ইউজার লগইন

স্বপ্ন মৃত্যু

গত কয়দিন ধরে ঝুম বৃষ্টি পড়ছে । খাওয়ার টেবিলে একফালি সরষে ইলিশ দেখতে মন চাইছিল আবিদ সাহেবের। হায় আফসোস মাসের শেষ প্রান্ত । আধমরা মাছি মারা কেরানির চাকুরী তাও আবার বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে । এখানে শুধু কাজের চাপ, ফাইলপত্র কাগজ কলম লক্ষ কিংবা কোটি টাকা এক মিছেমিছি হিসেব রাখা । এত টাকা প্রতি দিন সর্তকতার সাথে গুনতে হয়, জমা করতে হয় মালিক পক্ষের ব্যাংকে । একটা আহ ! একটা নোট যদি হত তাহলেই হয়ত খাওয়ার টেবিলে একফালি সরর্ষে ইলিশ এর দেখা মিলত। কি আর করা । আবিদ সাহেব ইদানিং প্রেমে পড়েছেন, তাই মাঝে মধ্যে দু'একটান চরুট খেতে ইচ্ছে করে, সেখানেও এক মহা ফ্যাসাদ ৩ টাকার সিগেরেট খেতে হলে সরকারকে দিতে হয় সাথে আরও ৫ টাকা । এ যেন বিষম খাওয়ার মতই । তাই একটা চুরুট কিনে তা নিভেয়ে রেখে আবার জ্বালিয়ে খান উনি, যদিও স্বাদ আর প্রথমবারের মত থাকে না, তবুও তরুর কথা মনে এলেই চুরুটা ফতুয়ার পকেট থেকে বের করে টানেন ।
ওহ! তরুর সাথে পরিচয় করিয়ে দিই, এই তরুর হচ্ছে আবিদ সাহেবের প্রেম, মন প্রাণ সব কিছু দিয়ে আবিদ সাহেব তরুর পূজা করেন।, তরু এক সময় আবিদ সাহেব এর ক্লাস মেট ছিলেন, তাও আবার সেই ক্লাস সেভেন এর কালে, তরুর বাবা আর্মি পারসন বদলী হয়ে কত কত জায়গায় গিয়েছেন, শেষ মেস আবার আবিদ এর সাথে দেখা মিলে যায় আরিচার ফেরী ঘাটে, সেখান থেকেই এই প্রেম । যদিও তরু মনে করেন আবিদ তার ভাল বন্ধু ছাড়া কিছুই নয়। কিন্তু এই গোবেচারা আবিদ তা মানতে নারাজ, এর পেছনে অবশ্য একটা যুক্তি সংঘত কারণ আছে, এই একমাত্র তরু যেন আবিদ সাহেবের খোঁজ খরব রাখেন, আর কেই মনে হয় আবিদ সাহেবকে মনে রাখেন কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে ।
গত দু'দিন আগে আবিদের বাবা গ্রাম থেকে পত্র পাঠিয়েছে, "
বাবা আবিদ,
আশা করি ভাল আছ, আমিও পরিবারের সকলকে নিয়ে ভাল আছি । আমার জন্য তুমি কোন চিন্তা করিও না । ভালমন্দ খাবার খাবা, শরীরের প্রতি যত্ন নিবা ।
এ মাসের শেষে তুমি আমার জন্য ৫০০০/- টকা পাঠিয়ে দিও ।
ইতি
তোমার পিতা ।

