শাস্তি
১)
মাছটা কালো রঙের,তার মাঝে কি রকম যেন লালচে একটা আভা ছড়ানো। গোটা এ্যাকুরিয়াম ভরা মাছের মাঝে কেবল একটাই আছে।
জিমরান বাবার কাছে মাছটা কেনার আগ্রহ প্রকাশ করতেই ইতস্তত করে মাথা নাড়ে দোকানী।জিমরানের দিকে চেয়ে হাসার চেষ্টাও করে।
`‘এইটা কেন নিবেন,বাবা?কত্ত রকমের মাছ আছে.. ..এই যে দ্যাখেন,কি সুন্দর অ্যাজ্ঞেল ফিস!আপনি বরং এই গুলি এক জোড়া নিয়ে যান। এক জোড়া গাপ্পি ফিশও নিতে পারেন।'’
‘`এইগুলি তো আগের বারেই নিলাম!’' ঠোঁট উল্টায় ১০বছরের জিমরান।` ‘আপনি জানেন আমার এ্যাকুরিয়ামে কত ফিশ আছে?’`
জিমরানের বাবা আজাদ সাহেব মাছ-টাছের ব্যপারে অত কিছু বোঝেন না।ছেলের শখ,তাই কিনে দেন।এবং কেন জানি তার মনে হয় মাছগুলির প্রতি ছেলের সেই রকম কোনো ভালোবাসা নেই,সেগুলি কেবল তার বিচিত্র কোনো খেলার অংশ।কারণ প্রায়ই একটা-দুটো মাছ মারা যাচ্ছে,এবং সেগুলোর স্থান পূরণ করতে নতুন মাছ কিনতে হচ্ছে তাকে।
তবে একটা ব্যাপার তিনি নিশ্চিত জানেন-অদ্ভভুত চেহারার মাছটা যখন জিমরানের মনে ধরেছে,তখন সেটাকে না নিয়ে এই দোকান ছাড়ছে না জিমরান।ছেলে তার সাংঘাতিক রকমের জেদী।
‘`ওই মাছটাই প্যাকেট করে দেন।’`শান্ত ভঙ্গিতে দোকানীকে অনুরোধ করেন তিনি।‘`কত দেবো?`’
`‘টাকা তো বিষয় না,ভাই সাহেব।বিষয় হলো-মাছটার ব্যপারে আমি সেইরকম কিছু জানি না।একটা ছেলে আইসে বিক্রি কইরে গেছে গেলো সপ্তাহে।আমি দোকানে ছিলাম না,আমার ভাতিজা কিনে রাখছে।`’
‘`সমস্যা কি?অন্য কেউ কিনবে বলে গেছে?’`
‘`না না.. ..সেইরকম কিছু না।আসলে.. ..কেমনে বলবো আপনেরে.. ..আমার মনে হয় মাছটা ভালো না!`’
‘`ভালো না মানে কি?অসুস্থ?নাকি হিংস্র?`’
‘`না ভাইসাহেব,অসুস্থ না।হিংস্রও না একটুও,খুব ঠান্ডা স্বভাবের।`’
‘`তাহলে সমস্যা কি?`’
বিব্রত দেখায় দোকানীকে,‘`ইয়ে মানে.. ..মাছটা ভালো না।এইটা কিনার দরকার নাই।আমি ভয়ে ফেলতে পারতেছি না.. ..কি না কি হয়,এই ভয়ে। আপনে আমার পুরানা কাস্টোমার,জাইনে শুইনে তো আর আপনের ঘাড়ে এই বিপদ দিতে পারি না।`’
‘`আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না!`’এবার সত্যিই হতাশ বোধ করেন আজাদ সাহেব।আর কৌতুহলীও।‘`একটা ছোট্ট মাছের মধ্যে বিপদের কি আছে?এটা কেমন কথা?`’
`‘আপনেরে ঠিক বুঝাইতে পারবো না ভাই সাহেব.. ..যেই ছেলে মাছটা বিক্রি করছে সে বইলে গেছে-মাছটারে যত করতে।ভয় পাইয়ে ফেলায়-টেলায় না দিতে।তাইলে নাকি অনেক বড় বিপদ হবে।আর এরে যতœ করলে কপাল খুইলে যাবে।’'
‘`আপনি এইসব গাঁজাখুরিতে বিশ্বাস করেন?`’
‘`বিশ্বাস না কইরে উপায় কি?সত্য কথা হইলো-এইরকম কোনো মাছ আমি আগে কোনোদিন দেখি নাই।এত মাছ দেখছি জীবনে,কিন্তু এইরকম দেখি নাই।`’
