ঢাকাবাসী-আদিবাসী-অভিবাসী আর বীনবাঁশির তত্ত্ব: যেদিক চাইবেন তিনি, বিভ্রান্ত ইদুরের দল সেদিকেই ঝাপ দিবে
মাঝে মাঝে এক অযৌক্তিক অহম তৈরী হয়, এই শহরটারে মনে হয় একেবারে নিজের আর যারা অভিবাসী হইছে বিবিধ কারনে তাদের অসহনীয় লাগতে থাকে। মনে হয় এই শহরের শরীরে তারা আছে জীবানুর মতো, অনাহুত, দখলদারী মনোবৃত্তিতে। আমার মনে হইতে থাকে এই শহরটারে ভালোবাইসা জীবনের ৪০টা শরীরি বছর কাটাইয়া দিছি, তারো আগে আরো এক-দেড়শ বছর জেনেটিক্যালি এই শহরেই ছিলাম আমি। এই রকম মনে হওয়াতে অপরাধবোধ তৈরী হওয়াটাই স্বাভাবিক ছিলো, একবিংশ শতকের উত্তরাধুনিক দুনিয়ায় একটা শহর নিয়া এমন জাত্যাভিমান বেশ বিব্রতকর। অথচ জানি গতো শতকের শেষভাগেও পৃথিবীর বেশ কিছু দেশে অভিবাসীরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হইছে। ফিজি, সিঙ্গাপুর, পাপুয়া নিউ গিনি...
অভিবাসীদের অর্জিত এই ক্ষমতা জাতিসংঘ গঠিত হইবার পরের ইন্সট্যান্স, তার আগেই উপনিবেশের মধ্য দিয়া আরো অনেক দেশই দখলদারদের দ্বারা পরিচালিত হইতে শুরু করছে; আদিবাসীরা বরং বঞ্চিত রইছে এইসব দখলদারদের সাথে তাল মিলাইয়া জীবন যাপনের পরিবর্তন না আনতে পারায়। বতর্মান বিশ্বের সবচাইতে ক্ষমতাধর রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে শিল্প-সাহিত্য কিম্বা সাংবাদিকতায় আদিবাসীদের উপস্থিতি বেশ উল্লেখযোগ্য হইলেও এতোদিনের এই গণতন্ত্রের ধ্বজাধারী বা সোওল ডিস্ট্রিবিউটরের দেশে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের হায়ারার্কিতে মাত্র দুইজনের নাম পাওয়া যায়। আরো উল্লেখ্য দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালে একজন আফ্রিকান আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হইলেও আদিবাসী অরিজিনের মাত্র একজনের ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হাওয়ার নজীর পাওয়া যায়। চার্লস কার্টিস নামের এই ভদ্রলোক ১৯৩১'এ ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে আর কোনো আদিবাসী জাতিসত্ত্বার প্রতিনিধি কখনো কোনো মন্ত্রীসভায়ও মনোনীত হয় নাই।
আদিবাসীদের এমন পরিনতি চলতেছে বহুকাল ধইরাই। শিল্প বিপ্লবের পথ ধইরা দস্যূতা ছাইড়া সভ্যতারে আলিঙ্গনের মধ্য দিয়া অভিবাসিত হইছে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের লাখে লাখে মানুষ। তাদের বিজ্ঞানমনষ্ক দস্যুতার সামনে টিকা থাকতে পারে নাই নিরীহ বেদুঈন ঘরানার কিম্বা প্রকৃতি পুজারী আদিবাসীরা। আদিবাসীদের সরলতা ছিলো, সমর্পন ছিলো নিজের ভূখণ্ডে আর অভিবাসীরা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী কৌশল গ্রহণ কইরা কন্সপিরেসী খেলছে চিরকাল। আদিবাসীদের প্রকৃতির প্রতি সমর্পনের সরলতা নিয়া অভিবাসীরা সবসময় কূটকৌশলে যায়। এতোগুলি অতীত কালগত বাক্যের পরেও এমন বর্তমান কালীন বাক্য লিখি কারণ বিদ্যমান বৈশ্বিক সংকটেও আদিবাসীরা ব্যবহৃত হইতেছে সমানে। আফঘানিস্তান, পাকিস্তান কিম্বা ইয়েমেনে তালেবানি কন্সপিরেসীতে আদিবাসীরাই ব্যবহৃত হইতেছে তাদের সরলতার সুযোগে।
