ইউজার লগইন

জীবন অন্যত্র - মিলান কুন্ডেরা (প্রথম ও দ্বিতীয় অধ্যায়)

(বিষয়টা অহেতুকও মনে হইতে পারে, কয়েকজন নিয়মিত পাঠক যখন জানাইলেন যে অল্প অল্প কইরা কিস্তি দেয়ার জন্য তারা পড়তে আগ্রহ পাইতেছেন না, আমার তাই প্রথম দুই অধ্যায় অনুবাদ শেষে যতোটুক কাজ শেষ হইছে সেইটুকরে একটা পোস্টে দেওনের ইচ্ছা হইলো...৭ কিস্তি একসাথে পইড়া বিষয়টা নিয়া আলোচনা করতে আগ্রহী হইয়া পড়ি আমিও। একটু কাব্যময়তা সম্পন্ন এই উপন্যাসের অনুবাদকর্মের আঙ্গিক নিয়া আত্মবিশ্বাসী হইলেও কিছু জায়গায় এখনো সমস্যা দেখতে পাই এখনো...সেই জায়গাগুলি ঠিক করাটা জরুরী লাগে ভবিষ্যতের জন্য)

১.

কবি'র মা যখন ভাবতে চেষ্টা করেন, ঠিক কোথায় কবিকে পেটে ধরেছিলেন, ঘুরেফিরে কেবল তিনটি জায়গার কথা তার মাথায় আসে: একরাতে একটি পার্কের বেঞ্চ, এক বিকেলে কবি'র বাবার এক বন্ধুর এপার্টমেন্ট, কোন এক সুন্দর সকালে প্রাগের বাইরের একটা রোমান্টিক নিসর্গ।

আর যখন একই প্রশ্ন কবি'র বাবা নিজেকে করেন, তিনি শেষ পর্যন্ত নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌছে যান যে কবি'র জন্ম নির্ধারিত হয়েছিলো তার বন্ধুর এপার্টমেন্টেই, তিনি যদ্দূর ভাবতে পারেন ঐ দিন সবকিছু ওলোটপালোট হয়ে যাচ্ছিলো। কবি'র মা প্রথমে বন্ধুর এপার্টমেন্টে যেতেই চাচ্ছিলেন না, দুইবার তাদের এটা নিয়ে ঝগড়া হয়েছিলো, দুইবারই তারা আপোষনামায় পৌছে যান শেষ পর্যন্ত। সব ঝামেলা শেষে যখন তারা উত্তেজনার তুঙ্গে ঠিক তখনই পাশের এপার্টমেন্টের দরজা ঠাস করে বন্ধ হওয়ার শব্দে কবি'র মা ভয় পেয়ে যান। ঐরকম অবস্থায় বিষয়টাকে আর তারা আর চালিয়ে যেতে পারেননি। ভালোবাসাবাসি বন্ধ করে দেন টেনশনে। বাবা ঐ টেনশনের সময়টাকেই কবি'র জন্মের সময় বলে দাবী করেন।

অন্যদিকে কবির মা কখনো মেনে নিতে পারেন না যে কবির জন্ম নির্ধারিত হয়েছিলো একটা ধার করা জায়গায় (তার কিছুটা ঘেন্না বোধ হয় একজন ব্যাচেলরের অপরিচ্ছন্ন ঘর, অপরিচিত একটা এলোমেলো বিছানার কথা মনে হলে), পার্কের বেঞ্চির সম্ভাবনাটাও সে বাতিল করে দেয় এক কথায়, সে ভাবতেই পারেনা অমন একটা জায়গায় কিভাবে সে সঙ্গমের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো, যেখানে কোন আনন্দবোধ কাজ করার কথা না, কেবল বেশ্যারাই এরকম জায়গায় শুয়ে পড়তে রাজী হতে পারে! তাই সে দৃঢ়ভাবে মনে করতে থাকে শহরের বাইরে একটা ছোট্ট উপত্যকায় আবেগঘন পরিবেশে দাঁড়িয়ে থাকা একটা বড় পাথরের চাইয়ের আড়ালেই সে কবিকে পেটে ধরেছিলো গ্রীস্মের কোন এক সুন্দর সকালে, যেখানে প্রাগবাসীরা ছুটি কাটাতে যায় সমস্ত ক্লান্তি থেকে।

এরকম একটা পরিবেশেই অবশ্য গর্ভধারনের বিষয়টাকে বেশ যথাযথ লাগে: তখন কেবল আঁধার কেটে গিয়ে চারদিক আলোকিত হয়েছে, প্রকৃতির অবারিত সৌন্দর্য্যের মাঝে, ঠিক যেখানে জীবন শুরু হলে সবচে' ভালো হয়; জায়গাটা যদিও শহরের যান্ত্রিকতা থেকে খুব বেশি দূরে নয় কিন্তু নিসর্গে পড়ে থাকা সারি সারি পাথরের চাই গুলো বেশ রোমান্টিক আবহ তৈরী করে রেখেছে। কবি'র মায়ের মনে হয় গর্ভধারনের সময়টায় তার অমন অনুভূতিগুলোই তৈরী হচ্ছিলো। তার নিজের বাবা-মা'র বিরক্তিকর রুটিনবদ্ধ জীবনের বিপরীতে কবি'র বাবার প্রতি তার প্রেম কি আবেগী বিদ্রোহ ছিলো না? একজন ধনী ব্যবসায়ির মেয়ে হয়েও তার সদ্য ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করা কপর্দকহীন একটা ছেলের প্রেমে পড়ার সিদ্ধান্তের সাথে কি ঐ বুনো আর দৃঢ় নিসর্গের তুলনাটাই বেশি মিলে যায় না?