‘`না দেখাতে অস্বাভাবিক কি হলো?কত প্রজাতির মাছ আছে.. ..’`
‘`না,ঠিক সেইটা না।আমার আব্বাও এই ব্যবসা করতো ভাই সাহেব। আমার মনে আছে ছোটবেলায় এইরকম একটা মাছের গল্প আমারে বলছিলো আব্বা। আর এও বলছিলো ভুলেও যেনো এইরকম কোনো মাছ না কিনি দোকানের জন্যে।আব্বা এইগুলারে বলতো অপয়া মাছ।আরও বলছিলো কোনোদিন ভুলে খরিদ করে ফেললে যেনো ভালো কইরে যতœ-আত্তি করি।এই মাছ যেন কোনো কারণে মারা-টারা না যায়।`’
এইবার হেসে ফেলেন আজাদ সাহেব।স্বস্তির হাসি।
মাছটা কিনতে না পারলে জিমরান কি রকম কান্নাকাটি করবে,এটা চিন্তা করেই ভয় লাগছিল। এখন দোকাণীকে আশ্বস্ত করে মাছটা কিনে ফেলা যাবে।যত যাই হোক, কুসংস্কারে তিনি বিশ্বাস করেন না।তাছাড়া সব পেশার মানুষের মাঝেই কমবেশী কিছু কুসংস্কার থাকে।এটা তাদের পেশারই একটা অংশ।
‘`নাম কি এই মাছের?`’দোকানীকে প্রশ্ন করে জিমরান।
‘`তা তো জানি না বাবা!আপনে অন্য একটা মাছ নেন।এইটা আমার কাছে আছে যখণ,সেইভাবেই থাকুক।’`
`‘আমি এটাই নিবো!`’
হতাশ দৃষ্টিতে আজাদ সাহেবের দিকে তাকায় দোকানী।এবং মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানান আজাদ সাহেব।
‘`অসুবিধা নেই,আপনি এই মাছটাকেই দিয়ে দিন।’`
‘`দেইখেন কিন্তু ভাইসাহেব!আমি এরে অনেক যতেœ রাখছি,আপনেও রাইখেন।আর কিছু অসুখ-বিসুখ করলেই আমারে খবর দিয়েন।`’
‘`তা তো দেবোই,আপনি চিন্তা করবেন না।কুসংস্কারে আমার বিশ্বাস নেই,তবু আমি চেষ্টা করবো এক যেন সবচাইতে বেশী যতœ করা হয়।`’
আজাদ সাহেব বোঝেন,এক রকম নিমরাজি হয়েই মাছটা পলিথিনের ব্যাগে পুরে দেয় দোকানী লোকটা।দাম নিয়ে তাই আর অযথা কথা বাড়ান না তিনি। দোকানী এক হাজার চেয়েছে,সেটা দিয়েই কিনে নেন মাছটাকে।
‘`একটা কথা ভাইসাহেব.. ..’ইতস্তত করতে করতে একসময় বলেই ফেলে দোকানী।‘আমার যে ভাতিজা মাছটাকে কিনছিলো.. ..সে তো পোলাপান মানুষ.. ..আমি যে কয়দিন দোকানে ছিলাম না,মাছটারে সে ঠিকমত যতœ করে নাই.. ..এখন.. ..’`
‘`এখন?`’
‘`সেই ঘটনার পর থেইকে ভাতিজা আমার হাসপাতালে।ডেঙ্গু হইছে। জীবন নিয়ে টানাটানি.. ..`’
আজাদ সাহেবের একবার ইচ্ছা হয় যে বলেন-ডেঙ্গুর সাথে এই মাছের কোনো সম্পর্ক নেই।ডেঙ্গু হয় এক বিশেষ শ্রেণীর মশার কামড় থেকে।
কি ভেবে আর কথা বাড়ান না।অবশ্য লাভও নেই বাড়িয়ে।যার যার বিশ্বাস!এবং নিজের বিশ্বাস থেকে কাউকে টলানো কঠিন একটা কাজ নিঃসন্দেহে।
গাড়িতে ওঠার সময় অদ্ভভুত একটা ব্যাপার ল্য করেন আজাদ সাহেব।কাঁটাবন এলাকায় একই সাথে অসংখ্য দোকান সারবেঁধে দাঁড়িয়ে আছে,অথচ সব ভীড় যেন লেগে আছে এই একটি দোকানেই।অন্য দোকান গুলোকে যেন চোখেই দেখতে পাচ্ছে না ক্রেতারা।
ণিকের জন্যে আজাদ সাহেবের মনে হয়.. ..
