চট্টগ্রাম মেয়র র্নিবাচন: জনগণের চাইতে আভ্যন্তরীণ কোন্দলের ক্ষমতা অনেক বেশি...
যখন এই পোস্ট লিখতে শুরু করলাম তখন চট্টগ্রাম মেয়র নির্বাচনের ভোটাভুটি চলতেছে। আমি এক্কেরেই ঢাকার পোলা। চট্টগ্রামের সাথে আমার কোনরম রক্তের সম্পর্ক কোনকালে ছিলো না। বিভক্তির ষষ্ঠ ডিগ্রী দিয়া যদি জোরকৃত সম্পর্ক তৈরী করতে চাই তাইলে হয়তো মেয়র পদপ্রার্থীগো লগেও আমার সম্পর্ক বের কইরা ফেলা সম্ভব। হা হা হা। কিন্তু শহর চট্টগ্রাম আমার অনেক প্রাণের জায়গা। সেই নব্বই দশকের মধ্যভাগ থেইকা চট্টগ্রামে আমার যাতায়াত। সেই যাতায়াত কখনো বন্ধ হয় নাই। চট্টগ্রামের পরিবর্তনের সময়টাও এইটাই। চট্টগ্রাম শহর যেনো আমার চোখের সামনে দিয়া আরবানিটির ওড়না পরলো গায়ে। পাহাড়ি পথে রিকশাওয়ালাগো পাশাপাশি হাটতে হাটতে কথা কইতে কইতে গন্তব্যের দিকে যাওয়ার দিনগুলি মোটরের ভাগে গিয়া পড়তে শুরু করলো। এখনতো ঢাকা শহরের শহুইরা স্বভাব, ট্রাফিক জ্যামটাও চট্টগ্রাম খানিকটা দখলে নিছে। সিটি সার্ভিসের নামে যেই মিনিবাস/কোস্টার গুলি রাস্তায় চলে, তারা কালো ধোঁয়া ছাড়ে, তাদের চাকায় পিষ্ট হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র...
যাউগ্গা আমার এই পোস্টের উদ্দেশ্য শহুরেপনার সমালোচনা না বরং শহুরেপনার অগ্রযাত্রায় যারা সামিল হইতে চায় তাগো নেতা নির্বাচনের মূল্যায়ন-বিশ্লেষণ। যদিও রাজনৈতিক বিভাজনের বিশ্লেষণে আমার খুব একটা আগ্রহ নাই। কারণ ঐটা আড্ডার বিষয়, লিখিত ফর্মে যার গুরুত্ব কেবল পত্রিকার পাতায় থাকে...কারণ ঐটারে সেকেন্ডারী রেফারেন্স হিসাবেই দেখবো মানুষ। আদালতে যারে কখনোই প্রমাণ হিসাবে উপস্থাপন সম্ভব হইবো না। সতর বছর মহিউদ্দিন সাহেব চট্টগ্রামের মেয়রগীরি করছেন বইলা এই বছর কোনো চট্টলাবাসী যদি তারে ভোট না দেওনের সিদ্ধান্ত নেয় তাতে আমার কি বলার আছে। কর্পোরেশনের সমস্যার মুখোমুখিতো আমারে হইতে হয় না। এই সতর বছরে মহিউদ্দিন সাহেব তার ক্ষমতার ম্যানিপ্যুলেশন কেমনে করছেন সেইটাতো আমারে চোখ মেইলাই দেখতে হয় নাই। এর লেইগাই আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এক রাজনৈতিক সহকর্মী খোকন ভাই বলছিলেন দুইটা বিষয়ে কখোনো ভবিষ্যত বানী করনের ঝুঁকিতে না যাইতে এর প্রথমটা হইলো ক্রিকেট খেলা আর দ্বিতীয়টা হইলো নির্বাচন।
