মানুষ গুরু নিষ্ঠা যার
পথ সহজ হলেই হলো, তাতেই আমোদ-তাতেই উল্লাস।
"কীর্তি কর্মার কীর্তি কে বুঝতে পারে,
সেবা চিত্তে লয়ে কোথায় রাখে ধরে,
এ কথা আর শুধাব কারে,
নিগুঢ় তত্ত্বকথা কে বলবে আমায়?"
ইতিহাস জ্ঞানে নিতান্তই বোকামানুষ আমি সাইজী'র এমন প্রশ্ন শুইনা প্রথমে চমকাইয়া উঠছি। সম্ভবতঃ সিরাজ সাইজীর অন্তর্ধানে শোকগ্রস্ত লালনের অভাগা অন্তরে এই প্রশ্ন জাইগা উঠছিলো আর্তনাদের মতোন। লালন সাই'য়ের কালামে অনেক অনুযোগ টের পাই প্রায়শঃ'ই, কিন্তু অন্তরের এমন আহাজারী হৃদয়ের স্পর্শকাতরতায় আঘাত করে। গুরু-শিষ্যের এই নির্ভরতামূলক সম্পর্কের এই ধরণটারে একেবারেই উপমহাদেশীয় মনে হয়। এর আগে আরেকটা গান শুনছিলাম উকিল মুনশী'র চরনে,
শুয়াচাঁন পাখি,
আমি ডাকিতাছি তুমি ঘুমাইছো নাকি!
তুমি আমি জনম ভরা ছিলাম মাখামাখি
আজ কেন হইলে নীরব মেলো দুটি আঁখি।
কেউ কয় স্ত্রীর অন্তর্ধানের খবর পাওনের পর মঞ্চে দাঁড়ানো উকিল মুনশী তার বিরহের প্রকাশ করতে এই গান বানছিলেন। আবার কারো মুখে শুনছি এই গান বিজয় সরকারের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ছিলো। তবে যাই হোক না কেনো বাঙালি মনস্তত্ত্বে এইরম নির্ভরতার দর্শন হরহামেশাই মেলে। আকূল প্রণতির মতোন শুনাইলেও এই সব প্রকাশ আসলে দুইজন মানুষের পারষ্পরিক সম্পর্কের রাজনীতিরে নির্দেশ করে। এই রাজনীতি আমাদের অবক্ষয়ী কালের হানাহানি-প্রতিশোধ পরায়নতার নয়, এই রাজনীতি কৌমবিলাসী জনপদের তার্কিক চরিত্রের ঐতিহাসিক নিদর্শন। গুরু-শিষ্যের কালামে বা বয়ানে ব্যবধান থাকলেও ভক্তিমূলকতায় কোনো কমতি থাকে না।
লালন সাইজী'র কালাম শুনতে শুনতে বিভোর হইয়া ছিলাম। সূচনায় তিনি ক'ন,
মিছে দৌড়াদৌড়ি করি কার মায়ায়
আমি দেখিলাম সংসার
ভোজবাজীর প্রকার...
শুরুতেই তিনি নিজের ইহজাগতিকতারে স্মরণ করেন। সংসার নামক প্রতিষ্ঠানের প্রহেলিকাময়তারে তিনি কতো সহজে তুইলা ধরেন। লালন বয়ানের সাথে যারা পরিচিত, তাদের কাছে এই রূপ উপস্থাপন সহজ আর স্বাভাবিক। আধুনিক অণু পরিবারের তত্ত্ব খুব বেশিদিনের না হইলেও পারিবারিক বন্ধনের ইতিহাস বহুদিনের। নৃতত্ত্বের প্রাজ্ঞ গবেষক মানুষেরা সংসার ধর্মের প্রবণতার সাথে মানুষের থিতু হওনের সময়কালরে এক করেন। মূলতঃ সম্পদকেন্দ্রীক অনিশ্চয়তাবোধ, (এইখানে সম্পদ বলতে একেবারেই বাঁইচা থাকনের উপাদানসমূহরেই সম্পদের একক হিসাবে ধরা হইছে), তবে এই সময়টাতে সম্পর্কের বন্ধনেও সম্পদের অনুভূতি আরোপ হইতে শুরু করে। সম্পদ হইয়া উঠে অর্জনের বিষয়, আর অর্জনের সাথে তার তত্ত্বাবধান আর ভোগের বিষয়গুলিও সম্পর্কযুক্ত থাকে। পুরুষতন্ত্রের শুরুতে ক্ষমতাশালী পুরুষ বাকীসবরেই ভোগ্য হিসাবে দেখতেছিলো। সভ্যতার বিবর্তনে দাসপ্রথা-সামন্তপ্রথা'র কাল পার হইয়া বুর্জোয়াতন্ত্রে প্রবেশকালে ভোগ্য সামগ্রী'র সংজ্ঞা ধীরে ধীরে পাল্টাইছে।
