ভাষাভিত্তিক জাতি আর ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বা বিষয়ে প্রাসঙ্গিক কিছু ভাবনা...
১.
জিনিষরে সরলীকরণের সুবিধা যেরম, জ্বালাও ঠিক একইরকম বাড়ে। ১৯৭১-এ এই দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সাংগঠনিক যেই আবেদন আছিলো, সেইখানে ভাষাভিত্তিক জাতির স্বপ্ন আসলে কদ্দূর ছিলো সেইটা কি কখনো বিতর্কের মুখামুখি হইছে? আমি দেখি নাই...এমনকি জিয়াও সেইটা স্বীকার কইরা নিয়াই কইছিলেন, যে এই ভূখন্ডে অন্য ভাষাভাষি মানুষের অবস্থানরে স্বীকৃতি দিতে হইলে দেশের জাতীয়তা হইতে হইবো ভূখন্ডের সীমানা কেন্দ্রীক। এই হইলো সরলীকরণের জ্বালা!
পাকিস্তানের উর্দুভাষী আধিপত্যবাদের লগে লাগছিলো আসলে কাদের? ইতিহাস কয় বাঙালী প্রতিরোধই ছিলো মূখ্য...এই বাঙালী আসলে কারা? হাজার বছরের বিভিন্নরকম আধিপত্য-সংগ্রাম-মূখাপেক্ষী জীবন যাপনের মধ্য দিয়া তৈরী হইছিলো একটা যোগাযোগমূখীন জাতি, যারা মূল ধ্বনিগত অবস্থান থেইকা প্রায় একইরম উচ্চারণ করে...কেবল অভিজ্ঞতার কারণে কিছু চিহ্ন ব্যতিক্রমী ভঙ্গীতে ব্যবহৃত হয়। কিছু শব্দ পরিবেশের কারণে পাল্টাইছিলো...বাতাসের ভূমিকা, মাটির ভূমিকা ছিলো এই পালটানির খেলায়...
২.
জাতিসংঘ বহুদিন আগেই ঘোষণা দিছে সব প্রান্তিক জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতি আর ভাষারে বাঁচাইয়া রাখতে ভূমিকা নিতে হইবো, লূপ্ত প্রায় ভাষারে শিক্ষার সাথে সম্পর্কীত কইরা দিতে হইবো। এখন এইটা কারা করবো? জাতিসংঘ কয় এই দায়িত্ব সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতির নিয়ন্ত্রক অংশের! বাংলা ভাষাভাষীরাই যেহেতু এই এলাকায় বেশি, তারাই যেহেতু এইখানে শিক্ষা কাঠামোর পরিকল্পক, তাই তারাই আগাইয়া থাকা...কিন্তু এই টপ ডাউন প্রক্রিয়া আসলে কেমনে খেলে তার খেলা!? আমি আসলে একজন পাহাড়ি যুবার স্বপ্ন কেমনে বুঝি? আমার মনে আছে ১৯৯৪ সালে ব্যোম নারীগো টপলেস দেখছি তাগো এলাকায় কাজ করনের টাইমে, সেই একই জনগোষ্ঠীর নারীরা এখন টিশার্ট টপ্স আর জিনস পরে! আমার কাছে মনে হয় সংস্কৃতি গেলো! কিন্তু আসলে কি হইলো তা কি কক্ষনো ভাবছি! ভাবনাটা কি আসলেই সম্ভব? আমি মনে করি সম্ভব না, অন্য অনেকেই হয়তো অন্যরম ভাবেন।
যেই বিষয়ে শুরু করছিলাম সেইটা এক্কেরে ভিন্ন ছিলো...এই জাতির মুক্তিকামী স্বপ্নে ছিলো বাংলা ভাষা! এর বাইরে অন্য কোন ভাবনার আসলেই কোন জায়গা নাই, যদি এর বাইরে কেউ কিছু ভাবে সেইটার দায়িত্ব নিতে হইবো তারেই, গালাগালির মুখোমুখি হওয়ার বিষয়েও আমার কোন ভূমিকা থাকবো না তখন। তবে প্রশ্ন জাগত্ই পারে এই ভাষা ভিত্তিক স্বপ্নে অন্য ভাষাভাষিরা কেমনে ছিলো? পাহাড়ি জনপদের মানুষেরা আসলে কেমনে ছিলো? তৎকালীন চাকমা রাজা ছিলেন পাকিস্তানের পক্ষের লোক। কিন্তু পুরা পাহাড় কি একইরম ভাবছিলো? না! মানবেন্দ্র লারমা ভাবেন নাই...প্রীতি চাকমা ভাবেন নাই। তারা বাঙালীর অধিকার আদায়ের সংগ্রামে-যুদ্ধের সাথী হিসাবে থাকলেও নিশ্চিত নিজের জাতিগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র পরিচয় নিয়া এই ভূখন্ডেই থাকতে চাইছেন! তারা কি বাঙালী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারেন? নিশ্চয়ই না!
