তপ্ত স্বাধীনতা
হাসপাতাল জিনিসটা আমার মনে বেশ সুখকর অনুভূতির জন্ম দেয়। ছোটবেলায় যখন দাদাকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি করালো তখন দেখা গেলো বাসায় একটা উৎসবের মেজাজ চালু হয়ে গেলো। বাবার তেমন কোনো ভ্রূক্ষেপ ছিলো না, কিন্তু মা এর কাজের শেষ নেই। যেখানে বাসায় সপ্তাহে একবার গোস্ত রাঁধা হতো সেখানে দুদিন পর পর মুরগীর স্যুপ। মুরগীর স্যুপ বানানো হলে বাকী কলিজা গোস্তের টুকরো দিয়ে ভাত খেতাম আর মনে মনে ভাবতাম স্বর্গে কি এত সুন্দর খাবার পাওয়া যায়? সমস্যা নেই, দাদা বুড়ো মানুষ। একবার যেহেতু হাসপাতালে পা দিয়েছেন সেহেতু বার বার দেবেন। কচি লাউ শাকের ডগার চচ্চরী, সাথে শিং মাছের ঝোলে কাচা পেঁপের কোমল রং পেটের ক্ষুধাকে কয়েকগুন বাড়িয়ে দিতো। আমার মা কেমন রাধুনি সেটা কাউকে বিচার করতে হবে না, তার হাতের রান্না যে আমাকে মন্ত্রমুগ্ধ করেছে সেই ছোটবেলা থেকেই এই ভেবেই আমি চিরসুখী।
দাদা আর সেবেলা বাড়ি আসেনি। একদিন রাতে বাবা খুব ভাঙ্গিয়ে উঠালেন, তার চোখ দুটো লাল। বললো ওজু করতে। পাশের ঘরে মায়ের কান্নার আওয়াজ। কিছু জিজ্ঞেস না করেই ওজু করে জায়নামাজে দাড়ালাম। বুঝতে পারলাম ভয়াবহ কিছু ঘটছে। বাবা ঝাড়ি দিয়ে জিজ্ঞেস করলো,"তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ছিস নাকি?"
আমি একটু থতমত হয়ে গেলাম জায়নামাজে দাড়িয়ে,"মানে ফজরের নামাজ?"
বাবা বুঝলেন আমার ঘুম ভাঙ্গেনি,"রাত দুটো বাজে, তোর মা এর কাছে বস। আমি হাসপাতালে যাচ্ছি। তোর দাদা আর নেই!" বাবার গলাটা কেঁপে উঠলো। চোখ মুছতে মুছতে বারান্দায় বসলেন, রিক্সার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন।
ছোটবেলার এসব তাবত স্মৃতিগুলো আমাকে আর আনন্দ দেয় না, কিন্তু যখন আমাকে হাসপাতালে ভর্তি করালো তখন কেমন যেনো শান্তি অনুভব করলাম। মুখে যখন মাস্ক লাগাচ্ছিলো তখন মনে হলো আমার মা এই বুঝি তার রান্নার ঝাপি খুলে বসবেন। জীবন সায়াহ্নে মায়ের হাতের রান্না স্বর্গের স্বাদের কাছাকাছি কিছু একটা হবে।
ঠিক কতদিন হাসপাতালে ছিলাম মনে নেই। জ্ঞান ফিরবার কিছুদিন পরও স্যালাইন চলছিলো, কাঁচা ব্রুকোলি, আলু সেদ্ধ আর ভেজা ভুট্টা খেতে গিয়ে বমির উপক্রম হতো। প্রচন্ড ক্ষুধার সাথে শুরু হতো প্রচন্ড কাপুনি, অজ্ঞান হয়ে যেতাম। মনে পড়ে আমি কাজ শুরু করেছিলাম, আমার জন্য সবাই পার্টি করছিলো গ্রান্ড হোটেল পার্সোনাল রূমে। সোফিয়া হোয়াইট ওয়াইন সবার গ্লাসে ঢেলে দিচ্ছিলো। আমি তাকিয়ে ছিলাম শ্যাম্পেনটা দিকে। যখন গ্লাসের অবশিষ্ট ওয়াইনটুকু চুমুক দেবো তখন আমার পৃথিবী অন্ধকার হয়ে গেলো। আমি জ্ঞান হারালাম।
