ইউজার লগইন

হেথাক তুকে মানাইছে নারে, ইক্কেবারে মানাইছে নারে...(৩)

এক.
সকাল ১০টার মধ্যে সুধাসিন্ধু খীসার টিলার উপর বাড়িতে যাওয়ার কথা। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি। খাগড়াছড়িতে নিজের বাড়িতে আছেন সাংগঠনিক কাজের জন্য। আমি একজন কেন্দ্রীয় নেতার লগে দেখা হওনের উত্তেজনায় সকাল ৯টার মধ্যে গোসল-টোসল কইরা প্রস্তুত; সুধাকর দা আমারে আইসা নিয়া যাইবেন কদমতলী। ঠিক ৯টায় ফোন দিলাম সুধাকর ত্রিপুরারে, তিনি জানাইলেন তার একটু দেরী হইবো...সকালের নাস্তায় তিনি ভাত খান পাহাড়ি অভ্যাসমতোন। ভাত চড়াইতে একটু দেরী কইরা ফেলছেন বৌদি। আমার আর কি করা ফেনী হোটেলে পরোটা আর ডিম খাইয়া ক্যামেরা নিয়া ঘুরাঘুরি শুরু করলাম।

ফেনী হোটেলের সামনে খাগড়াছড়ি মুক্তমঞ্চ, সেইখানকার মুক্তির স্বাদ প্রথম দিন থেইকাই দেখি ধূসর পোশাকের পুলিশ ভাইয়েরা দখল কইরা বইসা থাকেন সকাল সন্ধ্যা-রাত্রি। আজকে সাথে একদল সেনাবাহিনী দেইখা আমি ওয়াইড অ্যাঙ্গেল লেন্স লাগাইলাম। তারপর শহরের জীবনযাত্রায় সেনাবাহিনী-পুলিশ-বাঙালি আর পাহাড়ি'র সহাবস্থান বিষয়ক একটা ছবি তুইলা ফেললাম। খাগড়াছড়ি শহরটা পাহাড়ের উপরে তৈরী। আগেরদিন সঞ্জীবদার কাছে শুনছিলাম একসময় সাপ্লাইয়ের পানির কোনো ব্যবস্থা ছিলো না। তখন পাহাড়ি ম্যাট্রিলিনিয়াল সোসাইটির মেয়েরা কলস কাঁধে হাজার ফিট নীচে নাইমা ছড়ি থেইকা পানি সংগ্রহ কইরা আবার হাজার ফিট উপরে উঠতো। তার ধারাবাহিকতাতেই পাহাড়ি মেয়েরাই এখনো সংসারের বেশিরভাগ কাজ করে। পুরুষরা কাজে গেলেও তাদের দায়ভার নাই কোনো সংসারে। বাজারের দুই একটা ছবি তুলনের পরেই আমার ডাক পড়লো।

এক সেনা অফিসার বইসা আছেন মুক্তমঞ্চে। আমারে পথ দেখাইয়া নিয়া গেলো একজন পুলিশ কনস্টেবল। তারপর জেরা শুরু। কোত্থেইকা আসছেন? কি কাজে আসছেন? ছবি যে তুলছেন এইটার জন্য কেনো অনুমতি নেন নাই টাইপ প্রশ্নবানে আমি জর্জরিত। কিন্তু চীরকাল এইরম পরিস্থিতি আমি ভালোই সামলাইয়া ফেলি চোপার জোরে, আজকেও সামলাইলাম। বরং পুলিম ভাইয়েরা তাগো একটা গ্রুপ ছবি তুইলা দেওনের অনুরোধ করলো। তারপর সেনাবাহিনীর সদস্যগো মাঝ দিয়া বীরদর্পে নাইমা আসনের টাইমে টের পাইলাম পেছনে গোয়েন্দা লাগছে। আমি যেইখানেই যাই দূর থেইকা দুইজন আমারে চোখে চোখে রাখতেছে। ফোন আসলো সুধাকরদা'র। তিনি আমারে সরাসরি কদমতলী চইলা যাইতে বললেন টমটম নিয়া।