আর তাই কবির মা'র জীবন কেটে যাচ্ছিলো ভালোবাসায়, কেবল সেই পাথরের চাইয়ের আড়ালে ভালোবাসাবাসির কয়েক সপ্তাহ পরের আশাহত হওয়ার দিনটি ছাড়া। যখন সে তার প্রেমিককে জীবনের সবচে আনন্দময় খবরটি জানালো, বেশ কয়েকদিন কেটে গেলেও নিয়মিত সেই মাসিক অসুস্থতার দিনগুলো রুটিনমতো আসেনি এমাসে। প্রতিক্রিয়ায় ইঞ্জিনিয়ার প্রেমিক রীতিমতো হতাশ করে দেয়া নিস্পৃহতা নিয়ে বলতে চেষ্টা করলো ( আমার কাছে যদিও তার ঐ নিস্পৃহতাকে বানানো আর অস্বস্তিকর লেগেছে) এটা কিছু নয়, মেয়েদের শরীর মাঝেমাঝেই এমন উদ্ভট আচরণ করে, হয়তো কয়েকদিন পরই আবার ঠিক হয়ে যাবে। কবি'র মা কিন্তু ঠিকই বুঝতে পারলো প্রেমিক তার আনন্দময় অনুভূতিকে এড়িয়ে যেতে চাইছে, মন খারাপ হয়ে গেলো তার, ডাক্তার যেদিন তার গর্ভধারনের খবরটি নিশ্চিত করলো সেদিন পর্যন্ত প্রেমিকের সাথে সে কথা বলতে পর্যন্ত পারেনি। অথচ কবি'র বাবা খবর শোনার সাথে সাথে বললো সে একজন বেশ ভালো গায়নোকোলজিস্টকে চেনে, যে তাদের চিন্তামুক্ত করে দিতে পারে। প্রেমিকের এমন কথায় কবি'র মা কেঁদে উঠেছিলো তারস্বরে।

একজন বিদ্রোহীর এমন করুণ পরিণতি! প্রথমে সে তার বাবা-মা'র কথার বিরুদ্ধে গিয়েছিলো তরুণ ইঞ্জিনিয়ারের জন্য আর এ ঘটনার পর সে ছুটে গেলো বাবা-মায়ের কাছে প্রেমিকের বিচারের আশায়। অভিভাবকেরা তাকে আশাহত করেনি, তারা ইঞ্জিনিয়ারকে ডেকে কথা বললো, চালাক পাত্র শুরুতেই বুঝে নিলো তার পালানোর কোন পথ খোলা নেই, সে সহজেই রাজী হয়ে গেলো অনাড়ম্বর বিয়ের প্রস্তাবে, আর নিজের ব্যবসা শুরু করার জন্য বড় অংকের যৌতুক বুঝে নিলো কবি'র নানা-নানীর কাছ থেকে; তারপর যে বাড়িতে তার নববধু জন্মের পর থেকেই বাবা-মায়ের সাথে কাটিয়েছে সেখানেই উঠে এলো বাক্স-প্যাটরা নিয়ে।

সুবিধাবাদী ইঞ্জিনিয়ারের এমন তড়িঘড়ি কবির মায়ের চোখ এড়াতে পারেনি, সে বুঝে নিয়ে নিজেকে সরিয়ে নিলো প্রেমের সেইসব রোমাঞ্চকর অনুভূতিগুলো থেকে, সে বুঝতে পারলো প্রবল ভালোবাসার চাইতে বরং অমনোযোগী ভালোবাসাটাই এখন ভালো। নিজের মতোন করেই ভালোবাসা বিনিময় করার অধিকার রয়েছে তার। কারণ তার বাবা প্রাগের সবচাইতে বড় দুটি দোকানের মালিক, কন্যা হিসেবে তার গুরুত্ব ঐ দোকানের হিসাবের খাতার মতোই দামী; সে তার জীবনের সবকিছুই একসময় সপে দিয়েছিলো প্রেমের জন্য (সে একসময় তার বাবা-মাকে ছেড়ে যেতেও রাজী ছিলো ভালোবাসার জন্য), প্রেমিকের কাছ থেকেও সে একই পরিমাণ ভালোবাসার প্রতিদান চেয়েছিলো শুধু। আর তাই প্রেমিকের এই অন্যায় আচরণের জবাব দিতে শুরু করলো সে, এর আগে ভালোবাসার হিসেবের খাতায় যতোটুকু ভালোবাসা সে জমা রেখেছিলো, তার পুরোটা তুলে নিলো প্রথমেই, বিয়ের পর থেকে তার আচরণ একেবারে পাল্টে গেলো , বিরক্তি আর মুখ ঝামটা দিয়ে কথা বলতে শুরু করলো সে স্বামীর সাথে।

