জীবন অন্যত্র - মিলান কুন্ডেরা (অষ্টম কিস্তি)
৩.
আর তার সন্তানের হৃদয়? তার অন্তর্গত মনোজগত জুড়ে তার উপস্থিতি কি ছিলো না? অবশ্যই! জেরোমিল যেদিন প্রথম কোনো শব্দ উচ্চারণ করলো আর সেই ছোট্ট শব্দটি ছিলো, "মা," বাঁধ ভাঙা আবেগে ভেসে গেলো সে; সে ভেবে নিলো তার ছেলের মস্তিষ্কে কেবল একটি ধারণাই সর্বব্যাপী আছে, কেবল তাকে নিয়েই তার সব চিন্তা খেলা করে, আর যদিও তার বুদ্ধি বৃত্তি আরো বহুদূর যাবে, শাখায় শাখায় ছড়াবে, দিকে দিকে উদ্ভাসিত হবে, তার অবস্থান সবসময় রবে তার শেকড়েই। এসব মুগ্ধতা যেনো তাকে আরো অনুপ্রেরিত করলো, ছেলের কথা বলার সমস্ত প্রয়াসেই সে বিমোহিত লক্ষ্য করতে থাকলো, একটা লাল মলাটের ডায়েরী কিনে নিয়ে এলো সে আর ছেলের সকল শব্দোচ্চারণের মুহুর্তগুলো রেকর্ড করতে শুরু করলো, কারণ দীর্ঘ জীবন বিষয়ে তার ভালোই ধারণা ছিলো আর সে জানতো বিস্মৃতি বিষয়েও।
আমরা যদি মায়ের ডায়েরীতে চোখ বুলাই তাহলে খুব সহজেই দেখতে পাবো "মা" শব্দের পরপর সে আরো অনেক কিছু বলতে শুরু করে, তাদের মধ্যে "বাবা" হলো সপ্তম শব্দ যা উচ্চারিত হয়েছিলো "দিদা" "দাদা" "ডগি" "তু-তু" "ওয়া-ওয়া" এবং "পি-পি" এমন সব শব্দের পরে। এসব সাধারণ ধ্বনির পর (মায়ের ডায়েরীতে যার উল্লেখ পাওয়া যায় তারিখ-সময় আর একটা ছোট বর্ণনা সহ) কবি বাক্য তৈরী করতে শুরু করে। তার দ্বিতীয় জন্মদিনের আগেই সে বলে ওঠে "মা ভালো"। কয়েক সপ্তা পরেই সে ঘোষণা দেয় "মা ভালো না"। মা তাকে খাওয়ার আগে রাস্পবেরী জুস খাওয়াতে গেলে সে এই ঘোষণা দেয়, যার জন্য মা তার পিঠে আলতো করে চড় মারে, পরিণতিতে সে চীৎকার করে কেঁদে ওঠে,"অন্য মা চাই!" কিছুদিন পরেই আবার সে মাকে খুশি করে দিয়ে বলে ওঠে," আমার সুন্দর মা"। আরেক সময় সে বলে," মা আমি ললিপপ চুমু খাবো" যার অর্থ হলো সে জিহ্বা দিয়ে মায়ের পুরো মুখ চেটে দিবে।
কিছু পৃষ্ঠা বাদ দিয়ে গেলে, একটি মন্তব্য আমাদের চোখ আটকাতে বাধ্য। দিদা জেরোমিলকে একটা পীয়ার ফল খেতে দেবে বলেছিলো, কিন্তু ভুলে গিয়ে সে পুরোটাই একা খেয়ে ফেলে; এতে জেরোমিল ভীষণ রেগে যায়, আর বার বার বলতে থাকে,"দিদা ভালো নেই আর, খেয়ে ফেলেছে আমার পীয়ার"। এ বাক্যটা শুনলে আগে বলা "মা ভালো না"-এর মতোই মনে হতে পারে, কিন্তু আগের বারের মতোন তাকে চড় খেতে হয় না কারণ এমন কথায় সবাই হেসে উঠে, এমনকি দিদাও, বরং এই কথার উল্লেখ করে পরিবারের সবাই আনন্দ পেতে শুরু করে, জেরোমিলের নজরেও বিষয়টা বেশ ভালো মতোই ধরা দেয়। সে হয়তো বুঝে উঠতে পারে না তার এই জনপ্রিয়তার রহস্য, তবে আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি বাক্যস্থিত ছন্দের উপস্থিতি তাকে মার খাওয়া থেকে বাঁচিয়ে দেয়, আর এভাবেই তার ভেতরকার কবি সত্ত্বা টের পাওয়া যায় শিশু কালেই।
