একটি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মেইল শভিনিস্ট গল্প...
১৯৭১, ২১ জুন, দিবাগত রাত্র।
কাটা গ্রিলের ফাক দিয়ে ঘরে ঢুকতে গিয়ে ফজলু চোরের মনে পড়ে তার বয়স প্রায় ৪৫ ছাড়িয়েছে। আর সে কারনেই আগের মতোন বাউলি কেটে কোনো রকম শব্দ না করে, গায়ে কোনো আচর না ফেলে ঘরে ঢোকাটা আর সম্ভব হয় না তার পক্ষে। যদিও এসব দক্ষতার কোনো প্রয়োজনই নেই আজকের কাজটা শেষ করার জন্য। সে বেশ ভালোমতোই খবর নিয়েই বেরিয়েছে। গ্রিল না কেটে যদি দরোজার তালা ভেঙেও সে ঢুকতো তাহলেও প্রতিরোধের সম্মুখিন হওয়ার কোনো সম্ভাবনা ছিলো না। কিন্তু পেশাদারী সততা বজায় রাখতেই ফজলু সময়টা বেছে নিয়েছে সেই আগের মতোন মধ্যরাত, দরোজা ভেঙে না ঢুকে জানালার সিঁদ কেটে ঘরে ঢোকার বিষয়টা তার কাছে বেশি পছন্দ হয়েছে।
জানালার ফাক গলে যে ঘরে সে নেমে আসে অন্ধকারে প্রথমে তার কিছুই ঠাহর পায় না সে। আস্তে আস্তে ধাতস্থ হলে বুঝতে পারে এই ঘরটা কোনো মাইয়া মানুষের ঘর। ফজলু ঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না প্রথমে। নারী জাতি বিষয়ে তার চিরকাল কেমন অস্বস্তি কাজ করে। লুকিয়ে স্নানরতা রমনীর উদোম শরীর দেখায় আনন্দ পেলেও প্রকাশ্যে ন্যাংটা মেয়ের নাচন দেখতে তার রুচীতে লাগে। তার মনে হয় ঐটাতে আল্লাহ বেশি গুনাহ দেবে। আর তাই ফজলু এই ঘর থেকে বেরিয়ে অন্য ঘরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। কিন্তু ঘরের আলমারীটা খুলে দেখার লোভটা সামলাতে পারে না।
আলমারীটা খোলার সাথে সাথেই সে সবকিছু দেখতে পাবে না এটা জানে বলে শুরুতে কিছু দেখার চেষ্টাই করে না ফজলু। কিন্তু আলমারীটা খোলার পর তার চোখে আটকায় একটা লাল পাড়ের শাড়িতে। কতটুক মাইয়ার ঘর এইটা! অন্য কয়টা ঝুলে থাকা জামা কাপড় হাতে নিয়ে সে এঘরের বাসিন্দা মেয়েটার বয়স আন্দাজ করতে চেষ্টা করে। তার মনে হয় ১২/১৩ বছরের একটা মেয়ে এই ঘরে থাকে। এই আধুনিক শহরের একটা ছোট্ট কিশোরীর ঘরে লাল পাড়ের সুতির শাড়ি দেখে ফজলু যারপরনাই উৎসাহিত হয়। হাসিনা এইরম একটা শাড়ির বায়না ধরছে বহুদিন। ফজলুর হাতে টাকা আসলেও বাজারে গিয়া উড়ানের সময় তার কখনোই মনে থাকতো না হাসিনার কথা। তাই বলে হাসিনার প্রতি তার ভালোবাসার কমতি ছিলো? কক্ষনোই না! সে হাসিনার লেইগা বহুত করছে। কী না দিছে তারে। এই হাসিনারে খাওয়ানের লেইগাই তো এতো রিস্ক নিয়া সে চুরিতে নামছে। তার বদলে হাসিনা তারে একটা সন্তান পর্যন্ত দিতে পারে নাই। তারপরেও সোহাগের সময় ফজলুর কোনো রকম কার্পন্য ছিলো না। হাসিনারে সে প্রাণ ভইরা আদর করতো।
হাসিনা অন্য কোনো পুরুষের সাথে কথা বললে তার শরীরের রোম দাঁড়িয়ে যেতো। তার মনে হতো হাসিনার হাসির মালিক একমাত্র সে। আর কারো অধিকার নেই সে হাসি দর্শনের। এই অনুভূতিও তো আসলে হাসিনার প্রতি তার ভালোবাসা থেকেই এসেছিলো। আর হাসিনারই বা কিসের প্রয়োজন এতো ঢলাঢলির! ফজলুর কি মুরোদ কম! এতো কিছু করেছে সে একটা ঢ্যামনা মাগীকে খুশি করার জন্য, আরেকটা লাল পাড়ের সাদা শাড়ির দরকারই বা কি তার! নিজের জন্যতো সে কখনো একটা রঙীন শার্টের কথা ভাবে নি!? আর এই মাগী তাকে একটা ছেলে দিতে পারে নি...ফজলুর খুব শখ একটা ছেলে সন্তানের। যেই ছেলে একদিন তাকে আরাম দেবে। ছেলে বৌ তার যত্নআত্তি করবে।
হাসিনা তাকে ছেলে না দিয়ে বরং পালিয়ে গেলো মুজাফফরের সাথে...
