ইউজার লগইন

জীবন অন্যত্র - মিলান কুন্ডেরা (নবম কিস্তি)

সে আসলে কি বোঝাতে চেয়েছিলো, সেটা বলা দুষ্কর; তবে এটা নিশ্চিত যে সে অপাংক্তেয় আগাছার মতোন কষ্টকর অহেতুকতা বা অহেতুক কষ্টজীবীতার কথা বলতে চায়নি, সে বরং একটা অষ্পষ্ট প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত দিতে চেয়ে থাকতে পারে, জীবনের ধারাবাহিকতা নিয়ে, যখন সব শেষ বলে ধরে নেয়া হয় তখনো জীবন অনর্থক আর দুঃখের রেশে মাখামাখি থাকে। যদিও সে যা বলতে চায়নি তা বলে ফেলেছিলো, কিন্তু তার কথার প্রতিক্রিয়া রীতিমতো সাড়া ফেলে দিলো; মা আর্দ্র চোখে তার দিকে তাকিয়ে চুলে হাত বোলাতে শুরু করলো। মায়ের এই দৃষ্টি জেরোমিলকেও নাড়া দিয়ে গেলো, এই চাহনী দেখার আগ্রহ তৈরী হলো তার অন্তরে, বারবার। মায়ের এই তাকানোর ভঙ্গীকে প্রশংসাসূচক মনে হওয়াতে আবারো দেখার বাসনা জাগলো তার ছোট্ট প্রাণে। এক বিকালে মায়ের সাথে হাটতে বেরিয়ে পথে একটা ছোট নুড়ি পাথরে লাথি দিয়ে মাকে বললো," পাথরটাকে লাথি দিয়ে আমার খারাপ লাগছে মা, ওকে এখন চুমু খাই?"। আর সত্যি সত্যিই সে নীচু হয়ে নুড়িটাকে চুমু খেলো।

জেরোমিল কেবল মেধাবী নয় (সে পাঁচ বছর বয়সেই নিজে নিজে পড়তে শিখে গিয়েছিলো) বরং অন্য সব শিশুদের চাইতে ভীষণভাবে আলাদা বলে মা নিশ্চিত হতে থাকলেন ধীরে ধীরে। সে তার এই অনুধাবন নিয়ে দাদা আর দিদার সাথে আলোচনা করতো, যখন জেরোমিল হয়তো মনোযোগের সাথে তার টিনের সেপাই অথবা পাথরের ঘোড়া নিয়ে খেলছিলো, কিন্তু তার কান ঠিকই পেতে রাখা থাকতো তাদের কথাবার্তায়। বাড়িতে কোনো অতিথী এলেই সে তাদের চোখের দিকে খেয়াল করতো, তাদের দৃষ্টি থেকে বুঝে নিতে চাইতো যে তারা তাকে কতোটা আলাদা রকম শিশু হিসাবে ভাবছে, অথবা তাকে হয়তো আর শিশুই ভাবছে না।

ছ' বছর বয়সের আগেই যখন তাকে স্কুলে ভর্তি করার কথা ভাবা হচ্ছিলো তখনই তাকে একটা নিজের ঘর দেয়ার কথা তোলা হলো পরিবার থেকে, যাতে সে একা ঘুমোতে পারে। মা তার ফেলে আসা সময়ের কথা ভেবে খানিকটা বঞ্চিত বোধ করলেও রাজী হলো এই প্রস্তাবে। সে আর তার ইঞ্জিনিয়ার স্বামী দুজনেই একমতো হলো যে তার ষষ্ঠ জন্মদিনে তাদের পাশের ছোট্ট ঘরটা উপহার হিসেবে দেয়া হবে, সাথে তার উপযোগী আর সব ফার্নিচার: যেখানে আরো থাকবে একটা ছোট্ট বইয়ের আলমারী, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতাকে উৎসাহী করতে একটা দেয়াল আয়না আর তার মাপের টেবিল আর চেয়ার।