দোকানীর কথা গুলো কি তাহলে সত্যি?এই মাছটাকে যতেœর বিনিময়ে সে কি সত্যিই সৌভাগ্য এনে দিতে পারে?
২)
মাছটার কারণেই কিনা কে জানে,সেটাকে বাড়িতে আনার পরপরই আশ্চর্য কিছু পরিবর্তণ ল্য করলেন আজাদ সাহেব।
বহুদিন যাবত অফিসে একটা সমস্যা ছিল।চাকরী যায় যায় অবস্থা যাকে বলে।সে সমস্যা মিটে তো গেলোই,এমনকি প্রমোশনও হলো তাঁর। কুসংস্কারে বিশ্বাসী তিনি নন।কোনো কালেই ছিলেন না।কিন্তু অফিসের সমস্যাটা মিটে যাওয়ার পর থেকে এক রকম বিশ্বাসই করতে শুরু করে দিলেন।সত্যিকারের বিশ্বাস।
পৃথিবীতে মানুষের বোধ সীমার বাইরেও তো কত কিছু আছে,তাই না? সব কিছু যে মানুষ জেনে বসে আছে এমনটাও তো নয়-আজাদ সাহেবের বিশ্বাসটা হলো অনেকটা এই রকমের।
তবে বিশ্বাস যাই হোক না কেন,মাছটাকে খুব যতœ করতেন তিনি।জিমরান মাছের নাম রেখেছে “ফিশি”।এই ফিশিকে যতœ করতে গিয়েই অনেক কিছু শেখা হয়ে গেলো তার।
কি করে নেট দিয়ে মাছ গুলোকে তুলে অন্য পাত্রে রাখতে হয়,কি করে পানি বদল করে এ্যাকুরিয়াম পরিষ্কার করতে হয় হয়, পানিতে কি করে পরিমান মত ওষুধ মেশাতে হয় এবং সবশেষে কি করে আবার একে একে পানিতে ছেড়ে দিতে হয় সবগুলোকে-সবই শেখা হলো।
নানান যন্ত্রণা মাছ গুলোকে নিয়ে।পানি বেশী ঠান্ডা হতে পারবে না,আবার গরমও নয়।খাবার দিতে হবে নিয়ম করে এবং হিসাব করে।এ্যাকুরিয়ামের মুখ আবদ্ধ রাখা যাবে না।বাচ্চা-কাচ্চা হলে আবার সরিয়ে রাখো অন্য জায়গায়.. ..ইত্যাদি ইত্যাদি হাজার রকম নিয়ম কানুন।
সব মিলিয়ে অবশ্য ভালোই লাগে আজাদ সাহেবের।অফিসের সময়টুকু ছাড়া বাকি সময়টা মাছগুলোর সাথেই কাটান।জিমরান কেবল চোখের দেখাটা দেখে,বাকি সব দ্বায়িত্বই পালন করে থাকেন তিনি একাই।মাঝে মাঝে এমনকি গভীর রাতে পর্যন্ত উঠে এসে দেখে যান মাছগুলো ঠিকঠাক মতো আছে কিনা।
এরই মাঝে একদিন অদ্ভভুত একটা দৃশ্য দেখেছিলেন।আজও মনে আছে সেই রাতের কথা.. .. ..
পানির পিপাসায় বিছানা ছেড়ে উঠেছিলেন।এ্যাকুরিয়ামটা রাখা বসার ঘরে,কি মনে হতে মাছ গুলোকে দেখতে গেলেন একবার।গিয়ে দেখেন আজব এক দৃশ্য।এ্যাকুরিয়ামের সমস্ত মাছ একদিকে,এবং ফিশি সম্পূর্ন অন্যদিকে।ব্যাপারটা দেখে মনে হতে পারে অদ্ভভুত দর্শন মাছটার ভয়েই বুঝি বাকি মাছেরা অন্যদিকে সরে আছে।
দেখার ভুল হতে পারে,কিন্তু আজাদ সাহেবের মনে হয় যেন পানিতে আলতো করে শরীর ভাসিয়ে ভেসে আছে ফিশি।ভাবটা এমন,যেন ঘুমাচ্ছে।এবং অবিকল মানুষের ভঙ্গিতে!
