর্তৃক প্রতারিত হয়ে জেলে যাবার বদলা নেয় তাকে ইদুর ভর্তি এক গুহায় আটকে রেখে। মাসুদ রানার একটা বইয়েও (বন্দী গগল) আছে ইদুরভর্তি গুহায় রানাকে আটকে রেখে তিলে তিলে মারতে চাওয়ার কাহিনী।
লেখায় হুমায়ুন আহমেদের প্রভাব আছে হয়তো। কিন্তু অবোধ্য, জটিল গদ্যের চেয়ে সাবলীল লেখা পড়তেই বেশি মজা পাই।
লেখককে অসংখ্য ধন্যবাদ।
এবিতে রেজিস্টার করার সাহস হারাইয়া ফেলসি পুরোপুরি।
হু,আ'র বইটা বোধহয় পারুল ও তিনটি কুকুর।
ইঁদুরসাহিত্য যেখানে যা আছে সব তুলে এনেছেন দেখি! আমার একটা মনে পড়ছে, পাইড পাইপার অফ হ্যামেলিন।
প্রিয় আসিফ, আপনার মন্তব্য দেখলেই পড়ি, নিয়মিত লেখাও দেখতে চাই, প্লিজ রেজি: করুন তাড়াতাড়ি। এবিতে আহমাদ মোস্তফা কামাল, জ্বিনের বাদশা, শওকত মাসুম, রুমানা বৈশাখী, লীনা দিলরুবার মতো অনেকগুলো সুকৃতী নাম আছে, আবার আমার মতো হুদাইটাইপ লোকজনও কম নাই। কাজেই "সাহস হারানো"র কথা মানা গেলো না
@নুশেরা আপু, আমরা বন্ধু ব্লগে আমার আগমন মাসুম ভাই আর আপনার লেখা অনুসরণ করতে করতে। আর ঢুকে এত এত ভাল লেখা পড়ছি যে আসলেই আমি একটু দ্বিধাগ্রস্ত। আমার মত নাদান এখানে রেজিস্টার না করলেই বরং ব্লগের মান যথার্থভাবে রক্ষা হবে বলে মনে করি। মাঝে মাঝে দু'একটা মন্তব্য করতে পারি মডারেটরদের কৃপায়, তাতেই আপাতত আমি ধন্য। সত্যি বলতে কি ব্লগ পড়ার অভিজ্ঞতা আমার সাকুল্যে তিনমাস, তাই এ মূহুর্তে বিভিন্নজনের ব্লগ পড়ে ব্লগ সম্পর্কে একটা ধারণা নেবার চেষ্টায় আছি। হয়তো কোন একদিন!
আমার মত আব-জাব পড়া পাঠক আর কখনোই কলম ভাঙার চেষ্টা না করা একজনের প্রতি আপনার মন্তব্য মন্তব্যকারীর বিশাল, সহৃদয় মনের পরিচয় দেয়।
মীর ভাইয়ের কথা ধার করে বলি-
@রুমানা বৈশাখী, দুঃখিত আপনার ব্লগে অযাচিত, বড় মন্তব্য করার জন্য। নিজগুণে মার্জনা প্রার্থনীয়।
এই ব্লগে আমি হচ্ছি সবচেয়ে নাদান পোলা।আমি রেজিঃ করে লিখে ফেলেছি আর আপনের মন্তব্য পড়লে বুঝা যায় আপনে ভাল লিখতে পারবেন।
দারুণ উপভোগ্য গল্প। রুমানা বৈশাখীর গল্প নিয়মিত চাই এবিতে।
মনিরের দ্বিতীয় স্ত্রীর প্রসঙ্গের পরপর কেন যেন মনে হচ্ছিলো মনির ইঁদুর মারার বিষ নিয়ে আসবে। তখন সালমা মনিরের আনা বিষ খাবে আর ইঁদুরগুলো মনিরকে মেরে ফেলবে।
আরে, রুমানা বৈশাখি...এখনো আমার হাতে রহস্য পত্রিকা ধরা, অবশ্য রহস্য পত্রিকাতেই পড়ছি আপনার লেখা..
ভালো লাগছে..
এবিতে আপনাকে স্বাগতম।
মন্তব্য করুন