পাবো না আর তোমায় অসম্ভবের পায়ে মাথা খুটে
ইদানিং সকালে ঘুম থেকে উঠেই আর খবরের কাগজ হাতে নেয়া হয় না। আবিদ মারা যাওয়ার পরদিন সকালে মা পেপার পড়ার সময় যখন বলল, ‘ক্লোজআপ ওয়ানের এই ছেলেটা মারা গেল’, প্রথমে খেয়াল করি নি। পেপারের উপর চোখ পড়তেই দেখি আবিদ। হাসছে।
অনেকক্ষন, অনেক অনেক ক্ষন আবিদের ছবিটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। বুঝতে পারছিলাম না কেন ওর ছবি পেপারের প্রথম পাতায়। লেখাটা পড়তে পারছিলাম না। অক্ষর গুলো অপরিচিত লাগছিল।
পেপারে কি তবে ভুল খবর আসলো? ভাবতে ভাবতে পেপার রেখে পিসি অন করলাম। ফেসবুকে তখনো আবিদের স্ট্যাটাস -
passing a wndrfl tym with MATTRA at cox'sbazar....
২৪ ঘন্টাও হয়নি এই স্ট্যাটাসের। একটা একটা করে ছয়টা পেপার দেখলাম। একই নিউজ সব গুলোতে। কি করে সম্ভব!!
ক্লোজআপ ওয়ান বা এ পর্যন্ত যত প্রতিযোগীতামূলক অনুষ্ঠান হয়েছে বাংলাদেশে আর যত শিল্পী বের হয়েছে এসব অনুষ্ঠান থেকে আবিদ শাহরিয়ার তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একজন শিল্পী।
মারা যাওয়ার মাত্র দশদিন আগে গীতিকার শুভ’র অকাল মৃত্যুতে আবিদ ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিল
“একটু দাঁড়াবে কি এখনি নামবে বৃষ্টি, বাংলালিংক দেশ, এরকম আরও অনেক গানের গীতিকার শুভ, আমার কাছে মানুষ, আজকে সকালে রোড এক্সিড্যান্টে মারা গেছে (ইন্নালিল্লাহ) তার আত্না শান্তি পাক, প্রতিদিন এত খারাপ নিউজ আর ভালো লাগে না” -
১৯।০৭।১১
আবিদ কি তখন জানতো তার ভাগ্য কি লিখে রেখেছে? নাকি কিছু বুঝে উঠার আগেই চলে গেল সব ফেলে! কেন সে এমন স্ট্যাটাস দিয়েছিল -
I am standing by with river and water's going slow, I saw my face on the silent water and feel lonely without you....
যে ছেলেটা সেদিনও ফেসবুকে অনলাইন হতো সে আর অনলাইন হবে না, তার স্ট্যাটাস আপডেট হবে না, তার নতুন কাজ, নতুন এ্যলবাম, কনসার্ট নিয়ে কোনো খবর আসবে না। কেমন যেন একটা অনুভূতি হচ্ছে মনে হলেই। সব শেষে কাজ করা এ্যলবাম 'নব আনন্দে জাগো' হয়তো বের হবে কিন্তু সে থাকবে না, সেই আনন্দে ভাসবে না।
কিভাবে সহ্য করেন বাবা-মা এই বয়সের একটা ছেলে তাদের ছেড়ে চলে গেলে? আবিদের মতো একটা ছেলে চলে গেলে? সবাই খুব মিস করছে আবিদ তোমাকে।

আবিদের কন্ঠে - ‘পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে’ গানটা সারাক্ষন মনের মধ্যে খচ খচ করছে। গানের কথা গুলো যেন আবিদের কথাই বলছে। ওর প্রোফাইলের এই স্ট্যাটাস গুলো দেখে মনটা আরও বেশী খারাপ হয়ে আছে। ওর একটা স্ট্যাটাস--
“একটা গল্প বলা দরকার। আমি যেখানে শেষ করবো সেখান থেকে আপনি শুরু করবেন। এভাবে দেখা যাক কত দূর যায়। বহুদিন পর কলেজে গিয়ে মন খারাপ হলো খুব। কিভাবে যে মনটা ঠিক হবে তাই ভাবছে আশিক। এবার আপনি….”
অনেক তাড়াতাড়ি তোমার গল্প শেষ করে দিলে আবিদ। অনেক কিছু বলার ছিল তোমার নিজের গল্পে। অনেক কাজ করার ছিল। আরও বড় গল্প করার ছিল জীবনে। অনেক কিছু দেয়ার ছিল তোমার বাবা-মাকে, তোমার বন্ধুদের, শুভাকাঙ্খীদের - আমাদের। কে শেষ করবে আবিদ তোমার গল্প?





