ইউজার লগইন

ক্রনিক্যাল অফ ঢাকা সিটি অথবা ঢাকা শহরের কিচ্ছা (৩)

(এই পোস্টটা হয়তো লিখতাম না কখনো। রায়েহাত শুভ নামের পছন্দের মানুষটার সাথে বেশ কয়েকদিন দেখা না হইলেও তার অনুরোধটা হঠাৎ মনে পড়লো...তারেই উৎসর্গ করলাম এই শহরে আমার জন্মবিষয়ক পাঁচালী)

সেইদিনেও মা'রে স্কুলে যাইতে হইছিলো। প্রশাসনিক কোনো ঝামেলায় তারে ডাইকা পাঠাইছিলো হেডমিস্ট্রেস। তার রুমে বইসা চা-বিস্কুট আর উদ্বেগ নিয়া আলোচনা করতে করতেই মায়ের প্রসব বেদনা উঠলো। তবে এইটা ফল্স পেইন ছিলো। এইরম প্রতারক ব্যথা লইয়া বেশ কয়দিন ধইরাই শংকায় কাটতেছিলো তার। হেডমিস্ট্রেস নিজের গাড়িতে কইরা মা'রে পৌছাইয়া দিয়া গেলেন নানা বাড়িতে। মা-বাপের বাড়িও নিকটেই ছিলো। কিন্তু সেইসময় আমার বড় বোইনরে নানাবাড়িতে রাইখাই মা স্কুলে যাইতো। সন্ধ্যায় আবার তার পেইন। কয়েকদিনের প্রতারণায় সবাই মনে হয় একটু অস্থির ছিলো। হসপিটালে খবর দিয়া এম্বুল্যান্স আনতে আনতে মায়ের অবস্থা কাহিল। বাপের ফ্যাক্টরীতে ফোন দেয়া হইলো এই অবসরে। আমার মা সেই দিন ভীষণ রকম উথাল-পাতাল ব্যথায় কাতড়াইতেছিলো। এম্বুল্যান্সে উঠাইয়া পুরান ঢাকার লালবাগ পাড়ি দিয়া সেই আমলের রমনায় হোলি ফ্যামিলি হাসপাতালে পৌছাইতো পৌছাইতে তার আর তর সয়নাই।

আমার জন্ম হইছিলো এম্বুল্যান্সেই। কোনো ডাক্তার লাগে নাই। কোনো বিশেষজ্ঞ ধাত্রী ছিলো না। আমার প্রসবের সময় কেবল সাধারণ নার্সরাই উপস্থিত ছিলো। সেই আমলের উচুনীচু পথ পার হইয়া ঠিক হসপিটালের গেইটের সামনে আমার নাড়ি কাটা হয়। মা যখন প্রথম আমারে দেখে তার অনুভূতি কোনোদিন শেয়ার করেন নাই আমার সাথে। তবে আমার ঘোর কৃষ্ণ বর্ণ দেইখা তার নাকি মনে হইছিলো নীলাভ। নবজাত শিশুর তুলনায় আমি ছিলাম অতিকায়। আমার বড় বোইনেরে নিয়া মায়রে প্রায় ৩ মাস গৃহান্তরীণ থাকতে হওয়ায় দ্বিতীয়বারের এমন স্বাস্থবান শিশু দেইখা সে খানিকটা ভরকাইছিলো বোঝা যায়।

আমার গায়ের রঙ নিয়া সম্ভবতঃ সবাই বেশ অস্বস্তিতে ছিলো, এইটা টের পাই মায়ের কিছু আচরনে। ঐ কৃষ্ণের সাথে তুলনা ছাড়া আর কখনো এই বিষয়ে আলোচনা তোলার চেষ্টা হইলেই মা উদ্যোগী হইয়া সেইসব ঠেকাইছে আমার বোঝাবুঝির বয়স পর্যন্তও। একেবারে শৈশবে মা আমারে আগলাইয়া রাখতো কিনা মনে পড়ে না, তবে আমার যে খুব বেশি বন্ধু ছিলো না এইটা মনে করতে পারি। আজকাল আমার মনে হয় হয়তো মা নিজেই ঐরকম মেশামেশি নিয়ন্ত্রণ করছে। আমার বন্ধু ছিলো বাকী দুই বোইন আর মা-বাবা। বাবা বন্ধু ছিলো এইটা লিখতে বেশ খানিক্ষণ ভাবতে হইলো যদিও...তবে তার লগেও আমাগো তিন ভাই-বোইনের সম্পর্ক খারাপ ছিলো না। তার মেজাজ দেখানের পুরাটাই ছিলো মায়ের সাথে।