বর্তমান বিশ্বে আদিবাসী আইন প্রণয়ন আর বাস্তবায়নে অভিবাসী সরকারগুলি বেশ গুরুত্ব দিতেছে। আদিবাসী জনগোষ্ঠী যেহেতু উন্নয়ণের সাথে তাল মিলাইয়া চলতে পারে নাই পুঁজির সাথে সম্পর্কহীনতার কারনে, সেহেতু তাদের এখন প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বইলা সম্বোধন করা হয়। তাদের এই প্রান্তিকতা এখন অনেকের আন্দোলন আবার একইসাথে অনেকের ব্যবসা-বাণিজ্য। প্রান্তিকতার কারনে আদিবাসীরা রাষ্ট্রের অনেক সুযোগ সুবিধার দাবীদার হইয়া উঠে, বাড়তি মনোযোগের দাবী রাখে। এই মনোযোগে অনাগ্রহী বাংলাদেশ সরকারের ইন্টেলেকচ্যুয়াল মন্ত্রীরা উঠতে বসতে এই ভূখণ্ডে কোনো আদিবাসী নাই এই প্রামাণ্যে সকল মনোযোগ দিয়া বইসা আছে। তবে বাংলাদেশের এই অনাগ্রহ একেবারেই স্বউৎসারিত কোনো ফেনোমেনন নয়, পুরা ভারত উপমহাদেশেই এই মনোবৃত্তি কাজ করছে। ভারত-পাকিস্তান-শ্রীলংকাতেও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বিষয়ে সরাসরি নেতিবাচক মনোভাব কাজ করে। এই অঞ্চলে আদিবাসীরা তাই উপজাতি হিসাবে স্বীকৃত হয়। মূল জাতের অধস্তনঃ হিসাবেই তারা বেড়ে উঠে বঞ্চনার অনুভূতি পাইতে পাইতে।
আদিবাসী-অভিবাসী প্যাচালে এতোকথার মানে এই না যে আমি নিজের ঢাকাবাসীত্ব কেন্দ্রীক রেইসিস্ট অ্যাটিচিউডটারে জায়েজ করতে চাইতেছি; অথবা ঢাকাবাসীত্বের অধিকার নিয়া কোনো বাড়তি মনোযোগ দাবী করতেছি। বরং উল্টাটা বুঝাইতে চাই। এই যে আদিবাসীত্ব নিয়া এতো আগ্রহ সারাবিশ্বে এর মূল কারণ মানবাধিকারে সকল জাতিগোষ্ঠীর সমান মর্যাদা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীরে বাড়তি মনোযোগ দিয়া তারে আগাইয়া থাকা জাতিগোষ্ঠীর সমান্তরালে নিয়া আসার এজেন্ডাতেই আদিবাসী আইন বা অন্য আচরণসমূহ নির্ধারিত হয়। আর সর্বোপরি রাষ্ট্রের প্রত্যেক প্রান্তে উন্নয়ণ ভাবনার বিস্তার এর আল্টিমেইট উদ্দেশ্য-লক্ষ্য।
আর এই চিন্তার প্রতিফলনেই একজন ঢাকাবাসী হিসাবে আমি বিবেচনা করি এই শহরে আসা অভিবাসীদের মানসিক অবস্থারে। সমাগত ঈদে লঞ্চ-বাস-ট্রেইনের টিকেট নিয়া হুড়াহুড়িতে আমি কোনোরকমের অভিজ্ঞতা ছাড়াই বুঝতে পারি এই শহরে থিতু হওয়া অভিবাসী মানুষেরা আসলে তাদের গ্রামের বাড়ি, তাদের শৈশব স্মৃতিরে অধিক গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। উৎসবে-পার্বণে তাই শহরের নিয়মিত অবস্থিতি ত্যাগ কইরা গ্রামের বাড়িতে ফিরা যাওয়াই তাদের ব্রত হইয়া উঠে। এই আবেগ বিবেচনায় তাদের অভিবাসনের হেতু তাইলে কী?
