আত্মহত্যা বিষয়ে যে সকল কথা আমার জানা ছিলো (এক)
আমার পরিচিত কেউ কখনো আত্মহত্যা করে নাই।
আর যদি চেষ্টাও কইরা থাকে ছোট ছিলাম বইলা বড়োরা কখনো সেইসব কাহিনী বা গল্প আমাদের সামনে করতো না। ছোটবেলায় মা বাপ, আত্মীয় স্বজন কিম্বা বাড়ির কাজের বুয়াদেরও বলতে শুনছি আত্মহত্যা মহাপাপ। এই কারনেই কিছু ভুল কইরা যখন মায়ের পিটুনি খাইছি, বা বন্ধু বান্ধবের সামনে আলপটকা কিছু বইলা বিব্রত হইছি অথবা দারিদ্র হেতু বড়লোক বন্ধু বান্ধবের সামনে মুখে হাসি রাইখা তাল মিলানের সময় ভেতরে অপ্রাপ্তির কষাঘাত চলছে তখন আত্মহত্যা করনের ইচ্ছা জাগলেও মহাপাপের ভয়ে সেই পথে আর যাওয়া হয় নাই। তয় ভয় যে ইচ্ছারে কেবল অবদমিত করে, তার যে ক্ষমতা নাই বিষয়টারে ভুলাইয়া দেওনের সেইটাও বুঝি...অতএব আমি আত্মহত্যা বিষয়ে আগ্রহী থাকি।
কৈশোর কালেই আমার মহাপাপ সম্পর্কীত মিথটা কাইটা যাইতে শুরু করে, আগে আমি যেই কাজগুলি করতে পাপবোধের ভয় পাইতাম তার কিছু করি না ধমকের ভয়ে, আর লুকাইয়া চুরাইয়া কিছু করতে শুরু করলাম। আজকাল আমার মাঝে মাঝে মনে হয় পাপবোধের নাগাল থেইকা বাইর হওয়ার কারণ অনেকটাই ছিলো ঐ লুকাইয়া কিছু করনের তাগীদ। এই ধরেন ১২ বছর বয়সে আমি নিজেরে নাস্তিক হিসাবে ঘোষণা দিয়া ধর্ম-কর্ম থেইকা নিজের নাম প্রত্যাহার করি। শুক্কুরবারে যদিও তখন জুম্মার নামাজ পড়নের কথা কইয়া বাড়ি থেইকা বের হইতাম। আসলে ঐ সময়টায় বড়ো পুরুষগো অনুপস্থিতির সুযোগে আমরা ঘুরতাম পাড়ার থেইকা পাড়া, মহল্লার থেইকা মহল্লায়। রাস্তা দিয়া হাটতাম আর মনে হইতো এই পথে যে অমুক জায়গায় যাওন যায় এইটা আমাগো মহল্লার কেউ জানে না। আমিই প্রথম তমুক মহল্লায় কলম্বাসের মতোন পা দিলাম...ব্লা ব্লা ব্লা। আমিই কইলাম কারণ আস্তিক বন্ধুরা বেশিরভাগ সময়েই জুম্মার মোনাজাত ধরনের লেইগা আমার সাথে যাইতো না। আমি একাকী কিশোর, যার পাপ বোধ ছিলো না, নামাজ পড়নের দায়িত্বরে যে অস্বীকার করছে, যার কাছে ধর্ম হইলো আজগুবি ফ্যান্টাসী। আর তাই নামাজের নামে বাড়ি থেইকা বাইর হওনের মিথ্যা অজুহাত আমার অজুর ভাঙনে কোনো অর্থ তৈরী করতো না। ধর্ম বিরোধীতার নামে আমি পারিবারিক অনুশাসনরেও ভাঙতাম। নিজেরে বিদ্রোহী আজো মনে হয়। কেবল উদ্যমহীনতায় ভুগি। যেই কারনে আত্মহত্যার প্রতি আমার আগ্রহ এখনো জমাটবদ্ধ থাকে।
