mithun chakma, conveinor, democratic youth forum, member UPDF central commitee
মিথুন চাকমা
চূক্তির মূল্যায়ণ
শুরুতেই আমরা বলতে চাই পিসিজেএসএসের সাথে সরকারের যে আনুষ্ঠানিকতা হয়েছে তাকে আমরা চূক্তি বলতে চাই না। এটা রাষ্ট্রের সাথে বিরোধী একটা দলের সাথে মেমোরান্ডাম অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিং। যারা রাষ্ট্রের জন্য হুমকী স্বরূপ ছিলো। সরকারী হিসেবে ১৯০০ জনের মতোন গেরিলা অস্ত্র সমর্পণ করেছিলো ঐ দিন। পাহাড়ি এলাকায় ২০০০'এর মতো গেরিলা যোদ্ধার সাথে সমতল ভূমির সেনাবাহিনীকে নাকানিচুবানি খেতে হয়েছে দীর্ঘ পনর বছর।
পার্বত্য এলাকায় রাজনৈতিক বিরোধ চলছিলো কাপ্তাই বাঁধ প্রকল্প বাস্তবায়নের পর থেকেই। সাড়ে তিনশ বর্গমাইল পাহাড়ি এলাকা থেকে বিতাড়িত হতে হয়েছিলো এর অধিবাসীদের। তারপর থেকেই শুরু হওয়া সংগ্রামী ইতিহাসের পরিনতি মাত্র ৯০ দিনের আলোচনায় হতে পারে আমরা এটা কখনোই মনে করিনি। এতো স্বল্প সময়ের আলোচনায় সংগ্রামী একটা অঞ্চলের শান্তি প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন শুরু হতে পারে না। তার জন্য প্রয়োজন দুটি ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন আইনী শাসনে অভ্যস্ত মানুষের দীর্ঘমেয়াদী আলোচনা বৈঠকের।
প্রশ্নকর্তা: কিন্তু পিসিজেএসএস নেতারা বলছেন তারা ১৯৮৫ থেকে এই প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন...
আশির দশকের মাঝামাঝিতে আলোচনা শুরু হয়েছিলো একটি সামরিক জান্তার সাথে। যারা তাদের স্বার্থ হাসিলের জন্য পার্বত্য এলাকার রাজনীতিকে অস্থিতিশীল করে তুলতে মূল ভূমিকা পালন করেছিলো। দেশের উত্তর বঙ্গের মানুষদের মাথাপিছু বড় অঙ্কের টাকার লোভ দেখিয়ে পার্বত্য এলাকায় রাজনৈতিক অনুপ্রবেশ করতে বাধ্য করেছিলো। তাদের সাথে কোনো গণতান্ত্রিক চূক্তি হতে পারে না। যে কারনে জনসংহতি সমিতির একজন নেতা প্রীতি চাকমার সাথে সমস্যার দ্রুত নিষ্পত্তির নামে একটি আধাখেচড়া চূক্তিও করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিলো। পরে প্রীতি চাকমাকে হত্যা করা হয় সেনাবাহিনীর আদেশেই।
এছাড়াও এই চূক্তি হয়েছিলো একপাক্ষিকভাবে আওয়ামি লীগ এবং পিসিজেএসএসের আলোচনায়। একটি দূর্বল জাতীয় কমিটি গঠিত হলেও কোনোরকম সাংবিধানিক প্রক্রিয়া মানা হয়নি চূক্তি প্রক্রিয়ায়। এধরনের বিশেষ চূক্তির জন্য প্রেসিডেন্সিয়াল প্রেসিডেন্সির বিধান থাকতে হয়। এই চূক্তি প্রণয়নে তাকে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে পুরোপুরি। এধরনের একটি সাংবিধানিক চূক্তি বাস্তবায়নের জন্য সংসদীয় অনুমোদন নেয়া বা আলোচনার স্কোপ থাকতে হয়, কিন্তু তার কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি আলোচনা শুরু কিংবা চূক্তি প্রণয়নের পরেও।
