শায়লার দিকে যাওয়া: রাজনৈতিক সম্পর্কের মেটাফিজিক্স উন্মোচন প্রচেষ্টা...
দালান উঠছে তাও রাজনীতি, দালান ভাঙছে তাও রাজনীতি,
------ আবুল হাসান
ইতিহাস আর পরিসংখ্যান এই দুই ক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণের পাতানো খেলা চলতেছে দুনিয়ায়। আর এই পাতানো খেলা চলে ক্ষমতায় যারা নিরন্তর থাকনের নিরাপত্তাহীনতায় বাস করে তাদের ছকে আর ছাউনীতে। অনেক সিদ্ধান্তমূলক প্রোপাগান্ডার মতোন লাইন দিয়া শুরু করলাম লেখাটা। তবে এইটাও উত্তরাধুনিক জমানার প্রচলিত বিশ্বাস যে ইতিহাস রচিত হয় বা হইছে ক্ষমতাবলয়ের ভেতরের মানুষের স্বার্থ সংশ্লিষ্টতা রক্ষা করতেই। আর পরিসংখ্যান বিষয়টারে নিয়ন্ত্রণ করে কর্পোরেইট দুনিয়ার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান...কখনো তা সরাসরি বাণিজ্যিক মোটিভেশনে, কখনো বা উন্নয়ণমূলক এজেন্সীর প্রয়োজনে। তবে এইসব নিয়ন্ত্রণের খেলায় অংশগ্রহণকারী সকল খাত, এজেন্সী কিম্বা সুবিধাভোগী শ্রেণীর মাঝে জানাবোঝা থাকে। জনতারে গিনিপিগ বানাইয়া তাদের বিভিন্ন নিক্তিতে চড়ানো হয়, বিভিন্ন রেখার বিভাজনে তাদের দিয়া রঙীন ছবি আঁকা হয়, যার নাম তারা দেয় চার্ট-টেবিল-গ্রাফ। ক্ষমতাবলয়ের বাইরের মানুষরা এখন এইসব রঙীন প্রেজেন্টেশনে বন্দি থাকে। তবু এর মধ্য দিয়াই শহর সভ্যতা আগায়। দিনে দিনে মানুষও এইসব গ্রাফের আকর্ষণে আইসা ভীড় করতে থাকে নাগরিক জনপদে। বসতির চাতুর্য্য আর নান্দনিতায় তারা মেট্রোপলিটান হয়।
সুমন রহমানের শায়লার দিকে যাওয়া গল্পের অবতারণা এমন একসময়ে যখন বাংলাদেশের ছোটগল্প বন্দি হইয়া গেছে উন্নয়ণ আর অনুন্নয়ণ সংস্কৃতির দোলাচলে। একদম চোখে আঙুল দেখানো এনজিও ধর্মী আচরণে গল্পের বিষয়বস্তু আর উদ্দেশ্য বিবৃত হয়। বঞ্চিত মানুষ আর মানুষের বঞ্চনা'র নৈতিক মানদণ্ডগুলিই যেনো নব্বই পরবর্তী ছোটগল্পের মূলধারা হইয়া আমাদের সামনে আসতে থাকে। যার পঠনে কেবল মনে হয় আন্তর্জাতিক কোনো তহবিলের সুপারিশে অন্তর্ভূক্তির জন্য এইসব ক্রাইসিস গল্পের কাঠামোয় উপস্থাপিত হইতেছে। গল্প লেখকেরা একএকজন যেনো উন্নয়ণ এজেন্সী'র চাকুরী প্রত্যাশী কিম্বা চাকুরীরত কর্মকর্তা। যেনো তৃতীয় বিশ্বের গল্প কাঠামোটাও দাঁড় করাইয়া দেয়ার চেষ্টায় আছে এই দেশে কাজ করা নন গভর্নমেন্ট অরগানাইজেশনগুলি। ৬০ অথবা ৭০ দশকে এই গল্প কাঠামোর নিয়ন্ত্রণেই ছিলো দেশের মার্ক্সিস্ট রাজনৈতিক সম্প্রদায়। তখনও তারে পোস্টার ক্যাটেগরীতে ফালাইয়া দেয়া হইতো। সুমন রহমানের গল্পের মূল প্রেক্ষাপট এনজিও অধ্যয়ণ, কিন্তু তারপরেও তারে সময়ের এই ট্রেন্ড বিচ্যূত মনে হয়। একেবারেই।
শায়লার দিকে যাওয়া গল্পে লেখক উত্তম পুরুষে তার প্রাক্তন প্রেমিকার অনুসন্ধান পরিকল্পণা বিবৃত করেন। যদিও গল্পে শায়লার স্মরণ বা স্মৃতি কাতরতা হঠাৎ আসে বইলাই মনে হয়। ঢাকা শহরের মেট্রোপলিটান স্বরূপ নির্ধারনের একটা দোহাই যদিও লেখক প্রথম প্যারাতেই বলতে চেষ্টা করেন। অথবা গল্পের পরিণতি পর্বে একবার সদ্য ভাইঙ্গা যাওয়া সম্পর্কের কথা বলেন। কিন্তু ক্যানো হঠাৎ শায়লা লেখকের বা বর্ণনাকারীর জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হইয়া উঠে আবার তার কোনো সিগনিফিকেন্স গল্পে উল্লেখ নাই। এই অনুল্লেখ একরকম ননলিনিয়ারিটি জারী করার সম্ভাবনা তৈরী করে শুরুতেই। কিন্তু বাস্তবতঃ সুমন রহমানের এই গল্প শায়লা'র গল্প থেইকা ধীরে ধীরে তার আসল