৩.
ভাষাভিত্তিক একটা জাতির নেতৃত্বে আন্দোলন শুরু হইলেও, এই ভূখন্ডে অন্য যেইসব ক্ষুদ্র জাতি তারা আসলে কেমনে চলতে চায় তার সকল টেকনিক্যাল প্রোপার্টিস তারা নিজেরাই ঠিক করবো, এইটাই স্বাভাবিক...জাতিগত আধিপত্যবাদের স্থান কি সভ্যতা অনুমোদন করে!? পাহাড়ে থাকা মানুষেরা বাঙালী হইতে চায় কি না...তারা আলাদা রাষ্ট্র গঠন করতে চায় কি না...তারা এই রাষ্ট্রেই তাগো সংস্কৃতি, ভাষা, আর আনুসঙ্গিক জীবন যাপন নিয়া সমান্তরালে চলবো কি না...এইসব তাগো ভাবনার বিষয়। কথা গুলি আসলে ইঙ্গিত করে পাহাড়ি এলাকায় স্বায়ত্বশাষণের। পাহাড়ি এলাকায় ১৩টা ক্ষুদ্রজাতি সত্ত্বার অবস্থান সরকারী ভাবে চিহ্নায়িত। তাগো মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক কিরম আমরা বুঝুম...বা বুঝি? মারমাগো লগে চাকমা কিম্বা কুকিগো লগে মারমাগো রিলেশন কি আমাগো বুঝনের জো আছে? আমি নিজে খুব ভালো জানিনা। এই জ্ঞানের জন্য আসলে ঐ এলাকার ইতিহাস, বিভিন্ন জাতিস্বত্ত্বার ঐ এলাকায় অবস্থানের ইতিহাস জানাটা জরুরী...
যাই হোক আমার কাছে এই সময় পর্যন্ত এইরকম অন্তঃরাষ্ট্রীয় আচরণে সবচাইতে বড় উদাহরণ সোভিয়েত ইউনিয়ন...একরাষ্ট্রে কেমনে ১৫টা ভাষা সরকারী হইতে পারে সেইটা বুঝন যায় তার দিকে তাকাইলেই। কালচার এক্কেরে সাবজেক্টিভ একটা বিষয়...এই জ্ঞান তৈরী হইতে অনেক প্রভাবক অনেক অভিজ্ঞতা কাজ করে...এইটারে কারা টিকাইবো সেইটা আসলেই এই ২০১০'এ একটা আলোচ্য হইতে পারে। পাল্টানোর ধরণ কিরম হইবো, উপর থেইকা আমরা? নাকি ভিতর থেইকা অন্যরা? অবরোহ নাকি আরোহের পদ্ধতিগত পরিবর্তন হইবো একটা এলাকায়।
৪.
