দেখলাম ২০১২ নামলেন আমাদের শ্যামলীতে
শ্যামলী এলাকার যেই প্রান্তে থাকতেছি সেইখানে হৈ-হল্লা চলতেছে। মহল্লার ছেলেরা রাস্তায় মরিচ বাতিতে আগুন দিয়া ছোটাছুটি করতেছে, বেশ শবেবরাত-শবেবরাত আমেজ। তাদের সাথে এলাকার রিকসাওয়ালা-দিনমজুর শ্রেণীর সমবয়সী কিছু তরুণও হাততালি ফাইফরমাসে ব্যস্ত। অ্যালকোহলের শ্লথ ভাবটা টের পাওয়া যায় ছেলেদের দৌড়াদৌড়িতে। বেশ ট্রান্সকালচারাল ব্যাপার-স্যাপার। বারান্দায় দাঁড়াইয়া মানুষের ভেতরকার প্রাণের ছটা দেখি। দূরে অন্য কোনো উৎসবে বাজী ফুটলো বেশ কয়েকটা। পথের জমায়েত বাড়তেছে ধীরে ধীরে। যদিও কোনো নারীর উপস্থিতি নাই সেইখানে। তারা আছে জানালায় আর বারান্দার গ্রীলে। মানুষের উত্তেজনায় ঈর্ষান্বিত হইয়া ঘরে ঢুকি। ধারাবিবরণী লিখতে লিখতে খেয়াল হয় শব্দহীন হইছে চারপাশ। বুঝতে পারি সবার চোখ আর মনযোগ ঘড়ির কাঁটার সাথে টিক টিক। ডিজিটাল ঘড়িতে যেনো বোধি আছে। শব্দহীনতার শব্দ টের পাওয়া যায়।
বারটা বাজলো। ঘড়ির দিকে না তাকাইয়াই বুঝতে পারি। গুম গুম শব্দে চারদিকে বর্ষবরণ হইতেছে। আগুনের সাথে শব্দের সমন্বয়ে মানুষের আবেগ প্রকাশিত হয়। বোমাবাজীর শব্দে মনে হয় বেশ বারুদে ঠাসা আছে আয়োজন। অ্যালকোহল আর বারুদে নতুন বছর বিস্ফোরিত গড়ায় আমাদের শ্যামলীতে। বেশ পুরুষালি আয়োজন। নতুন বছর আসলে বেনিয়াদের প্রয়োজন। হিসাবের খাতা সব হালনাগাদ হয়। পুঁজির সাথে পুরুষের কেবল অনুপ্রাসিক সম্পর্ক না, টের পাই সভ্যতায় ব্যবসা আর পুরুষের খবরদারী একই সাথে জোরদার হয়।
বিদেশী ছায়াছবিতেও বোমটোম ফুটে। তবে পাশ্চাত্যে চুমু খাওয়ার রীতিটারে প্রায় সমস্ত রিলিজিয়াস-রিচ্যুয়াল ভঙ্গীতে এক কইরা দেওয়া হইছে। নতুন বছরে দীর্ঘ চুম্বনের রীতি বিদেশী আকাশে। আর আমাদের আকাশে বোমাবাজীর পর পুলিশী গাড়ির সাইরেন বাজে। বিস্ফোরনের শব্দে মনে হয় শ্যামলীর সমস্ত শিশুরা কান্নাকাটি শুরু করে। সে এক প্রলংকরী শব্দের খেলা চলতেছে এখন। প্রায় পনর মিনিট নিস্তব্ধতার পর এইরকম আওয়াজী উদযাপনে খানিক ক্য্ওজ শুরু হয়। বুনো বুনো ভাবটা টের পাওয়া যায়। বুনো ভাবে লুকোছাপা থাকে না। পুলিশের ভয়ে মানুষজন মধ্যবিত্ত হইতেছিলো দেখছিলাম সন্ধ্যায়। এই মধ্যরাতে অ্যালকোহলে আর আগুনে মুখোশ ছিটকে পড়ে, পুড়ে যায়।
বারান্দার গ্রীল হয়ে আমি অবশ্য ভীষণ রকম মধ্যবিত্ত। সিগারেটে আগুন দিলে আবর্জনা পুড়ে না। সিগারেট আর বাজীর আগুন সমন্বিত বেজে উঠলে বুঝতে পারি পুরুষ আর পৌরুষের পার্থক্য।





এই লেখাটা এই বছরের প্রথম লেখা আমাদের ব্লগে। অসাধারণ এবং এটার মতো অসাধারণ লেখা এক বছরে আর নাও আসতে পারে। অবশ্য চাইবো, আসুক। কিন্তু এই বেঞ্চমার্ক টপকানো সহজ হবে না।
দিই, তা এই লেখার জন্য যথেষ্ট না।
ভাস্করদা'কে যত ধন্যবাদই
মুগ্ধ হলাম লেখাটা পড়ে।
বাসা বদল হয়ে গেলো? নতুন বাসায় নতুন বছর?