খোলস উন্মোচন করে। এই গল্প কেবলি একজন হারাইয়া যাওয়া শায়লার গল্প থাকে না বা থাকলেও শায়লা নিজেই আর কেবলি একজন শায়লা নাজনীন থাকে না। সে প্রতিনিধিত্ব করতে শুরু করে শহরের সেইসব মানুষরে যারা কখনো পরিসংখ্যানের গন্তব্য নয়। যাদের গায়ে বিবিধ তকমা লাগে। এইসব তকমার অনেকরকম যাদুই বাস্তবতা আছে কিন্তু একাডেমিক অনুৎসাহের কোপানলে তারা ধরা আর ছোঁয়ার বাইরের কোনো একরকম বাস্তব হিসাবেই ইতিহাস আর পরিসংখ্যানের একটি অথবা দুইটি বাক্যে ঠাই নেয় এনসাইক্লোপেডিয়া টাইপ বইয়ে।
তাই গল্পের সুতাবাহী একজন কনসালট্যান্টের আকস্মিক স্যাটায়ারের জবাব হিসাবে প্রধান চরিত্র যখন ঢাকার মেট্রোপলিটান বৈশিষ্ঠ্যরে পরিসংখ্যান বিদ্যার ঐকিকে বুঝাইতে চায়, তখনি আমি শায়লা নাজনীনের খোঁজ সম্পর্কে সচেতন হইয়া উঠি। লেখক যদিও তার ভ্রমণই শুরু করেন নাই তখনো। এরপরপরই তার লেখনীর শক্তিতে শায়লা নাজনীনের দিকে যাওয়ার প্রচেষ্টা এমন নেসেসারি বানাইয়া তুলেন যে আমি সেই প্রথম উপলব্ধিরে হারাইয়া ফেলি। কনসালট্যান্টরে বুঝ দেয়া বিনয় মজুমদারীয় (সম্ভবতঃ তিনি বিনয়'এর গণিত চরিত্ররে বুঝাইছেন) প্রত্যুত্তরের কনক্লুশান,
একবার যদি তুমি এই শহরে কাউরে হারায়া ফেল, বাকি জীবনভর খুঁজাখুঁজি কইরা তারে পাওয়ার সম্ভাবনা 14 শতাংশ মাত্র। নর্মাল স্ট্যাটিস্টিক!
প্রতিমুহুর্তে সম্ভাবনা জারী রাখে শায়লার মুখোমুখি হওয়ার। তার বর্ণনার সৌকর্য্যে আমি একটা ননলিনিয়ার গল্পেও লিনিয়ারিটি প্রত্যাশা করি। মনে হয় এই বুঝি একটা গল্প শুরু হইলো। যেই গল্প বলার ধরণ আর উপস্থাপণ আমার পরিচিত। যেই গল্পে মানুষ চটকী পরিনতি খোঁজে। যেনো গল্প হইয়া ওঠার মূল বৈশিষ্ঠ্য হইলো সম্পর্কের ক্রাইসিস-কম্প্লেক্সিটি। সুমন রহমান যদিও সেইসবের ইঙ্গিতও জারী রাখেন শরীরে শরীরে। তিনি শায়লার অপহরণ কাহিনী শোনান। শায়লার গর্ভে বর্ণনাকারীর সন্তান জন্মের বিষয়টা তুইলা ধরতে চান। অ্যাবরশান প্ল্যানের ঘটনাও আসে। লেখক যেনো এই গল্পরে শায়লার গল্প বানাইতে চায় এমন অনেক সম্ভাবনার ঘটনা উল্লেখিত থাকে এর পরেও।
গল্প পড়বার কালে সুমন রহমানের শায়লা নাজনীন কেমন চারিত্রিক বৈশিষ্ঠ্যের অধিকারী ছিলো তা জানবার আগ্রহ হইছে বেশ কয়েকবার, কিন্তু পরক্ষণেই কনসালট্যান্ট আর বর্ণনাকারীর আলোচনায় দারিদ্র বিষয়ক আলোচনারে তুইলা দিছেন তিনি। দ্বিতীয়বার এই ঘটনা ঘটবার পর আমি বুঝতে পারলাম একজন শায়লা নাজনীন আর সেই পরিসংখ্যানের খাতায় অনুপস্থিত আল্ট্রা পুওর জনগোষ্ঠী'র মধ্যে কোনো পার্থক্য নাই। লেখক সচেতনভাবেই আমাদের শায়লা নাজনীন সম্পর্কে জানাইতে চান না। কারণ এই শায়লা নাজনীন সেই আল্ট্রা পুওরদের মেটাফোর হইয়াই এই গল্পের চরিত্র। লেখকের ভাষায়,
তুমি কোনোদিন জানবা না আলট্রা-পুউর নিজের ঘরের মধ্যেই কেম্নে দিনের পর দিন ইনভিজিবল হয়া থাকে।
আল্ট্রা পুওরদের এই অদৃশ্যমানতা আসলে ক্ষমতাবলয়ের ভেতরে থাকা এলিট মানুষের ইচ্ছার উপরেই নির্ধারিত থাকে। পরিসংখ্যান বিদ্যার ম্যাপিংয়েও তারা ধরা খায় না। কারণ বেইজলাইনে থাকা দরিদ্ররাই বেশি চটকদার বিদেশি ফান্ডের জন্য। তাদের দৃশ্যমানতাই রাষ্ট্র-সমাজ-জিও-এনজিও কিম্বা গবেষকদের কাঙ্খিত। বেইজলাইনের মানুষরা পভার্টি লাইন পারাপারের জন্য খাড়াইয়া থাকে সবসময়। যারা জিনি ইনডেক্সের গিনিপিগ হিসাবে অধিক কৌশলী। পরীক্ষার ফলাফলে সুডৌল চিত্র হিসাবে বা লাইন-বেলাইনের গ্রাফকেন্দ্রীক জীবনেও তাদের ছবি ভালো আসে। শরীরি অনুপস্থিতি সত্ত্বেও চার্ট-টেবিল-গ্রাফ অনুসরণে তাদের হাসি-কান্না স্পষ্ট দেখা যায়।
