ইউজার লগইন

ডঃ স্ট্রেঞ্জলাভ একটি যুদ্ধবাজী বিরোধী সিনেমা।

স্ট্যানলি কুবরিক তখন মার্কিনী চলচ্চিত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে শুরু করেছেন। তার সিনেমাটিক পরিভাষা তৎকালীন আমেরিকান গড়পড়তা ছবির বাইরে দর্শকদের নতুন করে ভাবনার উদ্রেক করছিলো। কেবল তার সিনেমার কাহিনী চিত্রনাট্য নয় প্রযুক্তির ব্যবহারেও তিনি অনেক এক্সপেরিমেন্টের মধ্যদিয়ে গিয়েছেন তার প্রারম্ভিক সময়ে। কিন্তু ৫০ দশকের সময় থেকেই কুবরিক তার সিনেমায় যুদ্ধবিরোধী বক্তব্য এবং প্রযুক্তির ব্যবহারে পরিমিতি নিয়ে আসতে শুরু করেন। ডঃ স্টেঞ্জলাভ চলচ্চিত্রটি তার এই ধারার চলচ্চিত্রেরই একটি পরিপূর্ণ রূপ। যেই ছবিতে তিনি যুদ্ধের ভয়াবহতা, টেনশন, রাজনৈতিক কূটকৌশল আর সর্বোপরি ব্ল্যাক কমেডি’র প্রকাশ দেখান। যদিও ছবিটিকে চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ছবির কাতারে ফেলা হয় তার বক্তব্যধর্মীতার কারণে, কিন্তু এই সিনেমায় তিনি যুদ্ধবাজদের যেই কৌতুকপূর্ণ চারিত্রিক নমূনা দেখিয়েছেন তার উল্লেখই সমালোচকদের লেখালেখিতে বেশী প্রতিভাত হয়।

ঠিক স্নায়ুযুদ্ধ শুরু হওয়ার সময়কালে তৈরী হওয়া ছবিতে মূলতঃ সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি গোপন বেইজে মার্কিনীদের বোমা হামলার পরিকল্পণা আর তার প্রয়োগের কাহিনী বিবৃত হয়েছে। একটা অমর্থিত সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য থেকে মার্কিন সামরিক নেতা জ্যাক দ্য রিপার সিদ্ধান্ত নেন সোভিয়েত একটি গোপন গবেষণাগার নিউক্লিয়ার বোমা মেরে উড়িয়ে দেবার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি যখন সিদ্ধান্ত প্রদান করছেন টেলিযোগাযোগে তখন দেখানো হয় আমেরিকান অফিসাররা মৌজ মাস্তিতে ব্যস্ত। ব্রিগেডিয়ার রিপারের প্রতিনিধি বাক টারগিডসন তখন কেবল তার প্রেমিকার সাথে সম্ভোগ শেষে আয়েশ করছে। খুবই সাধারণ দৃশ্য পরিকল্পণার মাধ্যমে কুবরিক দেখান যুদ্ধবাজ সামরিক নেতাদের স্থূল মানসিকতাকে। কুবরিকের সিনেমার এই বৈশিষ্ট্য আমরা পরবর্তীতেও অনেক সিনেমাতেই দেখতে পাই।

যদিও রিপারের এই সিদ্ধান্তের সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নিজেও। পেন্টাগনের একটি বিশেষ ওয়ার রুমে পুরোমন্ত্রীসভা এবং জেনারেল বাক ব্রিগেডিয়ার রিপারের প্রতিনিধি হিসাবে উপস্থিত হয়ে যান কিছুক্ষণের মধ্যেই। তাদের আলোচনার উদ্বিগ্নতা দেখানোর পাশাপাশি দেখানো শুরু হয় আক্রমণের প্রস্তুতি। সেই সময়কার আধুনিক বোমারু বিমান বি ৫২ যাত্রা শুরু করে সাইবেরিয়াতে অবস্থিত কথিত সোভিয়েত গবেষণাস্থলে। প্রস্তুতির সময়কালটাতে দেখানো হয় সামরিক সদস্যরা কিভাবে রুটিনবদ্ধ জীবন যাপন করে। তাদের এতো ট্রেনিঙের পরেও তারা গাইড বই খুলে একের পর এক যন্ত্র চালু করতে থাকে। এই সময়টাতে কুবরিকের রসবোধ প্রখর হয়ে উঠে প্রত্যেকটি দৃশ্যায়ণে।

