কাকা, ঢাকা কতোদূর?
এক.
কিছু পেপারওয়ার্ক করতেছিলাম একটা প্রোডাকশনের জন্য, ডেডলাইনের খাড়া ঝুলতেছিলো গলা বরাবর, তাই একই সাথে ব্রেইনস্টর্মিং আর লেখালেখি। সেই মগজ ঝড়ের তাণ্ডবে মাঝপথে আসা একজন গেস্ট রীতিমতো পলাইলো। কিন্তু কাজের এই প্রসেসের জন্য ঝামেলা হইলো যে আমরা সামাজিক রীতিনীতি, মানবিক চাহিদা আর শারীরিক প্রয়োজনের কথা বেমালুম ভুললাম। সেই সকালে আটার রুটি আর ডিমের ওমলেট খাইয়া বের হইছি বাসা থেইকা...সন্ধ্যা ছয়টায় আমাদের মনে পড়লো আমরা বহু বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানরে ভায়োলেট করছি সারা দিনে। আমাদের দুপুরের খাবার টেবিলের উপর পইচা গন্ধ ছড়াইতেছে অবিরাম। প্রায় কোনোরকম বিরতি ছাড়া কম্পিউটার স্ক্রীনের দিকে তাকাইয়া থাকছি প্রায় সাত ঘণ্টা। এই সাত ঘণ্টায় আমরা দিন-দুনিয়া থেইকা আড়ালে চইলা গেছি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বহিষ্কৃত ছাত্রলীগের খুনিরা ঢাকা শহরে পুলিশের নাকের ডগায় বন্দুক নিয়া ঘুরতেছে তার প্রতিবাদে আয়োজিত সংহতি সমাবেশে যাওয়ার কথা ছিলো সেইটা মনে পড়লো শাপলুর ফোনের পর। সর্বোপরি সারাদিন কাজ করতে করতে আমরা সেই সার্বজনীন প্রবচন স্মরণে রাখতে পারি নাই, All work and no play, makes Jack a dull boy। আমরা আসলেই যথাযথ বিরক্তি উৎপাদন করতে শুরু করছি যে নিজের উপরে মেজাজ খারাপ আর ভবিষ্যত হাহাকার বোধ শুরু হইলো।
তাই প্ল্যান করলাম এইবার তাইলে কোথাও যাওয়া যাক; যেইখানে অখণ্ড অবসর, যেইখানে কাজের অবয়বে দুঃস্বপ্নেরা হামাগুড়ি দিয়া আগাইয়া আসে না। বন্ধু কইলো চলেন ধানমণ্ডি যাই। এস্কেইপ ফ্রম সাংহাইতে গিয়া বার্মিজ অথবা ফেইক অরিয়েন্টাল ভাত খাই। যেই কথা সেই কাজ। রাস্তার মোড়ে পৌছাইতেই খালি সিএনজি। ভাড়া জিগাইতে সিএনজিওয়ালা কয় মিটারের চে' কিছু বেশি দিয়েন। তার ব্যবহারে একইসাথে বিস্মিত আর মুগ্ধ হইয়া তাড়াতাড়ি চইড়া বসলাম সেই গ্যাসযানে। এতোটাই তাড়াতাড়ি যাতে সেই লোকের মাথায় দ্বিতীয় কোনো ভাবনা না আসে। লোকের গাড়ি চালানো দেইখা সন্দেহ হইলো। তারে জিগাইলাম "নতুন চালাইতেছেন নাকি?" সে সরলতার সাথে জবাব দিলো, "শেষবার চালাইছিলাম ১৭ বছর আগে।" এই লোক ১৭ বছর পর ঢাকায় আসছে, রাস্তাঘাট-ট্রাফিক বিহেভিয়ার-মানুষের আচরণ সব আপাদমস্তক পাল্টাইয়া গেছে; আর আমাদের সিএনজিওয়ালা ভাই কেবল ভাবছে তেল আগুনে গরম কইরা গ্যাস বানাইয়া ফেলা হইছে। সতর বছর আগে এক কন্যা সন্তানের বাপ হামিদ মিয়া টু স্ট্রোকটা মালিকের গ্যারেজে ঢুকাইয়া রাইখা সিরাজগঞ্জ জেলার চৌহালি থানায় গিয়া কাপড়ের ব্যবসা শুরু করছিলো। সতর বছরে সেই ব্যবসা লাটে উঠছে, স্কুটার চালানো টাকার বিলীন হইয়া যাওয়ার ইতিহাস লেখা হইছে কাপড়ে কাপড়ে। এই সতর বছরে সে আরো তিনজন কন্যা আর দুই পূত্রের বাবা হইছে। আর সবশেষে পরশু রাতে সতর বছর আগের এক বছর বয়সী কন্যারে একজন সৎপাত্রে সম্প্রদান কইরা একদিন