লালন যে কীসের চর্চা করতে চাইছেন তা আমার খুবেকটা ভালো জানা নাই। তবে তার মরমীবাদ চর্চা বিষয়ে একটা সাধারণীকৃত ধারণা আছে। এই ধারণা তৈরী হইছে তার কালাম শোনা আর পাঠের মধ্য দিয়া। ধইরা নিতে পারি লালনের আবির্ভাব কালে এতদঅঞ্চলে সামন্তীয় সংস্কৃতির চর্চাই প্রধান ছিলো। এই ধরনের সাংস্কৃতিক চর্চায় ভক্তিবাদের উন্মেষ ছিলো অত্যাবশকীয়। সমাজের মাথা মানে শাসকগোত্রীয় আর তার সমগোত্রীয়রা মূলতঃ ভক্তিবাদের মাধ্যমেই তাগো শাসন-শোষণের যাবতীয় কার্যকলাপরে বৈধতা আরোপ করতে চেষ্টা করছে। সেই সমাজ পুরুষতান্ত্রিক ছিলো। সেই সমাজে পরিবারের বন্ধন পুরুষের ইচ্ছানুসারেই হইতো। পুরুষের ইচ্ছা বা সুবিধা অনুযায়ী পারিবারিক ভোগ আর ত্যাগের দায়িত্ব অর্পিত হইতো নারীতে-অধঃস্তন পুরুষে কিম্বা অন্য যে কোনো মূল্যবান সামগ্রীতে।
সামন্তীয় কালের আরেকটা বিশেষ বৈশিষ্ঠ্য হইলো ধর্মের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দেওয়ার মধ্য দিয়া শাসক আর শাসিতের মধ্যে একধরনের রাজনৈতিক সম্পর্কের ধারণা প্রতিষ্ঠিত কইরা তোলা। ক্ষমতার প্রয়োগে হয়তো ধর্ম সামন্তপ্রভূগো নিরাপত্তা নিশ্চিতের আশ্বাস হিসাবে উপস্থিত ছিলো কোনো কোনো ক্ষেত্রে, কিন্তু ধর্মের নানা ভূমিকারে নেতিবাচক ধইরাও বলা যায় ক্ষমতাচক্রের দুইপ্রান্তে থাকা দুইদল মানুষের সেতুবন্ধন হিসাবেও এই প্রাতিষ্ঠানিকতার ভূমিকা ছিলো। শাসকের ক্ষমতা টিকাইয়া রাখতে যেমন ধর্মের ভূমিকা আছে আবার কৌমকেন্দ্রীক মানুষগো মধ্যে একটা একাত্ম সমাজের ধারণাও তৈরী হইছে ধর্মের বন্ধনসূলভ বেষ্টনীতেই।
চিন্তার ইতিহাসের সাথে মরমীবাদের একটা অবিচ্ছিন্ন যোগসূত্র আছে। মানুষ যখন সমসাময়িকতারে প্রশ্ন করতে শিখছে তখন থেইকাই মরমীবাদ নামের ধারণাটা বিস্তৃত হইছে। সমসাময়িকতা মানে ধইরা নেয়া ক্ষমতার দখলদারদের মতবাদ। এমনকি মরমীবাদ যখন ক্ষমতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে করতে নিজেই প্রতিষ্ঠান হইয়া উঠছে তখন আবার ভিন্ন এক মরমীবাদ আবির্ভূত হইছে তার বিপরীতে। মরমীবাদ এই অভীধা আরোপ করতে গিয়া যদিও মানুষ ভাববাদী স্পিরিচ্যুয়াল মতাদর্শিক অবস্থানরেই চিহ্নিত করছে প্রতিনিয়তঃ কিন্তু সেই ভাববাদের ভেতরেই আসলে তার বিরোধীতামূলক প্রশ্ন তৈরী হইছে কালের বিবর্তনে। মরমীবাদের এই রহস্য বুঝতে চাওয়ার চেষ্টা কখনো মানুষ করছে কীনা সেইটা আমার জানা নাই। তবে আমি বাংলার নিজস্ব মরমীবাদে আঞ্চলিক শাসকদের ধর্ম আর ধর্মভিত্তিক ব্যখ্যার বিরোধীতা খুঁইজা পাই।
লালন বা সকল বাউল সম্প্রদায় অথবা সহজিয়া ঘরানার অনুসারীগো মধ্যে সেমেটিক এলাকার অধিকাংশ সুফি অনুসারিদের মতোই নিজ অস্তিত্বের সন্ধান করবার মধ্য দিয়া সৃষ্টিকর্তার বা পরম সত্যের দিকে যাওনের একটা উদগ্র আগ্রহের নমূণা দেখতে পাই। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সুফিগণের মতো এই এলাকার মরমী চিন্তাবিদেরা নিজের অস্তিত্ব খোঁজাখুঁজির প্রক্রিয়ারে ঈশ্বরের অনুসন্ধান হিসাবেই প্রচারে নিয়া আসছে। যেই কারনে তারা জীবন যাপন আর ধারনের সুনির্দিষ্ট ধরনের কথা কয়। তবে উপমহাদেশীয় মরমীয়াদের মধ্যে একটা বিষয় সিগনিফিকেন্ট, সেইটা হইলো জাগতিক চিন্তাশূন্য স্তরে পৌছানোর প্রচেষ্টা। সেই ধারা হিন্দু সন্ন্যাসীরা করছে, বৌদ্ধ ভিক্ষুরা করছে, বাউল কিম্বা সহজিয়া গোত্রের অনুসারীরাও একইপথ খুঁজছে। সংস্কৃত-প্রাচীন আর আধুনিক বাংলায় যেই পদ্ধতিগত প্রচেষ্টারে ধ্যান বইলা অভিহিত করা হয়। আর এই ধ্যানের সামগ্রিকতারে কওয়া হয় সাধনা।