বুনিয়াদি উন্নয়ণের নামে এই দেশের এনজিও সংস্কৃতিরে বেশ ভালোই খোঁচাইছেন সুমন রহমান। ফান্ডের প্রয়োজনে এনজিওগুলির কর্মকান্ড বা প্রাইমারী টার্গেটগ্রুপের প্রয়োজন পাল্টাইয়া যায়। পভার্টি লাইনের কারিকুরীতে এই দেশের কৌশলী গরীবেরা তাদের গ্রাফে আবারো ঠাই পায়। লেখকের ভাষায়
ওরা মডারেট গরীবদের পরিস্থিতিরেই পভার্টি বইলা চালায়। সত্যিকারের পভার্টি লাইন অনেক নিচে ডাইবা গেছে, স্ট্যাটিস্টিকসে এইগুলা নাই, সব এইচআইভি/এইডস-এর ফান্ড বাড়ানোর ধান্দা। ভাতের বদলে কনডম গিলাইতে চায় শালারা।
বাংলাদেশের প্রত্যন্ত দারিদ্রপীড়িত কিছু এলাকার অভিজ্ঞতা থেইকা লেখকের বর্ণনার মিল পাই বইলা গল্পের অভ্যন্তরে সহজে ঢুকতে পারি। এই দেশে এনজিও ধূর্তামির সুযোগে বা প্রয়োজনেই একটা গোষ্ঠীতন্ত্র চালু হইছে। দালাল মারফত এই মানুষেরাই কুমিরের ছানার মতোন দ্রষ্টব্য হয় বিদেশি মনিটরিঙের রিপোর্টে। কখনো আইনে, কখনো শিক্ষায়, কখনো চিকিৎসায়, কখনো বৃক্ষে, কখনো সড়কে-দূর্ঘটনায়। তারা মাইক্রো ক্রেডিটের উন্নয়ন পরিণতি। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট এনজিও'র ফান্ডে বা তরীকায় এই ঘটনা ঘটে না। মডারেট গরীবেরা বছর ভইরা ঋণসুবিধা নিতেই থাকে। এরটা দিয়া ওরটা শোধ, ওরটা দিয়া আরেকজনেরটা।
গল্পে একেবারে শেষে একটু নাটকীয়তার আশ্রয় নিছেন লেখক। কনসালট্যান্টের কঠিন হৃদয়ে তিনি বর্ণনাকারীর প্রভাব দেখাইতে চান। এনজিও ফিকিরেই এই দেশে আসা ড্যানিশ মানুষটা হঠাৎ বদলে যায়। বর্ণনাকারীর ব্যখ্যানমতো দেশের প্রান্তরে প্রান্তরে অদৃশ্য থাকা আল্ট্রা পুওরদের খোঁজে তিনি অস্থির হইয়া উঠেন। মধুপুরের জঙ্গলবর্তী কোনো এক চার্চে ঠাই নিয়া তিনি আল্ট্রা পুওরের সন্ধানে ব্রত নেন। আর এইদিকে লেখক জ্ঞানতঃই থাকেন শায়লার সন্ধানে। যার মেটাফিজিক্স লেখক ভালোই বুঝেন। পৌণপুনিকতার জীবনে মেট্রোপলিটান মেটাফিজিক্সে ফাইসা যাওয়ার এই প্রবণতাই যেনো স্বাভাবিক হয়। গল্পের ঘটনায় যা কিছু বর্ণিত হয়, তার সবটাই ক্ষমতাকাঠামোরে ইঙ্গিতবহ করে। শ্রেণী বিভাজিত রাষ্ট্র-সমাজের আন্তঃসম্পর্কের সরলাংক যেইভাবে মানুষের চারপাশে রহস্যময়তার মেটাফিজিক্স তৈরী করে তার নিজস্ব নিরাপত্তার জন্য, সুমন রহমান সেই লুপে লুপে খেলারত প্রতারণারে স্যাটায়ার করেন তার গল্পে।
সুমন রহমানের গদ্য শক্তিশালী। তবে কিছু জায়গায় তার স্যাটায়ারিক টোনটা খানিক প্রাণে লাগে। একটু ধন্ধ তৈরী করে স্যাটায়ার না গল্প পড়তেছি এই বিষয়ে। তবে শায়লার দিকে যাওয়া গল্পে সুমন রহমান লিনিয়ার ধারাবাহিকতায় দুইটা প্যারালাল গল্প বলেন যার উপস্থাপণ আমার কাছে নন-লিনিয়ার লাগে। তবে গল্পের নন-ফিকশন বর্ণনা বেশি হওয়াটা এই মনে হওয়ার অনুঘটক হইতে পারে। বাংলা সাহিত্যের ছোটগল্প ক্যাটেগরীতে এই গল্প উল্লেখ্যভাবেই অন্যরকম।
নীচে পাঠকের সুবিধার্থে গল্পটা দেয়া হইলো।
শায়লার দিকে যাওয়া : সুমন রহমান
সোয়াকোটি লোকের এই ঢাকা শহরে শায়লা নাজনীন কোথায় থাকতে পারে? আমার দারিদ্র বিমোচন প্রজেক্টের ড্যানিশ কনসালটেন্ট শীতের শুরুতে ঢাকায় ল্যান্ড করলে তারে এই প্রশ্নটা ছুঁড়ে মারি, এজন্য না যে তিনি শায়লারে চেনেন, বরং এজন্য যে, গতবার নিজদেশে ফেরত যাওয়ার আগে তিনি বলতেছিলেন, হাতের তালুর মত আমাদের এই ঢাকা শহর মেট্রোপলিটন হয় কেম্নে?
