জীবন অন্যত্র - মিলান কুন্ডেরা (দশম কিস্তি)
ঠিক জন্মবার্ষিকীর আগের দিন তাকে দিদার ঘরে শুতে পাঠিয়ে দিয়ে বাবা আর মা মিলে তার নতুন ঘরের আসবাব আর দেয়াল সাজালো। পরেরদিন সকালে যখন তারা ছেলেকে নিয়ে নতুন সাজানো ঘরে এলো, মা খানিকটা উদ্বিগ্ন বোধ করছিলো, কিন্তু জেরোমিল মায়ের অস্থিরতা দূর করতে কোনোরকম কিছু করলো না; সে হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো ঘরের মাঝখানে; তার দৃষ্টি আকর্ষণ করলো (যদিও তাকে আড়ষ্ট মনে হচ্ছিলো) কাঠের ছোট্ট ডেস্কটা; পুরনো আমলের এই ফার্নিচারের সাথে যেনো স্কুল ডেস্কের মিলটাই বেশি ছিলো, টেবিলের উপরটা খানিকটা ঢালু হয়ে (আর মাঝে একটা ঢাকনি দিয়ে বইখাতা রাখারও জায়গা রাখা) বসার জায়গার সাথে মিশে গেছে।
"কেমন লাগছে জেরোমিল? কি মনে হচ্ছে? পছন্দ হয়েছে তোমার?" ধৈর্য্যের বাধ ভেঙে জিজ্ঞেস করলো মা।
"পছন্দ হয়েছে" ছেলে উত্তর দিলো।
"কোনটা বেশি পছন্দ হয়েছে দাদু?" দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা দাদা প্রশ্ন করলো এরপর।
"ডেস্ক" বলে সে সীটের উপর বসে ঢাকনিটা নিয়ে খেলতে শুরু করলো।
দেয়ালে ঝুলানো ফ্রেম করা ছবিগুলোর দিকে দেখিয়ে বাবা জিজ্ঞেস করলো,"আর ছবি গুলো?"
মাথা উচিয়ে একবার দেখে মুচকি হেসে ছেলে জবাব দিলো,"আমার আঁকা..."।
"দেয়ালে ঝুলানো দেখতে ভালো লাগছে না বাবা?"
ছোট্ট ডেস্কটার উপর বসেই সে মাথা নেড়ে সায় দিলো বাবার কথায়।
ছেলের এমন আচরনে মায়ের হৃদয় যেনো চৌচিড় হয়ে গেলো, তার ইচ্ছে হচ্ছিলো ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে যেতে। রঙীন শব্দগুলো এমন নীরব মন্তব্যহীন থেকে যাবে সেটা মেনে নিয়ে বেরিয়েও যেতে পারছিলো না, এমন নীরবতায় যেনো সে খানিকটা অপরাধ বোধ করছিলো। আর তাই সেও জানতে চাইলো,"দেয়ালের লেখা গুলো দেখো..."