পাহাড়িদের দীর্ঘ সংগ্রামের পুরোটাই ছিলো সামরিক। মূলতঃ দুটি সামরিক জান্তার সময়েই পার্বত্য এলাকায় পাহাড়ি-বাঙালি বিরোধের শুরু হয় পরিকল্পিতভাবে। অথচ সেনাবাহিনীকে এড়িয়ে চূক্তি প্রণয়নের পদক্ষেপ নিয়েছিলো তৎকালীন সরকার। তখনকার সামরিক বাহিনী প্রধান লেঃ জেনারেল মাহবুবুর রহমান চূক্তির সময়েই বলেছিলেন সেনাবাহিনীকে বাদ দিয়ে এধরনের চূক্তি হলে তার বাস্তবায়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। পরে এই মাহবুবর রহমান আওয়ামি লীগের রাজনীতিতেই যূক্ত হয়েছিলেন। প্রক্রিয়াগত এসব গাফিলতি পার্বত্য শান্তি চূক্তি প্রণয়নে দূর্বলতা সৃষ্টি করে এবং সীমাবদ্ধতাগুলি তৈরী হয়। যার জন্য এই আলোচনার মধ্য দিয়ে একটি মেমোরান্ডাম অফ আন্ডারস্ট্যান্ডিং তৈরী হয় কেবল। সরকার তার নিজের সিদ্ধান্ত পিসিজেএসএসের মারফত তার নিজের সিদ্ধান্ত সমগ্র পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীর উপর চাপিয়ে দেয়। চাপিয়ে দেওয়া কোনো আইনে শান্তি প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন কখনোই সম্ভব বলে আমরা মনে করি না। একটি বৃহৎ জাতি তার শক্তিমত্তার সুযোগ নিয়ে ক্ষুদ্র জাতির উপর আধিপত্য বিস্তার করার ব্লু প্রিন্ট বাস্তবায়ন করেছে। যার মধ্য দিয়ে একসময়কার সংগ্রামী যুদ্ধরত একটি বাহিনীর ক্ষমতা খর্ব হয়েছে, আর এর সাথে সাথেই এর তৃণমূল পর্যায় থেকেই ক্রমাগত স্বার্থান্বেষী চর্চা শুরু হয়েছে। নিজেদের স্বার্থোদ্ধার করতে গিয়ে তারা পাহাড়ি জনগণ থেকে ক্রমশঃ দূরে সরে গিয়েছে। চূক্তি বাস্তবায়নের জন্য বা চূক্তিকে নিয়ে আরো আলোচনার অধিকারও তারা হারিয়ে ফেলেছে।
আমরা ঐ সময়ে চূক্তির বিরোধীতা করলেও এখন আর এই প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করি না। তবে তার প্রশাসনিক-রাজনৈতিক ও আইনগত ভিত্তি নিয়ে আমাদের যে বিশ্লেষণ সেখান থেকে সরে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
যে দলটিকে পাহাড়ি জনপদের প্রতিনিধি হিসাবে বিবেচনা করে তৎকালীন সরকার চূক্তি করেছিলো সেই পিসিজেএসএস এখন দ্বিধাবিভক্ত। চূক্তির সময়ে তাদের নেতা জ্যোতিরিন্দ বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা)'র নেতৃত্ব অস্কীকার করে বেরিয়ে আসা তাদের হাই কমান্ডের একটি অংশ এমএন লারমা পন্থী হিসাবে পরিচিতি দিয়ে নতুন করে পাহাড়ি জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতার রাজনীতি করতে চাচ্ছে। তাদের সাথে আমাদের আলোচনা চলছে একটি ঐক্যমত্যের আন্দোলন গড়ে তোলা বিষয়ে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে বুর্জোয়া পুঁজিবাদী সরকার দেশের একটি বৃহৎ অংশকে বাদ দিয়ে উন্নয়ণের কথা ভাবতে পারে না। তাই পার্বত্য এলাকার এই আন্দোলন এক অর্থে সারাদেশের আন্দোলন। এবং আমরাও সেভাবেই ভিউ করছি এ আন্দোলনকে।
সামরিক প্রভাব বিষয়ে:
পার্বত্য চট্টগ্রামকে দেখা যেতে পারে দেশের সেনাশাসনের ব্রিডিং গ্রাউন্ড হিসাবে। লেঃ জেনারেল এরশাদ থেকে মইন উ আহমেদ পর্যন্ত সব সেনাশাসকের রাজনৈতিক উত্থান পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকেই। বর্তমান ক্ষমতার দৌড়ে থাকা রাজনৈতিক দল আওয়ামি বিএনপিও এটা বুঝে গেছে। যে কারনে তারা মিলিটারীকে বিভিন্ন সুবিধা দিচ্ছে এ অঞ্চলে। এসব ফ্যাসিলিটি নিয়েই ফ্রাংকেনস্টাইন তৈরী হচ্ছে পার্বত্য শাসকদের মধ্য থেকে।
ভূমি সংস্কার আইন:
HDC, RC, Development Board কিংবা পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে পাহাড়ের মাত্র ১০ শতাংশ এলাকার জমির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেয়ার এখতিয়ার রয়েছে। বাকী ৯০% জমি একোয়ার্ড ল্যান্ড, রিজার্ভ ফরেস্ট, বেতবুনিয়া ভূ উপগ্রহ, সরকারী কলকারখানা, খাস জমি কিংবা কাপ্তাই হ্রদের মধ্যে রয়েছে।
সাজেকে রিজার্ভ ফরেস্টের জায়গাতে ক্যানটনমেন্ট তৈরী করা হয়েছে। কিন্তু ঐ এলাকার জুম্ম জনগণ বেশ কিছু সফল আন্দোলন গড়ে তুলেছিলো বলে এখনো সেখানে সেনাবাহিনী বড় কোনো ধরনের নৃশংসতা দেখাতে পারেনি। পাহাড়ি অনেক জুম্ম চাষের জায়গা চা-বাগান, কফি বাগানের নামে সেনাবাহিনী এবং রাজনৈতিক নেতাদের আত্মীয় স্বজনদের নামে বন্দোবস্ত দেয়া হচ্ছে। যেখানে ৭০% কর্মসংস্থান পাচ্ছে সেটেলাররা। আর যেসব পাহাড়িরা সেখানে আছে তারা উচ্ছেদের হুমকী মাথায় নিয়েই টিকে আছে। কবলিয়তের মাধ্যমে কোনোরকম ভূমি জরীপের ধার না ধেরেই পলিটিক্যাল মাইগ্র্যান্টদের জমি বন্দোবস্ত দিয়ে দেয়া হচ্ছে।
ইউপিডিএফ'এর বিকল্প প্রশাসন:
ইউপিডিএফকে সরকার এখনো নিবন্ধন করা হয়নি। এটা গতো সামরিক সরকারের পাহাড়ি জনগণকে ডিভাইড এন্ড রুল করার একটা কৌশল। যার কনসিক্যুয়েন্সেই এখন সেনাবাহিনীও ইউপিডিএফকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রস্তাব দিচ্ছে। পার্বত্য এলাকার প্রশাসন ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত দূর্নীতির গ্রাসে, টাকা দিলে বা সেনাবাহিনীর ব্যাকআপ থাকলে যে কেউ যা ইচ্ছা তা করতে পারে। ইউপিডিএফ তাই বিকল্প প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রয়োজন বোধ করেছে। তারা জুম্ম জাতির চিরায়ত সংস্কৃতির রীতি অনুযায়ী বিকল্প প্রশাসনের কথা বলে। আর সরকার তার হেজিমনি বা আধিপত্য চাপিয়ে দিতে চায়। কিন্তু যে ব্যবস্থা জনগণ মেনে নিয়েছে তার বিরুদ্ধে কোনো সরকারী নিয়ন্ত্রণ আসলে অস্থিরতা তৈরী হবে।
আন্তর্জাতিক সীমানা হিসাবে দেশের উত্তর পশ্চিমাঞ্চল অনেক স্পর্শকাতর। চূক্তির আগে বাংলাদেশ ছিলো নাগাল্যান্ড-মিজোরাম বিদ্রোহীদের শেল্টার। তখন বিষয়টা ছিলো পারস্পরিক সমঝোতার বিষয়। কিন্তু চূক্তি পরবর্তী নির্যাতের কারনে সেটাই হয়ে গেছে রাজনৈতিক বিনিময়ের অলিখিত মেমোরান্ডাম।





মন্তব্য করুন