নতুন পৃথিবীর পথে, হলিউডি সিনেমার নতুন যাত্রা...
সিনেমা দেখাটা আসলে একধরণের অভ্যাস। মানুষ আসলে বিনোদিত হইতে চায় বইলাই সিনেমা দেখে, মানুষ সিনেমা দেখে নিজেরে সামাজিক সম্পর্কের অ্যাসপেক্টে যাচাই করতে, মানুষ সিনেমা দেখে উদ্বুদ্ধ হইতে...এইরম অসংখ্য সাবটেক্সটের উল্লেখ করা যায় সিনেমার উপস্থাপণ বিষয়ক আলোচনায়। কিন্তু যে সিনেমা দেখে এইটারে আসলে তার অভ্যাস মনে হয় আমার কাছে। তার এই অভ্যাসরে জায়েজ করতে গিয়া সে হেতু নির্ধারণ করে। আমিও অভ্যাসবশতঃ সিনেমা দেখি। দেখাদেখির নির্বিঘ্নতা নিশ্চিত করতে অভ্যাসের স্কেজ্যুয়ালিং করি। যেমন এখন দেশে সকাল ৯টা থেইকা রাত ১২ পর্যন্ত কেউ টানা একটা সিনেমা দেখতে পারবো বইলা নিশ্চিত করতে পারে না। কেবল রাত বার'টার পরেই আমি জানি যে বিদ্যুৎ বহাল থাকে।
সিনেমার সাথে আরো যেই কয়টা বিষয় আপনাসেই জড়িত হয় তার মধ্যে রাজনীতি প্রধান, এরপর আসে সামাজিক সম্পর্ক, আসে পাগলামীর ইতিহাস, নৃশংসতা...আমরা প্রায়শঃই আজকাল বিরাজনৈতিক মানসিকতায় ডানা মেলি। কই হালকা চালের সিনেমা দেখুম...আর দেখি ধরেন ক্রাউচিং টাইগার হিডেন ড্রাগন। এই সিনেমায় মারামারি আছে প্রাচ্য ঘরাণার, প্রেম-ভালোবাসা আছে, আছে রহস্যের উন্মোচন...কিন্তু রাজনীতি কি নাই!? বলামাত্রই হয়তো পাঠকের মনে পড়বো এই ছবিতে বৈষম্য আর কুচক্রীর গল্প আছে...যা একেবারেই রাজনৈতিক উপাদান হইয়া উঠছে মানব সভ্যতার ইতিহাসে। এমনকি ফ্যান্টাসী ছবিও রাজনৈতিক বক্তব্য অন্তর্নিহিত করে তার শরীরের পরতে পরতে।
আমি সবধরণের ছবি দেখি এখন...ইউরোপের সামাজিক দোদুল্যমানতার ফ্যান্টাসাইজ্ড রূপায়ণ, হলিউডের হিরোইক ইলিউশান কিম্বা মুম্বাইয়ের বৈষম্যজাত সংঘর্ষের গল্প-গাঁথা। বিষয়টারে অনেক ভারী কইরা ফেললাম হয়তো এই ট্যাগিংয়ের মাধ্যমে, কিন্তু আরেকটু বিস্তৃত দিলেই মনে হয় বুঝাইতে সক্ষম হমু আসলে কি কইতে চাই। যদিও বাজার সংস্কৃতির এই কালে এইভাবে ট্যাগিং অনেক্ষেত্রে অপরাধও বিবেচিত হইতে পারে। কারণ ইউরোপে এখন হলিউডের অনুকরণে সিনেমার তৈরী হয় প্রচূর, কারণ তার বাজার আছে...হলিউডে বাজার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে শুদ্ধ সিনেমার স্রোত মৃদূ হইলেও আছে ইন্ডি ছবির ব্যানারে, আবার মুম্বাই সিনেমা এখন বৈষম্যের বাইরেও কেবল সম্পর্কের গল্প কয়।
অস্কার পুরস্কার প্রাপ্ত সিনেমা নিয়া আমার আগে কখনোই আগ্রহ ছিলো না। সম্ভবতঃ ২০০৬ সালে একটা সিনেমা দেখছিলাম ক্র্যাশ নামে। ঐটা দেখার পর মনে হইছিলো হলিউডি সিনেমা ব্যবসায়িরাও কেবল নায়ক-ভিলেনের রাজনীতির বাইরেও ভাবতেছে। তারা মানুষে-মানুষে যেই সম্পর্কের রাজনীতি তাতেও মনযোগ দিতেছে। আর তাই পরবর্তী সময়ে আমি প্রতিবছর একটা দুইটা অস্কার মনোনীত চলচ্চিত্র দেইখা ফেলি। মনে হয় যদি ভালো কিছু হয়...যদি শান্তি মিলে...একটা ভালো সিনেমা দেখার পর যেই শান্তি সেইটার সাথে অন্য কিছুর তুলনা করা আমার পক্ষে করা সম্ভব না। কারণ সিনেমাতেই সপেছি পরান...