দৃষ্টিভ্রম,জানেন আজাদ সাহেব।তবে সেই দিনের পর থেকে মাছটাকে আরও বেশী যতœ-আত্তি করেন তিনি।সর্বণ দেখে শুনে রাখেন।কেননা তিনি আবিষ্কার করতে পেরেছেন যে জিমরানের আসলে পোষা মাছগুলির জন্যে কোনো রকম কোনো মমতা নেই।এগুলি তার শিশুসুলভ কিছু নিষ্ঠুর খেলার অংশ বিশেষ।
এইজন্যেই বাড়তি খেয়ালটা রাখতে হয়।কারণ জিমরানের মাঝে নির্দয় একটা প্রবনতা আছে মাছগুলিকে অত্যাচার করে সময় কাটানোর।না খাইয়ে রাখা,এ্যাকুরিয়ামের মাঝে হাত দিয়ে মাছ ধরার চেষ্টা করা-ইত্যাদি নানান রকম উপায় সে বের করে।আগে যে মাঝে মাধ্যেই একটা-দুটো মাছ মারা যেতো,তার পেছনকার মানুষটার পরিচয় আজাদ সাহেব সম্প্রতিই বুঝতে পেরেছেন।
তবে তিনি এখনও জানেন না যে এই অভ্যাসের কারণে তার একমাত্র পুত্রকে কি ভীষণ মূল্য পরিশোধ করতে হবে!
৩)
‘`শোনো বুয়া,জিমরানের দিকে খেয়াল রাখবে।আমি আর সাহেব বড় আপাকে দেখেই চলে আসবো।`’মায়ের কণ্ঠ।
এবং এখন বাবার।`‘আর মাছ গুলোর দিকে খেয়াল রাখবে।জিমরান যেন বসার ঘরে না যায়।টিভি দেখতে হলে আমাদের বেডরুমে দেখতে বলবে।’`
আবার আম্মা।‘`আর রাতের জন্যে রান্না করবে গরুর মাংস।সাথে টমেটো দিয়ে ডাল করো।ফ্রিজে চিচিঙ্গা ভাজি করা আছে।গরম করে টেবিলে দিও.. ..`’
দরজা আটকানোর শব্দ হয় সজোরে।তারমানে বেরিয়ে গেছে বাবা-মা।
কিছুণ পড়ার টেবিলে ভান করার জন্যে বসে থেকে উঠে পড়ে জিমরান। কাজের বুয়াটা কি করছে সেটা একবার ভালো করে দেখে নেয়।তারপর পা টিপে টিপে চলে আসে বসার ঘরে।বুয়া রান্নাঘরে গরুর মাংস রান্না করছে,আবার ডালও চড়িয়েছে মনে হয়।সুতরাং অনেকটা সময় এইদিকে মনযোগ দিতে পারবে না।
আব্বা-আম্মা গেছে কি এক হাসপাতালে,বড় খালাকে দেখতে।একটা মহিলার বাচ্চা হলে তাকে কেন দেখতে যেতে হবে-এই ব্যাপারটা জিমরান বুঝতে না পারলেও আজ বাবা মা বাইরে যাওয়াতে সে বেজায় খুশি হয়েছে।এ্যাকুরিয়ামটাকে অনেক দিন যাবত একা পাওয়া যায় না,সর্বণ বাবা চোখে চোখে রাখে।
আব্বা অবশ্য যাবার সময় বারবার করে সাবধান করে গেছেন কোনো মতেই বসার ঘরে না যেতে।এমনকি বুয়াকেও বলে রেখে গেছেন খেয়াল রাখার জন্যে।এ কারণেই জিরানের জেদ এবং কৌতুহল-দুটোই বেড়ে গেছে অনেক অনেক বেশী।
সাবধানে এ্যাকুরিয়ামের ঢাকনা সরায় জিমরান।হালকা নীল রঙের পানি ভেতরে।সাদা সাদা পাথর আছে,প্লাস্টিকের গাছপালা,ঘরবাড়ি সবই আছে। আরও আছে কমপে পনচাশটা মাছ,মহা আনন্দে সাঁতার কেটে বেড়াচ্ছে নিজেদের মতো।এতসব মাছের মাঝেও ফিশিকে আলাদা করে দেখা যায় প্রথম নজরেই।কালোর মাঝে গাঢ় লাল রঙের আভাস,মনে হয় বুঝি কেটে গেছে শরীরের কোথাও। আর গোটা শরীরের চারপাশ জুড়ে অনেক গুলি পাখনা।সাঁতার কাটার সময়ে মনে হয় আকাশে ভাসছে কালচে-লাল এক টুকরো মেঘ।
মাছটার দিকে অনেকটা সময় হিংস্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে সে।অনেক দিন হলো সেই মজার খেলাটা খেলা হচ্ছে না।ওই যে-মাছের শরীরের সাথে একটা সুতো বেধে পানিতে ছেড়ে দেয়া,তারপর নিয়ন্ত্রন করা নিজের ইচ্ছা মতো।কিছুণ পরপর পানি থেকে তুলে ফেললে মাছগুলো কি রকম ছটফট যে করে,সেটাই একটা দেখার বিষয়!