যদিও পাহাড়ের মানুষেরা জাতিরাষ্ট্র গঠনের পর থেইকাই আছে বিপদে। সেই আয়ুব শাহী থেইকা শুরু, তারপর দেশ স্বাধীন হইলো ঠিকই কিন্তু পাহাড়ের স্থবিরতা বাড়লো। শেখ মুজিবের মতোন জাতীয় নেতা একজন পাহাড়ি নেতারে কইলেন বাঙালি হইয়া যাইতে। আওয়ামি শাসন এরপর আর বেশিদিন কন্টিনিউ করে নাই, নাইলে হয়তো তখন থেইকাই শুরু হইতো লাঠির শাসন। পাহাড়িগো বেত মাইরা বাঙালি বানানের খেলা। কিন্তু পরবর্তী শাসক মেজর জিয়ার মাথা থেইকা বাইর হইলো যুদ্ধবাজীর তত্ত্ব...সে আইসা বঞ্চিত বাঙালিগো পাহাড়ে পাঠাইতে শুরু করলো। সেনাবাহিনী জ্যামিতিক হারে ডিপ্লয়েড হইতে লাগলো অত্র অঞ্চলে। আর দরিদ্র বঞ্চিত বাঙালিগো বানানো হইলো মানব ঢাল। তারা অভিবাসনের নামে সেনা চৌকীর চাইর পাশে অবস্থান নিলো। নীরব নির্যাতন শুরু হইলো পাহাড়ি মানুষের উপর।
এরশাদ আইসা এই প্রক্রিয়ারে একই গতিতে আগাইয়া নিতে লাগলো। সাথে শুরু হইলো সরাসরি পাহাড়ি গ্রামগুলিতে আক্রমণের কৌশল। গ্রামকে গ্রামে জ্বলছে আগুনের লেলিহান শিখা। লোগাং পুড়ছে, সাজেক পুড়ছে...
পরবর্তী নির্বাচিত বিএনপি সরকারো কি পারছে সেনাবাহিনী বিষয়ে সিদ্ধান্ত পাল্টাইতে, একেবারেই না। তয় আওয়ামিরা আগের বার আইসা একটা চটকী সিদ্ধান্ত নিতে পারছে। তারা এরশাদ আমলে সুবিধাবাদী পাহাড়ি নেতা প্রীতি চাকমার সাথে যেই চূক্তি হইছিলো সেইটারেই ঝারপোছ কইরা চালাইয়া দিলো অবিসংবাদিত চূক্তিনামা বইলা। পাহাড়িগো দুইভাগে বিভক্ত কইরা দিলো তারা রাজনৈতিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে। যেই বিভাজন খানিকটা এমএন লারমা'র শান্তিবাহিনী গঠন প্রক্রিয়ার সময় থেইকাই শুরু হইছিলো সেইটারে ব্যবহার করলো আওয়ামিরা। পাহাড়িরা বিভক্তি তাগো দূর্বল করলো। সেই সুযোগটা নিতে শুরু করলো রাজনৈতিক দলগুলি। চূক্তির বিরোধীতা করলেও তার সুবিধা নিয়াই ওয়াদুদ ভূইয়া খাগড়াছড়িতে সাম্রাজ্য বানাইছে। অভিবাসী বাঙালিরা ছড়াইয়া পড়ছে দিকে দিকে। পায়ে পারা দিয়া ঝগড়া বাধাইয়া আক্রমণ করছে পাহাড়ি গ্রামগুলিতে।
৫.
তারই ধারাবাহিকতায় এখনো চলে আক্রমণ। সেনাবাহিনী আর অভিবাসীরা দখল করে পাহাড়িগো যূগ যূগ ধইরা ব্যবহার কইরা আসা গোত্রভূক্ত জমি। দখল করে তারা সংস্কৃতি...বিনিময়ে পুড়ে যায় পাহাড়ের স্তেপে স্তেপে তৈরী হওয়া অসংখ্য গ্রাম, পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ঝড়ে অশ্রু...যার নোনা গন্ধ টের পাওয়া যায় প্রত্যেক পাহাড়ি পথেই...