তার কিছুদিন আগেই কবি'র মায়ের বড় বোন পারিবারিক বাড়ি ছেড়েছে (বিয়ে করে শহরের কেন্দ্রে একটি এপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়ে থাকে তার স্বামীর সাথে) তাই বিশাল বাড়ির নীচতলাতে শহরের বিখ্যাত ব্যবসায়ি থাকেন তার বৌকে নিয়ে আর ইঞ্জিনিয়ার তাদের ছোট মেয়েকে নিয়ে সংসার পাতে দোতলার তিনটা ঘরে -- দুটো বিরাট আর একটা ছোট ঘর --প্রাসাদোপম এ বাড়িটিতে শুরু থেকেই এর সব আসবাব তৈরী ছিলো দরকারমতো। এমন সাজানো ঘর না হলে ইঞ্জিনিয়ার বিপদে পড়ে যেতো, কারণ তার সম্পত্তি বলতে তো কেবল দুটো স্যুটকেস, যাই হোক, তবুও সে ঘরগুলোকে একটু অন্যরকম করে সাজাতে চাইলে কবি'র মা তাতে রাজী হয়নি, যে লোক তার ভালোবাসাকে গাইনোকোলজিস্টের ছুরির নীচে ফেলার চিন্তা করতে দ্বিধা করেনি, তার জন্য বিশ বছর ধরে তার বাবা মায়ের তিল-তিল করে গড়ে তোলা এই বাড়ির কোনকিছুকেই পাল্টে দিতে বিন্দুমাত্র আগ্রহবোধ করে না সে।

তবে তরুণ ইঞ্জিনিয়ার একটা বিষয়ে কোনরকম জবরদস্তি ছাড়াই খানিকটা কোমল প্রতিবাদী অবস্থান নিতে পারে বলে আমার মনে হয়: তাদের শোবার ঘরে একটা ভারী মার্বেল পাথরের টেবিলের উপর একটা নগ্ন পুরুষ মূর্তি রাখা ছিলো; মূর্তিটি তার নিটোল নিতম্বের উপর ভর দিয়ে রাখা বাম হাতে একটা বীনা ধরে আছে; আর ডানহাতের ভঙ্গীমাটা এমন যেনো এই মাত্র সে বীনার তারে আঙুল চালিয়েছে; ডান পাটা খানিকটা বাড়িয়ে রাখা, মাথাটা একটু ঝুকে আছে, কিন্তু চোখ দুটো আকাশের দিকে মেলে দেয়া। তবে এই পুরুষ মূর্তিটি অসম্ভব রূপবান, কোকড়া-কাঁধ ছাড়ানো চুল, যে শ্বেতপাথর খুড়ে তার শরীর তৈরী হয়েছে তার কোমল আভায় মনে হয় কিছুটা নারীসূলভ কমনীয়তা আর দেবতাসূলভ কৌমার্য্যের ছাপ পড়েছে সারা শরীরে; দেবতাসূলভ শব্দটা আমি কেবল উপলব্ধি থেকে বললাম বিষয়টা কিন্তু এমন নয়, মূর্তির পায়ের কাছে খোদাই করে লিখে রাখা নাম অনুযায়ী, বীনা হাতে এই মানুষটি হলেন গ্রীক দেবতা এ্যাপোলো।

কবি'র মা যদিও কালেভদ্রে মূর্তিটির দিকে তাকান। বেশিরভাগ সময়েই মূর্তির তাকানোর ভঙ্গীর কারনে খানিকটা অস্বস্তি কাজ করে বলে আর বাকী সময়ে ইঞ্জিনিয়ার সাহেব তার টুপি, জুতো কিম্বা গন্ধওয়ালা মোজা মেলে দেন মূর্তির মাথায় শরীরে, সঙ্গীতের দেবতারে এমন অপমানও সইতে হয়!

কবির মা তার বাবার উপর ক্ষেপে থাকার কারন কেবল তার রসবোধের খামতি বিষয়টা কিন্তু এমনও নয়: কবির মা আসলেই বুঝতে পারেন এ্যাপোলোর কাঁধে মোজা মেলে দিয়ে তার স্বামী কেবল মজা করছেন বিষয়টা এতো সোজাসাপ্টা নয়, ইঞ্জিনিয়ার এর মধ্যদিয়ে তাকে জানিয়ে দিতে চাচ্ছেন যে তার চূপ থাকাটা আদৌ সবকিছু মেনে নেয়া নয় বরং সে কবি'র মায়ের জগতকে অস্বীকার করতে চাইছে সৌন্দর্য্যের এই নিয়ম ভেঙে।

এভাবেই শ্বেত পাথরের সাধারন মূর্তিটি সত্যিই দেবতা হয়ে উঠে, যেই দেবতা মানবজীবনে হস্তক্ষেপ করে, যে সবকিছু দেখে চোখ মেলে, এলোমেলো করে দেয় মানুষের গন্তব্য আবার রহস্য উন্মোচনেও তার বিস্তৃত ভূমিকা। নববিবাহিত কন্যা এই দেবতাকে তার মিত্র বলে গণ্য করতে শুরু করে, নারীর স্বপ্নালু কল্পনায় সে মূর্তিটিকে প্রায়শ জীবন্ত দেখে, যার চোখের মনির রঙ পাল্টে যায়, কখনো-সখনো যেন শ্বাস নেয় বুক ভরে। সে এই ছোট্ট অর্ধনগ্ন মানুষটার প্রেমে পড়ে যায়, তার জন্যেইতো এতো অপমান সইতে হচ্ছে মানুষটাকে। দেবতার সুন্দর মুখের দিকে তাকিয়ে কবি'র মা প্রার্থনা করেন তার সন্তানটিও যেনো তার স্বামীর এই ছোট শত্রুর মতোন দেখতে হয়। তখন সে ভেবে নিতে পারবে তার সন্তানের বাবা আসলে ঐ ইঞ্জিনিয়ার নয় বরং এই দেবতার ঔরসেই তার জন্ম। সে দেবতার কাছে প্রার্থনা করে তার পেটের ভ্রূণটাকে যাতে পাল্টে দেয়া হয় ঠিক যেমন টিশিয়ান তার এ্যাপোলোকে এঁকেছিলো ফেলে দেয়া নষ্ট একটা ক্যানভাসের গায়ে।

