সম্মোহিত চুম্বন ২
১.
: শফিক, তাই না তোমার নাম?
: হ্যা।
: নিজের সম্পর্কে কিছু বলো।
: কি বলবো? অনেক কথাই তো আছে।
: হ্যা...কবিতা লিখতে চাইতাম, ছন্দ মিলতো না। বাবা আমাকে বলতেন মনকে মুক্ত করো, তখন যাই লিখবে, তাই কবিতা হবে। কিন্তু কিভাবে মুক্ত করবো? মন কি জেলখানায় বন্দী?
: কবিতা আর লেখা হয়নি?
: এখনও লিখতে পারিনি।
: কি নিয়ে লিখতে চাও?
: জানি না।
: তোমার মনে কি অনেক দুঃখ?
প্রশ্নটা আমার মাথায় ঘুরতে ঘুরতে থাকে। আমি আস্তে আস্তে ডুবে যাই অপরাহ্নের আলোর মতো। এই অন্ধকার বড্ড বেশী আপন আমার। প্রচন্ড শান্ত চারিদিক, তবু বুঝতে পারি আমি আদতে শান্ত নই।
চোখ মেলবার পর মনে পড়ে না কি হয়েছিলো সে সময়, অনুভব করি আমি বড্ড শান্ত। হসপিটাল থেকে বেরিয়ে মনটা চাইলো গুটেনবার্গ চলে যাই। সাগর পাড়ে শুয়ে কাটিয়ে দেই পুরোটা গ্রীস্ম। বাল্টিক সাগরের গাঁ বেয়ে ভেসে আসা উষ্ণ শীতল হাওয়ার চুম্বনে তন্দ্রা ডুবে যাই অথবা মার্টিনির গ্লাসে দেখতে থাকি ডুবতে থাকা টক টকে লাল সূর্য্য। বাসে বসে দেখি হাতের পাতা কাপছে, বমি আসছে গলা বেয়ে, কিন্তু হচ্ছে না। ডাক্তার বলেছে নিঃশ্বাস বড় বড় করে স্হির হয়ে বসে থাকতে। জগতের সকল চিন্তাকে দূরে ঠেলে যেন ভাবতে থাকি শান্ত সমুদ্র অথবা অসম্ভব সুন্দর নীল আকাশ। বমি যেনো না হয়, বমি হলে রক্ত বেরুবো আর তখন শুরু হবে আভ্যন্তরীন রক্তক্ষরন। তখন কোমায় চলে যাবো, এ জগৎ সংসার থেকে অজানা উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাবো ঠিকই কিন্তু পৌছানো যাবে না। মাঝপথে আটকে যাবো।
চোখ বন্ধ করলে আর সোনিয়াকে দেখি না, দেখি অদ্ভুত সুন্দর এক মানবীকে। ন গ্ন হয়ে দাড়িয়ে আছে আমার সামনে। হাত দুটো বাড়িয়ে চোখের ইশারায় কাছে ডাকছে। তার শ্যামল গড়ন দেহের ভাঁজে চোখ আটকায় না, কিন্তু তার চোখের হাতছানি আমি অগ্রাহ্য করতে পারি না। আমার হ্রৎপিন্ডের গতি বাড়ছে, শান্ত হবার বদলে অশান্ত হয়ে পড়ছি। শেষ ভরসা পকেটে থাকা ট্যাবলেটগুলো।
২.
বাবাকে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়তে দেখে অবাক হলাম। বাবা দাড়ি রেখেছেন, তাই তার দিকে যখনই তাকাই তখনই বাবা বলে ডাকার আগে মনে হয় সালাম দিয়ে বসি। মাঝে মাঝে সালাম দিয়েও ফেলি। এই ধরা যাক গতকাল রাতে! বাবা খেতে ডাকলেন পাশের রুম থেকে। আমি ডাইনিং টেবিলে বসতে গিয়ে দেখলাম বাবা নামাজ শেষ করে ঢুকলেন। আমি মনের অজান্তে সালাম দিয়ে বসলাম। বাবা সালামের উত্তর দিলেন, আমার কেমন যেনো লজ্জা পেলো। এখন চলছে তার থেমে থেমে কোরান শরীফ পড়া। রাতে আমার ঘুম হয় না, প্রচন্ড গরমে এটা ঠিক নয়, তিন তিনটা রুমে আইপিএস, এসি তিনটা, নীচে জেনারেটর। বিদ্যুৎ চলে গেলে এসি চলবে, তেল ফুরোলে ফ্যান। কিন্তু ঘুম হয় না। গলায় বড্ড তেষ্টা কিন্তু পানিতে সে তেষ্টা মেটে না। প্রচন্ড ঠান্ডা রুমেও আমি ঘামতে থাকি।
বাবার থেমে কোরান শরীফ পড়া শুনতে থাকি। হঠাৎ মায়ের কন্ঠ শুনতে পেলাম,"কোন সূরা পড়তেছো?"
: সুরা ইমরান।
: গত তিন ধরে এই এক সূরাই পড়তেছো কেন?