একেবারেই প্যারালালভাবে দেখানো হয় প্রেসিডেন্টের বিশেষ সভার বৈঠকটিকে। যেখানে প্রেসিডেন্ট নিজ উদ্যোগে ডেকে নিয়ে আসেন সোভিয়েত রাষ্ট্রদূতকে। বিশেষ সভায় একজন কম্যুনিস্ট শত্রুকে ডেকে আনাতে জেনারেল বাকের চ্যাপলিনসূলভ আচরণ মনে করিয়ে দেয় বিখ্যাত ছবি চ্যাপলিনের the dictatorএর  কথা। রাষ্ট্রদূতকে ফোন করতে বলা হয় তৎকালীন সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি কিসভকে...তিনি যাতে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন মার্কিন বোমারু বিমানগুলিকে তাৎক্ষণিক ভাবে ভূপাতিত করবার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। ব্রিগেডিয়ার রিপারের সিদ্ধান্তটিকে প্রেসিডেন্ট সমর্থন করছেন না বলে প্রমাণ করার একটা চেষ্টা থাকে পুরো সময়টাতেই। কিন্তু ঠিক সেই মুহুর্তে পৃথিবীর অপরপ্রান্তে কিসভ ছিলেন মাতাল অবস্থায়, তিনি মার্কিনীদের পাল্টা হুমকী দেন যে এই গবেষণাগার আসলে একটি ভিন্ন প্রজেক্ট। যার উপরে আক্রমণ হলে সারা পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে তৎক্ষনাত। ধীরে ধীরে পুরো সভায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়তে থাকে।

এদিকে বোমারু বিমানগুলিও নিজের কায়দায় প্রস্তুতিতে থাকে। তারা প্রায় সাইবেরিয়ার কাছাকাছি পৌছে যায়। কিন্তু একটা পর্যায়ে গিয়ে দেখা যায় নিউক্লিয়ার বোমা ফেলবার সুইচটি কাজ করছে না। পুরো বিমানের ইলেকট্রনিক সিস্টেমেই কোন একটা বিপর্যয় দেখা দেয়। এমন একটা সময়েই পেন্টাগনের ওয়ার রুমে প্রথম ডঃ স্ট্রেঞ্জলাভকে দেখা যায়। প্রেসিডেন্ট নিজে তাকে আলোচনার জন্য ডাকেন। এতোক্ষণ আড়ালে থাকা স্ট্রেঞ্জলাভ, একজন প্রাক্তন নাৎসী সদস্য, যিনি নিজপায়ে চলতে পারেন না। হুইল চেয়ারে করে তিনি সভার সমূখভাগে এসে উপস্থিত হন। তার ডান হাত ছাড়া শরীরের বাকী অংশ প্যারালাইজ্ড। তিনি এসে জানান যে এই ডিভাইসের কথা আগের থেকেই তিনি জানতেন। এই ডিভাইস কেবল পৃথিবীকে ধ্বংস করবার সম্ভাবনাই রাখে না বরং এই ডিভাইস অকেজো করতে গেলেও পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। বক্তব্যের শেষে তিনি ভুল করে প্রেসিডেন্টকে ফুয়েরার হিসাবে সম্বোধন করে বসেন। কুবরিকের যুদ্ধবিরোধী ব্যঙ্গাত্মক উপস্থাপণার এইরম দৃষ্টান্ত সিনেমাতে অবশ্য পরবর্তীতেও দেখতে পাই।

বোমারু বিমানগুলিকে ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করে সোভিয়েত বাহিনী। একটি মিসাইল মূল নেতৃত্বদানকারী বিমানে আঘাত করে ইতোমধ্যে। যে কারণে নিউক্লিয়ার বোমাটি সঠিক জায়গায় ফেলবার বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। হাস্যকরভাবে হলেও কুবরিক দেখান পাইলট নিজে বোমাটিকে সঠিক পথে নেয়ার জন্য উঠে গিয়ে বোমার পিঠে উঠে বসে আর বিভিন্ন ইলেকট্রনিক তার খালি হাতে মেরামত করতে থাকে। এর মধ্যেই বাকী দুটি বিমান সোভিয়েত মিসাইল আক্রমণে ধ্বংস হয়ে যায়। নেতুত্বদানকারী বিমানটি তার লক্ষ্যবস্তুর পথ হারিয়ে ফেলে এলোমেলো উড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত বোমাটিকে নিক্ষেপের উপযোগী করে তুলতে পারেন পাইলট এবং কমান্ডার টিজে কিংকং। কিন্তু বোমার সাথে সে নিজেও পড়ে যায়। সাইবেরিয়ার কোন এক অজানা জায়গায়। ইতোমধ্যে প্রেসিডেন্টের নির্দেশে গ্রেফতার শুরু হয় ধ্বংসকারী পরিকল্পকদের। ব্রিগেডিয়ার জ্যাক দ্য রিপার আত্মহত্যা করেন।

পেন্টাগনে তখন ডঃ স্ট্রেঞ্জলাভ তখন ডুমস ডে ডিভাইসের বিপরীতে নিরাপত্তা পরিকল্পণা দিতে শুরু করেছেন। তিনি একটি বিশেষ বাংকারের ব্যবস্থা করতে প্রস্তাব করেন, যেখানে রেডিও অ্যাক্টিভ কোন শক্তি প্রবেশ করতে পারবে না। যেখানে নির্বাচিত পুরুষদেরকেই কেবল নিয়ে যাওয়া হবে। প্রত্যেক পুরুষের জন্য যৌনাবেদনময়ী দশজন করে সুশ্রী রমণী রাখতে হবে। যারা পরবর্তীতে জন্ম দিবে একটি নতুন বৃদ্ধিবৃত্তিক জাতির। যারা এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জাতি হয়ে আবারো পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করবে তাদের কৌশল আর চাতুর্য্য দিয়ে। বক্তব্য শেষে বিকলাঙ্গ ডঃ স্ট্রেঞ্জলাভ তার হুইল চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়েন অবিশ্বাস্যভাবেই , এবং চীৎকার করে ওঠেন, “মিঃ ফুয়েরার! আমি হাটতে পারছি।“