নিজেকে ভার্জিন মেরী'র মতোন ভাবতে শুরু করে সে, কোন পুরুষের সাথে সম্পর্ক ছাড়াই যে গর্ভে সন্তানের ভ্রূণ তৈরী হয়েছে, এভাবেই তার মাতৃত্বের ধারণা ডালপালা মেলে, যেনো তার সন্তানের কোন বাবা নেই যে অনধিকার হস্তক্ষেপ করবে তার জন্মে, তার প্রবল ইচ্ছা জাগে এই সন্তানের নাম হবে এ্যাপোলো, যে নামটি শুনলে তার মনে হয় "যে শিশুর পিতা কোন মানুষ নয়". যদিও সে জানে এরকম মেকী, অমানবীয় নামের কারনে তার অনাগত সন্তানকে ভালোই ঝামেলা পোহাতে হবে, এরকম নামের জন্য সে আর তার সন্তান পরিণত হতে পারে কৌতুকে। একারনে সে একটা চেক নাম খুঁজতে শুরু করে এই প্রাচীন গ্রীক দেবতার সাথে মিল রেখে। শেষ পর্যন্ত তার মনে হয় তার সন্তানের নাম হবে জেরোমিল ( যার অর্থ, "যে বসন্ত ভালোবাসে" বা "বসন্ত যাকে ভালোবাসে"), অন্য সবার এই নামটি ভীষণ পছন্দ হয়।

আর মজার ব্যাপার হচ্ছে, বসন্তের লাইলাক ছাওয়া পথের মাঝ দিয়েই কবি'র মাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়; যেখানে শিশু কবি তার জঠর থেকে গড়িয়ে পড়ে এই মাটির পৃথিবীতে।

কবিকে তারপর একটা বেবি কটে শুইয়ে দেয়া হোলো মায়ের বিছানার পাশেই। সন্তানের কান্না শুনে মন ভরে গেলো তার; গর্বের অনুভূতি ছাপিয়ে গেলো সারা শরীরের অসহ ব্যথাকে। প্রজণন প্রক্রিয়ার এ ব্যথাকে আর প্রশ্রয় না দেয়া হোক তবে; সুগঠিত মনে হলেও সেই শরীরটাকে তখনো সে ছুঁয়ে দেখেনি: ছোট ছোট পা আর নিতম্ব, কিন্তু দেখলেই বোঝা যায় তার কমনীয়তা, আর তার মসৃন চুলের (এতোই মসৃন যে একেবারেই গুছিয়ে রাখা যায়না ) আড়ালে ঢাকা পড়া চেহারা হয়তো চমকে দেয়ার মতো নয় কিন্তু মুগ্ধতা ছেয়ে ফেলে অন্তরের ভেতরতক।

মা অবশ্য সচেতনভাবেই তার মুগ্ধতার চাইতে গুরুত্ব দিচ্ছিলেন ভেতরকার লাগামহীন অনুভূতিকে, শৈশব থেকে সে বেড়ে উঠেছে এমন এক বড় বোনের সাথে যে নাচে অতুলনীয়া, প্রাগের নামকরা সব ডিজাইনাররা তার পোশাক তৈরী করে দিতো, আর টেনিসেও সে ছিলো শহরের সেরা, অথচ সে বাবার বাড়ি পেছনে ফেলে চলে গেলো অভিজাত পুরুষদের সাম্রাজ্যে। বড় বোনের এমন চমক লাগানো অস্থিরতা কবির মা'য়ের চারিত্রিক বৈশিষ্ঠ্য ঠিক করে দিয়েছিলো, সে হয়ে উঠেছিলো বিষন্ন আর বিনয়ী, একরকম প্রতিবাদী প্রকাশেই যেনো সে সাহিত্য আর সঙ্গীতকে তার ভালোবাসার ভরকেন্দ্র হিসেবে বেছে নিয়েছিলো।

ইঞ্জিনিয়ারের সাথে দেখা হওয়ার আগে সে তার বাবার এক বন্ধুর ছেলে, এক হবু ডাক্তারের সাথে কয়েকদিন মিশেছিলো। কিন্তু এই সম্পর্ক কখনোই তার শরীরকে খুব একটা আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে পারেনি। এক সকালে, শহরের বাইরের এক সামার হাউজে ডাক্তার সাহেব তার সাথে শরীরি ভালোবাসায় যেতে চাইলে, কবির মা সম্পর্কটা ভেঙে দেয়, বিষন্নবোধের মধ্য দিয়েই সে বুঝতে পারে এই শরীরি ভালোবাসা তার আবেগ কিংবা শরীর কোনোটাকেই কখনো ভালোবাসার শীর্ষ অনুভূতিতে পৌছে দিতে পারবেনা। এর পর তার স্কুলের পড়াশোনা শেষ করেই সে বাবাকে জানিয়ে দেয় তার আগ্রহ কাজের মধ্যে ডুবে থেকে জীবনের মানে খুঁজে বের করা আর বাবার বাস্তববাদী বন্ধুদের নেতিবাচক মতামত উপেক্ষা করে সে শিল্পকলা ও সাহিত্য অনুষদে নাম লিখিয়ে এলো।

