ঢুলু ঢুলু নেশাতুর
১.
: ইয়াক! এসব ছাইপাশ গেলো কিভাবে? আমি তো এক গ্লাসই শেষ করতে পারি না।
: তুমি ইচ্ছে করলেই এক বোতল এক বসায় গিলে ফেলতো পারো।
: পাগল হয়েছো? সিবার রিগ্যালের ৭৫০ এমএল কিভাবে?
: এই দেখো। গ্লাসে কিছু বরফের কুচী নাও। কিছু স্পাইসি চিপস। একটা স্পাইসি চিপস, পুরো গ্লাস। অল্প অল্প সীপ।
: আর?
: এক সীপ, মিউজিকের তালে তালে শরীরটা ছেড়ে দাও। আমি ঢুলতে ঢুলতে তোমাকে জড়িয়ে ধরবো।
: আর?
: আরো একটা সীপ। তোমার ঠোট আমার ঠোটে। তোমার দুস্ট জিহবা আমার মধ্যে দুস্টুমি। আরো একটা সীপ। তোমার দুস্ট হাত আমার ব্লাউজের নীচে
: আর?
: আমি তোমার জিহবা কামড়ে দেবো.....হা হা হা হা।
পুরোনো স্মৃতিগুলো চোখের সামনে এমন ভাবে ভেসে উঠছে যেনো এই তো কিছু সময় আগে ঘটে গেছে। সিবার রিগ্যালের ৫ টা খালি বোতল পড়ে আছে তাকে। হাতে আছে অর্ধেকটা। পুরো শরীর গুলোয় ইদানিং। একটা সময় শরীর জুড়ে কাপুনি শুরু হবে। তখন দুটো সাদা ট্যাবলেট। আস্তে আস্তে পুরো শরীর শূন্য হয়ে আমাকে ছেড়ে যায়। আমি দেখতে থাকি আমার দেহটা নীচে পড়ে আছে শূন্য দৃষ্টিতে। আমি ছাদের দেয়াল ঘেষে অনুভব করি রুক্ষতা, বাইরে তাকিয়ে দেখি সবুজ বনান্ঞ্চল দিগন্তজোড়া। আমি জানালার শার্সি ঘেষে বেরিয়ে যায় দিগন্তে আহ্বানে। আমার দেহটা যে নিশ্চল পড়ে আছে তাতে ভ্রুক্ষেপ জাগে না।
বন পেরিয়ে ন গরের আলো দেখা যায়। ন গরের আলোর ফাঁকে অদ্ভুৎ সব হাসি ঠাট্টা, গান বাজনা। রুপসীর ভাজে ভাজের কামনার লীলাখেলা, ভেতর থেকে জাগিয়ে তোলা উত্তেজনা তাতে ভ্রুক্ষেপ করে না। মন শুধু খুজতে থাকে দিগন্ত পেরুলেই পাওয়া যাবে শান্তি, দেখা মেলবে কাঙ্খিত প্রিয় মানুষের।
বাদল নামের বন্ধুটির বাসাতে যেতে চেয়েছিলাম, শোভনডাঙ্গায় এখনও ওর বাবা মা থাকে। ওর মা বলতো তার নাকি এক ছেলে না, দুই ছেলে। বাদল আর শফিক। যেদিন বাদল পানিতে ডুবে মারা যায় সেদিন আমি বাজারে বসে চা খাচ্ছিলাম। যখন ফারুক দৌড়ে এসে খবরটা দিলো, আমি ছুটে গেলাম। লাশটা খুজবার জন্য টানা তিনদিন নদীর পাড় থেকে নড়লাম না। লাশ যেদিন পেলাম সেদিন চেনার উপায় নেই। ওর মার সামনে দাড়াবারও শক্তি ছিলো না দেহে। চোখ দিয়ে কোনো অশ্রু ঝরছিলো না। প্রচন্ড ক্ষুধায় হেচকী তুলছিলাম, আর লাশ কাঁধে নিয়ে জানাযায় যাচ্ছিলাম। আর কখনো দাড়াতে পারিনি ওর মার সামনে। পালিয়ে বেড়াতাম।
জীবন থেকে পালানো অপরাধ বৈকি। মাঝে মাঝে সুখের লোভে দেশান্তরী হয়, গেরস্হী হয়। স্বপ্ন দেখে একসময় সুখ তার ফুলে ফেপে মহীরুহ হবে। সেই ছায়া হয়ে সকলকে আগলে রাখবে।আমারও মহীরুহ হবার শখ ছিলো।
২.
মা কেন জানি ঢাকা থাকতে চায় না। কোনো এক দুপুরে বিদ্যূৎ চলে যাওয়ায় আমি হাঁসফাঁস করছিলাম বিছানায়। মা পাশে এসে বসে, কপালে হাত বুলিয়ে দেয়। কপালে হাত বুলানোর সাথে সাথে শরীর জুড়ে একটা ঠান্ডা স্রোত অনুভব করলাম। অদৃশ্য যন্ত্রনার নাগপাশ হঠাৎ করে গুড়িয়ে গেলো। আমি স্হির হয়ে চোখ বন্ধ করেই বললাম,"মা, আমি কি করবো?"
: মেয়েটার নাম কি ছিলো?
: সোনিয়া।
: মুসলিম?
: হ্যা, তবে নামাজ কালাম পড়ে না। পুরাই সুইডিশ। চাল চলন ভালো না।
: তুই খুব ভালোবাসতি?