তবু অচেনা ব্লগ কর্তৃপক্ষ আমারে গতোরাইতে একটা মেইল পাঠাইয়া কইলো এই নির্বাচন বিষয়ে কিছু একটা লিখতে। আমার একবিংশ শতকের শুরুর নির্বাচনের কথা মনে পড়ে তখন মহিউদ্দিন সাহেবের কোন একটা নির্বাচনের সময় আমি চট্টগ্রামে অবস্থান করতেছিলাম। চিটাগনিয়ান বন্ধুবান্ধব পরিবেষ্টিত আমি দেখতে পাই যে মহিউদ্দিন সাহেব চট্টগ্রামবাসীর প্রাণের দাবীগুলিরে স্পর্শ কইরা যান। তার প্রতিদ্বন্দ্বী সম্ভবতঃ ছিলেন চারদলীয় জোটের মীর নাসিরউদ্দিন সাহেব। সেই নির্বাচনের আগে আমরা জানতে পারি যে এবার জাহাজ মার্কায় মহিউদ্দিন সাহেব জিতে যাবেন। কারণ তিনি আওয়ামি আমলেও চট্টগ্রামবাসীর সাথে একাত্ম হইয়া বন্দর বাঁচানের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিছিলেন। তিনি জানেন চট্টগ্রামবাসীর মূল সমস্যা জলাবদ্ধতা আর চড়াই-উৎড়াই। এইসব সমস্যার সমাধান তিনি করবেন বইলা বিশ্বাস করতে শুরু করে চট্টগ্রামের মানুষেরা। মহিউদ্দিন সাহেব শহরে সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে পাড়া-মহল্লায় পাবলিক টয়লেট করছেন। যেইখানে আমি অনেক ব্যস্ত ব্যবসায়িরেও দেখি সকাল বেলার প্রাতকৃত্য সাইরা অফিসমূখী হইতে। তিনি রাস্তাঘাটের পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালান নিয়মিত। ঢাকায় যদিও দশটার সময় অফিসযাত্রার সময় দেখা যায় ঝাড়ুদাররা অফিসসূচী মাইনা রাস্তা ঝাড়ু দিতেছে, চট্টগ্রামে এইটা ঘটেনা সেইখানে ভোর হইতেই নামে পরিচ্চন্নতাকর্মীরা।
কিন্তু তৃতীয়বারের মতোন বিশাল ব্যবধানে জিতনের পর থেইকা শুনি আর পত্রপত্রিকায় পড়ি মহিউদ্দিন সাহেব নাকি বহুত পাল্টাইছেন। বাস্তবতঃ তার আসল রূপ পরিগ্রহ করেন। একসময়কার শ্রমিক সংগঠনের চান্দার টাকায় চলা মহিউদ্দিন সাহেব ক্ষমতার অপব্যবহার শুরু করতে শুরু করেন। চট্টগ্রাম শহরের মালিক বইলাই ভাবতে শুরু করেন নিজেরে। যার প্রতিবাদও শুরু হয় নগর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব কাঠামোর ভেতরেই। মঞ্জুর আলম নামের এক একনিষ্ঠ আওয়ামি রাজনীতিবিদ কমিশনারই এই প্রতিবাদে নেতৃত্ব দিতেছিলেন বইলা শুনতে পাই। এরমাঝেই আমাগো দেশে আবার জলপাই শাসকেরা আসে তারা দৌড়ের উপর রাখেন সকল ক্ষমতা কাঠামোর মানুষেরে। যাতে তারা নিজেরা ক্ষমতায় অধিগ্রহণ করতে পারে সুবিধামতোন।
এরপর আসে ২০০৮ সালের নির্বাচন। এই নির্বাচনে জিতনের পর ঘরের ছেলেরা আবার ঘরে ফিরতে শুরু করে। শুরু হয় দলাদলি আর কোন্দল। মানে পুরানা সব কোন্দল। যেমন চট্টগ্রামের বিএনপিপন্থীরা আজীবন আলোচনা করে আবদ্দুল্লাহ আল নোমান যদি নির্বাচন করে তাইলে তারা এককাট্টা হইয়া ভোট দিবো। কিন্তু আবার আমীর খসরুর লোকেরা এইটা হইতে দিতে পারে না। আওয়ামি মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে যেমন এইবারো নুরুল ইসলাম বিএসসি একজনরে ২৫ লাখ টাকা দিয়া নির্বাচনে খাড়া করাইয়া দিছিলো। সারাদেশের মতোন চট্টগ্রামেও দলের ভিতরকার দলাদলি অপারেট করে বেশ ভালোমতোনই। যেই কারনে এইবারের