আত্মবিশ্বাসহীন শরীরি হতাশা নিয়েই সে বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচার হলের বিস্তৃত বেঞ্চিতে বসে কাটিয়ে দিচ্ছিলো তার সময়, কিন্তু চার পাঁচ মাস পরেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পথে তার পরিচয় হোলো এক উদ্ধত স্বভাবের তরুণ ইঞ্জিনিয়ারের সাথে যে শুরুতেই ভালোবাসার নতুন দুয়ার খুলে দেয়ার কথা বললো, তারা তিনদিন একসাথে বেরিয়ে গেলো শহর থেকে...যেনো শহরের দুয়ার খুলে নতুন ভূখন্ডে যাওয়া। আর এসময়ে কবির মা অবাক হলেও টের পেলো তার শরীরি সন্তুষ্টির, সে ভুলে গেলো তার শিল্পসাহিত্যের প্রেরণার কথা, বিশ্ববিদ্যালয়-ক্যারিয়ার সব, শরীরের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনাটাই যেনো তখন তার প্রাণের একমাত্র গন্তব্য হোলো। ইঞ্জিনিয়ারের নতুন নতুন পরিকল্পণা, তার হঠাৎ হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া, দায়িত্বশীলতায় অনাগ্রহী আত্মা সবকিছুই কবির মায়ের ভাবনাকে আনন্দময়তায় ছেয়ে যেতো। যদিও সে জানতো এমন আচরণ তার অভিজাত পরিবারের সাথে কখনোই মিল খায় না। সে নিজেকে ইঞ্জিনিয়ারের বৈশিষ্ট্যগুলোর সাথে মিলিয়ে নিতে ভালোবাসতো, তাতেই তার বিষন্ন হতাশ শরীরের সংশয়গুলো দূর হয়ে যেতো, বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে, যা আছে তার মাঝেই পরমানন্দ খুঁজে পাওয়া।

শেষ পর্যন্ত কি সে সুখী হয়েছিলো? একদম না: বরং সংশয় আর আত্মবিশ্বাসের টানাপোড়েনে পড়ে গিয়েছিলো সে; আয়নার সামনে পোষাক খুলে দাঁড়িয়ে, নিজেকে চোখ মেলে দেখতে গিয়ে সে প্রায়শঃই উত্তেজনা টের পেতো, আবার মাঝে মাঝে নিজেকে মনে হতো সারাশব্দহীন মরা মাছের মতোন । এরপর অন্যকোনো চোখের পরিসরে ছেড়ে দিতেই শরীরময় ছড়িয়ে পড়তো অনিশ্চয়তার স্রোত।

যদিও সে আশা আর নিরাশার দোলাচলে দোল খাচ্ছিলো, তবুও সেই ছেড়ে দেয়া পুরনো আচরণগুলো থেকে সে দূরে সরে আসে; তার বোনের টেনিস র‍্যাকেট আর তাকে মুশরে দেয় না, শরীর যেনো একটা শরীর হিসেবেই সাড়া দেয়, তার মনে হয় এভাবেই হয়তো বেঁচে থাকার মানে খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। এই নতুন প্রাপ্তিকে সে মরিচীকার মতোন ছলনা হিসেবে নয় বরং বাস্তব সত্য হিসেবেই পেতে চাচ্ছিলো, যা টিকে থাকবে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত; সে চাইছিলো ইঞ্জিনিয়ার তাকে লেকচার হলের বিস্তৃত বেঞ্চি থেকে, বাবা-মায়ের আভিজাত্য থেকে সরিয়ে নিয়ে যাবে বহুদূর, ভালোবাসার চটক থেকে জীবনের অভিযাত্রায়। এ কারনেই সে গর্ভ ধারনের বিষয়টাকে বিবেচনা করছিলো বেশ আগ্রহের সাথে: নিজেকে, ইঞ্জিনিয়ারকে আর তাদের অনাগত সন্তানকে তিনটি তারা হিসেবে উদীয়মান দেখে সে, যারা খুব শীঘ্রই সারা বিশ্বজগতেই সাড়া ফেলে দিতে পারে।

