দুঃখ ব্যাথায় মুখটা যে নীল
যখন কেবল আমরা এসএসসি পাশ করলাম তখন আমাদের এক বন্ধু পড়াশুনা বাদ দিয়ে ফ্যামিলির কথা চিন্তা করে নেভীর সেইলরে জয়েন করলো। তিন মাস পরে পাসিং আউট শেষে যখন চিটাগাং আসলো তখন কেমন আছিস জিগেষ করলেই সে বলতো কি অবর্ননীয় দুঃখে আছি তা তোরা বুঝবি না। আমি তখন বুঝতাম না কিসের এত দুঃখ কিন্তু এখন বুঝি প্রত্যেক মানুষেরই নিজের একটা দুঃখবোধের জগৎ আছে যা একেক জনের কাছে তা একেক রকম।
আজকের ম্যাচটা হারার পরে সত্যিই অনেক দুঃখে সাগরে পড়ে গেলাম। ২ বলে চার রান পর্যন্ত যখন ছিলো তখনো আমি হান্ড্রেড পারসেন্ট সিউর বাংলাদেশ জিততেছে। শাহাদাত যখন নামলো তখনো আমি একটা মিরাকেলের আশায় বসে আছি। সবাই বলে ক্রিকেট গৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলা। তাই যখন ১ রান হলো তখন বুঝাতে পারবোনা আমাদের কী পরিমান মন খারাপ। মাঠে গিয়ে খেলা দেখার সুযোগ থাকা সত্তেও আমি যাই না মুলত ভালো লাগে না তাই। চায়ের দোকানে টিভি আনা হইছে আমরা যারা এক সাথে আড্ডা দেই তারা এক সাথে খেলা দেখবো বলে। আজকে ফাইনাল উপলক্ষে প্রজেক্টর ভাড়া নিয়ে রাস্তা আটকে বসানো হইছে খেলা শেষে ব্যাপক খানাদানা আয়োজন করা হইছে নিজেদের উদ্যোগে। আরও কত কিছুর যে প্ল্যান ছিলো তা বলে বুঝাতে পারবো না।
ভারত শ্রীলংকা হারিয়ে ফাইনালে উঠার পর থেকেই প্রতিটা মুহুর্ত কাটছে ফাইনালে পাকিস্তানকে হারাবো এইটা ভাবতে ভাবতে। সকাল থেকে খেলা কেনো শুরু হচ্ছে না এই নিয়ে আমার সে কি টেনসন! খেলা যখন থেকেই শুরু হলো তখন থেকেই আমি একটা কথাই সবাইকে বলতেছি ওভারে ১০ রান হোক আর যাই হোক বাংলাদেশ ম্যাচ জিতবে যে ভাবেই খেলুক যতই টার্গেট হোক। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হেরেই গেলো ২ রানে বাংলাদেশ। যদি ২০-৩০ বা ৫০-৬০ রানে হারতো তবে কোনো কস্টই পেতাম না কারন খারাপ খেলছে তাই হারছে। কিন্তু এ চমৎকার খেলার পরেও যদি হারতে হয় এই দুঃখ কই রাখি!
অনেকে সান্তনা দিতেছে ভালো খেলছে বলে উৎসাহ দিতেছে বাংলাদেশকে। কিন্তু আমার কাছে এইসবের কোনো মানে নাই। হয়তো বলবেন আপনারা, যারা খেলছে তাদের মতো তো তুমি কাদো নি ? তাদের চেয়ে তুমি বেশি বুঝো? আর কতো ভালো খেলবে? ক্রিকেটে হার জিত থাকবেই। কিন্তু আমার কাছে এই সবের কোনো অর্থ নেই! কারন যে ভাঙ্গারীর ছেলেটি কাজ বাদ দিয়ে মালিকের নিষেধ সত্তেও প্রজেক্টরের সামনে গলা ভেঙ্গে চিল্লাইছে আর চুপ থাকলেই বলা শুরু করতো শান্ত ভাই আপনারা না চিল্লাইলে ৬,৪ কিভাবে হবে? তার কান্না তো আপনারা টিভি পর্দায় দেখেন নি? আমি দেখেছি। আমার বন্ধু অঞ্জন যে কার্লটন থেকে এরোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করে এসে বাংলাদেশকে নিয়ে অতি স্বপ্নবান সে আমারে বারবার জিগেষ করতেছিলো শান্ত ভাই আপ্নে কামেল মানুষ। আপনার সাথে যত ম্যাচ দেখছি সবটাতেই জিতছে! আজকে জিতবে না? আমি বিরক্ত হয়ে বলতাম অঞ্জন ভাই আপ্নে বেহুদা টেনশন নেন আর প্যাকেটে প্যাকেটে মার্লবোরো শেষ করতেছেন। বাংলাদেশ এমনিতে জিতবে রিল্যাক্সে থাকেন। কিন্তু সেই অঞ্জন আর আমার অবস্থা ছিলো বলার মতো। দুজনেরই এতো মন খারাপ যে লজ্জায় একজন আরেকজনের দিকে তাকাতে পারছিলাম না। খাওয়া নষ্ট হবে বলে ম্যাচ হেরে যখন কাচ্চি খাচ্ছিলাম গলা দিয়ে তখন রাইস নামতে ছিলো না। শেষে দুই নলা খেয়েই দিয়ে দিলাম এক ছোটো ছেলেকে। এই খাবার আমরা কেউ খেতে পারি নি। যে রিকশাওয়ালা খলিল সাব রিকসা চালাতে যান নি খেলা দেখবেন বলে তিনি প্রচন্ড মন খারাপ নিয়ে বললেন শান্ত মামা আপনারা হুজুগ বানান সেই হুজুগে সবচেয়ে বেশী মন খারাপ হয় আমাদের। আমি বলার মতো কিছু খুজে পাই নাই। এরকম অসংখ্য চেহারা আমার সামনে খেলা শেষে ভাসছে যেই দুঃখ নাসির মুশফিকের চেয়ে কম না।