সুন্দর বলেছেন ভাষ্কর
ব্যাপারটা আসলে এত সহজ না মনে হয়।
ভাষার ব্যাপারটা অনেক বেশি স্পর্শকাতর। কারণ, একটা মানুষের স্বাধীনতার চেয়েও তার ভাষাভিমান অনেক বেশি তীব্র।
আর, কেবল সোভিয়েত রাশিয়াই না, একাধিক জাতীয় ভাষার প্রচলন অনেক দেশেই আছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় মনে হয় ৭টা, সুইজারল্যান্ডে ৩টা, এমন আরো অনেক উদাহরণ দেয়া যাবে।
বাংলাদেশে যেটা করা উচিত আমার মনে হয়, তা হল, আদিবাসী/ অধিবাসী/ পাহাড়ি/ উপজাতি যে নামেই তাদের ডাকি, সেটা আসলে তাদের নাম হতে পারে না, তাদের স্বতন্ত্র্য জাতীয় নাম তো আছেই, সেগুলোর ভাষাগুলো সংরক্ষণ করা উচিত, এবং তাদের নিজ নিজ এলাকায় এ সংশ্লিষ্ট স্কুলের প্রবর্তন করা উচিত; যাতে বাচ্চারা শুরু থেকেই বাংলা ভাষার পাশাপাশি নিজ ভাষায় লিখতে, পড়তে পারে।
মুক্তবয়ান ভাই আমি বুঝি নাই আপনে কোন ব্যাপারটারে সহজ না বললেন। ভাষাভিমান বিষয়টা যদিও অনেক মনস্তাত্ত্বিক বিষয় তবুও আমি তারে অগুরুত্বপূর্ণ মনে করলাম না...তো!? মানুষের স্বাধীনতার চাইতে সেইটা বড় হইয়া গেলো!? ভাষার মিল লইয়াও তো হানাহানি চলে বিভিন্ন দেশে স্বাধীনতার লেইগা। যদিও এর বিপরীত উদাহরণও আছে কিন্তু সেই বিরোধে ভাষা একটা অনুসঙ্গ মাত্র...মূল বিষয়টা আরো ব্যপক, পুরা সংস্কৃতিগত বিরোধই সেইসব ক্ষেত্রে নিয়ামক। আরো অনেক দেশেই একের অধিক ভাষার স্বীকৃতি থাকলেও সোভিয়েত ইউনিয়নের নামোল্লেখের পেছনে কারণ আছে। আপনে যেই দেশগুলির কথা কইলেন তারচাইতে বেশী সংখ্যক ভাষা গ্রেট ব্রিটেনেই সাংবিধানিক স্বীকৃতি পাইছে তাগো ঐখানে সম্ভবতঃ ১১টা ভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আছে। আমাগো বাংলাদেশেই দুইটা ভাষা সাংবিধানিক ভাবে স্বীকৃত। বাংলা আর ইংরেজী।
...
সোভিয়েত ইউনিয়নে কেবল ১৫টা ভাষা না, সাংস্কৃতিক ভিন্নতা নিয়া ১৫টা জাতির অবস্থান ছিলো। বিপ্লব সংগঠনের পর লেনিন আহ্বান জানাইছিলে রাশিয়া আর ইউক্রেনের বাইরে থাকা দেশগুলিরে, যে তারা চাইলে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে যুক্ত হইতে পারে। কিন্তু তারা নিজেগো সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ নিয়াই থাকতে পারবো সোভিয়েত ইউনিয়ন নামের সামাজিক রাষ্ট্রে। এমনকি স্ট্যালিনও ছিলেন একটা ভিন্ন ভাষিক রাষ্ট্রের মানুষ...জর্জিয়ার নাগরিক।
প্রশ্ন হইলো জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি। উপজাতি মানে আপনে মনে করেন তারা বাংলা থেইকা উদগত একটা অংশ...অধিবাসী কইলেও বিষয়টাতে অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় না। পাহাড়ে থাকে বইলা আমরা ১৩টা জাতিরে পাহাড়ি কই কিন্তু এইটা কখনো কোন সাংবিধানিক এক্সপ্রেশন হইতে পারে না। আর আদিবাসী বললেও পুরাটা বলা হয় না। সংবিধানে সকল ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার নামোল্লেখ সহ'ই থাকতে হইবো। তারা বাংলা শিখবো কি শিখবো না সেইটাও তাগো অধিকারের বিষয়। তাগো শিক্ষা ব্যবস্থারে আমরা ক্যানো ডিকটেট করুম...এইটা তাগো উপরেই ছাইড়া দেন না ক্যান...নিজেরে বাঙালী হিসাবে কি এতোটাই গর্বিত মনে করেন!?