লালনের কালাম যেহেতু ব্যাপক পরিচিতি পাইছে তাই তারেই বাউল যাপনের আইকন হিসাবে ধরা হয়। কিন্তু আমরা জালাল খাঁ, বিজয় সরকার এমন আরো অনেক নাম না জানা বাউল কিম্বা সহজিয়া সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিগো বয়ানেও মানুষ ভজনের কথা শুনতে পাই। জাগতিকতার বলিহারীতে ক্ষমতা আর লোভের দ্বন্দ্ব বিষয়ে উল্লেখ পাই। সম্পদ কেন্দ্রীক মানসিকতায় যেইসব বৈষম্য তৈরী হইছে সভ্যতার বিবিধ টানাপোড়েনে সেইসব বিরোধীতার আহ্বান শুনি।
সম্পর্কের ধরণ নিয়া আলোচনা শুরু করছিলাম। সেই সম্পর্ক যাত্রা উদাহরণ ছাড়া সূত্র উল্লেখ ছাড়াই পৌছাইয়া গেছে মরমীবাদের সামগ্রিক আলোচনায়। এইরম আলোচনায় আবেগ থাকলেও বাস্তবিক প্রতিষ্ঠানের নিরীখে তার কোনো গ্রহণযোগ্যতা নাই। লালন সাইজী কালাম রচনা করলেন সিরাজ সাইয়ের অন্তর্ধানের পর সেই কালামে আমরা এক অন্যরকম সম্পর্কের সম্ভাবনা টের পাই। এই সম্পর্কে গুরু শিষ্য নাই, সম্পদের মালিকানা নাই, দখলদারীত্ব কিম্বা গর্বের ছোঁয়া নাই...বরং আছে পারস্পরিক তর্ক আর আলোচনার মধ্য দিয়া আত্মপরিচয় খোঁজার চেষ্টা।
যে করে এই লীলে তারে চিনলাম না,
আমি আমি বলি ভবে আমি কোন জনা!
মরি এ কী আজব কারখানা
এবার গুনে পড়ে কিছুই ঠাহর নাহি হয়...
গুরুর অন্তর্ধানও সাইজী'র অন্তরে প্রশ্নের পরিসর তৈরী করে। মৃত্যুর রহস্যময়তাও তার অন্তরে আত্মপরিচয়ের সংকট হিসাবে আবির্ভূত হয়। তবে আহাজারীর স্বরূপ পরিবর্তীত হয় না। বরং নিগুঢ় তত্ত্ব আলোচনার অভাববোধের ইঙ্গিত ঠিক থাকে...আমার কাছে এই আহাজারীর আরেকটা বিকল্প অর্থ তৈরী হয় অবশ্য। সম্পর্কের রাজনীতির আবেগী অনুবাদ বাউল সাধক মানুষরেও আসলে মানুষ কইরা তোলে। এই আবেগে কি অভ্যাসের দাসত্ব থাকে? থাকতে পারে...এই আবেগে কি ভক্তিবাদের আছর একেবারেই থাকে না? থাকতে পারে। কিন্তু সোজাসাপ্টা প্রশ্নের ধরনে একরকম নিস্পৃহতাও কি টের পাওয়া যায় না? মৃত্যুরে আধিবিদ্যক ব্যখ্যায় খোঁজার আগ্রহ প্রকাশিত হইলেও ঈশ্বর বা কীর্তিকর্মা বা যে এই লীলার পরিচালনা করে তার সমান্তরালে মানুষ গুরু'র প্রতি শ্রদ্ধার প্রকাশও কি বড় কইরা দেখা হইতেছে না!





পড়তে পড়তে আউলায়া গেলাম।
লেখাটা বেশ এলোমেলো হইছে রায়হান ভাই, আপনের আউলানো স্বাভাবিক। আর পুরাটা পড়ার পরেও বোঝা যায় না আমি কি বলতে চাইছি। এই কারনেই প্রথম পাতা থেইকা সরাইয়া নিছি। তবে মুইছা ফেলি নাই কারণ মূল যেই ভাবনাটা তৈরী হইছে সেইটারে নিজের কাছে ইন্টারেস্টিং লাগছে। এইটারে অ্যাবস্ট্রাক্ট ধইরা হয়তো ভবিষ্যতে ভালো কিছু লেইখা ফেলতে পারবো...
মন্তব্য করুন