ইউজার লগইন

জীবন অন্যত্র - মিলান কুন্ডেরা (একাদশ কিস্তি)

স্কুলে যাবার আগেই জেরোমিল পড়তে আর লিখতে শিখেছিলো, আর তাই মা তাকে সরাসরি দ্বিতীয় গ্রেডে ভর্তি করার সিদ্ধান্ত নেয়; মন্ত্রণালয় থেকে এজন্য বিশেষ অনুমতিও বের করে ফেলে, বিশেষ ব্যবস্থায় স্কুল কমিটির সামনে দেয়া পরীক্ষায় পাশের পর জেরোমিল তার চেয়ে এক বছরের বড় ছাত্রদের সাথে ভর্তি হওয়ার অনুমতি পেয়ে যায়। সবাই তার মেধার প্রশংসা করতে থাকায় তার কাছে ক্লাসরুমটাকে পরিবারেরই একটা বর্ধিত অংশ মনে হতে থাকে। মা দিবসে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা একটা বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে, সব শেষে জেরোমিল একটা আবেগঘন ছোট্ট কবিতা আবৃত্তি করে অভিভাবকদের মন জয় করে নেয়।

যদিও কিছুদিনের মধ্যেই সে বুঝতে পারে যেসব দর্শকের মন জয় করে নিয়েছিলো তাদের বাইরে আরেকটা অংশ তার প্রতি অজান্তেই সংশয়ী দৃষ্টি নিয়ে তাকায়। একদিন দাঁতের ডাক্তারের ওয়েটিং রুমের ভীড়ে সে তার স্কুলের কিছু বন্ধুদের দেখে দৌড়ে গিয়ে দেখে তারা জানালার দিকে পিছন ফিরে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে কথা বলছে আর একজন বৃদ্ধ সেসব বেশ মনোযোগ দিয়ে শুনছে। বৃদ্ধের আগ্রহ দেখে জেরোমিল যে ছেলেটি তখন কথা বলছিলো তাকে প্রশ্ন করে (একটু গলা উচিয়েই বলে সে, যাতে তার কথা সবাই শুনতে পায়) যে দেশের শিক্ষামন্ত্রী হলে সে কি করবে। ছেলেটা খানিক হতভম্ব হয়ে চুপ মেরে যায়, কারণ এ প্রশ্নের উত্তর তার জানা ছিলো না। এ সুযোগে জেরোমিল নিজেই তার জবাব দিতে শুরু করে, তবে এ বিষয়টা তার জন্য বেশ সহজ, দাদুর সাথে সে এমন বিষয় নিয়ে প্রায়শঃ আলোচনা করে, আর তার চিন্তা দাদুকে আনন্দ দেয় বলেই তার ধারণা। জেরোমিল যদি শিক্ষামন্ত্রী হয় তাহলে স্কুল হবে দুই মাস আর বাকী দশ মাস ছুটি, শিক্ষকরা মেনে চলবে ছাত্র-ছাত্রীদের, বেকারী থেকে খাবার নিয়ে আসবে তাদের জন্য, এর বাইরেও আরো অনেক পাল্টে যাবে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, জেরোমিল এসব চিন্তা বেশ জোর গলায় স্পষ্টভাবেই সবার সামনে তুলে ধরে।

এমন সময় চেম্বারের দরজা খুলে একজন রোগী বেরিয়ে আসে, তার সাথে বেশ কয়েকজন নার্স। একজন মহিলা উঠে দাঁড়িয়ে তার হাতের বইয়ের যে পৃষ্ঠায় ছিলো সেটা আঙুল দিয়ে ধরে রেখে তাদের দিকে তাকিয়ে অনুরোধের স্বরে বলে উঠে,"বাচ্চাটাকে বোঝান,সে কিসব উল্টোপাল্টা বলছে!"

ক্রীসমাসের পর শিক্ষকরা ছাত্রদের একজন একজন করে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করে গাছের নীচে কে কি উপহার পেয়েছে। জেরোমিল বলতে শুরু করে একটা লেগো সেট, স্কি, আইস স্কেট, বই...তবে সে বুঝতে পারে অন্যরা তার কথা একবারেই বিশ্বাস করেনি, বরং বেশ কয়েকজন তার দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে, যাদের অনেকেই চোখ গরম করেও তাকাচ্ছিলো। সে বাকী উপহারগুলো নিয়ে কিছু না বলেই চুপ হয়ে যায়।

আরে না...আমি সেই বড়লোক ছাত্রের ক্লান্তিকর পুরনো গল্প বলতে চাই না, যাকে তার গরীব সহপাঠীরা ঘৃণা করে; তার ক্লাসে বরং তার পরিবারের চাইতেও ধনী ছাত্র-ছাত্রীরা ছিলো, তারপরও তারা সবাই সবার সাথে মিশে, নিজেদের বড়লোকী জাহির করায় ব্যস্ত থাকে না। তাহলে কোন জিনিষটা নিয়ে জেরোমিলের সহপাঠিরা তার উপর বিরক্ত হয়; কোন কারনে তারা উত্তেজিত হয়ে জেরোমিলকে ভিন্ন চোখে দেখে?