দলীয় মনোনয়ন লইয়াও চলে অনেক লুকোছাপা লুকোচুরি। আওয়ামি লীগে মহিউদ্দিনের রাজনৈতিক ঐতিহ্যের কারনে তার বিরুদ্ধে সরব উপস্থিতি কম দেখা যায়। মহিউদ্দিন একসময় নিজহাতে লাঠি লইয়া বন্দরে চান্দাবাজী করছে। এই কয়েকবছর আগেও তার এক নির্বাচনী জনসভা শুনছিলাম মাইকে। জনসভার বক্তৃতায় কেউ চুদানির ফুয়া শব্দবন্ধ ব্যবহার করবার পারে এইটা নিজকানে না শুনলে বিশ্বাস করতাম না। অন্যদিকে বিএনপির দলাদলি করে ভদ্রসমাজের(?) প্রতিনিধিরা তাই উভয়পক্ষই শক্তিশালি ভাবে নিজেগো। এইবার নোমান নিজে মেয়র নির্বাচন করবেন বইলা সিদ্ধান্ত নিছিলো বইলাই শুনছিলাম শুরুতে। এইটা শোনা মাত্রই আমীর খসরু মাহমুদের তোরজোর শুরু। সে যেহেতু ব্যবসায়ি পরিবারের সন্তান মেয়র নির্বাচন করনের শখ নাই তার নিজের, তাই বইলা তার পুতুল বসবোনা ঐ চেয়ারে এইটাতো হইতে পারে না। খোঁজ খোঁজ...সাবেক আওয়ামি মহিউদ্দিন বিরোধী মঞ্জুর আলম মেয়র হিসাবে মনোনয়নপত্র জমা দিলো। তারে সমর্থন দিলো বিএনপি নিয়ন্ত্রিত চট্টগ্রাম নাগরিক আন্দোলন। যেইখানে চবি'এর উপাচার্য সাহেবও আছেন। আমীর খসরু সাহেব মঞ্জুর আলমের সামর্থ্য বুঝাইতে সমর্থ হইলো খালেদা জিয়ারেও। বিএনপির সমর্থনে মঞ্জুর আলম প্রচারণা শুরু করলো মহিউদ্দিনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে।
আমার চট্টগ্রামবাসী বন্ধু-বান্ধবেরা নিশ্চিত কইরা কয় যে মঞ্জুর আলমের ক্ষমতা নাই মহিউদ্দিনরে নির্বাচনী যাত্রায় পরাজিত করনের। কিন্তু নির্বাচনে যে শেষ বইলা যে কিছু নাই সেইটা আমি মানি। কারণ বিএনপি নির্বাচনের পর থেইকা জামায়াতের সাথে একটা দূরত্ব তৈরী করতে চেষ্টা করতেছিলো। সেই বিএনপি তার মনোনীত প্রার্থীর জয়ের লেইগা জামায়াতের সহযোগিতা চাইলো হাত পেতে। জামায়াততো আসলে আগ বাড়াইয়াই ছিলো। শহর কেন্দ্রীক শক্তিশালি সাংগঠনিক ভিত্তির দাবীদার (?) জামায়াত সমর্থন দিলো মঞ্জুর আলমরেই।
আজকে নির্বাচনের প্রাক্কালে আমার মনে হয় না চট্টগ্রামের মেয়র নির্বাচনে জামায়াতের কোনো বিশেষ ভূমিকা থাকবো। কারণ জামায়াতের সাংগঠনিক ভিত্তির চাইতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রীক মাস্তানির শক্তি বেশি। মঞ্জুর আলমের একটা ভালো ভোটব্যাংক ছিলো রিয়াজউদ্দিন বাজারের হিন্দু ব্যবসায়ি জনগোষ্ঠী, তারা এখন মহিউদ্দিনের কথা কইতেছে শুনলাম বন্ধুগো কাছ থেইকা। বিএনপি এর আগের দুই নির্বাচনেই জামায়াতরে সাথে নিয়া ডুবছিলো। তারপরেও তাগো শিক্ষা হয় নাই ক্যান তা বুঝলাম না।