দুই.
কদমতলী বাজার থেইকা সুধাকরদা'র মোটর বাইকে টিলার চূড়ায় উঠতে খারাপ লাগলো না। মোটামুটি বড় একটা বাড়ি। তিনি নিজে আইসা আমারে অভ্যর্থনা জানাইলেন। ৬৩ বছরের তরুণ সুধাসিন্ধু খীসারে দেইখা আমি রীতিমতোন আহ্লাদিত হইলাম। তারপর শুনলাম তার যুদ্ধময় সংগ্রামী জীবনের ইতিহাস। রাজনৈতিক সংগ্রামের আদর্শ। সাথে ঘরে বানানো পিঠা-পায়েশ আর চা। বাঁশ কাইটা বানানো হুক্কা যারে ডাব বলতেছিলেন সেইটা দেইখা টান দিতে ইচ্ছা করলেও নিজের ব্র্যান্ডের সিগারেটেই আস্থা রাখলাম বেশি। তিনি শুনাইলেন শহরে রিকসা কেনো বাড়তেছে, গুচ্ছগ্রামের সেটেলাররা অলস হইয়া যাইতেছে এই অভিযোগ আসার পর সেনাবাহিনী তাগো রিকসা বানাইয়া দিছে, প্রতিদিন নতুন নতুন অভিবাসীরা আসে কুড়িগ্রাম-বগুড়া-যশোর থেইকা। তারা মাসে মাথাপিছু কার্ডে ৮৪ কেজি চাইলের সাথে একটা রিকসাও পায়। শহরের কোনো পথ না চিনাই তারা চলে। টমটম ফ্যাক্টরীর নামে পাহাড়ি শরণার্থীর জমি বন্দোবস্ত দিছে কোনো এক মালিকরে। সেই টমটম চলে ব্যাটারীতে এই অঞ্চলের রাজনীতির মতোই ধুকতে ধুকতে।

প্রায় দুইঘন্টা পাহাড়ি জনপদের মুক্তি সংগ্রামের দৃপ্ত প্রতীজ্ঞা শুইনা উঠলাম। আবারো দেখা করতে আসার আমন্ত্রণ নিয়া বাইরে আইসা ছবি তুলতে গিয়া দেখি সুধাসিন্ধু বাবু'র বাড়ির পাশের নীচু উপত্যকায় শয়ে শয়ে টিনের ঘর বাঙালিগো বন্দোবস্ত দিয়া অবৈধ ক্যাম্প বানাইছে সরকার। এই সব সেনাবাহিনী পরিচালনা করে। আমার বাঙালি চেহারার বদৌলতে একদল বাঙালি ছোকড়া আমার পিছনে ঘুর ঘুর করতে লাগলো। যারা সুধাসিন্ধু বাবুর বাড়িতে রাত হইলেই ঢিল ছোড়ে। যারা তার বাড়ির গাছ কাইটা নিয়া যায় ইন্টেলিজেন্সের উস্কানীতে। এমন সময় সুধাকরদার ফোন।

তিন.
সুধাকরদা'র ফোন পাইয়া টিলার ঢালু পথ বাইয়া নামতে শুরু করলাম। তিনি নীচে আমার জন্য অপেক্ষা করতেছিলেন। আমারে তিনি সিস্টেম রোস্তোরাঁয় নামাইয়া দিয়া যাইবেন। যদিও তারে জোর কইরা দাওয়াত দিয়া দুইজন মিলা খাইলাম। আবারো হাসের মাংস-সব্জী-ভর্তা। একবারে আর্মির পিক আপ ভ্যানের সামনে আমারে নামাইয়া দিয়া গেলেন তিনি। হোটেলে আসলেই কেরম অস্থির একাকীত্ব। তাই খুব বেশিক্ষণ রুমে থাকতে ইচ্ছা করলো না। আবারো শাওয়ার নিয়া রওনা দিলাম স্বনির্ভর বাজারে। সেইখানে গণতান্ত্রিক পাহাড়ি যূব ফোরামের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মিথুন চাকমা আমার জন্য অপেক্ষায় আছে।