এইবার আমি তারে বিনয় মজুমদার স্টাইলে ধরি : হাতের তালুর সমান স্পেস ঢাকা শহরকে মেট্রো বানায় না, বানায় সোয়া কোটি পপুলেশন। সোয়া কোটি লোক মানে সোয়া কোটি স্পেস, একেকটা গড়ে দেড়শ' গিগা কইরা। এই শহরে তুমি যদি কাউরে হারায়া ফেল, নর্মাল স্ট্যাটিস্টিকসে আবার ওরে দেখতে পাওয়ার সম্ভাবনা সোয়া কোটি ভাগের এক ভাগ। তোমার কোপেনহাগেন-এ সেইটা বড় জোর বিশ লাখ ভাগের এক ভাগ। আবার ধর, প্রতিদিন এই শহরে তোমার সাথে বড়জোর শ'খানেক লোকের দেখাসাক্ষাৎ হয়। বছরে দেখা হয় চলি্লশ হাজার লোকের সাথে। টেনেটুনে তুমি যদি আর তিরিশ বছর বাঁচো, মোট বার লাখ লোকের দেখা পাবে তুমি। এখন দেখ, একবার যদি তুমি এই শহরে কাউরে হারায়া ফেল, বাকি জীবনভর খুঁজাখুঁজি কইরা তারে পাওয়ার সম্ভাবনা 14 শতাংশ মাত্র। নর্মাল স্ট্যাটিস্টিকস।
দেশী মসলার রান্না খাইয়া আমার ড্যানিশ কনসালটেন্ট ঘন ঘন কোপেনহাগেন। দারিদ্র বিমোচন পিছায়া যায়, এই অবসরে আমি শায়লারে খোঁজাখুঁজির প্লান করতে থাকি। নর্মাল স্ট্যাটিস্টিকসে যে চেষ্টা সুদূর পরাহত, কস্টার স্যামপ্লিং-এ সেইটা সম্ভাবনার সীমানায় এসে দাঁড়ায়। শায়লা পড়ত ইকনমিক্সে, মাঝারি মানের ছাত্রী ছিল বরাবর। নিম্নমধ্যবিত্ত রক্ষণশীল ব্যাকগ্রাউন্ড, সুতরাং ব্যাংকে বা কলেজে চাকরি করার সম্ভাবনা।
ঢাকা শহরে তপসিলী অ-তপসিলী মিলায়া মোট 25 খানা ব্যাংক আছে, যাদের হেড অফিস, লোকাল অফিস, কর্পোরেট অফিস, মহিলা শাখা, বিলবুথ মিলায়া প্রায় 250 টি শাখাপ্রশাখা। ব্যাংকার্স রিক্রুটমেন্ট কমিটি আর বাংলাদেশ ব্যাংকের সংগৃহীত ডাটা থেকে খুঁজে খুঁজে আমি মোট 15 জন শায়লা নাজনীনকে বার করি, জন্মতারিখ বিবেচনায় বাদ দিই 11 জনকে। বাকি থাকে 4 জন। হইতে পারে এই চারজনের একজনই সেই শায়লা, যারে আমি খুঁজতেছি। হইতে পারে, পূবালী ব্যাংকের যে শাখায় আমি একটা একাউন্ট অপারেট করি, সেখানেই শায়লা চাকরি করে। হয়ত ব্যাংকের রিমোট কোনায় কিং সাইজের একটা লেজার বইয়ের উপর হামলে-থাকা হেজাব-পরা মহিলাটিই শায়লা, যার হেজাবের ভেতরে কোনো মুখমণ্ডল আছে কি না জানার প্রত্যাশা আমার কোনোদিন হয় নাই। আমার ভাবনার দৌড় এবার সত্যি-সত্যি আমায় আতঙ্কিত করে :
হ্যালো ম্যাডাম, চিনতে পারছেন?
আরে.....তুমি? এখানে?
এখানে তো আমি আসি দু'বছর ধরে।
কিন্তু...একদিনও তোমার সাথে দেখা হয় নি...আশ্চর্য!
অভিযোগ-উতরানো আভা। আলোচনা, অত্যন্ত সঙ্গত কারণে, অফিসের টেবিল থেকে দ্রুত কোনো রেস্তোরাঁর দিকে গড়ায়।
তুমি একদম বদলাও নি।
কোনো কোনো রেস্তোরাঁর পরিবেশে এরকম বিবৃতি দানের উস্কানি থাকে।
তুমি কিন্তু অনেক বদলেছ। আমি হেজাব দেখাই।
ব্যাংকার শায়লা হাসে। হ্যাঁ...শ্বশুরবাড়ির নিয়ম। সবাই হেজাব পড়ে। ব্যাকডেটেড।
না না...বরং মোস্ট আপডেটেড। এখন তো পশ্চিমে হেজাব পরার রাইট নিয়ে ব্রাইট ব্রাইট সব মুভমেন্ট হচ্ছে।
তোমার একাউন্ট কি সেভিংস?
আমার বিত্ত আন্দাজ করার চেষ্টা শায়লার।
না। কারেন্ট। আমি ক্ষণবাদী মানুষ। সেভিংসে বিশ্বাস নেই।
স্পেস করার জন্য আমার একটু খ্যামটা।
শায়লা তত্ত্বের ফাঁদে পা দেয় না।
কারেন্ট একাউন্টে খুব নমিনাল একটা ব্যালান্সের এগেইনস্টে আমাদের কনজিউমার ক্রেডিট লোনটা কিন্তু খুব ভাল। গাড়ি আছে তোমার?
আমার বসের একটা আছে।...আচ্ছা, টেবিলের কাচের নিচে যে ছবিটা ছিল...তোমার ছেলে?