মনে হয় ডুবন্ত জাহাজের যাত্রীরা যেরম খড়কুটা পাইলেও আকড়াইয়া ধরে ভাইসা থাকনের আশায়, তেমনি বিএনপি'ও চাইতেছে কাউরে ধইরা চট্টগ্রামের রাজনীতিতে আবার প্রতিষ্ঠিত হইতে। অথচ যেইটার পরিবর্তন প্রয়োজন সেইটা কেবল পুঁজিবাদী প্রবণতার কারনেই টিকা থাকবো আজীবন। হয়তো এই নির্বাচনেও জিতনের সম্ভাবনা তৈরী হইতে পারে। কিন্তু আমাগো পুঁজিতান্ত্রিক দলগুলিতে সামন্তীয় চরিত্রের অবশেষগুলি রইয়া গেলে নির্বাচনে প্রার্থী-দল কিংবা প্রতীকের চাইতে আভ্যন্তরীণ কোন্দল অনেক বড়ো ফ্যাক্টর হিসাবে বিবেচিত হইতেই থাকবো নির্বাচনী সংস্কৃতিতে।





আমার ধারণা মহিউদ্দিনের ধারে কাছে যাইতে পারবোনা। এই লেখাটাও প্রথম শ্রেনীর হইছে।
চসিক নির্বাচনের রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ভালোই লাগলো।
নির্বাচনে শুনলাম মঞ্জুর আলম জিতা গ্যাছে...যদি এইটা সত্য হয় এইটা আওয়ামি সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের প্রথম প্রতিকাদী প্রকাশ...
বিষয়টা আমার কাছে একদম আওয়ামী পরাজয় মনে হয় নাই। মহিউদ্দিন শেষের টার্মে নিজেই নিজেরে পচাইছে। আর মঞ্জুর সাকার প্রার্থি হ্ওয়ায় মহিউদ্দিনের জামাত কানেকশন ছুইটা গেছে।
প্রায় ৯৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে মহিউদ্দিন হারছে। এক চিটাগনিয়ান বন্ধু কইলো মহিউদ্দিন বিরোধী গণজোয়ার এই হারের কারণ। কিন্তু আমার নিজের একটা অবজার্ভেশন আছে এই বিষয়ে। সাধারনতঃ মধ্যবিত্ত ভোটাররা মার্কা দেইখা ভোট দেয়। মহিউদ্দিন তার নিজের এলাকা বন্দরে হারছে যেইখানে আসলে খাইটা খাওয়া শ্রমিক ভোটারের সংখ্যা বেশী। এইটারে আমার কাছে খালি মহিউদ্দিনের পরাজয় মনে হয় না, কারণ চট্টগ্রামে মহিউদ্দিন মানেই আওয়ামি লীগ। বাজেটের পর চাইলের দাম বাড়ছে...আমার আপনের খুব ঝামেলা না হইলেও যেই মানুষেরা দিন আনি দিন খাই টাইপ তাগো কাছে এই বিষয়টা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আর তারাই ঐ ৯৫ হাজার ভাসমান ভোটার।
ভাস্করদার কথাটা একেবারে ফেলনা না। আমাদের দেশের মানুষ যেমন কষ্টে থাকে, সরকারততো উদাসীন থাকে এবং আমরা সবকিছুর জন্য নিজেদের দায়ী না করে সরকারকেই করি। ক্ষমতায় থেকে জনপ্রিয় থাকা অসম্ভব এরকম দরিদ্র দেশে।
সম্ভবত মঞ্জুর জিতছে।
আমরা যারা চট্টগ্রামে থাকা আমজনতা, তারা এই ফলাফলে মোটেই অবাক হ্ইনি। জনগণ আর অভ্যন্তরীণ কোন্দল- দু্য়ের মিলিত প্রভাবই মঞ্জুরের জয়ের কারণ। মজার ব্যাপার হলো, জনসভায় পাশে ছিলেন মহিউদ্দিনের এমন মুখচেনা সঙ্গীসাথীরা ব্যক্তিগত ফোনকলে একেবারেই বিপরীত অনুরোধ করেছেন পরিচিতজনদের, এমনকি কিরাকসমও করিয়েছেন। হাসিনা নাকি এক ছুতায় কাঁটা উগরাতে পেরে স্বস্তি পেয়েছেন :)।
এখন বিনোদ বিহারীবাবুর উপর খড়্গহস্ত হওয়ার লোকজন জুটে যাচ্ছে।
মন্তব্য করুন