পাহাড়িগো যেই মূল আন্দোলন সেইটার প্রধান দাবী হইলো সংবিধানে তাগো অস্তিত্ব স্বীকার কইরা নেওয়া...এখনো হয়তো আছে কিন্তু সেইটা আইনগত নয়, অনেক দায়সারা গোছের। তারপর আসে বাকী সব অধিকার আদায়ের প্রশ্ন। ভাষাভিত্তিক আধিপত্যের নমূনাতো আমরা প্রতিনিয়তঃই দেখি...শেখ মুজিব দেখাইছেন তার জাতীয়তাবাদী অহংকার, জিয়ার হাটু নির্গত আগ্রাসন দেখি...এরশাদের অন্য কোন স্থান হইতে নির্গত বুদ্ধিবৃত্তি দেখি...খালেদা-হাসিনা তো কেবল অনুসরণ করে পূর্বসূরীগো।
ভাষার অভিমান থেইকা সইরা আইসা ভাষাভিত্তিক আধিপত্যবাদীগো লজ্জিত হওনের সময় এখন।
ভাষাভিত্তিক একটা জাতির নেতৃত্বে আন্দোলন শুরু হইলেও, এই ভূখন্ডে অন্য যেইসব ক্ষুদ্র জাতি তারা আসলে কেমনে চলতে চায় তার সকল টেকনিক্যাল প্রোপার্টিস তারা নিজেরাই ঠিক করবো, এইটাই স্বাভাবিক...জাতিগত আধিপত্যবাদের স্থান কি সভ্যতা অনুমোদন করে!?
এই ব্যাপারটা এত সহজ না। কারণটা বলি, এভাবে যদি হয়, তাহলে একটা ছোট্ট ঘটনা বলি, ভারতের অন্ধ্র প্রদেশ একটা বিশাল প্রদেশ। তারা নিজেরাও কিন্তু দাবি তুলছে নিজেদের স্বায়ত্ত্বশাসনের। কিন্তু, ভারত সরকার সেটা সমর্থন করছে না, বা, ঐ প্রদেশও এটা নিয়ে তেমন একটা উচ্চবাচ্য করছে না। এখন প্রশ্ন হল, ঐ প্রদেশ আর আমাদের পাহাড়ি মানুষগুলোর অবস্থান এক কাতারে কি না? যেখানে আমাদের মানুষগুলোর ভাষা, সংস্কৃতি আজ হুমকির মুখে সেখানে স্বায়ত্তশাসন অনেক দূরের ব্যাপার।
জাতিসংঘ বহুদিন আগেই ঘোষণা দিছে সব প্রান্তিক জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতি আর ভাষারে বাঁচাইয়া রাখতে ভূমিকা নিতে হইবো, লূপ্ত প্রায় ভাষারে শিক্ষার সাথে সম্পর্কীত কইরা দিতে হইবো। এখন এইটা কারা করবো?