কিন্তু ফিশিকে কি করবে?
শরীরে সুতো বেঁধে পানিতে ছেড়ে দিবে?নাকি একটু একটু করে কাটাকুটি করবে?প্রথমে কাটবে পাখনা গুলো।তারপর সুঁই দিয়ে ফুটো করবে শরীরে, চোখ দুটো অন্ধ করে দিবে... ..
ইস!! কি সুন্দর চোখ!! ঠিক যেরকম কোনো মানুষের হয়!!
চোখ ফুটো করার পর আস্তে আস্তে পুরো শরীরটাকে.. ..
আগুনে পোড়ালে কেমন হয়?
কাটাকুটির পরেও যদি জান অবশিষ্ট থাকে,তাহলে মোমবাতি জ্বালিয়ে তার আাঁচে ঝুলিয়ে রাখবে।একটু একটু করে পুড়ে তৈরি হবে মাছের রোস্ট।.. ..আহ,চিন্তা করেও তো ভালো লাগছে!
আসন্ন আনন্দের ভাবনায় চকচক করতে থাকে জিমরানের চোখ জোড়া। ছোট্ট নেটটার সাহায্যে খুব সাবধানে ফিশিকে পানি থেকে.. ..এ্যাকুরিয়ামের নিরাপদ আশ্রয় থেকে তুলে নেয় সে।
৪)
আয়নায় নিজের চেহারাটা দেখে ভয়ে অমানুষিক চিৎকার করে ওঠে জিমরান।আর করতেই থাকে।
গলে গলে পড়ছে চেহারাটা,আগুনে ঝলসে গেছে কাবাবের মতন।জায়গায় জায়গায় লাল রক্ত আর তীব্র যন্ত্রণা.. ..হচ্ছে তো হচ্ছেই।আর ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে শরীরের আনাচে-কানাচে।
আগের চাইতেও জোরে চিৎকার করতে থাকে জিমরান,নিজের শরীরের সমস্ত শক্তি একত্রিত করে চিৎকার করতে থাকে।কে যেন ধারালো একটা চাকু দিয়ে কেটে ফেলেছে তার হাত দুটো,রক্ত ছুটছে ফিনকি দিয়ে।আবার কে যেন সেই তস্থানে ডলে ডলে লাগিয়ে দিয়েছে অনেকখানি মরিচ.. ..
চরম ব্যথায়,আতঙ্কে চিৎকার করতেই থাকে জিমরান।মনে হয় যদি কেউ তাকে মেরে ফেলতো!ভয়ে স্তব্ধ হয়ে আসতে থাকে বাচ্চা ছেলেটার হৃদয়,যখন দেখতে পায় ইয়া বড় এক চাকুকে.. ..
নেমে আসছে ঠিক তার পা দুটো ল্য করে!
৫)
একটা ঝাঁকি খেয়ে ঘুম ভেঙে যায় জিমরানের।
স্বপ্ন দেখছিল?এতণ তাহলে স্বপ্ন দেখছিল সে?উফ খোদা!!এইসব তাহলে স্বপ্ন ছিল?