দেশের তাবৎ সরকারী আর বেসরকারী কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হইয়া উঠছে ঢাকা শহর, আর কোনোখানে গেলে নিশ্চিত জীবনের প্রতিশ্রুতি নাই। এইরকম একটা প্রতিপাদ্য তৈরী হইছে ক্ষমতাসীনদের চিন্তার দারিদ্রের কারনে। আর এই প্রতিপাদ্য মাত্র ৪০ বছরেই মীথ তৈরী করতে সক্ষম হইছে ঢাকার আকাশে টাকার ওড়াউড়ি চলে, বুদ্ধি আর ভাগ্যের সংমিশ্রন হইলে এই টাকা পকেটস্থকরন সময়ের ব্যাপার মাত্র। একসময় দেশের সার্বিক উন্নয়ণের ম্যাপ বিবেচনায় এই মীথ তৈরী হওয়াটাই যেনো স্বাভাবিক ছিলো। কিন্তু স্বাধীনতার পর ৪০ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও এই মীথ ভাঙে না, বরং একটা মীথ কিভাবে বাস্তব হইয়া উঠে তার প্রমাণ রাখতেই ঢাকা আরো গুরুত্বপূর্ণ শহর হয়।
আমি জানি না, একজন ঢাকাবাসী হিসাবে ঢাকা বিষয়ক আমার যেই আবেগ তৈরী হয়, তার নিরীখে একজন অভিবাসীর আবেগের মাত্রা কতোটা কাছাকাছি কিম্বা দূরবর্তী। তবে ঈদ আসলেই মানুষের ঘরে ফেরার তাগীদ দেখতে দেখতে আমার মনে প্রশ্ন জাগে; এই শহর এক আশ্চর্য্য ফেনোমেনন, একজন মানুষের ভালোবাসার এবং অভালোবাসার মাঝামাঝি কোনো একপ্রকারের অবলম্বন হইয়া উঠায় আসলে কি বুঝায় তবে!? যার বরাতে আমার মতোন সাতে পাঁচে না থাকা মানুষেরও ঢাকাবাসীত্বের গোষ্ঠীতান্ত্রিক অনুভূতি চাগার দেয়! আমি নিজের শহরের প্রতি পূর্ণ ভালোবাসাটা মাপতে আগ্রহী হইয়া পড়ি...এ যেনো ঢাকা নগরীর এক বাঁশিওয়ালা, যার বাঁশির সুরে দেশের সকল ইঁদুরও আজ ঢাকামুখী...
যদিও রেইসিস্ট, যদিও অযৌক্তিক অহমের প্রকাশ আছে এই ভাবনায়, তবুও কেনো জানি হৃদয়ের টান বিষয়ক প্রতিযোগিতারে আমার একেবারে নেতিবাচক লাগে না...





মাত্র আড়াই বছর হলো ঢাকায় আছি, এই শহরটাকে ভালোবাসতে বোধহয় পারিনি, তবে প্রতিদিনের চেষ্টায় অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছি। ফেনী আমার জন্মভূমি, ফেনীর জন্য দুর্মর এক টান অনুভব করি, গর্ব করি কিন্তু আজকাল বাস করার কথা ভাবলে মনে হয় ঢাকাই পারফেক্ট। মাঝে মাঝে মনে হয়, ঢাকার সাথে আমার একধরনের লাভ-হেইট সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।
এই ভালোবাসাময় ঘৃণারেই আমার ভালোবাসা আর অভালোবাসা'র মাঝামাঝি কোনো একটা অবলম্বন মনে হয়...
যাদের লনচে করে কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই, তাদের এই শহর চুষে খায়
(
আমার তো ফাকা ফাকা শহরটারে অনেক ভালো লাগে, আমি নিজেই তখন শহরটারে চষি...(নাকি চুষি?)
ঢাকা যখন ফাঁকা
তখন মনে হয় স্বপনে আছি।
কোথাও যাওয়ার নাই
মন্তব্য করুন