আটপৌরে শীতকাল
এবারও শীত কথা দিয়ে কথা রাখলো না; জ্যাকেট, বুট জুতো নতুন জীন্স শপিং করার পর থেকে শীত উধাও। কোথায় তুষারপাত হবে তা না, শুরু হয় ঝিরঝিরে বিরক্তিকর বৃষ্টি। এই বৃষ্টিতে ভিজে উদাস হওয়া যায় না, গায়ে শীতের কাঁপুনি ধরা আর কি।
স্টকহোম শহরটা ঘুরবার কিছু নেই তেমন। সামার হলে শহর ঘিরে থাকা লেকের পাশে বীচ আর নাগরিক শান্ত কোলাহল উপভোগ করার মত, ইউরোপের অপরাপর দেশের মতো ঐতিহ্যগত সৌন্দর্য্য এখানে অনুপস্হিত। বছরের পর বছর শহরটার খুব বেশী বাহ্যিক পরিবর্তন নেই। মানুষ শুধু ছুটছে, হয়তো গত বছর এই রাস্তা ধরে যে মেয়েটি সকাল বেলা কাজে যেতো, এ বছর রাস্তাটা একই থাকবে কিন্তু মানুষগুলো পাল্টে যাচ্ছে।
জীবনের অনেকগুলো ধাক্কা সামলাতে হলো। বলা নেই কওয়া নেই, বাবা মারা গেলেন। জানাজায় যাবার মতো শারীরিক অবস্হা ছিলো না আমার। অতিরিক্ত এলকোহলে আসক্তির কারনে ইন্টারনাল হ্যামারেজ হয়, কাগজ পত্র ঘেটে বুঝলাম ১৫ দিনের মতো হাসপাতালে ছিলাম। হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে জানতে পারি বাবা মারা গেছেন। মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। দেশে যাবার জন্য টিকেট কাটতে যাবো, তখন বলা হলো হাসপাতাল থেকে ক্লিয়ারেন্স না পেলে ফ্লাই করতে দেবে না। একবার ভাবলাম গাড়ি কিনে ফেলি, ইন্জ্ঞিনে স্টার্ট দিয়ে বাংলাদেশের দিকে রওনা দেই। সর্ব সাকূল্যে ১৮ দিন লাগবে। ঝোকের মাথায় গাড়ি কিনতে গিয়ে এক দঙ্গল কাগজের সিগন্যাচার দিতে হলো, সব শেষে বলা হলো আমার নাকি লাইসেন্স নাই। ১ ঘন্টা বসিয়ে রেখে গবেষনা না করে শুধু জিজ্ঞেস করলেই হতো আমার লাইসেন্স আছে কিনা। এভাবে সাইন গুলো নেয়ার কি দরকার!
তারপরও গাড়ি দেবে, কিন্তু আমাকে একজন ড্রাইভার রাখতে হবে নাহলে এমন বন্ধু নিয়ে আসতে হবে যার লাইসেন্স আছে। পিতৃশোক মাথায় উঠলো, দিলাম বাসায় ফোন:
: হ্যালো, মা!
: বাবা, কেমন আছিস?
: আর কেমন আছি! দেশে আসার জন্য বুকটা ফেটে যাচ্ছে কিন্তু এই হারামীগুলা প্রায় সব আয়োজন করে রেখেছে আমাকে আটকে রাখার। তুমি কি আমাকে নিয়ে যাবা?
: বাবা, তোর বাবাকে কাল রাতেও স্বপ্ন দেখলাম। আমি অনেক একারে। তুই চিন্তা করিস না। আমি ভালো আছি।
ফোনটা হাতে নিয়ে বিগড়ানো মেজাজ নিয়ে হুড়মুড় করে কেঁদে ফেললাম। শোরুমের সুইডীশ ছেলেটা হতবুদ্ধ হয়ে দাড়িয়ে রইলো। আশেপাশের কাস্টমার সবাই আমার পাশে এসে দাড়ালো। আমি পাগলের মতো কাদতে থাকলাম। ডাক্তার বলেছিলো আমি যেনো খুব এক্সাইটেড না হই। পরে যা শুনলাম আমার খিচুনী শুরু হয়, চোখ উল্টে হাত পা কাপতে থাকে। সবাই তড়িঘড়ি করে আবার আমাকে হাসপাতালে নিয়ে আসে। আবারও ১৫ দিন।
গত পরশু যখন ঘুম ভাঙ্গে তখন চোখ খুলে একটু অবাক হয়ে যাই। যেই শোরুমে আমি কান্নাকাটি শুরু করেছিলাম সেই ছেলেটি ফুলের তোড়া নিয়ে দাড়িয়ে আছে। মুখে একটা উদ্বিগ্নতা আর লজ্জার ভাব।
: হাই! চিনতে পেরেছো আমাকে?
: চিনবো না কেন? তোমাকে আমি জীবনেও ভুলবো না। আমি ক্যাশ পেমেন্ট করতে গিয়েও তুমি আমাকে গাড়ি দাও নাই।
: দুঃখিত! গাড়ি বিক্রি করবার জন্যই তো চাকুরী করি, কিন্তু তুমি তো জানো আমাদের দেশের অদ্ভুত নিয়ম। কিন্তু তুমিতো তারও চেয়ে বেশী অদ্ভুত।
: আমার বাবা মারা গেছে। বাসায় আমার মা একা। এই হারামী ডাক্তার গুলো আমাকে ফ্লাই করার ছাড়্পত্র দেয়নি। তুমি গাড়িটা বিক্রি করলে আমি সেটা নিয়েই রওনা হতাম।
ছেলেটা হাসলো। "হেই ডো" বলে চলে গেলো। কিছুক্ষন পর নার্স আসলো। একটা ইন্জ্ঞেকশন দিলো। আমাকে জিজ্ঞেস করলো,"এই ছেলেটি কি তোমার বন্ধু?"