ছেলে মাথা নামিয়ে ডেস্কের ভেতরটা দেখতেই যেনো বেশি আগ্রহী হয়ে উঠলো হঠাৎ করে।
"আমি ভেবেছিলাম, মানে..." সংশয়ী গলায় সে বলতে চাইলো, "আমি চেয়েছি তুমি...ছোট্ট বেলা থেকে তোমার স্মৃতিগুলো যাতে...তোমার মনে থাকে...সেই দোলনা থেকে স্কুলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত...তুমি আমাদের তারার মতোন ছেলে, আমাদের সবাইকে তুমি আলো দেবে," তার কন্ঠ শুনে মনে হচ্ছিলো সে কোনো ভুল স্বীকার করছে, আর খানিকটা নার্ভাস হওয়াতে সে একই কথা বারবার বলছিলো। শেষ পর্যন্ত আর কিছু বলার মতো না পেয়ে, সে চূপ করে গেলো একেবারে।
জেরোমিল এমন উপহারে খুশি হয়নি, মায়ের এই চিন্তাটাই আসলে ভুল ছিলো। সে আসলে ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলো না বলার মতোন; কথা নিয়ে তার সবসময়ই গর্ব ছিলো, শূন্য কোনো স্থানে এইসব শব্দ উচ্চারনে আদৌ আগ্রহ পায়নি সে কখনো; আর যখন তার বলা কথাগুলোকেই রঙে বর্ণিল আর ছবির মতোন দেয়ালে ঝোলানো দেখতে পেলো, তার প্রাণ ছুঁয়ে গেলো না জানা সাফল্যের অনুভূতিতে, এই অনুভূতি প্রকাশের কোনো শব্দ তার জানা ছিলো না, লোকসমুখে সে কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবে সেটা বুঝে উঠতে পারছিলো একেবারেই, বরং খানিকটা ভয় পাচ্ছিলো যেনো। সে বুঝতে পারছিলো নিজেকে, যেই শিশু চমকে দিতে জানে শব্দে , আর সেই শিশুর চমকে দেয়ার মতোই কিছু একটা বলতে হবে সবাইকে অবাক করে দিয়ে, অথচ তার মাথায় কিছুই খেলছিলো না তেমন, আর তাই মাথা নীচু করে যেনো অক্ষমতাকে ঢেকে রাখতে চেষ্টা করছিলো। কিন্তু আড়চোখে নিজের ফেলে আসা শব্দগুলোকে যখন দেয়ালে পাকাপোক্ত, দীর্ঘস্থায়ী আর নিজের চাইতেও বড় হয়ে ঝুলতে দেখলো, নিজের ভেতরেই ডুবে গেলো সে; তার মনে হতে থাকলো সে যেনো এই ঘরটাকে ঘিরে আছে অনেক বিস্তৃত হয়ে, সারা বাড়িময় ছড়িয়ে যাচ্ছে ধীরে।





ভালো লাগলো। ভাস্করদা' আপনি যে সত্যিকারের পরিশ্রমটা করছেন সেজন্য কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
সময় করে সবপর্ব একসাথে পড়ব। ধন্যবাদ ভাস্করদা।
ধন্যবাদ মীর এবং নরাধমকে...
"রঙিন শব্দ" মানে ছবিগুলোর ব্যাপারে ছেলের নীরবতা মাকে পীড়িত করেছে-- ব্যাপারটা তো সেরকমই, তাইনা? কথাগুলো অন্যভাবে সাজানো যায় কিনা আরেকবার ভেবে দেখবেন, ভাস্করদা?
আগের পর্বে আছে মা ছেলের কথাগুলিরে রঙ দিয়া লেখে। একদম ম্যাটেরিয়াল অর্থেই কুন্ডেরা ঐটারে কালার্ড ওয়ার্ডস কইতেছে...তাই আমিও চেইঞ্জ করি নাই আর...আপনের বাক্যটা ভালো...
কুন্ডেরার চিন্তার জায়গাতে অবশ্য ছেলের অপিনিয়ন অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিলো, এই শব্দগুলি আসলে ছেলেটার কথা, তার মা এই কথাগুলিরে ডায়েরীতে লেইখা রাখছে বিভিন্ন সময়ে, এখন ঐ শব্দগুলিরে সে আসলে ছেলের অস্তিত্বের প্রকাশ হিসাবেই দেখে, এমনকি দেখেন এই চ্যাপ্টারের শেষে আইসা ছেলেও নিজেরে ঐ শব্দের মধ্যেই খুঁইজা পায়...শব্দ/বাক্য এইখানে ইমেইজের মতো কইরা চইলা আসে, সে আর সাবজেক্ট থাকে না বরং অবজেক্ট হিসাবে অ্যাপিয়ার করে। এতোসব কিছু মনে কইরা ঐ বাক্যে একটু জটিলতা আরোপ করছিলাম...
তয় শেষ করার পর আপনেরে যেহেতু বানান কারেকশান করতে দিমু, তখন বাক্যগুলি নিয়াও কথা কওন যাইবো...
আমি সম্ভবত ইমিডিয়েট আগের পর্বটা মিস করছি... কয়েকদিন দৌড়ের উপর ব্লগ মিস গেলো
নাহ্ ঠিকই আছে
পড়ছি
ভালো ই আগাচ্ছে। শেষ করার আগে থামবেননা আশা করি।
পড়ছি
মন্তব্য করুন