ইউজার লগইন

সে একটা গল্প বলতে চেয়েছিলো...(এক)

দিগন্ত বিস্তৃত নদী। ছোট্ট ঘাট। অন্ধকারে যদিও নদীর কিছুই প্রায় দৃশ্যমান নয়। দূরে কিছু আলোকবর্তীকা দেখা যায়। তারা ভাসে। আলোর সাথে কিছু শব্দও ভেসে আসে। যদিও লঞ্চ ঘাটে কোনো শব্দ নাই। কেবল মাঝে মাঝে জলস্রোত এসে লোহার জেটিতে আছড়ে পড়লে যতোটা শব্দ হয় ততোটুকুনই। তাতে নীরবতা ভাঙে না। বরং নিথর লঞ্চঘাটের রহস্যময় নীরবতা আরো গাঢ় হয়। একজন পুলিশ অবশ্য ঘুমে ঢলে পড়লে তার রাইফেলটা পিছলে গিয়ে খানিকটা শব্দ করে আর তাতে কুন্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকা ঘেয়ো কুকুরটা নড়েচড়ে উঠে মাথা তুলে, সে'ও যেনো দূরের আলোর সাথে তাল মিলিয়ে মাথা দোলায়। মৃদূ তালের সেই দুলুনি বুঝতে হলে নীরবতার ছন্দ বুঝতে হবে। এই রকম পরিবেশে নীরবতাকেই মানাচ্ছিলো অনেক, আর তাই কেউ একজন যখন পুরনো ক্ষয়ে যাওয়া স্যান্ডেলে প্যাচ প্যাচ আর লোহার পাটাতনের ঘটঘটাং এই দুই শব্দের সঙ্গতে তাকে ভেঙে দিতে দিতে এগিয়ে আসে, তখন তন্দ্রায় থাকা পুলিশ, দুলুনিতে আচ্ছন্ন কুকুর আর গুটিশুটি মেরে বসে থাকা চায়ের দোকানী নুরু মিয়া সবার সম্বিত ফেরে, তাদের চোখমুখে বিরক্তি বোঝা যায়।

লোকটার স্যান্ডেলের মতোই তার ক্ষয়ে যাওয়া মুখ। এলোমেলো চুল। যেনো খনিতে বড় হওয়া কোনো মানুষ। যদিও আশপাশের কোনো বড় জেলাতেও কোনো খনি নাই। থাকলে অন্ততঃ এই এলাকার মানুষেরা খুশিই হতো। ছয়মাস ধান চষে বাকীসময় হয়তো তারা খনিতে লেগে যেতো ধুমধাম করে। বাস্তবে এমন পরিকল্পণা মূ্ল্যহীন। কিন্তু বন্যা পীড়িত এই ভাটিবর্তী জনপদে মানুষ কিছু সময় এমন অলসই কাটায়। তাদের গল্পে গল্পে নেমে যায় অনেক আষাঢ়।

নুরুমিয়ার দোকানের ভাঙা বেঞ্চিটায় লোকটা বসলেও, এলাকার বৈশিষ্ঠ্য মতোন নুরু মিয়াকে জড়োসড়োই দেখা যায়। ক্ষয়ে যাওয়া বর্ষাতেও সে শীতের রাতের মতোই কাঁথামুড়ি দিয়ে গুটিসুটি মেরে বসে থাকে। কেবল ভ্রু উচিয়ে একবার লোকটাকে দেখে আবার চোখ নামিয়ে নেয়। যেনো তারেও নীরব থাকতেই অনুরোধ করে পাল্টা নীরবতায়।

এক কাপ চা খাওয়ান তো...

লোকটা কেমন খসখসে গলায় প্রায় পাঁচ শব্দের বাক্যটা উচ্চারণ করে। নুরু মিয়ার মনে হয় এই কন্ঠস্বর তার পরিচিত। কিন্তু কথা বলার ভঙ্গীটা মেলাতে পারে না। বেশ ধীরে সে কাঁথার নীচ থেকে তার হাত বের করে। নদীর জলে ধুয়ে উল্টো করে রাখা একটা চায়ের কাপ তুলে নেয়। বয়াম থেকে এক চামচ চিনি ফেলে দিয়ে ফুটতে থাকা দুধ আর জলের মিশ্রণ ঢালে সেখানে। তারপর আরেক চুলো থেকে তুলে নেয় চায়ের লিকার। তারপর টিং টিং টিং টিং চামচ নাড়ার শব্দ। যতো তাড়াতাড়ি শেষ হয় ততোই আবার ফিরে যাওয়া যাবে আগের স্থবিরতায়। চায়ের কাপটা বাড়িয়ে দিয়ে যদিও সে কথা বলে উঠে,

আপনে কোন গেরামের থন আইলেন?