মায়ের লাল মলাটের ডায়েরীতে এমন আরো ছন্দময় কথার উল্লেখ পাওয়া যায়, আর তার বিপরীতে মায়ের লেখা মন্তব্য পড়লে টের পাওয়া যায় এসব কথা পরিবারে আনন্দ আর সন্তুষ্টির বর্ণিল ঝর্ণাধারা বয়ে দিয়েছিলো। যেমন সে বর্ণনা করতো, " বুয়া আমেলা, বাঁকা যেনো কলা" কিছুদূর গেলেই আমরা পড়তে পারবো, "বনের আলো, লাগে ভালো"। মা এ বিষয়টাকে শুধু জেরোমিলের স্বতঃস্ফুর্ত মেধার প্রকাশ ভাবতো না, জেরোমিলের শৈশবে সে ছোটদের অনেক ছড়া শুনিয়েছিলো সেসব থেকেই হয়তো জেরোমিল ভাষাকে এমন ছন্দোবদ্ধ ভাবতে শিখেছে বলে মন করতো সে। কিন্তু আমাদের হয়তো মায়ের এই ধারণাটির ভুল ধরিয়ে দেয়াটা দরকার: তার এই ছন্দ তৈরীর চেষ্টায় আসলে বড় একটা ভূমিকা ছিলো দাদা'র, একজন সুশীল, বাস্তববাদী আর কবিতাপ্রেমী মানুষ, যে এমন অর্থহীন ছড়ায় ছড়ায় কথা বলতো জেরোমিলের সাথে...জেরোমিলকে এমন কথা বলতে উদ্বুদ্ধ করতো।
জেরোমিল খুব অল্প দিনেই বুঝে যায় যে তার এমন কথা কওয়ার ধরণ সবাইকে আকৃষ্ট করে, আর তাই তার আচরণেও এর প্রভাব পড়লো। আগে সে নিজের প্রয়োজনে স্বাভাবিক ভাবেই কথা বলতো, ধীরে ধীরে সে অন্যের প্রশংসা আর মনোযোগ পেতে ছন্দময় কথা বলতে শুরু করলো। সে কথা বলে তার প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য অপেক্ষা করতো, অধিকাংশ সময়েই সে কাঙ্খিত ফল পেতে শুরু করলো। মানুষের প্রশংসাসূচক মন্তব্য তার উৎসাহ আরো বাড়িয়ে দিচ্ছিলো। তবে সবসময় কিন্তু একই ফল পেতোনা সে, যেমন একবার বাবা-মা'কে বললো, "তোমরা খানকি!" (যা সে পাশের বাড়ির এক ছেলের কাছে শুনেছিলো, যে কথায় অন্য শিশুরা হেসে উঠেছিলো দলবেঁধে) যা শুনে কবির বাবা তার মুখে চটাস করে একটা চড় বসিয়ে দিয়েছিলো।
এ ঘটনার পর জেরোমিল খুব ভালোভাবে বিশ্লেষণ করতে শুরু করলো তার কোন কথায় বড়রা কিভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় তা নিয়ে, তারা কোন ধরনের কথায় আনন্দিত হয়, কোন কথায় তাদের রাগ চড়ে যায়, আর কীসে তারা অবাক হয়; আর সেমতোই সে কথা বলতে শুরু করলো এবার, একদিন মায়ের সাথে বাগানে খেলতে খেলতে সে দিদার মতোন গম্ভীর বিষন্ন গলায় বলে বসলো, "জীবন যেনো আগাছা"।





ব্যপক
ধন্যবাদ মীর...কিছু টাইপো ঠিক করলাম, তারপরেও অনেক রইয়া গেলো মনে হয়...
ছোট বাচ্চার কথা সবসময়েই উপভোগ্য। রাইমিংগুলোর অনুবাদে ভাস্করদা একশোতে দু্ইশ
ধন্যবাদ নুশেরা...উৎসাহ পাইলাম।
চলুক কইলামনা।
ভালো হচ্ছে। বিস্তারিত আলোচনার সময় আসে নাই। মানে আমার কাছে। ভাল্লাগতাছে পইড়া যাইতাছি। এক সময় হয়ত বলা যাবে। অনুবাদ থামায়েন না।
ঠিকাছে রায়হান ভাই...
পড়ছি, মুগ্ধতা নিয়ে ।
ন্যবাদ আরাশি...
পড়ছি, মুগ্ধতা নিয়ে ।
মন্তব্য করুন