আবিদ চিঠিটা পড়ার পর , মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল, মাস শেষে সে বেতন পাবে ৭০০০/- টাকা ৫০০০/- টাকা বাড়িতে পাঠালে হাতে থাকবে ২০০০/- টাকা, এই খুপড়ি ঘরের ভাড়া গুনতে হবে ১৮০০/- টাকা, হাতে থাকল মাত্র ২০০/- টাকা । আবিদ মনে বাবাকে উদ্দেশ্য করে বলল, বাবা ক্ষমা করে দিও ভাল মন্দ তো দুরের কথা তোমাকে টাকা পাঠানোর পর রোজা রাখার সু-বন্দোবস্তো হল।
আবিদ সাহেব প্রায়ই স্বপ্ন দেখেন কোটি টাকার ফ্লাটের বারান্দায় বসে ঠান্ডা হাওয়া খাচ্ছেন । আবার মাঝে সাঝে দেখেন দামীগাড়ীর কেবিনে বসে গান শুনছেন আমার পরান যাহা চায় । স্বপ্ন তো স্বপ্ন আবিদ সাহেব তা কখনও বাস্তবে ভোগ করতে পারেন না । প্রতিদিন যখন অফিসের দিকে রওনা হন তখন ভাঙ্গা রাস্তার নোংরা পানি মাড়িয়ে, রিকশাওয়ালা, বাসের কন্টাক্টর এর সাথে খিস্তি করে অফিসে যেতে হয়, আবার ফিরে আসার সময় একই । বৃষ্টি হলে অনেকের মনই অজনা আনন্দে পুলকিত হয়, কিন্তু এই আবিদ সাহেবের মনে হয় উল্টোটা, গত তিন বছর ধরে যে ছাতাটা ব্যবহার করে আসছেন, সেটা তার বার্ধক্য প্রমান কার জন্য রং চটে গিয়েছে, স্থানে স্থানে ফুটো হয়ে বৃষ্টি থেকে তার প্রভুকে রক্ষা করতে না পেরে শোকাহত হয়ে পড়ে। রিকশা ভাড়া একলাফে দ্বিগুন হয়ে যায়, রাস্তার নোংড়া পানি মাড়িয়ে ক্লান্ত শরীর নিয়ে হেটে বাড়ি ফেরা ছাড়া কোন উপায় থাকে না । কোথায় আবিদ সাহেবের বৃষ্টি বিলাস? কোথায় রসনা ভোজ আর কোথায় তার বস্তবতা ?

আবিদ সাহেব বাবার জন্য টাকা পাঠিয়েছেন, কদিন থেকে অনিয়মিত আহার, পায়ে হেটে অফিস করে, ভীষণ জ্বরে পড়ে আছেন। তরু এসেছিল তাকে দেখতে, তরু অবশ্য তাকে বলেছিল তাকে ডাক্তার এর কাছে যেতে, আবিদ সাহেব ডাক্তারের কাছে যাননি, উনি এখন জ্বরে ঘোরে স্বপ্ন দেখছেন
আবিদ-তরু তুমি এ অসময়ে গোসল করলে কেন ?
তরু- আহ! দেখছনা আজ বাহিরে কি ভীষন বৃষ্টি একটু ভিজতে ইচ্ছে হল তাই ।
আবিদ- ঠান্ডা লেগে যাবে তো, আমি কি ডাক্তারকে কল করব ?
তরু- আহ ! না, কি দরকার, জানো আজ আমি তোমার জন্য সরষে ইলিশ রান্না করেছি, যাও ঝটপট ফ্রেশ হয়ে এসো।
আবিদ আর তরু এখ ডাইনিং রুমে
আবিদ - একটু এসি টা কমাও, ঠান্ডা লাগছে তো
তরু-ওকে
আবিদ- তোমার রান্নাটা খুব দারুন হয়েছে । মনে হচ্ছে স্বর্গের বাবুর্চির রান্না ।
তরু- থাক আর হাওয়া দিতে হবে না, আজ রাতে আমার বেড়াতে বের হব, বৃষ্টির রাতে হাইওয়েতে গাড়িতে ঘুরতে বেশ ভাল লাগে, চারদিকে বৃষ্টি তুমি আর আমি একা একটা গতিময় কেবিনে, রাতের আধার কেটে ছুটে চলছি, কি বল নিয়ে যাবে না ?
আবিদ - জ্বী হুকুম ।
ঢাকা ময়মনসিংহ হাইয়ে রোড ধরে গাড়ি ছুটে চলছে, বৃষ্টির সময় গাড়ি আস্তে চালাতে হয় কিন্তু আবিদের আজ আস্তে গাড়ি চালাতে ইচ্ছে করছে না, মনে হচ্ছে আরও আরও গতি চাই, সব গাড়ি গুলোকে এক এক করে পিছনে ফেলে আবিদ ছুটে চলছে । তরু এতক্ষণ বকবক করে কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে, যদি তরু চুলের ঝাপটটা আবিদের কাছে উসখুস এর সৃষ্টি করছে তবুও কেন জানি আবদিরে কিছু বলতে ইচ্ছে হচ্ছে না । মোড় ঘুড়তেই হেড লাইটের আলো গিয়ে পড়ল এক মহিলার উপর, উনি যেন গাড়ি থামাবার নির্দেশ দিচ্ছেন, আবিদ চিন্তা করল কি করবেন, হঠাৎ খেয়াল করল ঐটা যেন আবিদর মা, মা এখানে আসবেন কেন উনি তো গত ১৫ বছর আগেই সব মায়া ত্যাগ করে চলে গেছেন, উনি এই বৃষ্টির রাতে রাস্তায় কেন আসবেন ? আবিদ গাড়ি ব্রেক কষল, গাড়িটা ৩টা পল্টি খেয়ে পাশের পুকুরটাতে পড়ে গেল, আবির বুঝতে পাড়ছে সে আর তরু দু'জনেই ডুবে যাচ্ছে, তার কেন জানি বের হতে ইচ্ছে হচ্ছে না, কারণ পিছন থেকে তার মা যেন তার হাত ধরে বলছেন, "বাবা ডুবে যেতে দে , আয় বাবা আমরা সবাই ডুবে যাই, পৃথিবর লক্ষ কোটি কষ্ট বুকে লালন করার চেয়ে ডুবে যাওয়াই উত্তম , ভয় পাসনে বাবা, আমি আছি তোর সাথে, সবাই চলে গেলেও তোর মা তোকে ছেড়ে যাবে না ।

