জীবন অন্যত্র - মিলান কুন্ডেরা (ষষ্ঠ কিস্তি)
আর এর বাইরে যা ঘটছিলো: আগে নগ্ন শরীরে প্রেমিকের ছোঁয়ায় তার লজ্জাবোধ হতো; তাদের কাছাকাছি আসার অর্থ ছিলো ভিন্ন কোনো দেয়াল টপকে আসার মতোন, আর হঠাৎ জড়িয়ে ধরার বিষয়টা ছিলো রীতিমতোন বিব্রতকর কারণ এটা আসলে হঠাৎ'ই ঘটে যেতো। লজ্জার বিষয়টা যদিও তাকে নিরস্ত করতো না একেবারেই, উল্টো সঙ্গমের প্রবণতা বাড়তো, কিন্তু এ সময়ে তার সজাগ দৃষ্টি থাকতো নিজের শরীরের প্রতি, যেনো সঙ্গমের টানে শরীরটা আবার হারিয়ে না যায়। আর নতুন পরিস্থিতিতে লজ্জা ছিলো না একেবারেই; সব বাঁধা পেরিয়ে গিয়েছিলো সে। পরষ্পরের শরীর পুরোপুরি উন্মুক্ত ছিলো পরষ্পরের কাছে, লুকানোর কোনো চিন্তাই ছিলো না তার মাথায়...
এর আগে কখনো অন্য কোনো শরীরে নিজেকে এমন সমর্পণ করেনি সে, অথবা অন্য কোনো শরীরকে এমন করে অনুভব করেনি নিজের ভেতর। তার প্রেমিকেরা শরীরের মধ্যভাগ নিয়ে খেলা করতো হয়তো, কিন্তু সেখানে তারা কখনো বাস করেনি; তারা হয়তো তার স্তন নিয়েও খেলা করেছে, কিন্তু কখনো পান করে নাই তার অন্তস্থ সুধা। বুকের দুধ পান করানোর সময় সে মুগ্ধ হয়ে দেখতো তার সন্তানের দাঁত ছাড়া মুখের এলোমেলো খেলা, যেনো সে কেবল তার দুধ পান করেনি, বরং তার চিন্তা, কল্পণা এমনকি স্বপ্নগুলোতেও ভাগ বসাচ্ছিলো।
এই পরিস্থিতিটার তুলনা করা যায় শুধু স্বর্গোদ্যানের সাথে: শরীর সেখানে আবির্ভূত হয় একটা শরীর হিসাবেই, তাকে বনষ্পতির পাতা দিয়ে ঢেকে রাখবার কোনো মানে নেই; যেনো তারা ডুবে থাকে একটা শান্ত সময়ের অনিয়তঃ পরিধীর ভেতর; জ্ঞানবৃক্ষের গন্ধম ফলে কামড় বসানোর আগে ঠিক যেমন ছিলো আদম আর হাওয়া; মন্দ কিম্বা ভালো'র বাইরের কোনো মাপকাঠিতে তারা নিজেদের অবয়বে বেঁচে ওঠে; শুধুই কি তাই: স্বর্গের বেষ্টনীর ভেতর সুন্দর আর অসুন্দরের কোনো ভেদাভেদ থাকে না, আর তাই শরীরের কোনো উপাদানেই সুন্দর কিম্বা অসুন্দরের উপস্থিতি থাকে না, সবটাই সেখানে আনন্দময়; দাঁত না থাকলে কি হয়! মাড়িগুলো সেখানে আনন্দময়, স্তনজোড়া সেখানে আনন্দময়, নাভীর গভীরতা সেখানে আনন্দময়, ছোট্ট নিতম্ব সেখানে আনন্দময়, ছোট্ট অন্ত্রনালী যার উপস্থিতি মাকে দেখতে হতো খুব কাছ থেকে সেটাও আনন্দময়, বড় মাথার উপর খাড়া খাড়া চুলগুলোও সেখানে আনন্দময়। সে তার সন্তানের প্রস্রাব-পায়খানা কিম্বা শরীরের গ্যাস নির্গত হওয়ার বিষয়টাকে কেবল স্বাস্থ্য সচেতনতা হিসাবেই দেখতো না, বরং তাতে মেশানো ছিলো তার আবেগ-অনুকম্পা।
বিষয়টা একদমই নতুন লাগে তার কাছে কারণ সেই শৈশব থেকেই সে শারিরীক এইসব বিষয়গুলিকে এড়িয়ে যেতে চাইতো, এমন কি নিজের বেলাতেও; তার কাছে মনে হতো টয়লেটে বসার বিষয়টা মর্যাদাহানিকর (যে কারনে সে টয়লেটে যাওয়ার আগে তাকে কেউ দেখছেনা এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে তারপরেই টয়লেটে ঢুকতো), এমন অনেক সময় গেছে যখন সে লোকসম্মুখে খেতেও চাইতো না কারণ সবার সামনে খাবার চিবোনো আর গেলাটাও তার কাছে অস্বস্তির মনে হতো। তার ছেলের সব শরীরি প্রকাশই যেনো অসুন্দরকে আড়াল করে ফেলে, তৈরী করে দেয় তার শরীরের শুদ্ধতা আর পরিপূর্ণতা। স্তনবৃন্তে জমে থাকা দুধের ফোটাকে তার কাব্যময় লাগতে থাকে শিশির বিন্দুর মতোন; সে তার স্তন চেপে ধরে মাঝে মাঝেই ফোটা ফোটা দুধ বেরিয়ে আসতে দেখে; তারপর তর্জনীর ডগায় করে তার স্বাদ নেয়; ছেলের স্বাস্থ্যের জন্য প্রস্তুত তরলের স্বাদ নিতেই সে এমনটি করে বলে নিজেকে প্রবোধ দেয়, আসলে সে স্বাদ নেয় নিজ শরীরের; আর এই দুধ তার কাছে বেশ স্বাদু মনে হয়, শরীরের অন্য সব নির্গত রসের সাথেও সে এর ঘ্রাণের মিল খুঁজে পায়; এরফলে নিজেকে বেশ উপাদেয় বলে মনে হতে থাকে তার, শরীরটাকে মনে হয় কমনীয় আর যেকোনো প্রাকৃতিক উপাদানের মতোই গুণসম্পন্ন, ঠিক যেমন একটা গাছ অথবা একটা ঝোপ কিংবা ঝর্ণার জলের ধারা।





সত্যিই ভালো হচ্ছে অনুবাদটা।
ধন্যবাদ নুশেরা...যদিও আমি নিজে এই কিস্তি নিয়া খুব বেশি সন্তুষ্ট হইতে পারতেছি না।
পড়তে পড়তে হারিয়ে যাই। এটা যে অনুবাদকের গুণে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কুন্ডেরার ভাষায় পড়লে এভাবে হারাতাম না। কারণ ওটা আমার ভাষা নয়।
দারুন দারুন দারুন
মন্তব্য করুন