হ্যাঁ, সানিডেলে পড়ে। টু-তে। পাশেরটা নিশ্চয়ই স্বামীর।
না না...ওটা তো গাব্রিয়েল বাতিস্তুতার ছবি।
ঐ যে...আর্জেন্টিনার ফুটবলার।
মনে পড়ল, শায়লার সাথে হাকিম চত্বরে ঘুরাঘুরির মাত্র তৃতীয় দিনে ক্যাম্পাসের এক লম্বাচুল ক্যাডারের হাতে কী মাইরটাই না খাইছিলাম। ওরে সবাই বাতিস্তুতা ডাকত, শায়লার প্রেমাকাঙ্ী ছিল সে। শেষে একদিন পিস্তল ঠেকাইয়া সন্ধ্যাবেলা আমার কাছ থেকে নিয়া যায় শায়লারে, ছাড়ে পরের দিন। শাপে বর হইল এই ঘটনা। বাতিস্তুতার প্রেমাগি্ন নির্বাপিত হইল, অনুতাপ আর অসহায়ত্বে আমরা আরো প্রেমঘন হয়া উঠলাম।
ব্যাংকার শায়লার সাথে বাক্যালাপ আর আগায় না। আমি নানাভাবে কল্পনাকে ঠেলি, কিন্তু ওর চাকা কাদার মধ্যে একেবারে ডাইবা গেছে মনে হয়। অগত্যা একদিন আমার কনসালটেন্টের অফিসে গিয়া ওর গলা জড়ায়া হাউহাউ কর্যা কাঁদি। বলি, লণ খুব খারাপ, ডাটার মধ্যে মরহর জিনি ইনডেক্স নাইমা যাইতেছে, পরিসংখ্যানের বই থেকে গরিবী বিদায় নিতেছে, আমার আর চাকরি নাই। কনসালটেন্ট হো হো হাসে। বলে, মন্দ কী, ফি বছর আসা লাগব না, তিন বছর পর পর আইসা একটা ইভালুয়েশন কইরা যামু গা। এই বালের বেইজ লাইনে আমার জান কাবার হওয়ার দশা!
এ পর্যায়ে আমি টিচার শায়লারে নিয়া আশায় বুক বাঁধি। কল্পনায় তারে দেখি, হেজাব নয়, ফিনফিনে ফ্রেমের চশমা পরা। একদঙ্গল ছাত্রছাত্রীঘেরা অবস্থায় একটি বিরাট মথের মত কাশরুম থিকা বাইর হইতেছে। সেইদিনই ডাটার জন্য ব্যানবেইজ যাই। সরকারি-বেসরকারি মিলায়া মোট 36টা কলেজ আছে ঢাকা শহরে। এর মধ্যে মাত্র দুইটিতে অর্থনীতি বিভাগ নাই। বাদবাকি 34 টার মধ্যে শায়লা একাধিক থাকলেও অর্থনীতির প্রভাষক শায়লা নাজনীন আছে একজনই। পড়ায় তিতুমীর কলেজে। অতএব ফিল্ড ইনভেস্টিগেশন।
দুরু দুরু বক্ষে তিতুমীর কলেজে গিয়া দেখলাম বিশ্ব পরিষ্কার দুই শিবিরে বিভক্ত। এক শিবিরে ছাত্র, অন্য শিবিরে শিক। যেখানে ছাত্র আছে, সেইখানে শিক্ষক নাই। আবার যেখানে শিক্ষক আছে সেইখানে ছাত্র নাই। দুই দলই মহাখুশি। অর্থনীতি বিভাগের ম্যাডাম শায়লা নাজনীন ছুটিতে আছেন। চার মাসের প্রসূতি ছুটি।
আহা হা! এখন কী নিশ্চিন্ত মনে প্রকাশ্য সংবাদ হয়া গর্ভধারণ করলা প্রিয়তমা! মনে আছে, সেই যে ঝামেলা বাঁধায়া ফেললাম? তারপর তোমার কত হাতে ধরা পায়ে ধরা! রোজ সকালে এগারটা ম্যাটার্নিটি কিনিকের ঠিকানা নিয়া ধর্না দিতাম তোমার হলে। ডেসপ্যারেট বেলী-রাজু জুটির কাহিনী শুনাইতাম, আলাপ করায়া দিতাম তিন্নী-পিয়ারদের সাথে। তোমার ভয়ে-নীল মুখের সামনে ওরা ওদের অ্যাবরশনের ডালভাত মার্কা কাহিনীগুলি বলত সমানে।
কাজ পিছায়া যাইতেছে, কনসালটেন্টের এই অভিযোগ নিয়া একদিন তার সাথে তুমুল বাহাসে নামি। তারে বাংলাদেশ স্ট্যাটিস্টিক্যাল বু্যরো থেকে হিড়হিড় কইরা বার কইরা আনি, আর বলি, ঐসব জিনি ইনডেক্সে আমি বিশ্বাস করি না। এইসব ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের টাকা খাওয়া আমাদের মাথামোটা ইকনমিস্টদের বুজরুকি। পভার্টি-গ্যাপ বাড়তেছে, আমি হলফ কইরা কইতে পারি। আলট্রা-পুউর দের নিয়া কোনো বেইজ লাইন নাই। সরকার, ওয়ার্ল্ডব্যাংক বা এডিবি কেউ করে নাই। ওরা মডারেট গরীবদের পরিস্থিতিরেই পভার্টি বইলা চালায়। সত্যিকারের পভার্টি লাইন অনেক নিচে ডাইবা গেছে, স্ট্যাটিস্টিকসে এইগুলা নাই, সব এইচআইভি/এইডস-এর ফান্ড বাড়ানোর ধান্দা। ভাতের বদলে কনডম গিলাইতে চায় শালারা।