বাবা প্রস্তাব করলো ঘরের দেয়ালে জেরোমিলের নিজের আঁকা ছবি দিয়েই সাজিয়ে দেয়া হোক, অপক্ক হাতে আঁকা আপেল আর বাগানের সব ছবি সে ফ্রেমবদ্ধ করতে শুরু করলো। এমন সময়েই মা বাবা'র সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে বললো, " আমার কিছু জিনিস দরকার।" বাবা ঘুরে তাকালো মায়ের দিকে, মা তখনো আড়ষ্ট অথচ জোরদার গলায় বলেই চললো,"আমাকে কয়েকটা কাগজ আর রঙ এনে দাও"। তারপর কাগজ আর রঙ নিয়ে সে ঘরের টেবিলে বসে পড়লো, কাগজগুলো মেলে দিয়ে পেন্সিল দিয়ে কিছু বর্ণ লিখতে শুরু করলো; সব বর্ণ লেখা শেষ হলে লাল রঙে তুলি ডুবিয়ে পেন্সিলে লেখা বর্ণগুলোকে রঙীন করে তুললো, শুরুতেই বর্গীয় জ দীর্ঘ ঈ কার, তারপর ব আর ন, এভাবেই একটা বাক্য লেখা হলো " জীবন যেনো আগাছা"। নিজের কাজের দিকে সে সন্তুষ্টি নিয়েই তাকালো: অক্ষরগুলো বেশ স্পষ্ট আর পরিচ্ছন্ন লাগছিলো, তারপর সে আরো একটুকরো কাগজ নিয়ে আবারো পেন্সিলে একই বাক্য লিখে গাঢ় নীলে রাঙিয়ে দিলো অক্ষরগুলোকে, নীল রঙটাকেই তার কাছে বেশি ভালো লাগলো ছেলের বিষন্ন অনুভূতির সাথে।

তার মনে পড়লো জেরোমিলের আরো অনেক কথা, "দিদা ভালো নেই আর, খেয়ে ফেলেছে আমার পীয়ার," মুচকি হেসে সে এবার লিখলো, "ভালো দিদা আমার, ভালোবাসে পীয়ার"। তার মনে পড়লো জেরোমিল যেদিন বলেছিলো, "তোমরা খানকি" তার কথা, এবার তার হাসি পেলো ভীষণ, কিন্তু সে এ কথাটা আর কাগজে না লিখে সে পেন্সিল আর সবুজ রঙে লিখলো,"খেলবো আমরা বনের আলোয়, দিন কাটবে ভালোয় ভালোয়" তারপর বেগুনী রঙে," প্রিয় আমেলা, বাঁকা যেনো কলা" জেরোমিল যদিও বুয়া বলেছিলো, কিন্তু মায়ের কাছে বুয়া বলাটা একটু ককর্শ শোনালো। তারপর তার মনে পড়লো হাটু গেড়ে নুড়ি পাথরে চুমু খাওয়ার কাহিনীটা, এক মুহুর্ত ভেবে সে আকাশী নীলে লিখলো, "এমনকি পাথরকেও ব্যথা দিতে চাই না আমি,"। সে বেশ বিব্রত অথচ আনন্দের সাথে কমলা রঙে লিখলো, " মা আমি তোমাকে ললিপপ চুমু খাবো,"। সবশেষে সোনালী রঙে লিখলো," আমার মা সবচেয়ে সুন্দর।"

পোস্টটি ৮ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মীর's picture


জেরোমিল কেবল মেধাবী নয় (সে পাঁচ বছর বয়সেই নিজে নিজে পড়তে শিখে গিয়েছিলো) বরং অন্য সব শিশুদের চাইতে ভীষণভাবে আলাদা বলে মা নিশ্চিত হতে থাকলেন ধীরে ধীরে।

ভাস্করদা' লেখাটা ধীরে ধীরে আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে?

হাসান রায়হান's picture


খেলবো আমরা বনের আলোয়,
দিন কাটবে ভালোয় ভালোয়।

শাওন৩৫০৪'s picture


দাদা, একটা কথা কওয়া হয়নাই কিন্তু, আপনের এই সিরিজটা আমি কপি কৈরা ওয়ার্ড ফাইলে নিয়ে নেই রেগুলার।
কোনো রকম প্রকাশনা বা কোনো অংশ কপি করা উদ্দ্যেশ্য না কিন্তু।
এইগুলা আবার পড়বো আমি জানি, সেইজন্য, একসাথে রাখি, জমাইয়া, পড়তে সুবিধার জন্য।
এইটা এখন মনে হৈলো আপনারে জানানো উচিৎ।

ভাস্কর's picture


ধন্যবাদ মীর, রায়হান ভাই আর শাওনরে...

তানবীরা's picture


চলুক

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

ভাস্কর's picture

নিজের সম্পর্কে

মনে প্রাণে আমিও হয়েছি ইকারুস, সূর্য তপ্ত দিনে গলে যায় আমার হৃদয়...