প্রথম আত্মহত্যার লাশ দেখি আমি পনর বছর বয়সে। সেই বছর আমি ক্লাস নাইনে পড়ি। একটা কোচিং সেন্টারে ক্লাস ফাইভের বাচ্চাগো পড়াই তখন। আর এই অজুহাতে আমি যে কোনো বেলায় বাইরে থাকনের সার্টিফিকেট পাই বাইরে যাওনের। মায়ের ধমকের মাত্রা আর আগের মতোন নাই। ধমকের মাত্রা কইমা যাওনের কারণ অবশ্য আমার আপাতঃ শিক্ষক স্টেটাস প্রাপ্তি ছিলো না আদৌ, মূল কারণ ছিলো দারিদ্র। তখন আমাগো অভিভাবকেরা একটু দিশেহারা ছিলো। বাপের ব্যবসার গ্রোথ কার্ভ ক্রমশঃ নীচের দিকে ধাবমান। মাঝে মাঝে এমনো হয়, যেইদিন বাড়িতে তেল নুন কিননের টাকাও থাকে না। তখন আমার দায়িত্ব পরে দিনের পর দিন বুড়া চাচার দোকান থেইকা বাকীতে জিনিষপাতি নিয়া আসনের। হয়তো পনরদিন পর বাপ কোনো একখান থেইকা টাকা জোগার কইরা সেই বাকী শোধ করেন কিছু দিন আমরা আবারো নির্ভাবনায় কাটাই, অনিশ্চয়তাবোধের ঘানি টানতে টানতেই। তখন প্রায়শঃই মনে হইতো আমি যদি বাপের জায়গায় থাকতাম তাইলে আত্মহত্যা করতাম কবে! কিন্তু তিনি আত্মহত্যারে মহাপাপ মনে করেন। ধর্ম অনুযায়ী মৃত্যুরে ভয় করেন। বাপ সম্পর্কে আমার একটা অবজার্ভেশন প্রবল তিনি বাঁচতে চান ফ্যানাটিক্যালি। যাই হোক আমি কোচিং ক্লাসের নাম দিয়া বাড়ি থেইকা বের হই, তখন সকাল নয়টা বাজতেছিলো, বন্ধু আবু খবরটা দিছে খানিক্ষণ মানে মিনিট দশেক আগে। টুটুল ভাইয়ের বাড়ির নতুন ভাড়াটিয়া যার সাথে আমার কোনো পরিচয় নাই, যারে আমি তখনো দেখি নাই, বা হয়তো দেখছি কিন্তু নিতান্তই ছাপোষা চেহারার কারনে মনে রাখি নাই, তার বৌ গলায় দড়ি দিয়া মরছে। সেই প্রথম আমার কোনো নিকটজন আত্মহত্যা করলো। টুটুল ভাইয়ের বাড়ি আমাগো বাসার থেইকা ২০০ গজ দূরে। আমি গিয়া দেখি পুলিশ চইলা আসছে। লাশ নামাইয়া ফেলা হইছে। আশপাশের বাড়ির মানুষ উকিঝুকি মারাও কমাইয়া দিছে। তখন বাড়ির বাইরে বিভিন্ন বয়সী মানুষরা আলাদা আলাদা জটলা তৈরী কইরা তুমুল আলোচনারত। তারা মূলতঃ গোয়েন্দার মতোন এই পরিবারের শুলুক সন্ধানে ব্যস্ত। তয় আমার মনে আছে কোনো জটলাতেই আমি তেমন কোনো প্রয়োজনীয় তথ্য শুনি নাই। কয়েকজন হয়তো সাত্তার সাবরে চিনেন, যেমন বুড়া চাচা কারণ ঐ লোক বাড়িতে উঠনের একমাসের মাথায় একটা বাকীর খাতা খুইলা ফেলছে। তারে চেনার কথা কয় একজন বৃদ্ধ চৌকিদার, কারণ সে যখন রাইতে টহল দিতো তখন সাত্তার সাব ঢুলতে ঢুলতে বাড়ি ফিরা আসতো। হয়তো মদ খাওনের অভ্যাস ছিলো তার।
ছোট হওনের সুযোগ নিয়া, টুটুল ভাইয়ের বাসায় যাওনের অজুহাতে আমি অনেকটাই ভেতরে চইলা যাই (এইসব চালাকী আমি এখনো এনজয় করি)। গিয়া জানতে পারি সাত্তার সাব বাড়িতে ফিরেন নাই তখনো, ছুটা কাজের বেটি ভোরবেলা আইসা দরজা জানালা বন্ধ পায়, আধাঘন্টা ধাক্কানের পরেও কোনো সাড়া শব্দ না পাইয়া সে টুটুল ভাইরে ডাইকা নিয়া আসে। এরপর আরো লোকজন জড়ো হইয়া দরজা ভাইঙ্গা ঘরের ভেতরে ঢুইকা তারা দেখে মহিলার লাশ সিলিং ফ্যান থেইকা ঝুলতেছে ক্লীশে কোনো ভঙ্গীতে। বিষয়টা রোমাঞ্চকর লাগলেও আমার মনোযোগ কাড়ে আসলে এই লাশের প্রতি পুলিশ আর বাড়িওয়ালার দ্বান্দ্বিক চাহনী। তারা দুইজনই অপেক্ষায় আছে সাত্তার সাবের। কারণ সে না আসলে কিছু করা যাইতেছে না। কিন্তু একজনের চোখ উল্লসিত আর অন্য জনের হয়রানির শংকা। আর সেই মোবাইল ফোনহীনতার যূগে মানুষ কেমন অনিশ্চিত ছিলো সেইটা আমার মনে পড়ে এই লেখার সময়। আমি জানালার ফাঁক দিয়া দেখি কাপড়ে ঢাকা লাশ খাটে শোয়ানো আছে।