ডিড য়ু্য এভার ইন দ্য লেফট পলিটিকস? আমার কনসালটেন্টের মুখে সস্নেহ সংশয়।
আই ওয়াজ নট, স্যার! আমি মিলিটারি স্টাইলে চিল্লাই।
বাট আই ওয়াজ মাই সান। আই ড্রিমট অব অ্যা সোশ্যালিস্ট ডেনমার্ক থ্রু-আউট মাই ইয়ুথ।
খেদায় ঢুকাইতে চায়। বহুৎ পুরান ট্রিকস।
দ্যাট আনাবলস ইউ কোপিং উইদ দ্য ওয়েলফেয়ার ক্যাপিটালিজম। গুড হোমওয়ার্ক।
মনে মনে বলি। আর মুখে বলি, ঐটা তোমার সমস্যা। বামপন্থার ভূত আমার ঘাড়ে নাই। ফলে কনসালটেন্ট তার পন্থা বদলের ইতিহাস বয়ান থিকা আমারে নিষকৃতি দেন। টিচার শায়লার ব্যাপারে আমি বীতশ্রদ্ধ হয়া পড়ি। ওর গর্ভাবস্থার ডাটা আমার হাইপোথিসিসরে নাল বানায়া দিয়া ওর সুখীসমৃদ্ধ দাম্পত্য জীবনটারে ফোরকাস্ট করতে থাকে। ব্যাংকার শায়লাও আমার মনে এতখানি আতঙ্ক পয়দা করতে পারে নাই। আগে মনে হইত, ওর সরকারি চাকরিজীবী স্বামী রিমোট পোস্টিং লয়া কোনো থানা সদরে হাবুডুবু খাইতেছে। এখন আমি শিউর হালার পোস্টিং সচিবালয়ে। নন-ক্যারিয়ারিস্ট মুডে সকাল সন্ধ্যা সংসার সেবা করে। গর্ভবতী স্ত্রীর শয্যাপাশে একটি করুণ কমলালেবু। অসহ্য!
অনেক দিন আগের কথা মনে পড়ে, শায়লার যেবার অসুখ করল, দীর্ঘদিন বাড়িতে, বাড়ি থিকা আমার হলের ঠিকানায় চিঠি আসল ওর। করুণ আহ্বান ভরা একটা চিঠি। আমারে সম্বোধন করা, চিঠির শেষে ওরই নাম, কিন্তু হাতের লেখা ওর ছিল না। পরে জেনেছিলাম, ঐ চিঠি লিখ্যা দিছিল ওর মা। কাঁপা কাঁপা অক্ষরে একটি নিখুঁত পারিবারিক ষড়যন্ত্র। আমি দেখতে যাই নাই।
আমি তখন সাবরিনার নানা রকম উচ্চাভিলাষের অংশ হয়া গেছি। সকাল সন্ধ্যা ডাটা টেম্পার করি, প্রাইমারি ডাটা নষ্ট করি, শায়লার সাথে আমার এফেয়ারটারে আমার তরফে চ্যারিটি বইলা চালাই। স্ট্যাটিস্টিকস আমায় উৎসাহ দেয়, স্ট্যান্ডার্ড এরর আওতার মধ্যেই থাকে। সাবরিনা আমার মহত্ত্বে মুগ্ধ হয়, সাবরিনার মহত্ত্বে আমিও পাল্টা মুগ্ধ হই, শেষে নিজের মহত্ত্বে নিজেই মুগ্ধ হইতে শুরু করি। এতসব মুগ্ধতার মাঝে আলট্রা-পুউরের মত মিলায়া যায় শায়লা নাজনীন। মাস্টার্স ফাইনাল দিতে আইসা জ্বলজ্যান্ত দুইমাস হলে থাকলেও আমার সাথে দেখা হয় না তার।
আমার ড্যানিশ কনসালটেন্ট নানা রকম মেইল কইরা আমারে ডাক পাড়েন। বলেন, সেকেন্ডারি ডাটার আটার বস্তার নিচে তিনি নাকি চিৎপটাং হয়া আছেন। এখন নাকি গরিবদের এসেট-এনালিসিস করতে চান। আমি উত্তর দিই, ফালায়া থোও ঐসব ডাটার বস্তা, ঐখানে যারা আছে তারা মডারেট, পাতিবুর্জোয়ার চাইতেও ভয়ানক। ওরা জানে তোমার কী কী ডাটা লাগবে, তোমার প্রয়োজনে ওরা ল্যান্ডলেস হয়, ক্রেডিটের টাকা তুইলা মৌজ মারে। হার্ডকোর গরিব হয়া ওরা এনজিও অফিসে যায়, আবার ইভালুয়েশন রিপোর্টের সময় ঠিক ঠিক প্রয়োজন মত ওয়েলঅফ হয়া যায়। এতে তোমার আত্মতুষ্টি হয়, তোমার আত্মতুষ্টি আর কীসে কীসে হয় ওরা জানে। ওরা তোমার জিনি-ইনডেক্স দিয়া মোয়া বানায়া খায়, অ্যাসেট অ্যানালিসিস-এর কাগজ দিয়া বাচ্চার হাগা মোছে। তুমি শীতকালে বেড়ায়া যাও, এসি-লাগানো পালকিতে উইঠা মানিকগঞ্জের দুইটা গ্রাম ঘুইরা ঘুইরা দেখ আর ফটাফট ছবি তোল। সন্ধ্যা হইতে-না-হইতেই তোমার গুলশানের রেস্ট হাউজে হান্দায়া যাও। তুমি গ্রামে যাওয়ার তিনদিন আগে থেকে সেখানে রিহার্সাল চলে। আর সেই নাটকে ঢুকে তুমিও ঘন ঘন ঘড়ি দেখ, ওদের কাজ আরো সহজ কইরা দাও। তুমি পভার্টি মাপো তোমার প্রজেক্টে, এর বাইরে তোমার যাওয়ার উপায় নাই। আর তোমার লোকাল রিসিভার এনজিওরা মাত্র দুই দশকে এই দেশে এমন এক তুখোড় রেসপন্ডেন্ট জেনারেশন বানাইছে, যারা তোমার অফস্পিন, লেগস্পিন, গুগলি সব বোঝে। রাতের অন্ধকারে বোঝে। তাদের দুধের বাচ্চারাও বোঝে। তুমি দেখ নাই বর্ষায় অষ্টগ্রাম কেমন থৈ থৈ করে, ুধার মহামারী কী জিনিস। তুমি কোনোদিন জানবা না আলট্রা-পুউর নিজের ঘরের মধ্যেই কেম্নে দিনের পর দিন ইনভিজিবল হয়া থাকে।