২০১০ সালে অনুষ্ঠিত অস্কার অনুষ্ঠান নিয়াও আমার তেমন আগ্রহ ছিলো না। কিন্তু প্রথম আগ্রহ তৈরী হইলো ইনগ্লোরিয়াস বাস্টার্ডে...বহুদিন পর টারান্টিনোর একটা ছবি দেখুম বইলা তুমুল আয়োজন ছিলো। একদিন গেলাম ফাহিমে ছবি কিনতে এক সাদা চামড়ার আমেরিকান বৃদ্ধ মহিলারে দেখলাম দ্য ব্লাইন্ড সাইড নামের একটা ছবি কিনতে...যেহেতু আমার কোন পরামর্শক নাই এখন তাই তারেই জিগাইলাম...সে কইলো যে এই ছবি সেও শুনছে ভালো এইবার গোল্ডেন গ্লোবে নমিনেশন পাইছে...পাইরেসি'র সর্বোত্তম সুবিধা নিয়া কিনা ফেললাম তারে...তয় অ্যাভাটার দেখা হইলো হঠাৎ এক বন্ধুর বাসায়। আর হার্ট লকার দেখলাম নারী দিবসে একজন নারী চলচ্চিত্রকার হিসাবে ক্যাথেরিন বিগেলোর ছবি দেখনের পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকনে...
এই লেখার উদ্দেশ্য আদৌ কোন সিনেমার রিভিউ না। সাম্প্রতিক সময়ের হলিউড ইন্ডাস্ট্রির সিনেমা দেখার পর আমার ক্র্যাশ সিনেমার কথা মনে পড়ে। তখন যেই ছবিতে আমি উদ্বেলিত হইছিলাম তারে নিয়া আমার সন্দেহ জাগ্রত হয়, ঐ ছবিতেই কি তবে আমেরিকান ছবির নতুন ধারার শুরু হইছিলো?
আমার মাথায় চিন্তাটা কিন্তু কোন হলিউডি ছবি দেইখা আসে নাই। কাকতালীয় ভাবেই মহল্লার কেইবল অপারেটরের চ্যানেলে দেখলাম খুব বাজে প্রিন্টে মাই নেইম ইজ খান ছবিটা চলতেছে...প্রচারণার কারসাজিতে আমিও ফাইসা গেলাম মনে হয়। শুরু থেইকাই দেখতে শুরু করলাম মনযোগ দিয়া...আসলেই মনযোগ দিয়া দেখছি আজকাল আবার বিভিন্ন অত্যুৎশাহী মানুষের মন জোগাইয়াও দেখতে হয় একটা সিনেমা (?)। ছবির গল্পে অনেক কিছু আছে ভারতীয় সংস্কৃতিতে নতুন যুক্ত হওয়া বৈশিষ্ট্য এনআরবি সিন্ড্রম থেইকা শুরু কইরা আমেরিকান সংস্কৃতির ট্রান্সকালচারাল তোড়জোর পর্যন্ত সব...আছে অ্যাকশন, থ্রিল, সাসপেন্স, রোমান্স...