বলতে আমি খানিকটা বিব্রতই বোধ করছি, এই ঘৃণার হেতু জেরোমিলের পরিবারের টাকা নয় বরং তার মায়ের ভালোবাসা। এই ভালোবাসা সবকিছুতে ছড়িয়ে থাকে; তার পোষাকে, তার নিপাট কমনীয় চুলে, তার ব্যবহৃত শব্দে, বইপত্র রাখার স্কুল ব্যাগে, আর বাড়িতে সময় কাটানোর জন্য পড়া তার সব বইয়ে। দিদা নিজ হাতে তার পোষাক বানিয়ে দেয়। ঈশ্বরই জানেন সেটা ছেলেদের শার্টের মতো না হয়ে কেনো মেয়েদের টপসের মতোন হয়। তার লম্বা চুল কপালের অনেক্ষানি ঢেকে রাখে বলে মা আবার একটা ছোট ক্লিপ লাগিয়ে দেয় তাতে। বৃষ্টির সময় মা একটা বড় ফুলতোলা ছাতা হাতে ক্লাসরুমের বাইরে বসে থাকে, যে সময় অন্য ছাত্ররা কাদা মাটিতে গড়াগড়ি খাওয়ার স্বপ্নে বিভোর থাকে।

মায়ের এমন ভালোবাসা দেখে ছেলেপেলেরা ভ্রু কুচকায়, তাদের বন্ধুত্বের বদলে বিরূপ মনোভাব তৈরী হয়। শেষ পর্যন্ত জেরোমিলও তাদের সংস্কারকে এড়িয়ে চলতে শিখে যায়, কিন্তু এক ক্লাস ডিঙিয়ে স্কুলে ভর্তি হওয়ার গৌরবময় ঘটনার পরেই তার জন্য পরিস্থিতি বেশ জটিল হয়ে পরে, সহপাঠীরা তাকে উত্যক্ত করে, কখনো সখনো তাদের আনন্দের অংশ হিসাবে সে মার'ও খায়। কিন্তু এ পরেও তার জীবনে কিছু বন্ধু তৈরী হয়, যাদের কাছে সে সারাজীবনের জন্য কৃতজ্ঞ; এইসব বন্ধুদের বিষয়ে কিছু বলতেই হয়:

তার এক নম্বর বন্ধু হয় তার বাবা: যে তার সাথে বাড়ির উঠোনে ফুটবল খেলতে নেমে যায় (ভদ্রলোক ছাত্রাবস্থায় ফুটবল খেলতেন), জেরোমিল দুটি গাছের মাঝামাঝি দাঁড়ায়, আর তার বাবা জেরোমিলকে লক্ষ্য করে শট নেয়, যেনো সে চেক ন্যাশনাল টিমের গোলকিপার।

দাদা তার দুই নাম্বার বন্ধু। সে জেরোমিলকে নিয়ে তার দুটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যায়-একটা স্থাপত্য সামগ্রী বিক্রির বড় দোকান, যেটা তার বাবা দেখাশোনা করতো, আরেকটা একটা প্রসাধনী সামগ্রীর দোকান যেখানে একজন মিষ্টি চেহারার সেলসগার্ল তাকে মিষ্টি হেসে অভ্যর্থনা জানায়, তারপর তাকে সুগন্ধি শুকতে দেয়, এতে সে পারফিউমের ব্র্যান্ড চিনে যায় খুব তাড়াতাড়ি; দাদার সাথে সে প্রায়ই চোখ বন্ধ অবস্থায় কেবল গন্ধ শুকেই পারফিউমের নাম বলে দেয়ার খেলাটা খেলে, "তোমার ঘ্রাণ শক্তি বেশ!" দাদা তার প্রশংসা করে, আর জেরোমিল স্বপ্ন দেখে নতুন পারফিউম আবিষ্কারের।

আলিক তার তিন নাম্বার বন্ধু। আলিক হলো তাদের বাড়িতে বড় হয়ে ওঠা ছোট বুনো কুকুর; যদিও তাকে কেউ কখনো কিছু শেখায়নি, তবু জেরোমিল দিবাস্বপ্ন দেখে, যে এই কুকুরটি তার বিশ্বস্ত বন্ধু হয় উঠেছে, তার জন্য ক্লাসরুমের বাইরে অপেক্ষা করে থাকে আলিক, ছুটির পর তারা একসাথে দৌড়তে দৌড়তে বাড়ি ফিরে আসে।

পোস্টটি ৪ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

নুশেরা's picture


চলুক

মীর's picture


ভালো লাগলো। তবে এটা দেখতে আমার একটু দেরী হয়ে গেছে। Smile

ভাস্কর's picture


ধন্যবাদ নুশেরা এবং মীরকে...

অদিতি's picture


এক টানে পড়ে ফেললাম যতগুলো কিস্তি বাকী ছিল। এইটা বই হিসাবে বের হইলে মন্দ হয় না ।

তানবীরা's picture


বাকিগুলো কবে আসবে?

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

ভাস্কর's picture

নিজের সম্পর্কে

মনে প্রাণে আমিও হয়েছি ইকারুস, সূর্য তপ্ত দিনে গলে যায় আমার হৃদয়...