ইউজার লগইন

সে একটা গল্প বলতে চেয়েছিলো (দুই)

কি ভাই, আরেক কাপ চা খাওয়াইবেন না!

নুরু মিয়া হঠাৎ যেনো ধরতে পারে লোকটার উদ্দেশ্য। সে কখনোই কোনো নির্দিষ্ট ধরনে কথা বলে না। একেকটা বাক্য যেনো নীরবতার সাথে যূগলবন্দী খেলে। চায়ের দোকানী নুরু মিয়ার স্থির প্রাণেও দোলা খায় একটা সংশয়। পেটের ভেতর ভুটভুট করে বেজে ওঠে অস্বস্তিরা। তার মনে হয় লোকটা তার পরিচয় লুকোতে চায়। সে আসলে কোথাও পালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু পরক্ষণেই বুঝতে পারে পালাতে চাইলে সে এখানে বসে থাকতো না। আজকের পরিস্থিতি খানিকটা ভিন্ন। যে লাশটা মাটিতে অযত্নে পড়ে আছে, তার সামনে একজন পুলিশ কনস্টেবল উদাস ভঙ্গীতে ঘুমে ঢলে পড়তে পড়তে একসময় জেগে থাকার জন্য পকেট থেকে নেভী সিগারেটের প্যাকেট বের করে নুরু মিয়াকে হাক দেবে আগুণ ধরিয়ে দেয়ার জন্য, এমন দৃশ্য কল্পনাতেও খুব বলিষ্ঠতা নিয়ে আসে না।

নুরু মিয়াকে তাই নেমে আসতে দেখা যায় তার ছোট্ট টঙ দোকানটা থেকে। যাওয়ার সময় সে লোকটার দিকে তাকিয়ে বলে, "আপনারে একটা স্পিশাল চা খাওয়াইতাছি, একটু ওয়েট করেন"। নুরু মিয়া হেটে যায় পুলিশের দিকে। পদশব্দহীনতায় মনে হতে পারে এই মানুষটার যেনো ওজনহীন শরীর। সে আসলে হাটে নাই, সে আসলে ভেসে চলে যায়। ম্যাচের কাঠি জ্বলে ওঠাতেই যেনো অনেক্ষণ পর কোনো শব্দ নির্মিত হয়। পূণরায় আলস্য নিয়ে ফিরে আসে। আবারো গুটিশুটি বসে। খানিক্ষণ চুপ করে কিছু একটা ভেবে সে স্পিশাল চা বানানোর প্রস্তুতি নেয়।

এই অবসরে লোকটা পকেট থেকে পলিথিনে জড়ানো বিড়ি সমগ্র বের করে জ্বালায়। তারপর নিমগ্ন দৃষ্টিতে চা বানানোর প্রক্রিয়াটা অনুসরণ করে। কিন্তু নুরু মিয়া আসলেই বিস্ময়ে ধাক্কা খায়, যখন লোকটা হঠাৎ বলে ওঠে,

তাজ সাহেব শেষ পর্যন্ত মরলো...

নুরু মিয়ার স্তব্ধতায় গুমোট হয়ে ওঠে পরিস্থিতি, কারণ চায়ের কাপে তখন শেষ বারের মতোন সে চামচ নাড়িয়ে স্পিশাল মশলা মেশানোর প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছিলো। চামচটা কাপে একবার গোত্তা খেয়ে স্থিত হয় পড়ে। প্রথমবারের মতোন আবারো ভ্রু তুলে সেই অবস্থা থেকেই সে লোকটাকে দেখতে চেষ্টা করে। আসলে চিনতে চেষ্টা করে। পরিচিত স্বরের কথাটা তার মাথায় আবার ফিরে আসে। বিষ খেয়ে আত্মহননের বিষয়টা তার জানা না থাকলে হয়তো সে চীৎকার করে উঠতো। ঘাটের অদূরেই থাকা পুলিশের ছোট টিনের চালের ফাড়িতে ঘুমিয়ে থাকা পুলিশ কনস্টেবলরা হয়তো পোশাক না পরেই দৌড়ে আসতো তাদের অস্ত্র হাতে করে। তাই সে চোখ নামিয়ে চামচ নাড়তে শুরু করে। আর যেনো নিজেকে শোনানোর মতো করে নীচু গলায় বলে,

আইজকা বিহানে বিষ খাইছে...