কথা শেষ করে আমি হাঁপাই। ডিভোর্সের প্রথম বছরে পুরুষেরা এরকম একটুআধটু র্যাডিক্যাল হয়া যায়, আমার কনসালটেন্ট আমারে এইভাবে মাপেন। ফলে আমার চাকরি বহাল থাকে। উপরন্তু কয়েক দিনের ছুটি জোটে।
আচ্ছা, এমনও তো হইতে পারে যে, শায়লা শেষমেশ নারীবাদী হয়া গেছে! কদমছাঁট চুলের শায়লা নাজনীন অ্যাকশন-এইডের টাকায় ডমিস্টিক ভায়োলেন্সের উপর ডকুমেন্টারি বানাইতেছে! লিভ টুগেদার করতেছে শ্মশ্রুমণ্ডিত ও নারীবাদী কোনো যুবকের সাথে। রগরগে যৌনতা ছাড়াই। অতৃপ্ত আদর্শবাদী জীবন। উত্তেজনায় আমি শোয়া থেকে উইঠা বসি।
এনজিও বু্যরো'র ডাটা রিলাইয়েবল লাগে না। ওরাই পই পই করে বলেছে, রেজিস্ট্রেশন দেখবেন এক নামে, সাইনবোর্ড দেখবেন আরেকটা। কেব্লা ঘুইরা গেলে ওদেরও যে ঘুরতে হয়। কর্তার ইচ্ছায় কর্ম! তিনজন শায়লাকে পাওয়া যায় যারা নারীবাদী উন্নয়ন সংস্থায় কাজ করে। ঠিক করি, র্যানডম নয়, যেখানেই নারী অধিকারের গন্ধ পাব, সেইখানেই শায়লা নাজনীনের কথা জিগায়া দেখব। খুঁজব সর্বত্র। পুরুষতান্ত্রিকতা সহ। শায়লা জানে, প্যাট্রিয়ার্কি ছাড়া যৌনতায় ইনটেনসিটি আসে না। ওর রক্তে সেই বীজ ঘুমন্ত আছে। প্রয়োজন তারে জাগায়া দেয়া। একদিন আমার কনসালটেন্ট বাড়িতে আইসা হাজির। চোখেমুখে বামপন্থী অনুতাপ। আলট্রা-পুউর বিষয়ে প্রাইমারি ডাটার সন্ধানে নামতেছেন। আমি তারে অনেক বোঝাই। বলি, দেখ, দেখানোর দা আর কোপানোর দা এক না। আলট্রা-পুউর নিয়া কথা কইবা, ফান্ড চালু থাকব। আলট্রা-পুউর খুঁজতে গেলে তুমিই আলট্রা-পুউর হয়া যাবা। এই কথায় আমার কনসালটেন্টের মনে আরো বিপ্লবী জোশ আসে। আত্মারাম খাঁচাছাড়া হয় আমার, রবার্ট চ্যাম্বার্স-এর আদলে চে' গুয়েভারার ভূত দেখি। আলট্রা-পুউর নয়, নতুন চাকরি খুঁজি আমি। সাথে সাথে নারীবাদী অফিস। খোঁজ পাই, আমার ড্যানিশ কনসালটেন্ট মধুপুরের জঙ্গলে গিয়া খুঁটি গাড়ছেন। পায়ে পা বাঁধায়া ঝগড়া লাগাইছেন কারিতাসের সাথে। চার্চের একটি রেস্ট হাউজে থাকেন তিনি, রোজ রাতে তার টিনের ঘরের চালে আইসা হনুমান শাসায়া যায়। তিনি ফিল্ডে নামলেই চার্চের ফাদাররা নাকি আলট্রা-পুউরদের গহীন জঙ্গলের দিকে ভাগায়া দেয়। সেই অবসরে তিনি গোটা বর্ষাকাল ধরে হেন্ডারসন দ্য রেইনকিং স্টাইলে একটা উপন্যাসও নাকি লিখতেছেন।
আর আমি অলিতেগলিতে চাকরি ও নারীবাদ খুঁজি। সোয়াকোটি স্পেসের বিশাল এই মেট্রোপলিটনে। এভাবে প্রতিদিন শায়লার দিকে একটু একটু করে যাই। একেকটা এলাকায় খোঁজাখুজি শেষ কইরা ফিরা যাবার পথে দেখি, আরো গোটাদুই নারীবাদী অফিস গজায়া গেছে। তাতে স্বস্তি হয়। মেটাফিজিঙ্ হয়। একই ক্যাটাগরিতে অনন্তকাল খোঁজাখুঁজি চালায়া যাওয়ার সম্ভাবনা বলবৎ থাকে।
টীকা (না পড়লেও ক্ষতিবৃদ্ধি নাই)
অ্যাসেট অ্যানালিসিস : গরীবদের সয়সম্পদ মাপার জন্য একটা পশ্চিমা ফরম্যাট। উন্নয়নের বাজারে খুব চালু।
আলট্রা পুউর : অতিগরিব বা হতদরিদ্র। দারিদ্রসীমার একেবারে তলানির দিকে যারা থাকে। বা থাকে না।