আগের অধ্যায়ে যদিও আমি কিছু বিষয় বিস্তারিত বলে দিয়েছি: কবির মা খুব তাড়াতাড়িই বুঝে নিয়েছিলো তার এই ভালোবাসার মানুষটি আসলে শুধু ভালোবাসার রোমাঞ্চেই আগ্রহী, জোড়া তারা হিসাবে আলো ছড়ানোর কোনো আগ্রহই তার ছিলো না কোনোকালে। কিন্তু আমরা জানি তাতে কবির মা একেবারেই ভেঙে পড়েনি...তার আত্মবিশ্বাস কোনোভাবেই নুয়ে পড়েনি প্রেমিকের শীতলতায়। কিছু বিষয় পাল্টে গিয়েছিলো এরফলে। কবির মায়ের শরীর প্রেমিকের চোখের পরিসরে ঠিকই ছেড়ে দেয় সে, কিন্তু তার সাথে নতুন এক ইতিহাসের নির্মাণও ঘটে; অন্য সকলের জন্য শরীরের পটভূমি ছেড়ে না দিয়ে এমন একজনের জন্য শরীর বিছিয়ে দেয়া, যে তখনো দেখতেই শিখেনি। শরীরের বাইরের রূপ সেখানে কোনো বিবেচনায় থাকে না। অস্তিত্বের কোনো এক অতল থেকে আরেকটা শরীরকে ছুঁয়ে দেখা যা হয়তো কখনোই কেউ দেখেনি। বাইরের জগতের চোখ কেবল এর প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় বাস্তবতাটুকুই দেখতে পায়, এমনকি তার শরীরের জন্য ইঞ্জিনিয়ারের কোনো মতামতই আর গ্রহনীয় থাকে না, কারণ পরম লক্ষ্যের দিকে যাওয়ার পথে, শীর্ষ অনুভূতিতে পৌছানোর যাত্রায় তাদের কোনো ভূমিকাই আর গনায় ধরা যায় না। শরীর তার পূর্ণ স্বাধীনতা আর নিয়ন্ত্রণের কৌশল খুঁজে পায়, ক্রমশঃ বেড়ে গিয়ে কুৎসিত হয়ে উঠে শরীরের মধ্যভাগ, কিন্তু সেদিকে কবির মায়ের কোনো খেয়াল থাকে না, কারণ তার শরীর কেবল বেঁচে থাকে তার জন্যই, যে তার শরীরে ছড়িয়ে দেয় গর্বিত অনুভূতি।

প্রজননের পর কবির মায়ের শরীর বিদ্যমানতা পেরিয়ে এক নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করে। যখন তার স্তনবৃন্তে সন্তানের আনাড়ি মুখের ছোঁয়া লাগে, তখন যেনো একটা মিষ্টি কাঁপুনি বুক থেকে ছড়িয়ে পড়ে সারা শরীরে; এর সাথে বাস্তবতঃ তার প্রেমিকের ছোঁয়ার খুব বেশি পার্থক্য যদিও থাকে না, কিন্তু অন্য কি যেনো মিশে থাকে এর পরতে পরতে: এ যেনো শান্তির পরশ, পরিতৃপ্তির সুখ। এর আগে কখনো এমন অনুভূতির অভিজ্ঞতা হয়নি তার; প্রেমিক যখন তার স্তনে চুমু খেয়েছে, সাময়িক শিহরণ তৈরী হয়েছে হয়তো সংশয় আর অবিশ্বাসের মোড়কে, আর এই ছোট্ট মুখের স্পর্শে সে প্রতিনিয়তঃ আরেকটি শরীরের যূক্ত হওয়ার আবেশ টের পায় পুরোপুরি, নিশ্চিতভাবেই।

আর এর বাইরে যা ঘটছিলো: আগে নগ্ন শরীরে প্রেমিকের ছোঁয়ায় তার লজ্জাবোধ হতো; তাদের কাছাকাছি আসার অর্থ ছিলো ভিন্ন কোনো দেয়াল টপকে আসার মতোন, আর হঠাৎ জড়িয়ে ধরার বিষয়টা ছিলো রীতিমতোন বিব্রতকর কারণ এটা আসলে হঠাৎ'ই ঘটে যেতো। লজ্জার বিষয়টা যদিও তাকে নিরস্ত করতো না একেবারেই, উল্টো সঙ্গমের প্রবণতা বাড়তো, কিন্তু এ সময়ে তার সজাগ দৃষ্টি থাকতো নিজের শরীরের প্রতি, যেনো সঙ্গমের টানে শরীরটা আবার হারিয়ে না যায়। আর নতুন পরিস্থিতিতে লজ্জা ছিলো না একেবারেই; সব বাঁধা পেরিয়ে গিয়েছিলো সে। পরষ্পরের শরীর পুরোপুরি উন্মুক্ত ছিলো পরষ্পরের কাছে, লুকানোর কোনো চিন্তাই ছিলো না তার মাথায়...

এর আগে কখনো অন্য কোনো শরীরে নিজেকে এমন সমর্পণ করেনি সে, অথবা অন্য কোনো শরীরকে এমন করে অনুভব করেনি নিজের ভেতর। তার প্রেমিকেরা শরীরের মধ্যভাগ নিয়ে খেলা করতো হয়তো, কিন্তু সেখানে তারা কখনো বাস করেনি; তারা হয়তো তার স্তন নিয়েও খেলা করেছে, কিন্তু কখনো পান করে নাই তার অন্তস্থ সুধা। বুকের দুধ পান করানোর সময় সে মুগ্ধ হয়ে দেখতো তার সন্তানের দাঁত ছাড়া মুখের এলোমেলো খেলা, যেনো সে কেবল তার দুধ পান করেনি, বরং তার চিন্তা, কল্পণা এমনকি স্বপ্নগুলোতেও ভাগ বসাচ্ছিলো।

