আত্মহত্যা বিষয়ে যে সকল কথা আমার জানা ছিলো (পাঁচ)
টুটুল ভাইয়ের বাসায় সাত্তার সাহেবের স্ত্রী'র ভুত ঘোরাফেরা করে বইলা যেই আবু সন্ধ্যার পর হইলেই উশখুশ করতো বাড়ি ফেরার তাড়ায়, সেই আবু প্রেম করলো তার চাইতে দুই বছরের বড়ো প্রাপ্তি আপার সাথে। সময়ের পার্থক্যটা মাত্র বছর পচিশেকের হইলেও সেই আমলে এইরম সামাজিক মূল্যবোধের ব্যত্যয়ে সম্পর্ক খুব একটা হইতো না। হইলেও সেইটারে সামাজিক বিধিমালা ভঙ্গের দায়ে দুষ্ট হইতে হইতো। আর এর শাস্তির বিধান কি হইতে পারতো তা অনুমেয় না হইলেও তার মাত্রা বহুদূর যাওনের সম্ভাবনা নিয়াই বিরাজ করতো। তাই আবু যখন আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত আমাগো জানাইলো আমরা বিস্মিতই হইছিলাম। কারণ সমাজরে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাইয়া আবু এমনিতেই আত্মহননের মতোন একটা পদক্ষেপ নিয়া ফেলছে। একজন সামাজিক মানুষের, সামাজিক নিয়মকানুন-বিশ্বাস-সংস্কারের প্রতি সমর্পিত মানষের এইরম আচরণ তো আসলে তো তার নিজের স্বত্ত্বার সাথে বৈপরীত্যের সামিল। এরে আমরা কি আত্মহত্যার সাথে তুলনা করতে পারি!?
বিশ্বাস বিরুদ্ধ এই চেতনারে আমরা কি কইতে পারি? নিজের সাথে এই যে বৈপরীত্যের সংঘাত তারে কি আত্মহত্যা কওয়া যায়? ভালোবাসার খাতিরে নিজের অভ্যস্ততা-অনুরাগ-বিশ্বস্ততা এমনকি জীবনাচরণ পাল্টাইয়া ফেলার যেই মানবিক চাহিদা, তারে কি আত্মহত্যা কালীন পরিস্থিতির সাথে মেলানো যায়? ইন্দ্রিয়রে নিস্তেজ করনের মধ্য দিয়া মানুষ আসলে কি চায়! অনুপস্থিতিরে জাহির করবার চাহিদা তার থাকে। এই অনুপস্থিতি কি কেবল শরীরের! আবু যদি সেইদিন তার চেহারাতেও কিঞ্চিত পরিবর্তন করতে সক্ষম হইতো (তার চাহনীর পরিবর্তন যদিও আমাগো চোখে লাগে সেইসময়),তাইলে তারে চিনতে পারনটা কি আমাদের জন্য দুষ্কর হইতো? প্রাপ্তি আপারেই বা কিভাবে বিশ্লেষণ করতে পারি। সেই আমলে নারীর সাহসিকতা পুরুষতান্ত্রিকতায়ও ভর করতে শিখে নাই খুব একটা। নারী তখনো বেশ কোমল নারী। মিছিলের নারী মুখ তাই তখন আলোকচিত্রের বিরল বিষয়বস্তু হয়। নারীরা তখনো মুষ্টিবদ্ধ করতে বা হইতে শিখে নাই। প্রাপ্তি আপার প্রেম প্রার্থনায় তো সারিবদ্ধ ছিলেন এলাকার ইঞ্জিনিয়ার বড়ো ভাই ডায়মন্ড থেইকা শুরু কইরা পাড়ার মাস্তান শাহ আলম ভাই পর্যন্ত অনেকেই। কিন্তু প্রাপ্তি আপাও কেমনে এমন সিদ্ধান্ত নিলেন। আমরা আবুরে জিগাই,
ঘটনাটা কতোদিন আগে ঘটাইছিস?