এই ব্যাপারে আমার মত হল, বাঙালিদের উচিত এখানে এগিয়ে আসা। আমরা নিজেরা পাহাড়িদের উপর চলমান আগ্রাসন বন্ধ করতে পারি। তাইলেই মনে হয় তাদের নিজ ঐতিহ্যের প্রতি যে হুমকি সেটা বন্ধ হবে। আর, ঐতিহ্যের প্রতি হুমকির কথাই যদি বলতে যান, তাহলে সেটার খুব সরলীকরণ করে বললে পুঁজিবাদের অনুপ্রবেশের ফলাফর বলতে পারেন। যে কারণে আমাদের বাঙালীরা এখন শাড়ি, কামিজ ছেড়ে জিন্স, ফতুয়া বা ক্যাপ্রির দিকে ঝুঁকছে। একই কারণে পাহাড়িরাও।
ভাষাভিমান বিষয়টা যদিও অনেক মনস্তাত্ত্বিক বিষয় তবুও আমি তারে অগুরুত্বপূর্ণ মনে করলাম না...তো!? মানুষের স্বাধীনতার চাইতে সেইটা বড় হইয়া গেলো!?
কথার টোনটা আপনে ধরতে পারেন নাই মনে হয় ভাইয়া।
ব্যাপারটা ছিল এমন, নিজের ভাষার প্রতি প্রীতি। সবারই নিজের ভাষার প্রতি টান থাকবে, যেটা স্বাধীনতার চাইতেও বেশি হবে। আরেকটা খুব কাছের উদাহরণ দেই। '৪৭এর দেশ ভাগের সময় কিন্তু আমরা পরাধীন ছিলাম। আমাদের মাঝে শোষণের প্রতিবাদ ছিল, হয়ত দেশভাগের চেতনাও ছিল, কিন্তু, তা এত প্রবল ছিল না। '৫২তে যে তীব্র বিস্ফোরণ হল মানুষের মাঝে, তা এসেছিল কিন্তু ভাষার উপর আঘাতের ফলেই। তখন কিন্তু, মানুষ দু'টি পৃথক দেশ চায়নি। চেয়েছিল কেবল তার মাতৃভাষার স্বীকৃতি।
তাই, বলেছি, মানুষের ভাষার চেতনার বহি:প্রকাশ ঘটে প্রথমে, তারপর স্বাধীকারের কথা।
তাগো শিক্ষা ব্যবস্থারে আমরা ক্যানো ডিকটেট করুম...এইটা তাগো উপরেই ছাইড়া দেন না ক্যান...নিজেরে বাঙালী হিসাবে কি এতোটাই গর্বিত মনে করেন!?
এখানে ডিকটেট কথাটার সাথে দ্বিমত। কেননা, "যস্মিন দেশে যদাচার" আমাদের সাথে নেপাল থেকে আসা কিছু ছেলে পড়ে। যদিও আমাদের সরকারি হিসেবে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা পড়লে তার মাধ্যম হতে হয় ইংরেজি, তারপরও অধিকাংশ শিক্ষকরাই বাংলায় পড়ান। কাজেই ঐ সব ছাত্রদের নিজ প্রয়োজনেই বাংলা শিখে নিতে হচ্ছে।
তাই আমি প্রত্যেক জাতি-গোষ্ঠীর নিজ নিজ ভাষার প্রতি সম্মান দেখিয়েই বলছি, যেহেতু আমাদের সাধারণ ভাষা বাংলা, কাজেই পাহাড়ে অবস্থানকারীদের নিজেদের ভাষার পাশাপাশি বাংলাও শিখে আসা উচিত।
পাহাড়িগো যেই মূল আন্দোলন সেইটার প্রধান দাবী হইলো সংবিধানে তাগো অস্তিত্ব স্বীকার কইরা নেওয়া...এখনো হয়তো আছে কিন্তু সেইটা আইনগত নয়, অনেক দায়সারা গোছের।
এই ব্যাপারে লজ্জিত।
এবং অবশ্যই নিজেরে বাঙালী হিসাবে এতোটাই গর্বিত মনে করি।
বিশাল মন্তব্যের লিগ্গা ধন্যবাদ।
উদ্ধৃতি না দিয়াই উত্তর গুলি একে একে দেই।
১.