এই পরিস্থিতিটার তুলনা করা যায় শুধু স্বর্গোদ্যানের সাথে: শরীর সেখানে আবির্ভূত হয় একটা শরীর হিসাবেই, তাকে বনষ্পতির পাতা দিয়ে ঢেকে রাখবার কোনো মানে নেই; যেনো তারা ডুবে থাকে একটা শান্ত সময়ের অনিয়তঃ পরিধীর ভেতর; জ্ঞানবৃক্ষের গন্ধম ফলে কামড় বসানোর আগে ঠিক যেমন ছিলো আদম আর হাওয়া; মন্দ কিম্বা ভালো'র বাইরের কোনো মাপকাঠিতে তারা নিজেদের অবয়বে বেঁচে ওঠে; শুধুই কি তাই: স্বর্গের বেষ্টনীর ভেতর সুন্দর আর অসুন্দরের কোনো ভেদাভেদ থাকে না, আর তাই শরীরের কোনো উপাদানেই সুন্দর কিম্বা অসুন্দরের উপস্থিতি থাকে না, সবটাই সেখানে আনন্দময়; দাঁত না থাকলে কি হয়! মাড়িগুলো সেখানে আনন্দময়, স্তনজোড়া সেখানে আনন্দময়, নাভীর গভীরতা সেখানে আনন্দময়, ছোট্ট নিতম্ব সেখানে আনন্দময়, ছোট্ট অন্ত্রনালী যার উপস্থিতি মাকে দেখতে হতো খুব কাছ থেকে সেটাও আনন্দময়, বড় মাথার উপর খাড়া খাড়া চুলগুলোও সেখানে আনন্দময়। সে তার সন্তানের প্রস্রাব-পায়খানা কিম্বা শরীরের গ্যাস নির্গত হওয়ার বিষয়টাকে কেবল স্বাস্থ্য সচেতনতা হিসাবেই দেখতো না, বরং তাতে মেশানো ছিলো তার আবেগ-অনুকম্পা।

বিষয়টা একদমই নতুন লাগে তার কাছে কারণ সেই শৈশব থেকেই সে শারিরীক এইসব বিষয়গুলিকে এড়িয়ে যেতে চাইতো, এমন কি নিজের বেলাতেও; তার কাছে মনে হতো টয়লেটে বসার বিষয়টা মর্যাদাহানিকর (যে কারনে সে টয়লেটে যাওয়ার আগে তাকে কেউ দেখছেনা এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে তারপরেই টয়লেটে ঢুকতো), এমন অনেক সময় গেছে যখন সে লোকসম্মুখে খেতেও চাইতো না কারণ সবার সামনে খাবার চিবোনো আর গেলাটাও তার কাছে অস্বস্তির মনে হতো। তার ছেলের সব শরীরি প্রকাশই যেনো অসুন্দরকে আড়াল করে ফেলে, তৈরী করে দেয় তার শরীরের শুদ্ধতা আর পরিপূর্ণতা। স্তনবৃন্তে জমে থাকা দুধের ফোটাকে তার কাব্যময় লাগতে থাকে শিশির বিন্দুর মতোন; সে তার স্তন চেপে ধরে মাঝে মাঝেই ফোটা ফোটা দুধ বেরিয়ে আসতে দেখে; তারপর তর্জনীর ডগায় করে তার স্বাদ নেয়; ছেলের স্বাস্থ্যের জন্য প্রস্তুত তরলের স্বাদ নিতেই সে এমনটি করে বলে নিজেকে প্রবোধ দেয়, আসলে সে স্বাদ নেয় নিজ শরীরের; আর এই দুধ তার কাছে বেশ স্বাদু মনে হয়, শরীরের অন্য সব নির্গত রসের সাথেও সে এর ঘ্রাণের মিল খুঁজে পায়; এরফলে নিজেকে বেশ উপাদেয় বলে মনে হতে থাকে তার, শরীরটাকে মনে হয় কমনীয় আর যেকোনো প্রাকৃতিক উপাদানের মতোই গুণসম্পন্ন, ঠিক যেমন একটা গাছ অথবা একটা ঝোপ কিংবা ঝর্ণার জলের ধারা।

দূর্ভাগ্যবশতঃ, নিজের শরীরের প্রতি তার ভালোবাসার জন্য বহুকিছুই সে এড়িয়ে যেতে শুরু করেছিলো, একদিন সে হঠাৎ আবিষ্কার করলো ইতোমধ্যেই তার পেটের ত্বকে ভাঁজ পড়তে শুরু করেছে, সাদা সাদা দাঁগ পড়েছে মধ্যভাগ জুড়ে, চামড়ার টান টান ভাবটা চলে গিয়ে কেমন আলগোছে বাঁধা প্যাকেটের মতোন ঝুলে পড়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো এসব নিয়ে তার আদৌ কোনো ভাবনা তৈরী হলো না। ভাঁজ পড়া পেট নিয়েই মা এবং তার শরীরের সুখ অব্যাহত রইলো কারণ তার শরীরের একমাত্র ভোক্তা তখনো পৃথিবীকে কেবল অসার কিছু রেখার মতোন করেই দেখে, কিম্বা তার চোখ (স্বর্গীয় চোখের মতোন) এই ক্রুঢ় পৃথিবীর মাপকাঠিতে সুন্দর-অসুন্দর এই বিভাজনে দেখতে শিখেনি।