খোদার প্রতি কৃতজ্ঞতায় অন্তর ভারী হয়ে আসে জিমরানের।কাল কোন ফাঁকে যে ঘুমিয়ে পড়েছিল নিজেরও মনে নেই।তবে হ্যা,ফিশিকে মারার ব্যাপারটা খুব মজা হয়েছিল।আগুনে পোড়ানোর সময় কেমন করে শরীর মোচড়াচ্ছিল মাছটা.. ..
আচ্ছা,বাবা কি বুঝতে পেরেছে যে ফিশি গায়েব?মনে মনে একটা ঝাড়ি খাবার জন্যে প্রস্তুত হয় জিমরান।কি আর হবে,বড়জোড় একটা থাপ্পড় দেবে বাবা।যত যাই করুক না কেন,ফিশিকে তো আর ফেরত আনতে পারবে না। এই সামান্য ব্যাপারটা বাবা নিশ্চই বুঝবে।
মা কই?.. ..মা?আর বাবা কই?এখনও কি খেয়াল করেনি ফিশির অনুপস্থিতি?
.. ..যাই হোক,খিদে পেয়েছে তার।একটা বিকট মাছ নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে আম্মার কাছে যাওয়া দরকার.. ..ওই তো আম্মা বসে আছে সোফায়।সাথে আব্বাও আছে।চা খেতে খেতে ককরের কাগজ পড়ছে দুজন।
সজোরে কাঁচের দেয়ালটায় বাড়ি খাবার পর বুঝতে পারে জিমরান.. ..বুঝতে পারে যে কোথাও একটা সমস্যা আছে কোনো।হ্যা,সমস্যা আছে অবশ্যই।গুরূতর কোনো সমস্যা!!
সব কিছু এত বিশাল আকৃতির মনে হচ্ছে কেন?সে কি রাতারাতি খাটো হয়ে গেলো?
আর এই হতচ্ছাড়া কাঁচের ঘরেই বা তাকে রাখা হয়েছে কেন?এটাই কি ফিশিকে মারার শাস্তি?
মাথাটা ঠান্ডা রাখতে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে চায় জিমরান।এবং চিৎকার কেের উঠতে চায়-যখন দেখে নাক নিয়ে নয়,সে নিঃশ্বাস নিচ্ছে ফুলকার সাহায্যে।
হ্যা,ফুলকার সাহায্যেই।কারণ সে এখন একটা মাছ।
রাতারাতি সে পরিণত হয়েছে একটা মাছে!!!
শুধু তাই নয়,সে এখন ফিশির মতো দেখতে একটা মাছ।সেই ফিশি, যাকে নিজের হাতে গতকাল খুন করেছে সে।মনে হচ্ছে যেন ফিশির শরীরের মাঝে কোনো ভাবে চলে এসেছে তার আত্মাটা।
সেই কালচে-লাল শরীর,সেই পাখনা,সেই চোখ.. ..হুবহু!!
চিৎকার করে বাবা-মাকে ডাকতে াকে জিমরান।কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজ বের হয় না কোনো।কেবল আর কেবল র্অথহীন নিঃশব্দতা।
মাথা ঠোকে সে কাঁচের এ্যাকুরিয়ামের শরীরে।অবিরাম,অনবরত। এবং একসময় হয়তো আর্কষন করতে পারে আজাদ সাহেবের দৃষ্টি।
.. ..সত্যি কি পারে?
হ্যা,হয়তো।
ভ্রু কুঁচকে প্রিয় মাছটার দিকে তাকিয়ে থাকেন আজাদ সাহেব।তারপর স্ত্রীকে বলেন,`‘মাছটা কেমন করছে দেখেছো?স্ট্রেনজ!!’`
`‘মনে হয় যেন কিছু বলতে চায়,তাই না?`’
‘`হু,আমারও মনে হয়।.. ..এ্যাই,দেখে যাও।তোমার মাছটা কি আজব আচরণ করছে।`’গলা চড়িয়ে কাকে যেন ডাকেন আজাদ সাহেব।
এবং যে মানুষটা ভেতরে ঢোকে.. ..
কেঁদে ফেলে জিমরান!এটা কি করে সম্ভভব?আব্বা-আম্মার সাথে ওই ছেলেটা যদি জিমরান হয়,তাহলে সে কে?আর এ্যাকুরিয়ামের মাঝে আটকা পড়ে থাকা সে যদি আসল জিমরান হয়,তাহলে ওই ছেলেটা কে?তার মতো দেখতেই বা কি করে?
তাহলে কি.. ..