আপনে ভারতের উদাহরণ দিলেন কিন্তু প্রয়োজনীয় উদাহরণ দিলেন না। অন্ধ্র প্রদেশের আন্দোলনের চাইতেও বড় আন্দোলন চলতেছে ভারতে বহুদিন ধইরা। আসাম-মিজোরাম-নাগাল্যান্ড-মেঘালয়-ত্রিপুরা (বাকী দুইটা রাজ্যের কথা মনে পড়তাছে না এই মুহুর্তে। wiki দেখনেরও আগ্রহ হইতাছে না এই গভীর রাইতে।) এইরম সাতটা রাজ্য নিয়া যেই বেল্ট সেভেন সিস্টার্স নামে পরিচিত, তারা আন্দোলন চালাইতেছে স্বায়ত্বশাসনের দাবীতে, প্রকারান্তরে যা প্রায়শঃ স্বাধীনতার দাবীও তুইলা ফেলে। বঞ্চিত জাতি যতোই ক্ষুদ্র হোক, যতোই দূর্বল হোক তার স্বাধীনতার দাবী যৌক্তিক হয়। সহজ পথ না কঠিন পথ এই হিসাব নিয়া পইড়া থাকলে আপনেরে ৭১'এ রাজাকার উপাধী পাইতে হইতো নিশ্চিত।
২.
প্রান্তিক জাতিগোষ্ঠীর শিক্ষা আর সংস্কৃতি বাঁচানের মহান দায়িত্ব তাদেরই...যেহেতু বাঙালি শাসন তাগো পিছাইয়া দিছে সবসময় তাই জরিমানা বাবদ বাঙালিরা তাগো রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা দিতে বাধ্য। সেইটা টাকা পয়সা আর ইনফ্রাস্ট্রাকচার গঠন সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কিন্তু নিয়ন্ত্রণটা অবশ্যই প্রান্তিক ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার হাতেই থাকতে হইবো।
৩.
আপনের অংক মতে বাঙালিরা ভাষাভিমানের দোলায় ভারতের সাথে যাওনের কথা...কারণ ঐখানে ভাষার আভিজাত্য রক্ষা হইতো বেশি। কিন্তু আসলে তা হয় নাই। কারণ উদ্ভট দ্বিজাতি তত্ত্ব দাঁড়াইয়া গেলো সামনে। মানুষের কাছে ভাষার অভিমানের চাইতে ধর্মীয় অভিমান বেশি ছিলো মনে হয়। যেই কারণে ৪৭'এ পরাধীন থাকলেও এই দেশের মানুষ ক্ষুব্ধ হয় নাই...যদিও এই বিবৃতি আমি নিজেই সমর্থন করলাম না। রাজনীতিবিদগো ভাগাভাগি আর কামড়াকামড়ির বাইরেও মানুষ ক্ষোভ পুঁজি কইরা ছিলো তা নইলে এতো তাড়াতাড়ি ৪৮'এই ভাষাভিত্তিক আন্দোলনের পথ তারা তৈরী করতো না। ঐ সময়ের বক্তব্য গুলিতে তার প্রকাশও হইছে...
৪.
এইখানে আমি প্রবল যুক্তিবাদী হইতেছি না...তয় পাহাড়িরা কি করবো সেইটা তাগো উপরেই ছাইড়া দিতে চাই। একজন জুম্ম জনতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবো নাকি জুম চাষের আধুনিক গবেষণা করবো লোকাল নলেজ ব্যবহার কইরা, সেইটা আমি ঠিক কইরা দেওয়াটা অনৈতিক মনে করি। বাঙালিরা এই ঠিক কইরা দেওয়ার মানসিকতাতেই আধিপত্য চালায়...গ্রাম কে গ্রাম পোড়ায়। আর্মিরা মুরং মেয়েদের ব্লাউজ পরতে শিখাইতে চায়। পুরুষদের ধর্মীয় পানীয় তৈরীতে নিষেধাজ্ঞা জারী করে। সবতো মুসলমানি নৈতিকতা। তাগোটা তাগো উপরেই ছাইড়া দেওনটা আমার কাছে অধিক গ্রহণীয় মনে হয়।
৫.