হসপিটালের বাইরেই আমার জন্ম হইছিলো। এর একটা যাদুবাস্তবতা দেখি আমার জীবনে। হসপিটালের ভিতরে আমি খুব বেশিক্ষণ থাকতে পারি না। কেমন আটকা আটকা লাগে। ডেটল'এর গন্ধ, অসুস্থ মানুষের শরীরের ঘেরান কোনোটাই আমি সহ্য করতে পারি না। যদিও বছর পাচেক বয়সেই আমারে আবার দীর্ঘ্য সময়ের লেইগা হাসপাতালের কারাগারসুলভ জীবনে ঢুকতে হইছিলো। সেই আমলের ইন্ট্রোভার্ট আমার বাম হাত ভাঙলো স্কুলের টিফিন ব্রেকে খেলার ফাঁকে। একলা একলা থাকা আমারে নিয়া স্কুলে হুলস্থূল। স্বয়ং প্রিন্সিপাল মিসেস মঞ্জুর তার গাড়িতে কইরা আমারে হাসপাতালে নিয়া গেলেন। স্কুলের গেইম টিচার ছিলেন আযম স্যার। তিনি তখন বাংলাদেশ জাতীয় দলে ওপেনিং বোলার ছিলেন। তার কোলে চইড়া ভাঙা হাত ভাজ কইরা আমি হাসপাতালে পৌছানের পর আয়োজন দেইখা ডড়াইয়া গেছিলাম। সেই সপ্তাহেই এক বিদেশী চিকিৎসক দল শিশু হাসপাতালে আসছিলো অর্থোপেডিক চিকিৎসারে আধুনিকায়ন করতে। আমি ছিলাম সেই প্রকল্পের প্রথম সৌভাগ্যবান শিশু। মাঝেমাঝে ভাবি এক সপ্তাহ আগে হাত ভাঙলে হয়তো আমার হাত বাঁকা কইরাই রাখতে হইতো আজীবন। কনুইয়ের জয়েন্টের তিনটা হাড্ডি নাকি ভাইঙ্গা টুকরা টুকরা হইয়া গেছিলো।

মা চইলা আসছিলেন কিছুক্ষণের মধ্যেই। আমার মা ভীষণ শক্তটাইপ মহিলা, তার আবেগ ধরতে পারা কঠিন। মহাবিপদেও সে গম্ভীর থাকতে পারে। তো সে আমারে একটা কাগজ আর পেন্সিল দিয়া বসাইয়া দিলো আমি বাঁকা হাত নিয়া কোনো এক বালকের ছবি আঁকতে চেষ্টা করতে থাকলাম। মানুষের ছবি আমি ভালোই আঁকতে শিখছিলাম ছোটবেলাতেই। আঁকাআঁকি শেষ হওয়ার পরেই ঢুকলাম অপারেশন থিয়েটারে। এক বাদামী চামড়ার ক্যারিবিয়ান ডাক্তার হাসিমুখে আমারে অজ্ঞান করলেন। তারপর আর কিছু মনে নাই। এইরম অপারেশনের পর আজকাল আর হসপিটালে থাকতে হয় না...কিন্তু আমারে গিনিপিগ হিসাবে রাইখা দেওয়া হইলো। পনরদিন পর ছাড়া পাইছিলাম সেইবারে। এইসময়ে আমার সামনের পইড়া যাওয়া ফাঁকা জায়গায় কোদালের মতোন দুইটা দাঁতের আভাস দেখা দিলো।