তাহলে কি তাকে বাকি জীবন এই এ্যাকুরিয়ামের মাঝেই কাটাতে হবে? বাবা-মা থেকে দূরে,একটা কাঁচের বাক্সে মধ্যে পানিতে ভেসে ভেসে.. ..কেন যে ওই অপয়া শয়তান মাছটার গায়ে হাত লাগাতে গেছিলো!!!
জিমরান তখনও বুঝতে পারেনি যে মাছ হিসাবে তার অদ্ভভুত জীবনটা শেষ হতে যাচ্ছে খুব শিগগির।এবং নরক যন্ত্রণার চাইতেও ভয়াবহ সেই জীবনের পরিসমাপ্তি।
পরিশিষ্ট :-
`‘শোনো বুয়া,জিমরানের দিকে খেয়াল রাখবে।আমি আর সাহেব বড় আপাকে দেখেই চলে আসবো।`’মায়ের কণ্ঠ।
এবং এখন বাবার।`‘আর মাছ গুলোর দিকে খেয়াল রাখবে।জিমরান যেন বসার ঘরে না যায়।টিভি দেখতে হলে আমাদের বেডরুমে দেখতে বলবে।`’
আবার আম্মা।‘`আর রাতের জন্যে রান্না করবে গরুর মাংস।সাথে টমেটো দিয়ে ডাল করো।ফ্রিজে চিচিঙ্গা ভাজি করা আছে।গরম করে টেবিলে দিও.. ..`’
দরজা আটকানোর শব্দ হয় সজোরে।তারমানে বেরিয়ে গেছে বাবা-মা।
.. .. ..এবং আতঙ্কে পাথর হয়ে যায় মাছের শরীরে আটকা পড়া জিমরানের হৃদয়।
আশ্চর্য!!
প্রত্যেকটা কথা গতকালকের মতো শোনালো কেন?তারমানে কি.. ..তারমানে কি গতকালকের প্রত্যেকটা ঘটনাই আবার ঘটবে?জিমরান রূপী ছেলেটা এখন আসবে তাকে তিলে তিলে যন্ত্রণা দিয়ে খুণ করার জন্য?
প্রথমে সুতো বেঁধে খেলবে।তারপর একে একে কেটে ফেলবে পাখনাগুলো। তারপর সুইয়ের খোঁচায় অন্ধ করে দেবে চোখ,শরীরটাকে তবিত করবে। এবং সবশেষে ঝলসাবে আগুনের শিখায়!!
চরম ভয়ে কাঁদতে শুরু করেূ ফিশি রূপী জিমরান।অবশ্য কাঁদার সুযোগও পায় না বেশিণ। পৌছে গেছে জিমরাণরূপী ছেলেটা.. ..
এবং খুব সাবধানে তুলতে শুরু করেছে এ্যাকুরিয়ামের ঢাকনা!!!





এই গল্পটা দারুণ। আপনি মনে হয় কোথাও লেখেন...নাম চেনা চেনা...
গল্পে একটা ছোট খুঁত আছে। মাছের সাথে দুর্ব্যবহারে ডেঙ্গু হওয়া আর মাছ-মানুষ পাল্টায় যাওয়া দুটা একসাথে যায় না। একটু খটকা লাগে...
khotkar ekta jobab ache...jar dengu hoise,se mach take torture kore hotta koreni...ojotno korse,oshukh hoise...r porer jon marar try korse,tai tar shati tao boro.......
apni jodi somewhereinblog er vanga pencil hoy thaken...tahole amio oikhan kar-e rumana baishakhi
ami obossho nijeke rohossho potrikar rumana baishakhi boltei beshi shacchondo bodh kori.....r ekhon.alo-chayya r rumana.........
সিম্পলি অসাধারন গল্প!
বাধ্য হয়ে লগিন করলাম।
অসাধারণ গল্প। অ'সাম
দুর্দান্ত
সত্যি গা কাঁটা দিয়ে উঠছে। দুর্দান্ত।
অসাধারণ। দুইটা গল্প পড়লাম। মুগ্ধ হলাম।
অসাধারন হয়েছে। আজকের রুমানা বৈশাখী কালকের রুমানা আফাজ
অনেক অনেক শুভকামনা জানালাম লেখালেখির জন্য
রোমেনা আফাজ
thik bolechen.........
thank u apu........
মন্তব্য করুন