লোকটা তখন আনমনা হয়ে গেছে। স্পিশাল চায়ের কাপটা বাড়িয়ে দিয়ে নুরু মিয়া হালকা গলা খাকারী দিলে তার সম্বিত ফিরে পায়। সে নদীর দিকে তাকিয়েই হাত বাড়িয়ে কাপটা নিয়ে বলতে শুরু করে।

আগের দিনের মানুষেরা বিষ খাইতো না, তারা গলায় দড়ি দিতো। আমার দাদাজানে মরছিলেন তার নিজের হাতের সবচে পছন্দের আম গাছের ডালে ঝুইলা। লোকে কইতো আসলে সে গলায় দড়ি দেয় নাই। তার পোষা জ্বীন আবরার তারে খেলার সাথী বানাইতে ডাইকা নিয়া গেছে।

খয়েরী দাতগুলো বের করে সে নৈশব্দে হেসে উঠে নুরু মিয়ার দিকে ফিরে তাকায়।

তয় আমার মনে লয় দাদাজান আসলে নিজেই আবরারের লগে থাকতে চাইতো। দুইন্যার মানুষগো আর সে বিশ্বাস করতে পারতো না।

নুরু মিয়ার মনে তখন প্রলয়ঙ্করী ঝড়। সে মনে করতে চেষ্টা করে তাদের গ্রামে এমন কোন দাদাজান কবে গলায় দড়ি দিয়েছিলো। সে বুঝতে পারে এমন দাদাজানের যে কয়টি গল্প তার জানা আছে তার সাথে এই লোকটার কোনো সম্পর্ক নেই।

আপনে দ্যাখছেন দাদার লাশ?

লোকটা এবার চোখ তীক্ষ্ণ করে তাকিয়ে নীচু স্বর অর্থাৎ প্রায় চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,

আমারে কোলে কইরা মা ছুইটা গিয়াও লাশটারে দেখতে পায় নাই। তার আগেই পুলিশ লইয়া গেছিলো। আমার বাবা দেইখা আইসা বোবা হইয়া ছিলেন অনেকদিন। তারেও নাকি আবরার জ্বীনে ধরছিলো...লোকে কইতো।

বলতে বলতেই সে লাশটার দিকে ফিরে তাকায়,

তাজ সায়বের তো জ্বীন আছিলো না, তার সব খেলার সাথী ছিলো মানুষেরাই...

আবারো নীরবতা নেমে আসে। বেশ কিছু ঢেউ আছড়ে পড়ে লোহার জেটিতে। পুলিশটা একবার উঠে দাড়িয়ে আড়মোড়া ভাঙে। তারপর কি মনে করে শুয়ে থাকা কুকুরটাকে বুটের ডগা দিয়ে একটা খোঁচা দেয়। কেউ কেউ করতে করতে সে খানিক দূরে গিয়ে আবারো একই ভঙ্গীমায় শুয়ে পড়ে।

অভিশাপ!

পোস্টটি ১৩ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

নুশেরা's picture


ভাস্করদার লেখার বিষয়বৈচিত্র্য আর স্টাইল নিয়ে নতুন করে প্রশংসা করার কিছু নাই। তারপরও উত্তরোত্তর বিস্মিত হচ্ছি।

বেশ কিছু টাইপো রয়ে গেছে (প্রুফ দেখার আশায় আছি Smile ), আর ষষ্ঠ অনুচ্ছেদে
চামচটা কাপে একবার গোত্তা খেয়ে স্থিতু হয় পড়ে -- এখানে
স্থিত অথবা থিতু হবে সঠিক শব্দ। লেখার ধরণ অনুযায়ী দ্বিতীয়টা মানানসই বলে মনে হয়।

ভাস্কর's picture


স্থিত কইরা দিলাম...এমন সাহিত্যিক প্রুফ রিডার পাওয়া তো ভাগ্যের ব্যাপার...ধন্যবাদ নুশেরা।

নুশেরা's picture


ব্লগার পরিচয়েই আমি স্বচ্ছন্দ, তবু ভাস্করদার কথায় ব্যাপক খুশি Party

ভালো লেখার প্রুফ দেখার সুবিধা আছে। দ্বিতীয়বার পড়ার সুযোগ হয়ে যায়।

মীর's picture


এইটাও পছন্দ হৈসে।

মুক্ত বয়ান's picture


হুট করেই শেষ হয়ে গেল, মনে হয়?

ভাস্কর's picture


@মীর: ধন্যবাদ...

@ মুক্তবয়ান: আমি কেবল গল্প লিখনের চেষ্টায় আছি। অনেক বড় লেখা দিয়া ব্লগ পাঠকগো বিরক্তি উৎপাদান করতে চাই না বইলা ৭০০/৮০০ শব্দের পোস্টেই আগ্রহ পাই...