কিন্তু সবকিছু ছাপাইয়া এই ছবির যেই বিষয়টা আমার কাছে উল্লেখযোগ্য হইয়া উঠে সেইটা কিন্তু ভিন্ন উদ্দেশ্য...আমার কাছে মনে হয় এই ছবি সারা পৃথিবীতে আমেরিকানরা যা কইতে চায় তার প্রজেকশন বই আর কিছু নয়। আমেরিকানরা আর এখন কেবল সাদা বা কালো চামড়ার রাষ্ট্র না...আমেরিকানরা কেবল এখন ভিন্ন রাষ্ট্রের মানুষের স্বপ্নরাজ্য না...বরং আমেরিকা এখন একটা কনসেপ্ট...ইউনিফাইড বিশ্বের একটা রূপ...যেই রূপে কিছু মানুষ সারা পৃথিবীর সমস্যা নিয়া ভাবে...যারা সকল কোন্দলে, হানাহানিতে, মারামারিতে আছে মানুষের মুক্তির সংগ্রামে নিবেদিত।
দেখি দ্য ব্লাইন্ড সাইড...যেই ছবিতে অভিনয়ের লেইগা স্যান্ড্রা বুলক নামের অপছন্দের অভিনেত্রী শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেত্রী হিসাবে পুরস্কার পাইছে অস্কারে, গোল্ডেন গ্লোবে। ক্লীশে এক গল্প আর তার চাইতে অধিক ক্লীশে অভিনয়ে গইড়া উঠা এইরম চলচ্চিত্র হলিউড ইন্ডাস্ট্রিতেই হয়তো আরো অনেকবার নির্মিত হইছে... একজন আফ্রো আমেরিকান তরুণ একজন সাদা চামড়ার নারীর কল্যাণে কিভাবে আমেরিকান ফুটবলে জাতীয় স্বীকৃতি পায়, তার চিত্রায়ণ করা হইছে এইখানে। কালচারের এই ট্রান্স রূপের কদর আমেরিকানরা জানে...তারা আসলে আর এখন ককেশানগো রাষ্ট্র না...তাগো রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ক্যান্ডিডেটেরও এখন উপমহাদেশীয় পালক কন্যা থাকে...এইসবরে যেনো চোখে আঙুল দিয়া দেখানের লেইগাই চলচ্চিত্র ব্যবসার পত্তন।
আগে পছন্দ হওয়া ইনগ্লোরিয়াস বাস্টার্ড নিয়াও প্রশ্ন জাগে। তাইলে কি এই ছবিও আসলে আমেরিকান স্বার্থসিদ্ধির তরে নির্মিত হয়? নাকি জর্ম্মন জাতির আত্মম্ভরীতারে একটু শিক্ষা দেওনের চেষ্টা করেন কুইন্টিন টারান্টিনো। ধীরে এই ছবিরেও আমার রাজনৈতিক ভাবে ইনকারেক্ট মনে হয়...মার্কিনী সেক্যুলারিজমের গল্পের প্রপাগান্ডামূলক অবস্থানের বিষয়টাই প্রধান হইয়া উঠে...হিটলার এই ছবিতে কেবল একজন যুদ্ধবাজ ক্ষমতালোভী, ইহুদীবিরোধী...একপেশে এই গল্পের চলচ্চিত্রায়ন তাই মার্কিনীগো কাছে আগ্রহের?