আত্মহত্যা বিষয়টা আমার কাছে এমন চমকেরই মনে হয়। যার আবেদন কখনো ক্ষয়ে যায় নাই। পুরা মহল্লাবাসী, যার মধ্যে আমার বাপরেও আমি দেখতে পাই কিছুক্ষণ পরেই। যেই কারনে আমার সেই জটলা আর চমক থেইকা পালাইয়া যাইতে হয়। কেবল একটা আত্মহননের ঘটনা এমন চাঞ্চল্য তৈরী করে আমাগো শান্তসুবোধ মহল্লায়। যেইখানে মধ্যবিত্তরা ইন্ডিভিজ্যুয়ালিজম চর্চায় তখনো মনোনিবেশিত ছিলো। আর তাই নতুন ভাড়াটিয়া সাত্তার সাবের নাম জানা গেলেও তখনো মিসেস সাত্তারের কোনো আইডেন্টিটি কেউ কইতে পারে নাই। ২০/২২ বছরের একজন তরুণী বড়োজোর এইটুক কইতে পারতেছিলো তাগো বাড়িওয়ালি...অথচ সবার আলাপে আলাপে সাত্তার সাবের অনিয়মতান্ত্রিকতা আর নির্যাতনের খবর ছড়াইয়া পড়ে; অপরিচিত তরুণী যে রাত-দিন কখনো ঘর থেইকা বাইর হইতো না, যার স্বাভাবিক চেহারা ঐ ছুটা বুয়া ছাড়া আর কেউ কখনো দেখছে কীনা মনে কইরা উঠতে পারে না, তার প্রতি কোনো এক অজানা সিমপ্যাথিতে অনেকের কাছেই আত্মহনন আর মহাপাপ থাকে না, তাগো ভাবনায় কি হয় জানি না, কিন্তু কথায় আত্মহত্যা কতোটা জরুর সে বিষয়ে মতামত জারী হয়..
আমি জানি না আসলে কোন কাঠামোর লেখা লিখতে চাইতেছি, তয় এইটা আত্মজীবনীমূলক কোনো লেখা না, এই খানে কল্পিত ঘটনা থাকবো অনেক। সাথে কিছু আত্মজৈবনিক উপাদানও...তারে যদি গল্প কওয়া যায় তাইলে তাই। দেখা যাক কোনদিকে যায়।





অনেক সুলিখিত।
ধন্যবাদ রায়হান ভাই...
এই পোস্টটা কি প্রথম পাতায় দেন নাই? যাই হোক, ভালো লেখা।
কন্কি ?
আমিতো ভাবছিলাম, আত্মজীবনীই হইবো, গল্প হইলেও ভালো ।
হমম, এত বিষয় থাকতে হঠাত আত্মহত্যা নিয়ে লিখতে ইচ্ছা হল কেন?
তবে আত্মহত্যাকে কেন্দ্র করে আপনার শৈশব কৈশরের যে দিকগুলো এসেছে, পড়তে মন্দ লাগছে না কিন্তু।
প্রথমটা পরে পড়লাম। মনে হচ্ছে সিরিজ শেষ হলে খানিকটা সম্পাদনা করে দারুণ একটা গল্প দাঁড় করানো যাবে।
ধন্যবাদ আরাশি এবং শাপলা...
@ নুশেরা: আমি যেমনে হরবর কইরা লিখি তাতে আসলে অনেক বাক্য পরে পড়লে নিজেরই মনে হয় অসম্পূর্ণ। তয় আমারো মনে হয় আত্মহত্যা বিষয়টা অনেক কন্টেম্পোরারি ইস্যূ এইটা নিয়া গল্প ভালো হওয়ার কথা...
আমি প্রথম আত্মহত্যা করা লাশ দেখি যখন ওয়ানে পড়ি। জিব বের করা সেই লাশ এতদিন পড়েও আমার মনে পড়ে। ছোট ছিলাম বলেই হয়তো স্থায়ী হয়ে গেছে।
অপূর্ব একটা সিরিজের সন্ধান পাচ্ছি। দুর্দান্ত
মন্তব্য করুন