লোকটা চায়ের কাপে সুরুৎ করে একটা চুমুক দিয়ে প্রশংসার দৃষ্টিতে তাকায় নুরু মিয়ার দিকে।

ভালো চা হইছে, এইটা শেষ হইলে আরেক কাপ দিয়েন।

কিন্তু সে নুরু মিয়ার প্রশ্নের জবাব দেয় না। সে নদীর দিকেও তাকায় না। চায়ের কাপ ঠোটে লাগিয়েই সে পুলিশটার পাশে পড়ে থাকা লাশটা দেখতে থাকে।

ঢাকায় নিহি মূর্দারে গোসল দিয়া চা পাতি ছড়াইয়া দেয়...তাতে লাশ পঁচে না।

তারপর নুরু মিয়ার দিকে চোখ ফিরিয়ে কন্ঠস্বর আরো খানিক নামিয়ে বলে,

সেই চা পাতি ঢাকার দোকানদাররা কিনে কম দামে, ঐ চায়ের স্বাদ নিহি অন্য রহম।

পরক্ষণেই সে বাদামী হয়ে যাওয়া দাঁত বের করে গলা চড়ায়,

ডোমেরা লাশ কাটতে যাওনের আগে ম্যাক্সিমাম তিন কাপ সেই চা খাইয়া লয়।

নুরু মিয়ার অবাক হওয়ার কথা থাকলেও, তার কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। সে এই এলাকার মানুষের আচরনের সাথে পরিচিত। এরা এমন গল্প বলতেই অভ্যস্ত। সে বরং লোকটার দিকে চোরা চোখে নিমেষহীন তাকিয়ে থাকে। লোকটাকে তার চেনা চেনা লাগে। কিন্তু আবার না চিনতে পারার একটা অস্বস্তিবোধও শুরু হয়। নুরু মিয়াও লাশটাকে দেখে। সে এই পরিস্থিতির সাথে পরিচিত। এই নদীবর্তী গ্রামে অপঘাতে মরা লাশ ময়নাতদন্তের জন্য নিয়ে যেতে হয় জেলা সদরে। পুলিশ বেশিরভাগ সময় যে কারনে অপঘাতে মৃত্যু বিষয়ক মামলাই নিতে চায় না। এই লাশ সংরক্ষণের জন্য চা পাতা দেয়া হয় কি না এই বিষয়ক আগ্রহ তার কখনো হয় নাই। তবে রহস্যময় লোকটার কথায় তার ইচ্ছা করে পুলিশটাকে ডেকে চা পাতার কথাটা জিজ্ঞাসা করতে।

পোস্টটি ৯ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

নুশেরা's picture


অসাধারণ আবহ তৈরি হয়েছে। পারিপার্শ্বের বর্ণনা, চরিত্রের উপস্থিতি, সংলাপের চমৎকার ব্লেন্ড।

শব্দচয়নের একটা নিজস্ব স্টাইল আপনার আছে, সেটা মাথায় রেখেই একটা অনুরোধ।
এই রকম পরিবেশে নীরবতাকেই মানাচ্ছিলো অনেক, আর তাই কেউ একজন যখন পুরনো ক্ষয়ে যাওয়া স্যান্ডেলে প্যাচ প্যাচ আর লোহার পাটাতনের ঘটঘটাং এই দুই শব্দের সঙ্গতে তারে ভেঙে দিতে দিতে এগিয়ে আসে........
তারের বদলে তাকে ব্যবহার করা যায়?

