ইউজার লগইন

আত্মহত্যা বিষয়ে যে সকল কথা আমার জানা ছিলো (চার)

আশির দশকের রাজনৈতিকতার পটভূমিতে যেইসব শিশু কৈশোরত্ত্ব অর্জন করছে তাদের প্রাণে রাজনীতির অর্থ অন্যরম ছিলো সেইটা আজ হাড়ে হাড়ে বুঝি। নূর হোসেনের আত্মাহুতি আমাগো হৃৎপিন্ডের স্পন্দনে ছন্দপতন ঘটায়। আমার মনে পড়ে এমন আত্মাহুতির নজীর আমার পরিচিতজনগো মধ্যেও আছে। সম্পর্কের দূরত্বে বেশ দূরে অবস্থান করলেও বন্ধুত্বে বাপের নিকটতর এক আত্মীয়, যার কাছে আমরা চকলেট চাইতাম ফজল মামা বইলা, সেনা সদস্য হিসাবে কর্নেল আহসান নামে তার পরিচিত ছিলো। প্রশাসনিক দায়িত্বে তিনি ছিলেন রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধান। তিনি ১৯৮১ সালের ৩০ মে অভ্যূত্থানকারী সেনাসদস্যগো ব্রাশ ফায়ারিংয়ের সামনে দাঁড়াইয়া গেছিলেন রাষ্ট্রপতির দরোজায়। এমন দায়িত্ব পালনের ঘটনারে আমরা কি নামে অভিহিত করতে পারি!?

তবে নূর হোসেন তো রাষ্ট্রের কাছে গণতন্ত্রের মুক্তি সংগ্রামে যোদ্ধা হওয়ার খাতিরে কোনো মাসোহারা পাইতো না; বরং শহর অবরুদ্ধ হওয়ায় তার দিনের রোজগার বন্ধ হইয়া গেছিলো ১০ তারিখ। স্কুটার চালাইয়া দিন আনি দিন খাই ধরনের জীবন পাল্টানের প্রতিশ্রুতি কি গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় কোনোভাবে লেখা থাকে? তবে কেনো নূর হোসেনের সংগ্রামী আত্মাহুতির আলেখ্য তৈরী হয়? গণতন্ত্রহীন সমাজে বাঁইচা থাকনের তাড়না পাইতেছিলো না নূর হোসেন ড্রাইভার? নাকি সে আসলে কখনো ভাইবা দেখতে পারে নাই গণতন্ত্রের শত্রু স্বৈরাচার সামরিক জান্তা কদ্দূর নৃশংস হইতে পারে। নূর হোসেনের স্বল্প শিক্ষিত মনন কি তারে শিখায় নাই কখনো যে গরীবের প্রতিবাদ শোষক শাসকরে সবসময় কোনঠাসা কইরা ফেলে, দেয়ালে পিঠ ঠেইকা যাওয়া হায়নাতো আক্রমণের সিদ্ধান্তই নিবো! এতো সব চিন্তার ফেড়ে আমি খেই হারাইয়া ফেলি। বুঝতে পারি মধ্যবিত্ত প্রাণে নূর হোসেনদের বুঝতে চাওয়ার চেষ্টা আসলে বামন হইয়া চাঁদের পানে হাত বাড়ানের মতোন একটা প্রয়াস।

তার চেয়ে ভালো নূর হোসেনের প্রতি শ্রদ্ধাটুকুনই থাক। আমি বরং বন্ধু আবুর গল্পে মনোনিবেশ করি। নবম শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষা শেষে ফলাফলের অপেক্ষায় ছিলাম তখন আমরা। কেনো জানি আমাগো আড্ডার প্রাণকেন্দ্র হইয়া উঠছিলো আবুর বাড়িতেই। হয়তো আবুর সরকারী কর্মকর্তা অভিভাবকেরা তখন অফিসে থাকতেন বইলা একমাত্র সন্তান আবুরে শাসন করনের মতোন কেউ ছিলো না। আর সেই সুযোগে তার বাড়িতে আমরা সকল ধরনের পানাহার আর জুয়ার আড্ডা বসাইছিলাম। তারপর কলাবাগান মসজিদ সংলগ্ন সেই বাড়ির ছাদে উইঠা আশপাশের ছাদে ওঠা নারীগো দেখা। সেইসময় মহল্লাবাসীগো ছাদে ওঠার একটা অভ্যাস ছিলো বিকালে। খোলা হাওয়ায় চুল উড়াইতো তরুণীরা। মধ্যবয়স্ক খালাম্মারা আঁচল বিছাইয়া বসতেন আড্ডায়।

আমরাও প্রায় ৫/৬ জন কিশোরের দল তখন প্রতি বিকালে আবুদের বাড়ির ছাদে উঠি। সৌন্দর্য্য পিপাসা তখন কেবল বুইঝা উঠতেছি। বুঝতে বুঝতেই হয়তো আমাগো সময় কাটতেছিলো। কিন্তু একদিন আবু ঘোষণা দিলো প্রাপ্তি আপার সাথে তার সম্পর্ক না হইলে সে আত্মহত্যা করবো। আবু'র এই ঘোষণারে আমরা কয়দিন আগে হইলে তুড়ি মাইরা উড়াইয়া দিতাম...কিন্তু কিছুদিন আগে সাত্তার সাহেবের স্ত্রী আমাগো চোখ খুইলা দিয়া গেছেন; আত্মহত্যা বিষয়টারে তখন আমরা বাস্তবতার পরিভাষায় অনুবাদ করতে পারি। আত্মহত্যার মহাপাপ সংক্রান্ত প্রবচন তখন আমাগো প্রাণে একইরকম খেলে না। আত্মহত্যা তখন অপ্রাপ্তির সম্ভাবনায় প্রতিবাদী এক প্রকাশ। আবুর আত্মহত্যা সংক্রান্ত ঘোষণায় আমরা তখন শূন্যতারে অনুভব করতে পারি। এই শূন্যতা নিকটজনের অনুপস্থিতির শূন্যতা। তবে শূন্যতা তৈরীর এই হুমকীর বৈধতা নিয়া আলোচনায় যাওনের মতোন জ্ঞান তখনো আমাগো ছিলো না। আমরা আবুর আত্মহননের সম্ভাবনারে দূর করনের চেষ্টায় বরং বেশী আগ্রহী হইয়া উঠি।