পরেই সে ঢাকার বাস ধরছে; কারণ উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া যেই জমি থেইকা ছয়মাসের খোরাকী জুটতো সেইটা বন্ধক দিয়া মেয়ের বিয়ার একলাখ টাকা জোগার করতে হইছে। এই শহরে স্কুটার চালাইয়া সে একসময় স্বচ্ছলতার স্বপ্ন দেখছিলো। আবারো সেই শহরে ফিরা আসছে সে তিন বছরের পরিকল্পণা নিয়া, জমির বন্ধকী ফেরানোর জন্য একলাখ টাকা জুটাইয়া সে আবার গ্রামে ফিরবো...ছেলের কলেজে ভর্তি আর পড়াশোনা চালানের টাকা জোগার করতে হইবো। মাসে মাসে বাড়িতে খাওয়া খরচ পাঠাইতে হইবো। তার নিজের খরচও উঠবো এই গাড়ি চালাইয়াই।
আমাদের হামিদ মিয়ার সরলতায় ধরা পড়ে নাই সতর বছর আগের টু স্ট্রোক স্কুটার চালাইয়া যেই সঞ্চয় হইছিলো তিন সদস্যের পরিবারের খরচ চালাইয়া, এই ঢাকা আর সেই ঢাকা নাই। মানুষ আগেরচে আধুনিক হইছে, পরিবেশ সচেতন হইছে, টাউট-বাটপার বাড়ছে, ব্যক্তিমালিকানার গাড়ি বাড়ছে প্রায় ১০ গুন; তবে তার মাথায় ছিলো না দিন শেষে গাড়ির মালিকরে জমা বাবদ যেই টাকা দিতে হয় তার পরিমাণ বাড়ছে প্রায় ২০ গুন। চাইলের দাম বাড়ছে, বাড়িভাড়া বাড়ছে...কমছে কেবল টাকা আর মানুষের জীবনের মূল্য।
তবে আমি মধ্যবিত্তসুলভ বদান্যতায় হামিদ মিয়ারে সতর্ক করার বদলে আশ্বাস দিলাম। তার সরলতায় আঘাত করতে ইচ্ছা হইলো না একেবারেই। গরীব মানুষের হৃদয় ভাঙা, মসজিদ ভাঙার সামিল! তবে ধানমণ্ডি ৫ নাম্বারে ল্যাবএইডের সামনে নাইমা দেখি এস্কেইপ ফ্রম সাংহাই ক্যাফেটা সিটি কর্পোরেশনের লোকরা আইসা ভাইঙ্গা ফেলছে। সাথে সাথে ক্যাফে ম্যাঙ্গোতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু আমাদের মতোন আরো শ'খানেক লোক আজকে ক্যাফে ম্যাঙ্গোতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়াতে দাঁড়ানোর জায়গাও মিললো না সেইখানে। আমার বন্ধু একজন ফটোগ্রাফার। কজমো লাউঞ্জের মালিক আরিফ হাফিজের সাথে তার অন্তরঙ্গতা আছে। আমরা সেইখানে গেলাম।
কজমো লাউঞ্জে বন্ধু একজন বান্ধবীর সন্ধান পাইলো। যার সাথে দীর্ঘ্ চার বছর পর দেখা। আমি কাকতালিয়তার সংকটে পড়লাম। এই মেয়ে থাকে গুলশানে। আজকে সে ছুটির দিনে বাড়িতে জামাইরে বেবি সিট করতে দিয়া বের হইছে ঢাকা শহর দেখতে। যেনো ঢাকা প্রেমে মশগুল হইতে শুরু করছে বাঙালি জাতি। বাড়ির কাছে খাওনের দোকান রাইখা আমরাও কি তাই?
কজমো লাউঞ্জ যেনো ঢাকার প্রতিচছবি। সেইখানে গিয়া বসতেই সামনে একটা সুদৃশ্য মেনু কার্ড হাতে চইলা আসে। তারপর মেনু থেইকা সবচে চটকদার খাবারের অর্ডার করলে পাঁচ মিনিট পর জানা যায় সেইটা আনঅ্যাভেইলেবল। উপরে দিয়া ফিটফাট, ভিতরে সদরঘাট। শুধু যাওয়া-আসা, শুধু স্রোতে ভাসা। আঁধা ঘণ্টা পর আমরা জানতে পারলাম পছন্দমতো আমরা কেবল তেলে ভাজা শব্জী খাইতে পাবো। একঘণ্টা পর খাবার আসার পর টের পাইলাম কজমো লাউঞ্জটাই একটা ঢাকা শহরে পরিণত হইছে। যেই শহর মানুষের আশা-আকাঙ্খা-স্বপ্ন-দারিদ্র-ক্ষুধা সব গিলা খাইয়া ফেলে।
দুই.