আবু কোনো উত্তর না দিয়া মিটিমিটি হাসে। তার চোখে তখন আর আত্মহত্যা হুমকী দেওয়া কিশোর দৃষ্টির ভঙ্গীটা নাই।
আমরা আবারো কই,
প্রাপ্তি আপারেই বা তুই কেমনে রাজী করাইলি?
আবু তখনো নিশ্চুপ। আমাগো মধ্যে সবচাইতে নিরীহ ছেলে সেলিমের চোখে আবু তখন হিরো হইয়া গেছিলো সম্ভবতঃ। সেলিম প্রশ্ন করে,
আবু, তুই কি কইছিলি প্রাপ্তি আপারে? মানে...প্রেমের প্রস্তাব করতে গিয়া কি কইছিলি রে?
এইবার আবুর চাহনীতে আমরা দুষ্টুমি খেলা করতে দেখি। সে প্রায় ফিসফিস কইরা কয়,
তারে কইছিলাম, সে যদি আমারে ভালো না বাসে তাইলে আমি আত্মহত্যা করুম...
আমি অবশ্য বিন্দুমাত্র বিশ্বাস করি নাই আবুর এই স্বীকারোক্তি। আত্মহত্যার এই হুমকীতে ভালোবাসা তৈরী হইয়া যাইবো...আর সেই ভালোবাসা পূনরায় আত্মহত্যার প্রয়োজনীয়তা তৈরী করবো, বিষয়টা কি এতোই সরলতা ধারণ করে!? ভালো বাসাবাসির এই পরিণতি আসলে কোন পথে আসে, আমি আজো তা জানি না। অনুপস্থিতির এই হুমকী কি কেবল যারা বাঁচে তাগো লেইগা? নাকি আত্মহত্যা করতে চাওয়া মানুষের যেই এমপিরিক্যাল পৃথিবী সেইটার অনুপস্থিতির প্রতি আগ্রহী হইয়া ওঠাই এইখানে মূল ভূমিকা পালন করে? আমি নিজে অনুপস্থিত হইতে চাই নাকি আমার অভিজ্ঞতালব্ধ পৃথিবীর চেহারা আর দেখতে না চাওয়ার তাগীদেই আত্মহত্যার ঘোর তৈরী হয়?
প্রশ্নের পর প্রশ্ন সাজাইতে সাজাইতে আমি পৃষ্ঠা ভরাইয়া ফেলতে পারি। তবু জানি আত্মহননের এই প্রক্রিয়ারে সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞায়নের চেষ্টা আসলে বোকামী। আত্মহত্যাতো কেবল চোখ বুইজা থাকা নয়। চিরতরে চোখ বুইজা থাকনের মতোনও না বিষয়টা। আত্মহত্যা মানে পরবর্তী সময়ে আর কোনো বিষয়ে চিন্তা না করতে চাওয়া বা পারার মতোন একটা সিদ্ধান্ত। আত্মহত্যা মানে শূন্যতা। আত্মহত্যা মানে নিজের সকল চাহিদা-সাধ-আহলাদের পরিসমাপ্তি। রাগ-ক্ষোভ-আনন্দ-বেদনার মতোন সবধরনের অনুভূতি বা আবেগের উর্দ্ধে চইলা যাওয়া। বা আদৌ এই যে কিছু মানে তৈরীর চেষ্টা করা হইলো এই পাতায়...তার কোনো ভিত্তি নাই। হয়তো আত্মহত্যা একটা মুহুর্তের বাস্তবতা। আত্মহত্যা প্রচেষ্টার পর যেই কারনে বেশিরভাগ মানুষই বাঁচতে চায় বইলা মনস্তাত্ত্বিকরা বলতে চায়। কিন্তু চিন্তার এই প্যাটার্নটারেও আসলে অনুসিদ্ধান্ত কওন যায় না। কারণ আসলেই আত্মহত্যামূখী যাত্রার পথ পুনরায় নির্ধারিত হওনের সম্ভাবনা থাকে বইলাই মনে করে মনোবিশ্লেষক কিম্বা