আমি মুখে বিশ্রী একটা গাল দিয়ে বললাম,"আমি হাসপাতালে আসার আগে একে খুন করতে চেয়েছিলাম। তখন মনে হয়েছিলো এই রেসিস্টা দুনিয়ার সবচেয়ে খারাপ লোক। কিন্তু মনে হয় আমি ভুল করেছি।"
নার্স বলতে শুরু করলো," ও মাঝে মাঝেই আসতো। আসলে তোমার ব্যাপারে ডাক্তার আশা ছেড়ে দিয়েছিলো। তোমার কাছের কাউকে খোজ করলে একেই খুজে পেয়েছে।"
আমার মুখ হাঁ হয়ে গেলো। বলে কি! এই হারামী সাদা চামড়াটা নাকি আমার কাছের মানুষ! মনটা চাইলো নার্সটার কান বরারবর দুটো লাগাই। নার্সকে কিছু না বলে চোখ বন্ধ করলাম। বুকের ভেতর এক অদ্ভুত দম আটকানো ভাব।
হঠাৎ মাথায় একটা খবর মনে পড়লো মাইমুনার তো ভিসা হয়েছিলো। ও কি আসে নি? হাসপাতাল থেকে রিলিজ পেয়ে বাসায় আসলাম। বাসায় এসে দেখি পুরো খালি। পুরো খালি হবে নাই বা কেন! বাসার চাবী আর পাসলক তো জানে না, তার ওপর আমার আইফোন যে ঠিক কতদিন বন্ধ সেটাও জানি না।
দেশে মাকে ফোন দিলাম ধরে নি। আজকে আর ফোন দিতে ইচ্ছে করলো না। ফ্রিডেমসপ্লানে নতুন একটা স্ট্রিট ক্লাব খুলেছে, হারেম। ওখান বরাবর হাটা দিলাম!
জীবনটা নষ্ট যখন হলো তখন আরেকটু ভালো করেই নষ্ট হোক!





কন্ট্রোল..
নিওয়ে, গুড টু সি ইউ ব্যাক।
আসলে একাকী জীবনে আত্মনিয়ন্ত্রন খুব কঠিন এখন। সোনিয়ার চলে যাওয়াটা বেশ ভোগাচ্ছে!
ধন্যবাদ আমাকে মনে রেখেছেন।
আমি অরেব্র তে ছিলাম. ভিসা শেষ হয়ে যায় তাই দেশে চলে আসি। এখন সেখানে খুব যেতে ইচ্ছা করে কিন্তু যাবার কোনো উপায় নাই. আপনি নিজের জীবনের জন্য সন্তুষ্ট থাকুন. আমার মত দেশে এসে আপনাকে ধুকe মরতে হচ্ছে না.
সোনিয়ার নানীবাড়ি ভিভালাতে। ওরেব্রো সেন্ট্রালে একটা রাজপ্রাসাদ আছে লেকের মাঝখানে। সামারে খুব সুন্দর লাগে ওখানে যেতে। কসমস, টিউলিপ আর সবুজ ঘাস গাছ পালায় ছেয়ে থাকে। আর পুরো শহরটা এতটাই জমকালো যে মাঝে মাঝে মনে হয় ইউরোপের যৌবন সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়। এছাড়া শহরের বাইরে বিশাল মুভিং টাওয়ারের চাকতীতে ইকিয়ার রেস্টুরেন্টে বসে পুরো শহরের চারিদিকে সবুজ বন আর ভাঙ্গা চোরা ইন্ডাস্ট্রি তাঁক লাগিয়ে দেয়।
তবে যতই যা বলেন নিঃসঙ্গতা ধ্বংস ডেকে আনে। আপনি দেশে সবাইকে নিয়ে আছেন বলে সবসময় ভাবেন আপনাকে বাঁচতে হবে আর আমি একাকী, কিছু দিন আগে বাবা চলে গেলেন, মাকে একা ফেলে চলে আসলাম। রাতের বেলা খেতে বসলে ইদানিং মনে হয় পুরো জীবনটাই একটা বিশাল শূন্য। বেচে থাকাটা যেন এক বীভিষিকা।
আপনি অবশ্যই একজন সৌভাগ্যবান। ভালো থাকুন
বাবার কথা জেনে খারাপ লাগলো
এই খারাপ লাগা ব্যাপারটা যেনো আমার পিছু ছাড়ে না
জীবন থেকে যেন আস্তে আস্তে সবকিছুই বিয়োগ হয়ে যাচ্ছে
Amaro beche thakata orthohin laage। Sweden theke lekhapora kore deshe eshe bekar bohudin dhore। Sweden e thakle to ontoto odd job korte partam। ekhon chokh buje orebro er rastai hatar kotha vabi।
May ur father rest in peace।
Take care.
আপনিও নিজের দিকে খেয়াল রাখুন
তাই?
সব ঠিক হয়ে যাবে। সামনেই আসবে সুদিন!
হবে একদিন
মন্তব্য করুন