এই প্রশ্নের একটা হাইপোথেটিক্যাল সমাধানের জায়গায় পৌছাইয়া যাই যখন ক্যাথেরিন বিগেলো'র দ্য হার্ট লকার দেখি। ইরাকে অবস্থানরত আমেরিকান সৈন্য বাহিনীর একটা বিশেষ স্কোয়াডে থাকা চরিত্রগুলি নিয়া গল্প। কিভাবে তারা মুঠোর মধ্যে জীবন নিয়া চলে। মানুষের জীবন বাঁচানের তাগীদে তারা সেইখানে কিভাবে জীবন বিপন্ন করে এই প্রাত্যহিকতাই এই সিনেমার মূল গল্প। বিপন্ন হওনের এই যে আভাস, সেইটা আমেরিকানগো ইরাক কিম্বা আফঘানিস্তানে অবস্থানরে জায়েজ করনের লেইগাই যে উত্থাপিত, সেইটা বেশ নগ্নভাবেই বলা হয় হার্ট লকারে। আর এই নগ্নতা আমারে হলিউডি নতুন ধারা সম্পর্কীত ধারণায় বিশ্বাসী হইতে সহযোগিতা করে।
মজার ব্যাপার হইলো মার্কিনীরা যেই প্রোপাগান্ডা সিনেমা বানানের আর তারে স্বীকৃতি দেওনের প্রক্রিয়ায় আছে, তারে একটা বিশেষণ দিতে আমার মনে পড়ে পলিটিক্যালি ইনকারেক্ট ছবি ইনগ্লোরিয়াস বাস্টার্ডের একটা মুহুর্তের কথাই...যেইখানে গেস্টাপোগো প্রোপাগান্ডা অংশের নেতা গোয়েবলসের দেখানো পথে তারা জর্ম্মন বীরত্ব চিহ্নিত করনের নামে প্রোপাগান্ডা ছবি বানায় আর তার প্রচারণার চেষ্টা করে। জর্ম্মনগো সেই চেতনার লগে আমেরিকান এই চেতনার আমি তেমন কোন ফারাক দেখি না। সাম্রাজ্যবাদী আকাঙ্খা আসলে সব আসরেই একই পথে ধাবমান।





দ্য হার্ট লকার দেখছি কয়েকদিন আগে। আমারও একই ধারণা।
হ...
সব কিছু যখন আমেরিকার নাগালে তখন তো তারা এটাই করবে...
আমেরিকানরা এখন বিশ্ব নাগরিক হইছে...কোন জায়গায় যাইতে তাগো ভিসা লাগে না...এয়ারপোর্টে পৌছাইয়া পাসপোর্টের সীল লাগায়...
চীনে যাইতে ভিসা লাগে তাগো, চিনারা মাঝে মধ্যে ভিসা দেয়ও না । নিজে দেখসি ভিসা না পাইয়া আম্রিকানগো বেজার মুখ
এর লেইগাই চীনা সিনেমা এখনো তাগো নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে অটুট...
সাম্রাজ্যবাদী আকাঙ্খা আসলে সব আসরেই একই পথে ধাবমান।
--হক কথা
যারা একসময় গোয়েবলসের বিচার করছে তারাই এখন গোয়েবলসের প্রচার কৌশলে আছে...এর নামই হইলো মার্কিনী প্রয়োগবাদ...
বুলেটপ্রুফ জ্যাকেটের পেছনে কিংবা কামানের আড়ালে অত্যাধুনিক অস্ত্র নিয়া যে সৈন্য জীবনের ঝুঁকিতে(!) থাকে, তার অস্ত্রের সামনে নিরস্ত্র শিশু-নারী-সিভিলিয়ান জনতার তেমন ঝুঁকি নাই। এটাই হার্ট লকার দেইখা শিখলাম। অখাদ্য এই মুভি দেখার পর পণ করছি, আর কোনোদিন অস্কার পাইছে শুইনা কোনো মুভি ফাল পাইড়া দেখবো না।
ভাবছিলাম হার্ট লকার দেখমু। অনেকদিন কোন সিনেমা দেখি না। এখন মনে হচ্ছে মাই নেম ইজ খান দেখা দিয়াই শুরু করতে হইব সিনেমা দেখা।
সেইটা আমেরিকানগো ইরাক কিম্বা আফঘানিস্তানে অবস্থানরে জায়েজ করনের লেইগাই যে উত্থাপিত, সেইটা বেশ নগ্নভাবেই বলা হয় হার্ট লকারে।
ব্রেইন ওয়াশ শুরু হইছে, অস্কার দিয়া ঐটারে সিদ্ধ করা হইতেছে।
তবে, আমেরিকান জীবন যে নিরাপদ না সেটা দেখার জন্য দেখবেন, দি লাভলী বোনস।
প্রথম দুই ঘন্টা আমার মাই নেম ইজ খান খারাপ লাগে নাই, তারপরতো আসলে সিনেমা আরম্ভ হইলো
মন্তব্য করুন