ইন্নালিল্লাহ, কিছুক্ষণ আগে এই ভাঙ্গা মেসে একজন আবিদ চলে গেছেন না ফেরার দেশে, এই মেসের সবাই যেমনই হউক ,তারা যেন আজ এক সাথে আবিদের জন্য কাজ করছে, তার লাশ তার গ্রামে বাড়িতে পাঠাতে হবে, সবাই মিলে টাকা, গাড়ি, কাফন, বরফ, চা- পাতা আর তুলা কাঠের বাক্সের ব্যবস্থা করছেন। মেসের মালিক এলাহি মিয়া আবিদের পাশে চেয়ার পেতে বসে চুরুট টানছেন আর বলছেন " পোলাডা বড় ভালা আছিল, ভালা মানুষরা বেশি দিন টিকে না " ।

পোস্টটি ৯ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

অনিমেষ রহমান's picture


হা আমরাবন্ধুতে স্বাগতম!!
কেমন আছেন।
পড়লাম; সাথে আছি।

তানিম হক's picture


ধন্যবাদ, তেমনটা আগের মতন নেই, একটু পাল্টে যেতে হচ্ছে, মনে হচ্ছে আবিদ সাহেবের মতন না, জীবন অবাসান হয়।, ভাল থাকবেন ।

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


Welcome

টিপ সই

তানিম হক's picture


ধন্যবাদ, শুভেচ্ছা রইল।

মেসবাহ য়াযাদ's picture


সুন্দর লেখা
স্বাগতম

তানিম হক's picture


শুভেচ্ছা রইল।

মীর's picture


সুন্দর লেখা Smile
এবি'তে Welcome

নিকোলাস's picture


স্বাগতম, তানিম ভাই।
লেখাটা বেশ ভালো লাগলো.....
Smile

তানবীরা's picture


সুন্দর লেখা
স্বাগতম

১০

অকিঞ্চনের বৃথা আস্ফালন's picture


তনিম ভাই, একানে কি নতুন?
লেখাটা টা কষ্ট দিয়েছে।

১১

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


এবি তে সুস্বাগত।

লিখতে থাকুন, পড়তে থাকি।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.