আমরা আবুরে প্রশ্ন করি,
:প্রাপ্তি আপা কি জানে যে তুই তার প্রেমে পড়ছিস।
আবু কিছু না কইয়া মাথা নাইড়া সম্মতি জানায়। আমরা আবারো প্রশ্ন করি,
:সেও কি তোর মতোই আত্মহত্যা করতে চায় নাকি?

আবু এইবারো মাথা নাড়ে। আমরা আসলেই সেই সময় বিস্মিত হই। প্রাপ্তি আপারে আমরা সবাই ছাদে উঠতে দেখতাম। তার দিকে আমরা সবাই মিলা বহুভাবে তাকাইছি বেশিরভাগ বিকালেই। কিন্তু ছোটখাটো গড়নের বাম কানে ছোট দুল পরা আবু কেমনে প্রাপ্তি আপার সাথে প্রেমের সম্পর্ক গইড়া তুললো! তার বাবা-মা বেশ কয়েকজন সন্তান মারা যাওনের পর জন্ম নেয়া ছোট্ট আবুর কান ফুরাইয়া দিছিলো কোনো সংস্কারে, সেই দুলের কারনেই আবু বাঁইচা গেছিলো বইলা অনেকে বিশ্বাস করে। প্রাপ্তি আপার সাথে সম্পর্ক নির্মাণেও কি এই দুলের কোনো কারিকুরি ছিলো!?

পোস্টটি ৯ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

নুশেরা's picture


আত্মহত্যা তখন অপ্রাপ্তির সম্ভাবনায় প্রতিবাদী এক প্রকাশ।

এখনকার অবস্থায় বোধহয় প্রতিকারহীন অপ্রাপ্তির বিরুদ্ধে একমাত্র প্রতিবাদ।

==============================================

যাক, এই পর্বে শেষ হয়ে যায়নি! দারুণ লাগছে এই সিরিজ। গল্পটা পড়ার আগ্রহ আরো বাড়লো।

মীর's picture


একটানে পড়লাম। দুর্দান্ত হৈসে। ইদানীং দেশে আত্মহত্যা বেড়েছে সেটা দেখেছেন? এখন অবশ্য আত্মহত্যা নয়, চাই আত্মাহুতি। নব্বুইয়ের পর অনেক দিন পার হয়ে গেছে। এখন আবার একটা বলি চায় ইতিহাস।

ভাস্কর's picture


ধন্যবাদ নুশেরা আর মীরকে, মন্তব্যের জন্য...

হাসান রায়হান's picture


গল্প জমে গেছে। যদিও সাবজেক্ট বেদনাদায়ক।

ভাস্কর's picture


ধন্যবাদ রায়হান ভাই...

সাঈদ's picture


আত্মহত্যা !!!!

একলব্যের পুনর্জন্ম's picture


আমরা যখন বড় হয়েছি তখন এরকম কোনোকিছু সামনে ছিলো না ---- কেবল কর্পোরেট ধান্দাবাজ ছাড়া আমাদের কোনো প্রডিজিও চোখের সামনে পাই নাই ।

সেই সময়টাতে বড় হয়ে ওঠা মানুষগুলো ঈর্ষা করার মত ।

ভাস্কর's picture


@সাঈদ : ডরাইছেন নাকি?

@এপু: বিশ্বব্যবস্থার সাথে মানুষের উদ্দেশ্যমূখীনতার ধরণও পাল্টাইছে, আর তাই আপনেগো রোল মডেলও পাল্টাইছে। প্রতিরোধের সময় পার হইয়া এখন অ্যাম্বিশনের সময়ে প্রবেশ করছে পৃথিবী। কে কারে পিছনে ফেলতে পারে সেই প্রতিযোগিতাই নতুন প্রজন্মের মূল লক্ষ্য, কেউ সাথে সাথে যাইতে চায় না...

হাসান রায়হান's picture


আগায় যাওয়ার চেষ্টাটা যদি স্বাভাবিক হইত, সুস্থ হইত তাইলে কোনো সমস্যা ছিলনা।

১০

শওকত মাসুম's picture


রাজনীতি ও ব্যক্তিজীবন নিয়ে এভাবে আগাতে থাকেন। এসময়টাও ধইরেন। তাতে এপুর মন্তব্যেরও একটা ভাল উত্তর হবে।

১১

তানবীরা's picture


দারুণ লাগছে এই সিরিজ। গল্পটা পড়ার আগ্রহ আরো বাড়লো।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

ভাস্কর's picture

নিজের সম্পর্কে

মনে প্রাণে আমিও হয়েছি ইকারুস, সূর্য তপ্ত দিনে গলে যায় আমার হৃদয়...