লাল শাড়িটা ঝোলায় ভরতে গিয়েও রেখে দ্যায় ফজলু। এই ঘরে থাকাটা নিরাপদ না বলেই মনে হয় তার। ঘরের দরোজায় গিয়ে দাঁড়িয়ে সে একবার পেছন ফিরে দেখে অন্য কিছু নেয়া যায় কি না। এমন সময়েই তার অন্তর পর্যন্ত কেঁপে উঠে বিস্ফোরনে। বাইরে ঠা ঠা ঠা গুলির আওয়াজ। নিস্তব্ধ রাস্তাটায় সাইরেন বাজানো গাড়ি ঢোকে। ঠাক ঠাক বুটে আওয়াজে প্রকম্পিত হয় সিদ্ধেশ্বরীর শান্তিময় গলিটাও।
বানচোত!” ফজলু গালি দ্যায়...কাকে সেটা অবশ্য তার নিজের কাছেও খুবেকটা পরিষ্কার না। হয়তো পাকিস্তানী সেনাবাহিনীদের, যারা তার কাজের মাঝে এসে বাগড়া দিচ্ছে। অথবা মুক্তিযোদ্ধাদের, যারা এই গন্ডগোলের জন্য দায়ী। সে লুঙ্গি তুলে উভয়ের দিকেই তার যন্ত্রটা তাক করে। মুখ দিয়ে কৃত্রিম ঠাঠাঠা আওয়াজ করে, যদিও সাবধানে।
ফজলু বুঝতে পারে এই ঝামেলা না কাটা পর্যন্ত তার এই বাড়ির ভেতর থাকতে হবে। রাতে থাকাটা হয়তো অতোটা সমস্যার না, কিন্তু সকালে কেউ না কেউ লক্ষ্য করবে ঘরের জানালা। দোতলায় থাকা বাড়ির মালিক নিশ্চিত একবার করে চেক করে একতলার অবস্থা। যেইদিন একতলার মানুষেরা বোচকা বুচকি নিয়ে অন্য কোথাও চলে যাচ্ছিলো তখন দোতলার বুড়াটাই বিদায় জানাচ্ছিলো তাদের। সামনের দোকানে বসে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতেই ফজলুর নজরে পড়ে পুরো বিষয়টা। দোকানদার তার পাশের গ্রামের মফিজুদ্দি। যার বাড়িতেই সে উঠেছে থাকার নিমিত্তে। যদিও নিজের প্ল্যানটা সে ভুলেও তার সাথে শেয়ার করে নাই। মফিজুদ্দি অবশ্য তাকে নিয়ে খানিকটা সন্দিহান আছে এখনো। এই গন্ডগোলের সময় সবাই যখন গ্রামের নিরাপত্তা খুঁজতে বেরিয়ে যাচ্ছে, তখন ফজলু ক্যানো ঢাকা শহরে!
ফজলুর পরিকল্পণাটা খুব সাধারণ আর বাস্তবতা সম্পন্ন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরেই সে দেখতে থাকে গ্রামের একদল পুরুষ হঠাৎ বেশ প্রতিবাদী হয়ে উঠে, তারা বেশ গোপনে ফিশফাম করে কথা কয়। আর অন্যদল খান সাহেবের বাড়িতে ভীড় জমায়। এদের গলা ভারী। ভারী গলার তাকদে মূগ্ধ হয়ে বেশ কিছু মানুষ জুটে যায় তাদের পেছনে। ফজলু ঠিক বুঝে উঠতে পারে না শুরুতেই তার কি করণীয়। কিন্তু গ্রামের সাহেবসুবোদদের গ্রামে ফিরে আসার একটা প্রবণতা তার চোখে লাগে। শহরে নাকি যুদ্ধের দামামা টেনশনটা বেশি। এদের বড় একটা অংশ নিরাপত্তার খোঁজে গ্রামে চলে আসতে শুরু করে। এসব দেখে সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে জীবনের শেষ দানটা মারতে তার শহরেই যেতে হবে।
তবে প্রথম কাজটা এতো সহজে জুটে যাবে এমন ভাবে নাই ফজলু। সে দেখতে পায় একটা সংসারের প্রয়োজনীয় প্রায় বেশিরভাগ জিনিসই ফেলে রেখে গিয়েছে এই বাড়ির মানুষ। এতো কিছুতো তার একার পক্ষে বের করে নিয়ে যাওয়াটাও কঠিন। সে বাছতে থাকে কি কি জিনিস সে নিতে পারবে সাথে। টাকা পয়সা তেমন থাকার কথা না। কিন্তু ছোটখাটো গয়নাগাটি মিলতে পারে। কিম্বা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিষপাতি। বাইরে এখনো গুলির শব্দ আছে। ফজলু এই ফাকে একটু শুয়ে নেয় দামী খাটের উপর...





ভাস্করদা, এই গল্পটার সাথে মেইল-শভিনিজমের সম্পর্ক বুঝলাম না। গল্পের শিরোনামটা ব্যাপক পছন্দ হইছে কিন্তু কাহিনীর সাথে সম্পর্ক বুঝিনি। এই নাদানকে একটু হেল্প করবেন?
মন্তব্য করুন