পুরো সিনেমাটিতেই কুবরিক স্নায়ুযুদ্ধকালীন রাজনৈতিক বিরোধকে ব্যঙ্গ করেছেন পদে পদে। তিনি মার্কিনী পুঁজিবাদী ভোগবিলাসের বিপরীতে সোভিয়েত অপরিনামদর্শী নেতৃত্বকেও কটাক্ষ করেছেন প্রত্যেক সংলাপে, আচরণে এবং প্রায়োগিকতায়। কুবরিকের যুদ্ধাবাজীর বিরোধী পরবর্তী ছবিগুলিতেও আমরা এই ডঃ স্ট্রেঞ্জলাভের অনেক ইমেজের অনুবাদ দেখতে পাই। রঙীন চলচ্চিত্রের এই সময়েও সাদা-কালোয় নির্মিত এই সিনেমাটি দর্শকদের অবশ্যই মুগ্ধ করবে।

এই সিনেমার একটি আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় না বললে আসলে আলোচনা অসমাপ্ত থেকে যাবে। ষাটের দশকের খ্যাতনামা অভিনেতা পিটার সেলার একসাথে চারটি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন প্রযোজকদের অনুরোধে। পাইলট কমান্ডার চরিত্রেও তার অভিনয় করার কথা ছিলো, কিন্তু শারিরীক অসুস্থতার অযুহাতে তিনি সেই চরিত্রে অভিনয় করেন নি।তার বদলে নেয়া হয় সে সময়কার অখ্যাত মূলতঃ স্প্যাগেটি ওয়েস্টার্ন ঘরানার ছবিতে অভিনয় করা স্লিম পিকেন্সকে। যিনি পুরো ছবিতে একজন মেজর কমান্ডার পাইলট হলেও সামরিক হেলমেট না পড়ে একটি কাউবয় হ্যাট পরেছিলেন।

পোস্টটি ১২ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

অরিত্র's picture


চমৎকার লাগলো। চোখের সামনে সিনেমাটা চলে এলো। এটাই লেখকের স্বার্থকতা।

ধন্যবাদ লেখককে

নজরুল ইসলাম's picture


খুবই ভালো লাগলো আলোচনাটা। ছবিটা দেখা হয় নাই। দেখার আগ্রহ তীব্র হইলো। অচিরেই দেখে ফেলার আশা রাখি। আজকেই ডাউনলোডে বসাইতেছি।

লোকেন বোস's picture


আগ্রহ জাগানিয়া পোস্টটির জন্য অনেক ধন্যবাদ। ছবিটি দেখার অপেক্ষায় রইলাম। এরকম আরো ছবি নিয়ে আলোচনার অনুরোধ জানাই।

তানবীরা's picture


এইটাই জীবন। মার্কিন মুল্লুকের লুক যুদ্ধের বিরুদ্ধে সিনেমা বানাইবে। সাপ হইয়া কামড়াবে আবার ওঝা হইয়া ঝাড়িবে

ভাস্কর's picture


মার্কিন মুল্লুকের অনেক লোকই কিন্তু আছে যারা মার্কিনীগো বিরুদ্ধে কথা কয়...তয় তাগো সংখ্যা এখনো কম বইলা মার্কিনী শাসকেরা তাগো পাত্তা দেয় না বেশী। এইরম প্রতিরোধের সংখ্যা বাড়লে আর এককাট্টা হইলে কি  হয় তার নিদর্শনও তো মার্কিনীরা দেখাইছে সিয়াটলে...

অদিতি's picture


তানবীরা আপার কমেন্টে জাঝা...

কাঁকন's picture


যুদ্ধের ছবি দেখতে ভালো লাগেনা তবে লিখা পড়ে এই ছবিটা দেখতে ইচ্ছে করছে

নড়বড়ে's picture


দারুণ! ছবিটা দেখি নাই ... আজকেই নামাইতে হবে।

নুশেরা's picture


ডঃ স্ট্রেঞ্জলাভের কোটেশন পড়েছি অনেক জায়গায়, এই তাহলে কাহিনী। চমৎকার আলোচনার জন্য অভিবাদন, ভাস্করদা।

১০

শওকত মাসুম's picture


কুবরিক বস।

এই  সিনেমায় পিটার সেলার্সরে দেইখাও মুগ্ধ হইছিলাম।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

ভাস্কর's picture

নিজের সম্পর্কে

মনে প্রাণে আমিও হয়েছি ইকারুস, সূর্য তপ্ত দিনে গলে যায় আমার হৃদয়...