হাসপাতাল থেকে যখন সলিনট্যূনা রিহ্যাবে নিয়ে গেলো তখন আমার হাতে একটা হ্যান্ড ব্যান্ড পড়িয়ে দিলো। ওখানে ছিলো আমার নাম্বার। আমি জানতাম আমার যাবতীয় অসুখের কোনো রেকর্ড আমাকে দেয়া হবে না, সব অনলাইন। সোনিয়ার বেলায়ও তাই হয়ে ছিলো। রিহ্যাবে চলতো একের পর এক মানসিক যন্ত্রনা। সামনে বিভিন্ন মদের বোতল দিয়ে রাখতো, কড়া নির্দেশ ছিলো যতদ্রুত সুস্হ হতে চাই নিজেদের কন্ট্রোল করতে হবে। ভুলে দুবার বোতলে ছুয়ে ফেলেছিলাম, অমন সময় পায়ে লাগানো বেল্টে থাকা তীব্রশক মন আর শরীরটাকে বিষিয়ে তুলতো।
আমার অতিরিক্ত এডিকশনের কারনে ব্রেন স্ট্রোক করে ফেলি। এর আগে ট্রিটম্যান্টের জন্য যখন রক্ত দিয়েছিলাম তখন রক্তে এলকোহলের লেভেল ভয়াবহ মাত্রায় বেশী, অন্যান্যা এডিকশনের কারনে হালকা জন্ডিসের উপক্রমও হয়ে ছিলো। হাসপাতালে বেশ কিছু দিন সংজ্ঞাহীন ছিলাম, সংজ্ঞা ফিরে পেলে জানতে পারলাম সবচেয়ে ভয়ংকর সময় নাকি তখন শুরু হবে। ইন্টারনাল হেমারেজ ছিলো সবচেয়ে ভয়ের। এলকোহল এডিকশন এমন একটা এডিকশন যেটাকে সনাক্ত করা যায় না। কিন্তু এই এডিকশনটা ধীরে ধীরে শিকড় বাঁধে, পরজীবি হয়ে শুষে নেয় জীবনি শক্তি।
তবে মাঝে মাঝে আত্মহত্যাপ্রবন হতে খুব মন চায়, ঘুমের দুএকটা ওষুধ আর ভোদকা অথবা ফিসস্কেল কোক সাথে একটু বুজ। মুহুর্তে ভুলিয়ে দেয় জীবনের সকল কষ্ট। এখনো যখন সিস্টেম বোলাগেট এর সামনে দিয়ে হেটে যাই, মনে হয় তুলে আনি দুটো সিবাস রিগ্যাল অথব জ্যাক ড্যানিয়েলস অথবা সোদরার আইরিশ পাবে মোহনীয় মানবীর কোমড়ের ভাজে ভাজে লুকিয়ে থাকা গল্পের সাথে সাথে টাকিলার শট!
জীবনের এই অধ্যায়টা আদৌ বন্ধ হবে কিনা এখনও বুঝতে পারছি না। জীবনের লক্ষ্য ঠিক এই মুহুর্তে পুরোপুরি ফাঁকা। মনটাকে বশ মানানো জরুরী, জরুরী পাগলা ঘোড়ার মুখে লাগাম লাগানো।
প্রচন্ড দাবদাহে যখন পুরো স্টক হোম পুড়ে ছাই, তখন আমি শুয়ে দুটো ন গ্ন দেহের মাঝে মুখ লুকিয়ে। নেশার অনেক রং, জীবনের রং কি তার কাছে কম হয়ে যায়?





কেমন আছেন? অনেকদিন পর দেখলাম আপনাকে।
পোষ্ট আগের মতোই ভালো। অনেক অনেক শুভকামনা!
উচ্ছৃংখলতা জীবনকে সুন্দর করে না। কিন্তু জীবন থেকে সব রং হারিয়ে গিয়ে তার সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলে তখন উচ্ছৃংখলতা ঘুরে ফিরে জুটে যায় নিজের অস্তিত্বের। আর তাই মিলিয়েই বর্তমান আমি।
আপনাকেও ধন্যবাদ
শুধু যারা নিজের জন্যই বাঁচে, তারা অল্পতেই হতাশ হয়ে যায়। যারা অন্যদের জন্য বাঁচে, তারা কিন্তু অল্পতেই হতাশ হয়না। তারা যানে, তারা ঠিকমত বাচলেই আরও দশজন মানুষ বাচবে।
আশা করি আপনি আমার কথাটা বুঝতে পেরেছেন।
এমন সাহসী লেখা গুলো সমাজের অনেক উপকারে আসবে। আপ্নার জীবন দীর্ঘ হউক এই কামনা করছি।
ভাল থাকুন
মন্তব্য করুন