সমাজবিজ্ঞানীরা। প্রাপ্তি আপার সাথে জীবন কাটাইতে না পারলে আবু কি সেই জীবনরে আর যথার্থ মনে করতো না? আমার কাছে তা কখনোই মনে হয় নাই। আবু হয়তো তালিকায় তার পরের জনের নামও সেইসময় ঠিক কইরা রাখছিলো। কারণ তারে ঠারেঠোরে স্বপ্নার দিকেও তাকাইতে দেখা গেছে সেই সময়ে। স্বপ্না বরং আবুর সাথে বেশি কমপ্যাটিবল হইতে পারতো বইলা আমরা সেই সময়ে ভাবছিলাম। পারিবারিকভাবে স্বপ্নাগো মিশুক পরিবার প্রাপ্তি আপার নাক উচা পরিবারের চাইতে মহল্লাবাসীর কাছে অধিক গ্রহণীয় ছিলো। এলাকার দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রথম কিশোর-কিশোরীর বিবাহ বা সংসার পাতনের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আবু আর স্বপ্না অনেক উদ্দীপনা তৈরী করতে পারতো বইলা আমরা ভাবতে শুরু করি। আবুরে সেই কথা বিবিধ বাক ভঙ্গীমায় বুঝানের চেষ্টাও করা হয়।
তবু কিছুতে কিছু হয় না। কেবল সেই ৮৮ সালে সামরিক জান্তা তার নিজের কবর খোড়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন করে বইলা আমরা বুঝতে পারি। আত্মহননের দিকে যাত্রা শুরু করে লেজেহোমো এরশাদের স্বৈরাচার। আর আমাগো আবুর যাত্রারেও আমাগো কাছে অনিশ্চয়তার দিকে ধাবমান ঠেকে।





পড়লাম ।
সিরিজটা শেষ হোক, কয়েকটা প্রশ্ন করবো। আপাতত পড়েই চলেছি।
@আরাশি: ধন্যবাদ...
@ মুক্ত : আপনের প্রশ্নগুলি কইরা ফেলতে পারেন, কারণ আমি নিজেও জানি না এই সিরিজ কবে শেষ করুম। এইটা হয়তো আজীবনও চলতে পারে :p। পড়বার জন্য ধন্যবাদ...
সিরিজটা পড়ছি আর বিভিন্ন বিষয়ে নতুন নতুন জ্ঞান লাভ করছি।
কিরকম?
মিলান কুন্ডেরা বন্ধ কেন?
দুর্দান্ত মসৃণতায় এগুচ্ছে সিরিজ! এমন একটা মনোসামাজিক টপিকের বিশ্লেষণশেষে প্রতি পর্বেই সমসাময়িক রাজনৈতিক বাস্তবতা মিলিয়ে নেয়া, সেটাও ইউনিক।
এরশাদপতনের সেই সময়টা আসলেই অদ্ভুত। এই লোক এখনও এইভাবে বহাল তবিয়তে দেশে অথবা দুনিয়ায় থাকতে পারবে, এটা তখন কল্পনাতীত ছিলো। মওদুদের হাতে ক্ষমতা দিয়ে কোথায় লুকিয়েছে এরশাদ, পালালো কিনা আটকানোর জন্য বিমানবন্দর ঘিরে রেখেছে বিশাল জনতা-- সেই সময়ে আমাদের পাড়ার মোড়ে খবরের কাগজ বিক্রেতা দোকানির মন্তব্যটা এখনও মনে পড়ে, এরশাইজ্জার কইলজা লাগে ফাইকানার রাস্তা দি ফরি গেইয়্যে গই... (হিউম্যান অ্যানাটমির কী বিশ্লেষণ!)
@মীর: কুন্ডেরা আবার শুরু করবো শিগগিরী...
@ নুশেরা: ধন্যবাদ...
অপূর্ব একটা সিরিজ হচ্ছে
মন্তব্য করুন