আমার মায়ের ওভারী থেইকা যেইবার প্রায় আটকেজি ওজনের টিউমার বাইর করা হইলো, সেইবারো আমি মাত্র একবার গেছিলাম তারে দেখতে। সেই ক্লিনিকটা অবশ্য ঠিক ঠিক হসপিটাল মার্কা ছিলো না। সুরাইয়া জেবীন নামের এক গাইনোকোলোজির ডক্টরের নিজের হসপিটাল। বিশাল এক একতলা বাড়ি। আমার খালি মনে পড়ে যতো তাড়াতাড়ি পারি কেবিন থেইকা বের হইয়া টানা করিডোরে একা একা হাটতেছিলাম। এই সুরাইয়া জেবীন আমার বাকী দুইবোইনের প্রসবকালের ডক্টর আছিলো। কেবল আমিই তারে দেখি নাই। যদিও সে নাকি অপেক্ষায় ছিলো আমার সময়েও।

হসপিটাল ভীতি আমার দিন দিন বাড়তেছে। কিন্তু যাদুবাস্তবতার একটা করুন পরিণতি হইলো অপছন্দনীয়তার মধ্যেই থাকতে হয় যতোক্ষণ না কোনো ঋষিজাতের কেউ আইসা পৌছায়। আগেরবার বাপের ব্রেইন স্ট্রোক করনের টাইমেও আমি হাতে গোনা কয়েক ঘণ্টা কাটাইছি হসপিটালে। কিন্তু গতো কয়েকমাস ধইরা আমার মাসের বেশীরভাগ সময়েই হসপিটালে কাটাইতে হয়। কাজকামের নাম কইরা কখনো কখনো দূরে থাকার চেষ্টা করি মাঝমাঝে, কিন্তু অমন কইরা আর কতো পলাইয়া থাকা যায়...মা আর বাপ তাগো শেষজীবনে যেনো হসপিটালের প্রেমে পড়ছে একলগে। আমার সেই কৃষ্ণবর্ণ গায়ের কথা ভাবতে থাকি আজকাল। অতোটা কালো আর নাই মনে হয় আমি। কালো বর্ণে কিছু বাদামী রঙ মিশা গেছে কেমনে জানি। সেই নীলাভ কৃষ্ণবর্ণটা যদি আমার থাকতো তাইলে হয়তো আমি পারমানেন্টলি ঘরের ভিতর নিজেরে আটকাইয়া রাখতে পারতাম। বের হইতে পারতাম না সামাজিক ভয়ে। আমারে দেখলে শিশুরা মনস্টার বইলা চিৎকার কইরা উঠতো। আমি কোদালের মতোন দাঁত বাইর কইরা তাদের দিকে রেরেরেরেরেরেরে বইলা তাড়া করতাম...

পোস্টটি ৯ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

রায়েহাত শুভ's picture


সবার আগে কইয়া রাখি, আপনের মতো প্রিয় মানুষটা আমারে লেখা উৎসর্গ করায় আমি নিজেরে নিয়া গর্বিত বোধ করতেছি।

আংকেলের শরীর কি আবার বেশী খারাপ হইছে? নাকি আন্টির?

ভাস্কর's picture


বাপের অবস্থা খারাপ...ডক্টররা ধরতেই পারতেছে না তার সমস্যাটা কেনো হইতেছে। তাই বহুবিধ চিকিৎসা হইতেছে।

তানবীরা's picture


বানানটা বোধহয় বইন হবে

আমারে দেখলে শিশুরা মনস্টার বইলা চিৎকার কইরা উঠতো। আমি কোদালের মতোন দাঁত বাইর কইরা তাদের দিকে রেরেরেরেরেরেরে বইলা তাড়া করতাম...

মনদ হতো না, শিশুদের নিরাননদ জিবনে কিছু আননদ নিয়ে আসতেন Laughing out loud

ভাস্কর's picture


বোইন বা বইন, এইরম ঊন শব্দের বানান বিষয়ে জানতে চাই...আপনার কোনো অভিধানের খোঁজ জানা আছে?

পোলাপাইনের আনন্দ!? আপনে কী ভাবেন ভ্যাম্পায়ার দেইখা আজকালকার পোলাপাইন আনন্দ পায়?