নাইমা আসার পর বন্ধু গেলো তার হারাইয়া ফিরা পাওয়া বান্ধবীরে বাড়ি পৌছাইয়া দিতে। কোনোরকম তাড়া না থাকলেও আমি বেশ তাড়াহুড়ার তাড়না দেখাইয়া তাদের উল্টাদিকে হাটতে শুরু করলাম। একদল বেশ ধনী লোক-ধনী লোক মানুষরে ফুটপাথে বইসা থাকতে দেইখা চোখ আটকাইল...মানে চকমকা শাড়ি পরা মহিলা, স্যুট-কোট-লাল টাই পরা মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক আর সিল্কের সালোয়ার-কামিজের তন্বী তরুণী। তাদের বসার ভঙ্গীর সাথে পোশাক কিংবা চেহারা কোনোটাই মানাইতেছিলো না। সামনের রিকশাওয়ালারে শ্যামলী যাবে কীনা জিজ্ঞেস করতে সে উত্তর দিলো, "দেখেন কী তামাশা! একটা বড় গাড়ি চুরি করলো সব মানুষের সামনে থেইকা। কেউ বুঝেও নাই"। তারপর দাঁত ক্যালাইয়া হাইসা দিয়া আবারো সেই মানুষগুলিরে দেখতে থাকলো।
আমার বাড়ির ফেরার তাড়া ছিলো তাই সামনে বাড়তে শুরু করলাম। তাড়াটা যে বানানো সেইটা নিজেই ভুইলা গেছি একেবারে। ঢাকা শহর বড়ই রঙ্গীন জায়গা, যার ভেতরটা একেবারেই সাদা-কালো; এই শহরে থাকতে হয় "হয় বাঁচো, নয় মর" এমন বেদবাক্য জপতে জপতে...





এক নিশ্বাসে পড়লাম । জমি বিক্রি করে মেয়ের বিয়া দেয়ার বিষয়টায় প্রচন্ড মন খারাপ হওয়াটা ঠেকাইতে পারলামনা।
জমি বিক্রি করে নাই কিন্তু, বন্ধক রাখছে এক লাখ টাকার বিনিময়ে...এখন বন্ধক ছুটানের টাকা রোজগার করতে ঢাকায় আসছে।
ঢাকা শহরের বাতাসে মনে হয় নেশা আছে, যে একবার এই শহরে নিঃশ্বাস নিয়েছে সে নেশাগ্রস্থ হয়েই আজীবন এই অবাসযোগ্য শহরে ঘুরে মরে..
~
আপনে নিজেও তো এইটার শিকার; কানাডার পাসপোর্ট পাইয়াও ঢাকায় বইসা আছেন...
ভাস্করদা, পুরো পৃথিবীর একই দশা। পশ্চিমে চুরি-ছিনতাই কি হারে বেড়েছে কল্পনা করতে পারবেন না। যাদের চাকরী আছে আছে বাকি সব স্ন্যাচের পর্যায়ে গেছে কারণ কোন কাজ নেই। জিনিসপত্রের দাম আকাশ ছোঁয়া আর বেতন অফার করছে কম। প্রপার্টিজ এর দাম প্রতিবছর পড়তেছে শুধু শুধু ঢাকারে দোষাইয়া লাভ নাই কোন অথচ কতো মানুষ আজো ভাগ্যন্বেষনে পশ্চিমের দিকে রওয়ানা দিচ্ছে
সারা পৃথিবীর যে এই দশা সেইটা নিয়া আমারো কোনো সন্দেহ নাই। কিন্তু তাই বইলা ঢাকারে দোষ দেয়া যাইবো না ক্যান কনতো? পশ্চিমেও গাড়ি চুরি হয়, ছিনতাই হয় পার্থক্য হইলো ঢাকায় পুলিশ কেস করতে গেলে আপনের কোনো ক্ষমতাসীন পরিচিত না থাকলে সেইখানে আপনেরে কেউ পাত্তাই দিবো না; আপনে দূর্বল টাইপের কেউ এইটা বুঝতে পারলে পুলিশ উল্টা আপনেরে ফাসাইয়া দেওয়ার ধান্দা করবো অন্য কোনো কেইসে আর চালাক টাইপের কেউ হইলে একজন সোর্সের দেখা পাইবেন যে আপনের কাছে আরেকটা চোরাই গাড়ি অথবা অন্য যেকোনো কিছু গছাইয়া দিতে চেষ্টা করবো পুলিশের প্রেজেন্সেই। পশ্চিমে রাষ্ট্রীয় সার্ভিস গুলিতে আপনের খোয়া যাওয়া জিনিস ফেরত না পাইলেও পাওয়া যাইতে পারে এই আশায় থাকতে পারবেন চাইলে। এই শান্তিটাও তো প্রয়োজনীয়, নাকি?.
এটা অবশ্য ঠিক বলেছেন। পশ্চিমের পুলিশ আর যাই হোক সৎ। আল্লাহর মাল আল্লায় লইয়া গেছে, আমরা ফেরত এনে দিতে পারবো না। এটা তারা বলে দেয়। জিনিস চুরি গেছে ফেরত পাবেন না, চুরি হলেও আমরা কিছু করতে পারবো না, নিজে সাবধানে থাকেন এই সৎ উপদেশ এখানকার পুলিশ অহরহ বিতরন করে যায়।
হায় ঢাকা !!! রাক্ষুসি ঢাকা ।
পশ্চিমা পুলিশ লোক ভাল এটা বলতেই হবে। তবে চুরি চামারির হলে তাদের কাছে গেলে বলে দেবে, ইনস্যুরেন্স ক্লেইম কর, আমরা লেটার ইস্যু করে দিয়ে দিচ্ছি। চোরদের ধরতে এদের কোন আগ্রহ দেখি না।
মন্তব্য করুন