আমি একজন গম্ভীর চেহারার পাহাড়ি নেতার প্রত্যাশায় গিয়া দেখি এই ছেলেরে আমি চিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষ থেইকা। একই সাথে রাজনীতি করার অভিজ্ঞতা থাকায় ইউপিডিএফ'এর এই তরুণ নেতা তার সমস্ত অনুভূতি আবেগ ঢাইলা দিলো আমার রেকর্ডারে। তাগো নির্যাতিত হওনের একটা ভিডিও দলিল উপহার দিলো আমারে। ২৩ ফেব্রুয়ারি স্বনির্ভর বাজারের আশপাশ মিলাইয়া ৩৯৯টা পাহাড়ি স্থাপনা পুড়াইয়া দিছে বাঙালিরা। নিরন চাকমা নামের এক পাহাড়ি তরুণ ঐ হামলার পর থেইকা ক্র্যাচে ভর দিয়া হাটে। মনে হইলো আমার পাশে আমার অবনত হৃদয় হাটতেছিলো খোড়াইয়া খোড়াইয়া। নিজের বাঙালিত্বরে করুনা করা ছাড়া আর কীইবা করতে পারি এই আবহে!?

চার.
রাতের খাবারে আবারো গেলাম মারমা হোটেলে। আগেরদিনের চাইতে আন্তরিক পাহাড়ি মালিক আর বাকী কর্মচারীরা। একটা ছোট্ট চুয়ানির বোতল আর মাছ ভাজা নিয়া গল্প শুরু করলাম চাইল্বা ম্রাইমার সাথে। একসময় ভাত আসলো স্পেশাল ভূনা পর্ক আর চিংড়ির সাথে। মনে হইলো এইবার পাহাড়ি আবেগের সাথে কিছু বাড়তি কোলস্টেরলও নিতে হইতেছে আমার। কিন্তু পাহাড় আমারে স্বাধীনতা দিছে যা কিছু করার। পাহাড়ের আড়ালে আমি আর নিজের ক্ষয়িষ্ণু চেতনারে ধারণ করতে পারি না। পাহাড়ি সরলতায় আমিও তবে গড়াগড়ি করি এই বেলা।

পোস্টটি ১৫ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মাহবুব সুমন's picture


আপনার এই সিরিজটায় লেখার স্টাইলে পরিবর্তনের চেস্টা লক্ষ্য করছি। অবশ্য আপনার সদা পরিচিত " কেরম" "সেরম" স্টাইলটাই আমার বেশী ভালো লাগে।

বাংলাদেশের প্রতিটি সরকার ( ৭২ - বর্তমান ) যেভাবে পাহাড়ে "শাষন" / প্রশাসন চালিয়েছে বা চালাচ্ছে সেটা চলতে থাকলে সে কারনে আজ হোক পাহাড় আলাদা হয়ে যাবেই। সভ্য দেশে যা কিছু অসম্ভব তার অনেক কিছুই সেখানে সম্ভব। এখনো সময় আছে শোধরানোর, নচেৎ কি হবে বোঝাই যায়।

একজন বাঙালী হিসেবে নিজের কাছে এর জন্য অনেক ছোট লাগে। অনেক কিছুইতো জানা কিন্তু অনেক কিছুইতো বলতে পারি না।

সিরিজটা উপভোগ করছি বস।

মেসবাহ য়াযাদ's picture


পাহাড় আমারে টানে না। যতটা সমুদ্দুর টানে। আপনের লেখা পড়ে আস্তে ধীরে মনে হয় পাহাড়ের ডাক শুনতে পাচ্ছি। চলুক বস... ভালো থাইকেন

নজরুল ইসলাম's picture


কোনো ডকু বানাইতেছেন?