হাসান রায়হান's picture


অ এর পরে ই থাকলে অ এর উচ্চারণ ও হয়। যেমন মনি = মোনি।

তানবীরা's picture


বানান বিষয়ে কি আপনে আমারে পড়া ধরতাছেন? Stare

পোলাপাইন শুধু ভয়ের জিনিসে আনন্দ পায়। আনন্দের সংজ্ঞা বদলে গেছে আজকাল। যতোরকম হাইটেক এমুজমেন্ট পার্কে যাবেন, যতো আপনার কইলজা নাড়ানো খেলা আছে, তাতে বেশি ভীড় হয়। বসে চিল্লায় আবার যেয়ে সেটাতেই বসে। আমি আমার মেয়েকে জিজ্ঞেস করছি, বলে ভয় লাগে যে সেটাই আনন্দ Smile আমিতো ভয়ে বসিনা কিছুতে, আমার ছটির দুধের মায়ায়, ঐটা এখনো আমার পেটেই থাকুক

ভাস্কর's picture


পড়া ধরুম ক্যান...সেই বানান ভক্তি আমার নাই। মানে পত্রিকার সম্পাদক মার্কা খবরদারীর সামর্থ্য আমার নাই। আপনে বানান ভুল ধরলেন বইলা অভিধানের খবর জানতে চাইলাম, যদি সেইটা থাইকা থাকে তাইলে কিছু শিক্ষাগ্রহণ করা যাবে।

আর পোলাপাইন নিয়া আমার তেমন সমস্যা নাই। কিন্তু অভিভাবকদের নিয়া ভয়ে থাকি। তারা নিজেরা একসময় ট্রু ব্লাড ভক্ত হইলেও প্যারেন্টাল সময়ে প্রবেশের পর সব ভুইলা যায় তারা। পোলাপাইনরে তারা কেবল শুদ্ধ-পবিত্র এই টাইপ দেখতে চায়।

তানবীরা's picture


আমি অবশ্য অভিভাবক এখনো হতে পারিনি। চেষ্টা চালাচ্ছি কিন্তু মনে হয় না এ জীবনে সম্ভব। আমার মেয়ে আমাকে হাজার বার বলে “দুষট আম্মি” কিংবা “দুষ্ট মামা”। আমার থেকে বরং আমার মেয়ের অনেক বেশি অভিভাবক। আমাকে বলে এটা করো না, তাহলে পাপা বকবে তোমাকে। আবার এটা করছো? পাপা না সেদিন বকলো তোমাকে

আমি ঠিক কথা কই তাই আমারে কেউ দেখতে পারে না মেজর Sad

হাসান রায়হান's picture


ববির কথাই ঠিক মনে হয়। রিমঝিমও দেখছি হরর ছবি দেখার জন্য আগ্রহী। তু আপনেরে দেইখা ভয় পায় নাই। Smile বরং বলছে টেলেন্টেড। Laughing out loud

১০

লীনা দিলরুবা's picture


হাহাহাহাহা কইরা যে হাসি দিছি সেইটা গোপন করলাম না।

লেখায় পাঁচতারা দিলাম ভাস্করদা।

১১

হাসান রায়হান's picture


আমিও পাঁচ্তারা দিলাম। তবে লেখায় এত কষ্টের কথা কেন। কষ্ট ভাললাগেনা। সবাই যদি আনন্দে মাস্তিতে থাকত!

১২

জেবীন's picture


হসপিটাল ভীতি আমার অনেক, যত পারি এড়াইয়া যাই। ফলস পেইনের কথায় মনে পড়লো, আম্মারে নাকি আমি এমনি জ্বালানি দিছি অনেক, শেষে যখন আসল টাইম এলো, দেখা গেলো খুব্বি বেহাল অবস্থায় নেয়া হইছে হস্পিটালে। হলি ফ্যামিলিতে।
আদ্দিকালে ঢাকার সবাই আজিমপুর ম্যাটারনিটি আর হলি ফ্যামিলিতেই যাইতো নাকি?

১৩

মীর's picture


লেখা চমৎকার।

১৪

শওকত মাসুম's picture


দারুণ সিরিজ

১৫

স্বপ্নের ফেরীওয়ালা's picture


আমরা কতটা বর্ণবাদী সেটা আরেকবার দেখাইয়া দিলেন

আমার জন্মও হলি ফ্যামিলিতে

~

১৬

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


আমি-ও হাসপাতাল সিরিয়াস ডরাই! Tongue

লেখায় Star Star Star Star Star

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

ভাস্কর's picture

নিজের সম্পর্কে

মনে প্রাণে আমিও হয়েছি ইকারুস, সূর্য তপ্ত দিনে গলে যায় আমার হৃদয়...