প্রাইমারি ডাটা : নিজে নিজে ফিল্ড থেকে সংগৃহীত ডাটা। ফিল্ড রিসার্চার নামক একদল বোবা এবং কলুর বলদ এই কাজ করে থাকে।
সেকেন্ডারি ডাটা : উন্নয়ন-গবেষকদের স্বপ্নের ধন। অন্যের রক্তেঘামের এই জোগাড় তাদেরকে ঢাকা বা নু্যইয়র্কে (কখনও প্লেনের মধ্যে ল্যাপটপে) বইসা বাংলাদেশ নিয়া গিগা গিগা ম্যাটার বানাইবার উৎসাহ দেয়।
পভার্টি লাইন : দারিদ্রের লক্ষণরেখা। এই রেখার নিচে যাদের আয়ব্যয় তারাই গরিব, পশ্চিমা গবেষকেরা এইভাবে তৃতীয় বিশ্বে জুতা আবিষ্কার করেন। এ প্রসঙ্গে তারাপদ রায়ের বিখ্যাত কবিতাটি স্মর্তব্য।
ব্যানবেইজ : বাংলাদেশের একটি সরকারি সংস্থা যেখানে শিাবিষয়ক তথ্যাদি সংরণ (ও গবেষণা?) করা হয়। এসব তথ্যের একমাত্র কাজ বিনা-উৎকোচে তালাবদ্ধ থাকা।
জিনি ইনডেক্স : একটা দেশে ধনীগরিবের ব্যবধান মাপার একটা ব্যবস্থা। নামটি গিনিপিগের কথা মনে করায়া দেয় বইলা এরে গিনি না বইলা আদর কইরা 'জিনি' ডাকা হয়।
রবার্ট চ্যাম্বার্স : সাসেক্সর শিক্ষক। গ্রামীণ দারিদ্র এবং উন্নয়নের রীতিকৌশল নিয়া অনেক চ্যাটাং চ্যাটাং আলাপসালাপ করেন, কিন্তু তার চাকরি ও প্রমোশন অব্যাহত থাকে।
স্ট্যান্ডার্ড এরর : যতটুকু ভুল করলে বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফ খাপ্পা হয় না।
প্যাট্রিয়ার্কি : একটি (অ)মানবিক, (অ)মানসিক এবং দৈশিক অবস্থা, যা নারীপুরুষ নির্বিশেষে কিছু কিছু মানুষের চেতনায় ও রাজনীতির মধ্যে বিদ্যমান। কিন্তু নারীবাদ এরে পুরুষের একচ্ছত্র সম্পত্তি বইলা হাহুতাশ করে।
মার্চ ২০০৫
সুমন রহমান : জন্ম. ভৈরব ৩০ মার্চ ১৯৭০; ঢাকা, বাংলাদেশ প্রকাশ: গদ্যসঞ্চালন ৫ (মার্চ ১৯, ২০০৫)





গল্প আর সমালোচনা, দুইটাই দারূণ লাগলো...
গল্পটা অসাধারণ! আধুনিক বাংলা ছোটগল্পের ঈর্ষণীয় উন্নতি আসলেই অদ্ভুত।
দারুন গল্প সাথে পরিপক্ক সমালোচনা!
গল্পটা ভালো। বিশেষ করে অপরিচিত শব্দের পরিপক্ব ব্যবহারের কল্যাণে সুখপাঠ্য। তবে সর্বসাধারণ এই গল্প কতটুকু বুঝতে পারবে, সেটা বিবেচ্য। আমাদের দেশে মনোযোগী পাঠক তৈরী হয় সিক্স-সেভেন থেকে। সেটা আবার বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গিয়ে আনুপাতিক হারে কমতেও থাকে। আর এই গল্পটা এমন প্রেক্ষাপট নিয়ে লেখা যে, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া পোলাপানের এন্টেনা ছাড়া ক্যাচ করা কঠিন। বলতেছি না যে ক্যাচ হবেই না। কিন্তু রেশিও কম হইতে পারে।
আর আপনের সমালোচনাটা তো আরো দুর্বোধ্য। গল্পটা যেহেতু একটু কড়া, সমালোচনাটা একটু সহজ হওয়া লাগতো। তাহলে দুইয়ে মিলে একটা দারুণ ককটেল হতে পারতো।
গল্প বোঝাবুঝির দায়িত্বটা আসলে কার সেইটা নিয়া প্রশ্ন তোলাটারে নিরর্থক মনে হয় আমার কাছে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার দীনতা মাথায় নিয়া গল্প লেখার অর্থ আমরা দূর্বলতারেই স্ট্যান্ডার্ড মাইনা নিতেছি। বরং এই গল্প বুঝার মতোন শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজনিয়তারে আমার জরুরী লাগে।
আর আমার সমালোচনার কোন কোন জায়গারে আপনের দুর্বোধ্য লাগছে স্পষ্ট কইরা বললে আসলে বুঝতে পারতাম ভালোভাবে। নিউ মিডিয়া হিসাবে ব্লগের গ্রহণযোগ্যতা বাড়তেছে এর ইন্টার্যাক্টিভ চরিত্রের জন্যই। এইখানে লেখক-পাঠক যোগাযোগের সম্ভাবনা থাকে বইলাই যেকোনো বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গীর স্বচ্ছতা তৈরী করা সম্ভব...প্রয়োজনে এডিটিংও সম্ভব...
মন্তব্য করুন