ঠিক বলছিস অনেক অসময়ে চলে গেল................
মন খারাপ করাই বটে
ক্লোজআপ ওয়ানের ২০০৫-এর আয়োজনের সময় সব প্রতিযোগীর মধ্যে তিনটা ছেলেরে আশ্চর্যরকম আলাদা মনে হইছিলো। রুমি, রিংকু আর আবিদ। তিনটা ছেলের তিন রকমের হইলেও তাদের মধ্যে অদ্ভুত একটা মিল দেখতে পাইছিলাম। পুরা গ্রুপটারে নিয়া একটা মিউজিক ভিডিও বানানোর টীমের সাথে চাকুরীসূত্রে প্রায় এক সপ্তাহ টানা বাংলাদেশ ট্র্যাভেল করতে হইছিলো। প্রত্যেক রাতে সবাই মিলা ক্যাম্পফায়ার কইরা গান করা আড্ডা দেওয়া। তখন দেখছিলাম এই তিনজনের মিলটা...রুমি ঘাড় ত্যাড়া, রিংকু একটু মফস্বলি আবিদ একটু রিজার্ভ...কিন্তু তিনজনই অসম্ভব রকম ডিটারমাইন্ড তাদের লক্ষ্য নিয়া, আর তাদের একরোখামী। রুমি একবারো শিল্পী হওয়ার স্বপ্নের কথা শোনায় নাই সে বোহেমিয়ান হইতে চাইছিলো, রিংকু কইছিলো সে বাউল আর লোকগীতি নিয়াই থাকতে চায় আর আবিদের রবীন্দ্রপ্রীতি ছিলো চলনে বলনে।
আবিদের মৃত্যু সংবাদ শু্ইনা আমার একটা বাজে অনুভূতি হইছে, আমার এখনো বিশ্বাস হয় না আবিদ রাতের বেলায় ঐরকম আনসেইফটি মেজারে অ্যাডভেঞ্চারে বের হইছে। আবিদ সবসময়ই বেশ সাবধানতায় থাকা ছেলে...ঐ রাতে ভাটার সময় সমুদ্রে যাওয়ার বিষয়টা আবিদের চরিত্রের সাথে কেনো জানি মিল খায় না।
কি বাচ্চা চেহারা, আহারে
আবিদের চেহারা দেইখা প্রথমে আমিও ভুলটা করছিলাম, বাচ্চা একটা মুখচোরা টাইপ ছেলে ভাবছিলাম, পরে দেখি সে চরম মজা করতে জানা একজন বন্ধুবৎসল ছেলে...
ক্লোজআপ ওয়ানের ২০০৫ এর টিমটা বেস্ট টিম এভার...... নোলক ছাড়া।
আবিদ, মেহরাব, পুতুল, বিউটি, রাজিব, সোনিয়া, রিংকু, রুমি................
খবর শুনে মনে হল আমার নিকট কোন আত্মীয় হারানোর সংবাদ শুনছি।
আবিদ এরকম আত্মার আত্মীয় হয়ে উঠেছিল ।
আমার এখনো মনে হচ্ছে নিকট কোন আত্মীয় হারিয়েছি।
আমার মা পেপার হাতে নিয়ে বসে থাকেন।
বড় অসময়ে চলে গেল।
সেদিন সক্কাল্বেলা ফেসবুকে দেখলাম একজনের স্ট্যাটাস, বিশ্বাস হচ্ছিল না, এক বন্ধুরে জিজ্ঞসা করতেই দিলো নিউজ লিঙ্ক আর এই ওর গাওয়া গানটা অনেক অনেক খারাপ লাগছে
ওর পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে গানটা শুনে দেইখেন আপু।
ভালমানুষ হিসেবে যেরকম চেহারা চোখে ভাসে আবিদ ছিল দেখতে ঠিক সেইরকম একটা ছেলে। প্রথম আলোর একটা ফিচার পড়ে জানলাম শুধু চেহারাতেই নয় সে সত্যিকার অর্থেই একটা ভাল মানুষ ছিল। জনপ্রিয়তার মোহে না পড়ে শুধু রবীন্দ্রসংগীত নিয়েই তার যে আগ্রহ সেটা তাকে অন্য সবার চেয়ে আলাদা করে তুলেছিল। সব কিছু মিলিয়ে সে ছিল খুব আকর্ষনীয় একটা ব্যক্তিত্ব। এরকম প্রমিজিং একজন শিল্পীর অকালে চলে যাওয়া মানে আমাদের ক্ষতি। আমাদের দেশের জন্য একটা বিরাট ক্ষতি।
ঠিক বলছেন। গানের পাশাপাশি অনেক স্যোশাল ওয়ার্ক করতো আবিদ। ভালো স্টুডেন্ট, আকর্ষনীয় ব্যক্তিত্ব, ভদ্র - বিনয়ী, সত্যিকার অর্থেই একটা ভাল মানুষ।
অসম্ভব মন খারাপ করা একটা দূ্র্ঘটনা..
(
অসম্ভব.. মন খারাপ করা একটা বিষয়। মেনে নিতে ইচ্ছা হয়না।
দুই এক বছর আগে ভারতের "আমুল স্টার ভয়েস অব ইন্ডিয়া"র চ্যাম্পিয়ন পুলে ডুবে মারা গেছিল । সেই মৃত্যুকে স্বাভাবিক মনে হয়নি । আমাদের আবিদের মৃত্যুও কেমন য্বন অস্বাভাবিক । ওর মত ছেলে জেনেশুনে ভাটার সময় সমুদ্রে নামবে, কেমন অদ্ভুত!! মেনে নিতে কষ্ট হয় । সেই সাথে ওর আরো দুইজন বন্ধু! সেইদিন প্রথম আলোয় ওদের নিয়ে লেখা পড়ে চোখের পানি সামলাতে কষ্ট হচ্ছিল । কি যে হচ্ছে এখন দেশে! চল্লিশ জন বাচ্চা ছেলে, তারপর ছয়জন তরুণ । আর এখন এই তিনজন তরুণ । মন ভালো রাখা সম্ভব হচ্ছে না এখন আর ।
পরক্ষণেই আবার আমরা নিজেদের কাজে ব্যস্ত হয়ে যাচ্ছি। কারো যেন সময় নাই।

যার যায় সেই বুঝে।
যে ডিন তুমি এসেছিলে ভবে হেসেছিল সবে্্্
মন্তব্য করুন