: জানি না, মা।
: বিয়ে করবি? সোনিয়ার কথা ভুলে যেতে পারবি।
আমি হাসলাম শুধু। সে হাসিটা কেনো দিলাম না জানলেও মা মনের কথা বুঝলেন বোধ হয়। হাত বুলানো বন্ধ করে চুপচাপ বসে রইলেন। আমি চোখ মেলে উঠে বসলাম,"কি হলো?"
: কিছু না। আমার আর এখানে থাকতে ভালো লাগে না। আমাদের গ্রামে রেখে আয়।
: গ্রামে গিয়ে কি করবা? ডাক্তার, হাসপাতাল কিছুই ওখানে নেই।
: না থাকুক। ওখানে বুঝি কেউ থাকে না?
: আমি বিয়ে করবো না।মন বসে না কেন জানি।
: আমি মরলে সবার মন বসবে।
এই বলে উঠে গেলো। আমি মাথা নীচু করে বসে রইলাম কিছুক্ষন। বাঁ পায়ের বুড়ো নখটাকে দেখতে থাকলাম। ছোটবেলা মনে আছে এটা কত ছিলো। যখন ক্লাস ৯ এ উঠলাম, তখন থেকে এটাকে হঠাৎ অনেক বড় মনে হতে লাগলো। এই বড় মনে হওয়াটা এখনও মাঝে মাঝে লাগে। এই বড় লাগাটা খুব পরিচিত একটা চিন্তা মনে হয়। কেন যেন মনে হয় এই চিন্তার সাথে যুক্ত আমার অপরাপর দুশ্চিন্তা, আক্ষেপ, শংকা। আমার সকল যন্ত্রনা অস হায়ত্বের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে যায় বা পায়ের ঐ বুড়ো আঙ্গুলিটা।
৩.
সুইডেনে এসে মনে পড়লো আমি ভুলে মায়ের একটা শাড়ি এনে ফেলেছি। শাড়িটা মায়ের বিয়ের শাড়ি। লাল কাতান...হাতে নিলে বেশ ভারী লাগে। বর্গাকার কাজ করে কট কটা লাল। এই শাড়ি নিয়ে আমি কি করবো? লন্ড্রিতে দিয়েছিলো। আমি লন্ড্রি থেকে শপিং ব্যাগে রেখে দিয়েছিলাম। আসবার সময় বাবার আনা স্যুটকেসটায় বেশ কিছু জামা কাপড়ের সাথে শপিং ব্যাগটাও ঢুকে যায়। মাতো পাশেই ছিলো। সেও তো জানতো ঐ শপিং ব্যাগে তার বিয়ের শাড়িটা। শপিং ব্যাগটা তো সেই দিয়েছিলো, কাপড় চোপড় সেই গুছিয়েছিলো, তাহলে কি সে ইচ্ছে করেই স্যুটকেসে দিয়ে দিলো?
আর অল্প একটু বাকি বোতলটা শেষ হবার। সোনিয়ার বিদ্যাটা কাজে লাগাচ্ছিলো। একটা সিবার রিগ্যাল দু' রাতে। এক রাতে শেষ করতে পারলে সেটা হবার সোনিয়ার রেকর্ড। কিভাবে খেতো এই ছাইপাশ? আস্তে আস্তে চোখের দৃষ্টি ঘোলা হয়ে যায় আমার। আমি আমাকে ছেড়ে ভাসতে থাকি শূন্যে।
এ এক অনন্য অনুভূতি! কখনো কি এমন হতে পারে না যে আমি আর আমার দেহে ফিরবো না?





নেশাগ্রস্হ অবস্হায় কি উল্টা পাল্টা লিখেছি সেটা পড়ে এখন নিজেরই লজ্জা লাগছে। কাল হাসপাতালে ভর্তি হবো। তারা আমার আসক্তির চিকিৎসা শুরু করবে। আজকেই ভর্তি হতাম, কিন্তু আজ সামার অফটন।
ধন্যবাদ পড়বার জন্য এই ছাইপাশ
আপনার লেখায় আমার দুই অনুভুতি এক সাথে কাজ করে -- এক, মুগ্ধ হই। দুই, অবসাদগ্রস্থ হই আপনার কথা ভেবে!
সারাটা জীবন বাবাকে দেখেছি মানুষের সশ্রদ্ধ সম্মান নিয়ে বুক উচু করে চলতে। যখন সে কথা বলতেন, তার কথাগুলো অপ্তবাক্য মেনে নিয়ে গ্রামের ছোট বড় সবাই। বাবার যোগ্য সন্তান হতে পারিনি, পারিনি জীবনটাকে একটা সুন্দর অর্থ দিতে।
রাতের আঁধারে কষ্ট গুলো চোখের সামনে সূচ হয়ে বাধে বারবার। ভোঁতা যন্ত্রনায় ডুকড়ে কেপে শরীরের প্রতিটা লোমকূপ। আমি কেমন যেনো প্রচন্ড অসহায় পড়ি রাতের আঁধারে।
লেখা দারুন হয়েছে ...... সামনে তাকানোই জীবন ......
ধন্যবাদ আপনার সহানুভূতির জন্য। ছাইপাশ জীবনের নাগপাশ থেকে মুক্তির একটা উপায় খুজে চলেছি ইদানিং
সুন্দর লেখা।
আপনি একজন সুলেখিকা, আপনার লেখা পড়ে আমি বরাবরই মুগ্ধ।
মন্তব্য করুন