বৃহত্তর ময়মনসিংহের দূরবর্তী ভাটি এলাকায় বর্ষা থেকে হেমন্তে অপঘাতে মৃত্যু বেশি হয়; সেখানকার থানার পরিসংখ্যান তাই বলে। একটা সাধারণ দৃশ্য হলো আখের পাতায় মুড়িয়ে এমন লাশ পরিবহন।

মীর's picture


হুম, পছন্দ হৈসে।

ভাস্কর's picture


ধন্যবাদ নুশেরা...ঐটা পাল্টাইয়া দিলাম...আমি যেই সময়টার গল্প বলতে চেষ্টা করতেছি সেইটা বর্ষার শেষ ভাগ অথবা শরতের শুরু। মাথায় আছে বৃহত্তর ময়মনসিংহের হাওরবর্তী একটা জনপদ। সেইখানে অবশ্য লাশ সাদা কাফনের কাপড় দিয়া জড়াইয়া নিতে দেখছিলাম।

@মীর: আপনারেও অসংখ্য ধন্যবাদ...

মুক্ত বয়ান's picture


শুরুটা সেইরাম হইছে, তয়, একটু যেন বেশি ছোট। Sad
পরের পর্বের অপেক্ষায়। Smile

ভাস্কর's picture


প্রথমে ধন্যবাদ দেই তারপর কই আয়তন বিষয়ে, সাধারনতঃ ব্লগে যেই আয়তনের গল্প পোস্ট করা হয় আমি সেইটারে স্ট্যান্ডার্ড হিসাবে নিছি...তাই ৭০০ শব্দের মধ্যে থাকতে চাইছি পোস্টে।

পরের পর্ব দিমু পোস্টটা আরেকটু নীচে নামলেই...

বাতিঘর's picture


ঘন কুয়াশা সরিয়ে যেভাবে সূর্য নিজেকে জানান দেয়, গল্পের আবহ তৈরিটা ঠিক তেমনই মোলায়েম সুন্দর লাগলো গো ভাই!!! ঈর্ষাকাতর মুগ্ধতা জানান দিয়ে গেলাম। ....বিনীতভাবে বলি, বেশ কিছু বানানের প্রতি সঠিক নজরদারীর ঘাটতি লক্ষ্য করলাম। দয়া করে ওদের প্রতি যত্ন নিবেন। নুশেরা আপুর ঝাঁমা খাবো হয়ত, তারপরও আমার নিজস্ব মত হলো, 'তাকে' না করে 'সেটাকে' করলে মনে হয় ভালুই হতো..... Tongue পরের পর্ব পড়বার আগ্রহ থাকলো। ভালো থাকবেন। শুভেচ্ছা নিরন্তর।

নুশেরা's picture


নুশেরা আপুর ঝাঁমা খাবো হয়ত,

ঝামা দিয়ে আমি শুধু বাসনই মাজি, বাতিঘর না Angry Wink

"তাকে অথবা সেটাকে" লিখেও কেটে দিয়েছিলাম, সত্যিই! কারণ দ্বিতীয়া বিভক্তির রূপটা কেমন হতে পারতো শুধু সেটাই বলতে চেয়েছি।

হাসান রায়হান's picture


সেরম শুরু।

ভাস্কর's picture


ধন্যবাদ বাতিঘর এবং রায়হান ভাইকে...

১০

জ্যোতি's picture


দারুণ ।পড়তে শুরু করতেই শেষ হয়ে গেলো।

১১

শওকত মাসুম's picture


আগ্রহ ভালই তৈরি হইলো। পরের পর্বগুলোর অপেক্ষায়

১২

নীড় সন্ধানী's picture


এটা সেরকম একটা লেখা যা কেবল আমি পড়তেই পারি, লিখতে পারি না। ঘটনার চেয়েও উপভোগ করলাম গদ্যটা।

১৩

শাপলা's picture


ইস! মানুষ যে কি করে এত সুন্দর লিখে!!!!!

খুব ভালো লাগলো ভাস্কর দা।

১৪

আবদুর রাজ্জাক শিপন's picture


 

শুরু ।

১৫

তানবীরা's picture


যাই পরেরটা পড়ে আসি

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

ভাস্কর's picture

নিজের সম্পর্কে

মনে প্রাণে আমিও হয়েছি ইকারুস, সূর্য তপ্ত দিনে গলে যায় আমার হৃদয়...