এই বিভাজন অবোধ শিশুর চোখে ধরা পড়েনি, এমনকি তার স্বামী, জেরোমিলের জন্মের পর যে সাহস করে শান্তি প্রচেষ্টা শুরু করেছিলো, তার চোখেও বিষয়টাকে ঠিকই মনে হচ্ছিলো। দীর্ঘ একটা বিরতির পর তারাও আবার শরীরি ভালোবাসার প্রক্রিয়া শুরু করেছিলো; হয়তো তার সাথে আগের সেই ভালোবাসার কোনো তুলনা চলে না: তারা বেশ আড়ষ্টতা নিয়েই পরষ্পরকে জড়িয়ে ধরতো খুব সাধারন মুহুর্তের মতোন, অন্ধকারে রয়েসয়ে। মায়ের জন্যও বিষয়টা বেশ ভালোই হয়েছিলো, কারণ সে জানতো তার শরীর আর আগের মতোন নেই, যেকোনো ধরনের আবেগঘন মুহুর্তের জন্য হয়তো তাকে নিজের শরীরের প্রতি তৈরী হওয়া মমতা হারাতে হতে পারে, তার সন্তানের দেওয়া এই শান্তি নষ্ট হয়ে যেতে পারে যে কোনো সময়েই।

সে কখনোই ভুলতে পারেনা যে তার স্বামী তাকে আনন্দ দিয়েছিলো অনিশ্চয়তার আর সন্তানের ভালোবাসা এসেছিলো তার জন্য আশীর্বাদ হিসাবে; আর তাই সে খানিক আরামেই থাকতে চাচ্ছিলো নিকটজনের কাছ থেকে (সে তখন হামাগুড়ি থেকে অল্পস্বল্প হাটাহাটি কিংবা কথা বলতে চেষ্টা শুরু করেছে)। কবি হঠাৎ বড় অসুখে পড়লো এরমাঝে, দু সপ্তাহ ধরে মা তার পাশে বসে রইলো চোখের পলক না ফেলে, সে যেনো ছোট্ট শরীরটার ব্যথা অনুভব করতে পারছিলো্‌; এসময়টা মায়ের পুরো ঘোরের মধ্যেই কেটে গেলো। যখন শিশুটি সেরে উঠতে শুরু করলো মায়ের মনে হলো সে তার সন্তানকে মৃত্যুমুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছে নিজ হাতে ধরে; তার মনে হতে থাকলো এমন সময়ের পর তাদের দু'জনকে আর কখনো আলাদা করতে পারবে না আর কোনো শক্তি।

তার স্বামীর স্যুট কিম্বা পাজামা পরা শরীর থেকে তার আগ্রহ দিনকে দিন কমে যাচ্ছিলো, অন্য দিকে সন্তানের প্রতি নির্ভরতা যেনো বাড়ছিলো ধীরে ধীরে। যদিও বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিলো ততোদিনে, কিন্তু তখন ছেলেকে সে শেখাচ্ছিলো কিভাবে টয়লেট ব্যবহার করতে হয়, তার জামা কাপড় পাল্টে দেয়া, চুল ঠিক করে আচরে দেয়া, পছন্দের খাবার তৈরী করে তার সামনে সাজিয়ে দেয়াতে মায়ের দিন ভালোই কেটে যাচ্ছিলো। চার বছর বয়সে যখন কবি খাবারের প্রতি আগ্রহ হারাতে শুরু করলো, মা তখন খানিকটা কঠোরও হলো; জোর করে তাকে খাওয়ানোর মধ্য দিয়ে সে হঠাৎ বুঝতে পারলো সন্তানের সাথে তার কেবল বন্ধুত্বের সম্পর্ক নয় বরং এই শিশুর শরীরের মালিকানাও যেনো একান্ত তার নিজের। যতোই না খেতে চাক, খাবার না চিবিয়ে মুকে পুরে রাখুক, কিন্তু তাকে মায়ের কাছে হার মানতেই হবে। এক ধরনের অদ্ভুত তৃপ্তি নিয়ে মা এই ব্যর্থ প্রতিবাদ, আত্মসমর্পন, কিম্বা মুখ ভর্তি করে খাবার চিবোনর দৃশ্য দেখতো।

আহা! তার সন্তানের শরীর, তার ঘর তার বেহেশত, তার উপলব্ধি...

পোস্টটি ৭ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

টুটুল's picture


এইটা একটা ভালো কাজ হইছে...
ধন্যবাদ বস

শওকত মাসুম's picture


মাঝের দুইটা মনে হয় মিস করছি। ঐ খান থেকে শুরু করতে হবে।

শওকত মাসুম's picture


ঐ খান না এখান থেকে শুরু করতে হবে*

মীর's picture


আর বেশি প্রশংসা দেয়ার নেই। ভাস্করদা' দুর্দান্ত।

আবদুর রাজ্জাক শিপন's picture


 

 

এই  জিনিস অবশ্যই আগামী বইমেলায় পেতে চাই, বস !

আবদুর রাজ্জাক শিপন's picture


এবং সেই ওয়াদাটা আপনে এইক্ষণে কইরা লন !

ভাস্কর's picture


ধন্যবাদ আপনাদের...

তানবীরা's picture


ভাস্করদা' দুর্দান্ত।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

ভাস্কর's picture

নিজের সম্পর্কে

মনে প্রাণে আমিও হয়েছি ইকারুস, সূর্য তপ্ত দিনে গলে যায় আমার হৃদয়...