: একটু একটু করে পড়ি আর সাথে সাথে অর্থগুলো পড়ি।
: এভাবে পড়লে আর খতম হবে না।
দুই বুড়োবুড়ি কুট কুট করে গল্প করছে। গল্পগুলো শুনতে ভালোই লাগে। গত দিন ভোরবেলায় গল্প করলো ফরমালিনের আম নিয়ে। বাবা কোরান শরীফ পড়তে বসলে মা রাজ্যের গল্প শুরু করে দেয়, আর বাবা সেই গল্পে বেশ মনোযোগের সাথেই অংশ নেয়। গতকালকের মতো আজও আমার চোখ ভিজে যায়, বুঝতে পারি না এ কি কান্না না হাসি নাকি আদৌ অশ্রূ। কিছুক্ষন পর আজান দেয়, বাবা খোড়াতে খোড়াতে দরজা খুলে মসজিদে যায়। আমিও বের হলাম।
: ওজু করলি না যে?
: মসজিদে গিয়ে করবো।
: মসজিদে দু'দিন ধরে পানি নাই, জানিস না? যা ওজু করে আয়। আমি দাড়াচ্ছি।
: না বাবা। আমার দাড়িও না। আমি নিজেও জানি না আমি কোথায় যাচ্ছি।
বাবা আমার পাশে দাড়ালেন। কতবছর পর মাথার চুল নাড়লেন আমার জানি না, কি যেনো পড়ে ফঁ দিলেন। বললেন,"বাবা, ভেঙ্গে পড়িস না। তুই সুখি হ, এটাই দেখতে যাই। মন চাইলে নামাজ পড়িস। আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।"
বাবা মসজিদের দিকে হাটতে শুরু করলেন, আমার গায়ে দখিনা বাতাস হালকা ধাক্কা দিলো, চুলগুলো উড়তে থাকলো। আমি ঘরে ফিরে আসলাম, ছাদের চাবীটা নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেলাম। ভোরের আলোয় ছাদে দাড়িয়ে পুরো ঢাকা শহরটাকে মনে ক্ষয়ে যাওয়া ইটের শহর যেনো ক্ষত বিক্ষত।পরিস্কার আকাশে কাকেদের উড়ে যাওয়া মনে করিয়ে দেয় অসামাজিক কাকও কখনো কখনো সামাজিক হয়। মুখ ফুটে হাসি বেরুলো, আর গাইতে থাকি আনমনে
যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই হাটে
আমি বাইবো না
আমি বাইবো না মোর খেয়া তোর এই ঘাটে....
হঠাৎ একটা শব্দে আমি চমকে গেলাম," ভোর বেলা রবীন্দ্র নাথ! বাহ! আপনি তো ভালোই গান।" আমি বুকে হাত দিয়ে থতমত খেয়ে গেলাম। পাশ ফিরে দেখি মাইমুনা,"ওহ তুমি! আমি তো চমকে গিয়ে ছিলাম।"
মাইমুনা পড়ে ছিলো সাদা রং এর লো কাট সালোয়ার আর নীচে লেগিংস মেরুন রং এর। মধ্যখানে সিথি কাটা দীর্ঘ কালো চুলে মনে হচ্ছিলো কাঠগোলাপের সাদা মায়া পুরো পুরি ওর রুপে গেথে আছে।
: ওহ! দুঃখিত, আপনাকে চমকানোর জন্য। আন্কেলকে দেখলাম নামাজে যেতে, আপনি ফিরে আসলেন কেন?
: ধর্ম কর্ম এখন আমাকে টানে না।
: হুমম....তা এতো ভোরে? সুইডেনে বুঝি এতো ভোরে ওঠা হয়?
: ঘুম আসছে না। জায়গা বদল হলে আমার ঘুমে সমস্যা হয়।
: সুইডেন দেশটা কেমন? শুনেছি খুব সুন্দর।
: সুন্দর না ছাই। বছর জুড়ে ঠান্ডা চলে, গ্রীস্মের সময় যেই তাপমাত্রা ওঠে তা আমাদের দেশে পৌষ মাঘ মাসে থাকে।
: আর মেয়েরা? শুনেছি আপনি নাকি বিয়ে করেছেন?
আমি দৃষ্টি ফেরালাম মাইমুনার কাছ থেকে, সোনিয়ার মুখটা সেকেন্ডের সহস্র ভাগের এক ভাগ সময়ের জন্য ভেসে উঠলো। বুকটা কেমন যেনো ফাঁকা হয়ে গেলো, মনে হলো নাগরিক কোলাহল আমাকে পিনবিদ্ধ করছে, ভোরের এই সূর্য, ইট দিয়ে গড়া এই আধুনিক বস্তি অথবা ডিজেলের হালকা গন্ধযুক্ত ভোরের বাতাস আমাকে সোনিয়ার শূন্যতাকেই প্রকট করে তুলে হঠাৎ হঠাৎ।
দম নিতে কষ্ট হচ্ছিলো, কোনো মতে মুখটা ফিরিয়ে,"আমি একটু আসছি, ঘরে যেতে হবে।সরি।" বলে নীচে নেমে আসলাম। পুরো দিনটা হোটেল জাকারিয়া বা ফু ওয়াং এ ঢু মারা দরকার। কোনো একটা হোটেলে একটা রুম ভাড়া দরকার। আর দরকার দুটো জ্যাক ডেনিয়েলস আর সিবাস রিগ্যাল আর কিছু রাত নিঃসঙ্গতা। অসহ্য সবকিছু।
........................





হুট করে মন্তব্য করেছিলাম প্রথম পর্বে । এখন দূঃখ হচ্ছে । সে ভুল আর করছিনে । শেষ পর্ব পড়ে তবেই মন্তব্য করবো । কি বলেন । তয় তাতাপু আর খোঁচাতে পারবেনা । ভালো থাকুন ।
মন্তব্য করুন