বাঙালি হিসাবে আমার তেমন গর্ব নাই। এইটা আমার কাছে নিয়তির মতোন। বাপ-মা বাঙালি তাই আমিও বাঙালি। তারা মুসলমান তাই পাসপোর্টে আমিও মুসলমান। আমি বরং নিজেরে শ্রদ্ধাশীল রাখতে চাই নিজের অভ্যস্ততার আধিপত্যে না গিয়া।
পার্বত্য এলাকায় সামরিক অভিযান শুরু হয় ৭০ দশকেই। ৭০ দশকের শেষভাগে জেনারেল মন্জুর নাকি বলেছিলেন, "আমি পার্বত্য চট্টগ্রামের মাটি চাই, মানুষ চাই না"। (শোনা কথা, সূত্র নাই)
৭০ দশকের শেষভাগেই ঐ অঞ্চলে মেজর জিয়ার নির্দেশে আর্মি নিয়োজিত করনের হার মাত্রা ছাড়াইতে শুরু করে...যা শুনছেন সত্য শুনছেন...
এটাতো গেলো সমস্যার উৎস বা স্বরূপ সন্ধান কিন্তু এর প্রতিকার কি?
"জাতিসংঘ বহুদিন আগেই ঘোষণা দিছে সব প্রান্তিক জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতি আর ভাষারে বাঁচাইয়া রাখতে ভূমিকা নিতে হইবো, লূপ্ত প্রায় ভাষারে শিক্ষার সাথে সম্পর্কীত কইরা দিতে হইবো। এখন এইটা কারা করবো?"
শান্তিচুক্তিতে এই সম্পর্কিত কোন ঘোষণা অথবা প্রস্তাব কিছু ছিলো?
কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে তাদের নিজস্ব ভাষা শেখানোর ক্লাস হয়। স্বেচ্ছাসেবক নাকি ইউএন- কাদের উদ্যোগে, সেটা জানি না।
উদ্যোগটা রোহিঙ্গাগোই সহযোগিতা করে ইউএনএইচসিআর। তবে রোহিঙ্গারা এইখানে বাংলা আর ইংরেজী শিখতে বেশি আগ্রহী। আমি একটা ছোট গবেষণামূলক কাজ করছিলাম ঐ এলাকায়। ঐটা নিয়া আমার একটা ভ্রমণ কাহিনী লেখা আছে পুরানা।
উপজাতীয় ভাষাগুলো তো লুপ্ত হবার পথেই। অক্ষরহীন ভাষাগুলো সহজে লুপ্ত হয়। পৃথিবীর ৬ হাজার ভাষার মধ্যে কার্যকর আছে মাত্র কয়েকশো।
কেবল ভাষা নয়, অন্য সকল সমস্যার ক্ষেত্রেও সংখ্যালঘুদের ব্যাপারগুলো সংখ্যাগুরুদের চশমা দিয়ে বিচার করা হয়েছে, ফলে একপক্ষে সুবিচার করতে গেলে অন্যপক্ষের অবিচার হয়ে যায়। অবিশ্বাস একটা বড় ফ্যাক্টর এখানে। এই অবিশ্বাস দুর করার মতো মধ্যস্ততাকারী দেখা যায়নি এখনো পর্যন্ত।
উপজাত শব্দটা অস্বস্তিকর লাগে...চাকমাগো বর্ণমালা আছে...মারমাগোও বিলুপ্তপ্রায় টেক্সট আছে। তঞ্চঙ্গাগোও যদ্দূর জানি হরফ আছে। কিন্তু ব্যবহার না হইতে হইতে এই সব লুপ্ত হইতেছে।
মন্তব্য করুন