বাতিঘর's picture


দারুণ!!! গল্পে আগাগোড়া রহস্যময়তাকে শক্ত হাতে ধরে রাখবার ক্ষমতায় মুগ্ধ না হলেই না Smile
.....সংকোচের সাথে একটা কথা বলি ভাইটি? (আমি লেখালেখির তেমন কিছু বুঝিনা। তবে শেখবার আগ্রহ আছে। সে তাগিদেই আপনাদের কাছে বিভিন্ন প্রশ্ন করা, বিরক্ত হবেন না যেনো!) " নুরু মিয়া হেঁটে যায় পুলিশের দিকে। পদশব্দহীনতা দেখে মনে হতে পারে এই মানুষটার যেনো ওজনহীন শরীর।" ......দ্বিতীয় লাইনটা একটু দেখবেন প্লিজ? আমার স্বল্পজ্ঞান বলে 'পদশব্দহীনতা' দেখার বিষয় না, বুঝবার বা অনুভবের ব্যাপার। তাই এখানে 'দেখে' শব্দটা বাদ দিলে হয় না? ভাইটি, বিরক্তির কারণ ঘটালে আন্তরিকভাবেই দুঃখিত থাকলাম।
শুভেচ্ছা নিরন্তর Smile

ভাস্কর's picture


সৌখিনতার সমস্যা এইটাই...মনোযোগ কম থাকে। লিখনের পর আবার চেক কইরা দেখার অভ্যাসটা খুব ভালো না আমার। ঠিক কইরা দিলাম... Smile

বাতিঘর's picture


আপনার বিনয়ে মুগ্ধ না, বরং বাকরুদ্ধ হলেম! মাগ্গো আপনি তো পুরাই ছুপা রোস্তম Crazy
মাত্রই ব্যানারের পোষ্ট ঘুরে এলাম। আপনি বসলুক ভাইয়া.. অধমের সালাম লন Steve ভালো থাকা হোক Smile

১০

হাসান রায়হান's picture


ইনি বস পাবলিক। বহু গুণের আধাঁর।

১১

শাপলা's picture


ভাস্করদা লেখাটা অন্যরকম ভালো লাগলো। কেমন একটা ভিন্নটা আছে লেখাটায়। সাধারণ আটপৌঢ়ে জীবনের গল্প কিন্ত বৈচিত্রে অসাধারণ।

শুভ কামনা রইল।

১২

হাসান রায়হান's picture


গল্প জমে উঠার পথে। লেখা চমৎকার আগাইতাছে

১৩

ভাস্কর's picture


ধন্যবাদ শাপলা আর রায়হান ভাইকে...

১৪

মামুন হক's picture


একটানে দুইটা পর্বই পড়লাম। একেবারে আগাগোড়া জমজমাট লেখা। সেইদিন না কইলেন আপনার লেখা আসতেছে না? সেই জট কী ভাবে ছুটাইলেন? ছুঃ মন্তর বা টোটকা তাবিজ কিছু থাকলে জানাইয়েন বস।

১৫

আবদুর রাজ্জাক শিপন's picture


 

 

একটা বিষয় আমাকে আনন্দিত করছে, ভাস্করদার লেখাতে ফুল ফুটছে নিয়ত, এটা লেখকের জন্য যতোটা আনন্দের, পাঠক হিসাবে আমার জন্যও কম আনন্দের না যে , প্রতিদিন লেখার ফুল আর সৌরভ আমাকে মোহীত করছে !

১৬

জ্যোতি's picture


গল্পটা খুব জমেছে। রহস্য লাগছে। পরের পর্ব আসবে কবে?

১৭

ভাস্কর's picture


ধন্যবাদ মামুন হক, আরাশি আর জয়িতারে।

@জয়িতা: প্রথম পাতায় তিনটা পোস্ট দেখতে খুব জুইতের লাগে না। প্রথম পর্বটা গেলেগা এর পরের পর্ব দিমু...

১৮

রাসেল আশরাফ's picture


ধুর পড়ার আগেই শেষ হয়ে গেল। এরপরের পর্বটা একটু বড় করে দিবেন ভাস্কর দা।

১৯

শওকত মাসুম's picture


আগ্রহ আরো বাড়লো। কোনদিকে যাচ্ছে বুজতে পারতাছি না।

২০

ভাস্কর's picture


@ রাসেল আশরাফ: পরের পর্ব নিয়া আমার ভিন্ন ভাবনা আছে...

@ মাসুম ভাই: যেইদিকে নিতে চাই ঐদিকেই যাউবো মাসুম ভাই...

২১

আরিফ জেবতিক's picture


আপনার বয়ানভঙ্গির বিয়াপক উন্নতি/পরিবর্তন হইছে।

২২

মেসবাহ য়াযাদ's picture


হ, বিয়াপক

২৩

ভাস্কর's picture


পরিবর্তনের বিষয়টা ইন্টেনশনাল...কিন্তু উন্নতির মানদন্ডটা বুঝলাম না।

২৪

তানবীরা's picture


হুট করেই শেষ হয়ে গেল, মনে হয়

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

ভাস্কর's picture

নিজের সম্পর্কে

মনে প্রাণে আমিও হয়েছি ইকারুস, সূর্য তপ্ত দিনে গলে যায় আমার হৃদয়...