ঠিক বাসা বদল না। আমি উদ্বাস্তু হিসাবে মা-বাপের বাসায় উঠলাম...
আপনার অনেক লেখায় পুরুষালি আচরণ নিয়ে আলাদা করে বলা থাকে, এইটা যে নিয়মের বাইরের একধরণের আচরণ তার ইঙ্গিত একজন পুরুষ করছে... পুরুষ হয়ে পুরুষালি আচরণ নিয়ে উপমা টানার আপনার এই অভ্যেসটা কী ভাস্করদা ইচ্ছে করেই করেন? না ভেতর থেকে এসে যায়?
লেখাটা আমারও খুব ভালো লেগেছে। মধ্যবিত্ত মানসিকতার জন্যই মনে হয়, বাতি, শব্দবহুল কোনো আয়োজনকেই আমার নিজের লাগে না, মনে হয় আমি এখানে অনাহুত।
এই ধরনের ফিজিক্যাল প্রকাশ, যাতে খানিকটা ভায়োলেন্স-খানিকটা ঔদ্ধত্য-খানিকটা স্পর্ধা'র মতোন যেইসব আচরণগুলি জড়াইয়া থাকে তারে তো আমার পুরুষালি'ই লাগে। পুরুষ অস্তিত্বটা এইখানে কেবল একটা সেক্সুয়াল অ্যাটিচিউড না, তার নিয়ন্ত্রণকামী আর আধিপত্য চাপানের বৈশিষ্ঠ্যরে ইঙ্গিত করে অনেক বেশি। আর এই আচরণ নিয়মের বাইরে থাকা কোনো আচরণ নয়, উপরন্তু এখনতো এইটাই নিয়ম।
এই সোসাইটির একজন পুরুষ হিসাবে হয়তো আমার অভ্যাসে-প্রকাশেও পুরুষালী অনেক কিছু আছে, তবে ধরতে পারলে তার আধিপত্যকামী বাড়াবাড়িটারে ছাটতেই চেষ্টা করি। আর আমি একা না...আমার অনেক পরিচিত বন্ধু-বান্ধবেরই এই তাগীদ আছে।
খানিকটা ভায়োলেন্স-খানিকটা ঔদ্ধত্য-খানিকটা স্পর্ধা'র মতোন যেইসব আচরণগুলি জড়াইয়া থাকে তারে তো আমার পুরুষালি'ই লাগে। আমি এইটারেই নিয়মের বাইরে আচরণ বলছি। শাব্দিক আর আচরণের মানবিক ব্যাখ্যার দিক থেকে তো এগুলো অনিয়ম হওয়ার কথা ছিলো কিন্তু এইটাই নিয়ম হয়ে গেলো!
সচেতন হয়ে আধিপত্যকামী বাড়াবাড়িটারে ছাটতে চেষ্টা করারে সাধুবাদ জানাই। এই চোখটা বেশী সংখ্যক পুরুষ আত্মীয়-বন্ধুদের মধ্যে দেখতে পারলে ভালো লাগতো, তাহলে পদে পদে অন্যায়ের শিকার হয়েও মনে একটু শান্তি পেতাম যে, যুগ পালটে যাচ্ছে। আমাদের মধ্যে অনেকেই ক্রমশ আধুনিক আর সভ্য হয়ে উঠছি।
দিনশেষে আমি প্রবলভাবেই মধ্যবিত্ত, যেইটারে এখনো এড়াইতে পারি না...
শ্যামলী দেখি এবি'র লুকজনে ভর্তি হয়ে গেছে!!
আমি শ্যামলী'র স্থায়ী বাসিন্দা মানে ঠিক এইখানেই থাকুম এমন ঠিক করি নাই। এই মুহুর্তে বাপ-মায়ের বাসায় থাকতেছি কিছুদিন।
অসাধারণ লেখা!
পড়া আর মন্তব্যের জন্য সকলরে ধন্যবাদ।
নতুন বছরে কি হয়? একটা সংখ্যার পরিবর্তন ছাড়া জীবনে আর কি পরিবর্তন আসে জানি না। মানুষ কেনো এতো বেহুশের মতো করে?
নতুন বছরে বাজেট হয়। বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ'এর নতুন প্রেসক্রিপশন আসে।
দারুণ
মন্তব্য করুন