ভাস্কর's picture


@ মাসু, আমি সচেতনভাবে লেখা পরিবর্তন করি নাই...যেমনে মাথায় আসছে লেইখা গেছি।

@ মেসবাহ ভাই, আমারে সমুদ্র পাহাড় বন সব টানে। শহর ছাইড়া এইরম কোনো জায়গাতেই চইলা যামু ভাবতেছি।

@নজরুল, স্টিল ফটোতে ডক্যুমেন্টারীর কথা ভাবতেছিলাম। এইবার হইলো না। বোধহয় আরো একবার আসতে হইবো।

মীর's picture


পর্ক, চিংড়ি, মাছভাজা, চুয়ানি.. সন্ধ্যায় কি সব যে শুনাইলেন দাদা

ভাস্কর's picture


আরো কতো কি খাইলাম...তাতো এখনো কই নাই... Tongue

চাঙ্কু's picture


নন আফসুসিত মজায় আছেন দেখি !!!

ভাস্কর's picture


হ...

বোহেমিয়ান's picture


তাগো নির্যাতিত হওনের একটা ভিডিও দলিল উপহার দিলো আমারে..

আমাদের এই সব অন্যায় বন্ধ করতে হবে

১০

মুক্ত বয়ান's picture


এই সব পাহাড়ের আকর্ষণটাই মনে হয় এইরকম। একলা থাকা যায় না। সবসময় দলবেঁধে থাকতে হয়।
চলুক লেখা...

১১

লীনা দিলরুবা's picture


এই সিরিজটার অপমৃত্যু যেন না ঘটে (যেইটা ঘটতেছে আপনার লেখালেখিতে)।
পুরা গল্পের পরে উপসংহারের টোন টা অতীব সুন্দর হইতেছে। ফিনিশিং এমন মনোরম হলে পুরো লেখায় কোন একটি জায়গায় কোন অসঙ্গতি থাকলে সেইটা ভুইলা যাওন যায়।

১২

হাসান রায়হান's picture


আমি যদি আপনের মত এরম ঘুরতে পারতাম!

১৩

তানবীরা's picture


পাহাড়ের আড়ালে আমি আর নিজের ক্ষয়িষ্ণু চেতনারে ধারণ করতে পারি না। পাহাড়ি সরলতায় আমিও তবে গড়াগড়ি করি এই বেলা

হুমম, এনজয় ইয়োড় সেলফ

১৪

শাপলা's picture


আপনার এই লেখা পড়ে আমার রাঙগামাটির দিনগুলোর কথা মনে পড়ে গেল। যে ছবি আপনি আঁকলেন, সেটা যেন আমি ছুঁয়ে দেখতে পারছি। এমনই জীবনত আপনার লেখাটা।
অভিননদন। আপনার সাথে বেদনায় আমিও অবনত।

১৫

নুশেরা's picture


ঘোরাঘুরির ছবিব্লগ দেখলে কেউ কেউ যেমন বলে-- আপনার সাথে ঘুরে আসলাম, ভাস্করদার বেশীরভাগ লেখা সেরকম অনুভূতি দেয়। ডায়রী পড়লে মনে হয়, আরে এইরকম সময়ে তো আমার্ও একই কথা মনে হচ্ছিলো! ভ্রমণব্লগ পড়লে মনে হয়, ঠিক ওইখানে আমিও গেছিলাম, সুধাসিন্ধু খীসাকে আমিও চিনি। সত্যিই, পাঠককে লেখায় বুঁদ করে ফেলা অসাধারণ একটা সিরিজ পড়ছি।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

ভাস্কর's picture

নিজের সম্পর্কে

মনে প্রাণে আমিও হয়েছি ইকারুস, সূর্য তপ্ত দিনে গলে যায় আমার হৃদয়...