সব মিলিয়ে এক অবর্ননীয় দুঃখ আমাদের সবার। আমার মামা খুবই শক্ত মনের মানুষ নানুর মৃত্যু সংবাদেও যে এতটুকু বিচলিত হন নি সেই মামাও আজকে হারার পরে মন খারাপে কাপতেছে। স্তব্ধ পা চলতেছে না তার। আমার কথা আর কী বলবো খুবই আবেগপ্রবন আমি চোখে খালি পানি আসতেছে সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করতেছি পানি আটকানোর কিন্তু থামতেছেই না। কি বলবো আর নিজের এই ছেলেমানুষীর কথা।
সবাই হয়তো বলবেন বাংলাদেশ যা খেলছে তাই বেশী। এত আশা আপনারে করতে কে বলছে? আশার ভিত্তি কি? কিন্তু শ্রীলংকাকে হারানোর পর থেকেই যে মনের ভেতর স্বপ্নের ডালপালা মেলেছে তা কোনো যুক্তিতেই টিকে না পুরাই আবেগের উপর। তাই আজকে আমার খুব মন খারাপের দিন। সবাই ফেসবুক ব্লগে নিজেরা নিজেদের মতো সান্তনা খুজতেছে দিতেছে। কিন্তু আমার কোনো ভাবেই তা কেনো জানি আসতেছে না। কারন আমি বিশ্বাস করি পারা আর না পারা যোজন যোজন দূর। আপনি সামান্য ব্যাবধানে হারলেন মানেই আপনি হারছেন তার ভিতরে সম্মান অসম্মানের কিছু নাই। হারলাম তো হারলাম। এম্নিতে সব কিছতেই আমরা হারতেছি জীবন থেকে। সবসময় আপসোস করেই দিন যায়। দেশ নিয়ে আপসোস, নিজেরে নিয়া আপসোস, ক্যারিয়ার নিয়া আপসোস, আমাকে নিয়ে পরিচিত লোকজনের আপসোস। এতো আপসোসের ভীড়ে একটুর জন্য এশিয়া কাপটা না পাওয়ার আপসোসটাই বড় হয়ে দাঁড়ায়। হয়তো সামনে বাংলাদেশ অনেক ভালো খেলবে ক্রিকেট, একদিন হয়তো বিশ্বকাপটাই পাবে কিন্তু আজকের হতাশা দুঃখবোধ কোনো ভাবেই মুছে যাবে না। হয়তো অনুভব করবো না দুঃখটা কিন্তু বারবার মনে আসবে কী দুঃখের সাত রংয়ে ভাসছিলাম এই দিনে। আমি বাস্তব জীবনে খুব আস্তিক মানুষ। প্রাক্টিসিং মুসলীম যাকে বলে কিন্তু ১৬ কোটি মানুষের প্রার্থনা তুমি শুনলানা আল্লাহ? এ তোমার কেমন বিচার!





শান্তনা খুঁজছি শুধু শান্তনা খোঁজার জন্যই। আর কিই বা করার আছে
স্পোর্টিংলি নাও। আমরা একদিন ক্রিকেটে এমন জয় পাবো- 'ভুলে যাব সর্বগ্লানী বিপুল গৌরবে'!
এইটা প্রায় সব যায়গারই চিত্র। নেভার গিভ আপ
বিমার বাসায় খেলা দেখতে গিয়েছিলাম, ফেরার পথে দেখি রাস্তায় দোকানের সামনে অনেক অনেক লোক, উদ্বেগ, উৎকন্ঠা নিয়ে খেলা দেখছে, আবার জয়োল্লাস। কেন যেন কান্না ধরে রাখতে পারলাম না। প্রতিটা মানুষ বিজয়ের অপেক্ষা করছিলো আর আমাদের ক্রিকেটাররা জান দিয়ে লড়েছে কিন্তু তবুও ওদের কাঁদতে হলো। বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের জন্য অফুরন্ত ভালোবাসা, শুভকামনা। জয় হবেই বারবার।
দেইখো... একদিন আমরা ঠিকি জিতব... হইবার না হইছে তো কি হইছে?
ভীষন কান্না পাচ্ছিল। খেলা শেষে কখন যে চোখ দিয়ে পানি পড়েছে- জানিনা ! আমার বউ আর ছেলে অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল আমার দিকে। এত কষ্ট !!!
(
খারাপ লাগছে। তবে এরপর থেকে আমি আর বাংলাদেশকে হারতে দেখতে রাজি না। ছেলেদেরকে ভেঙ্গে না পড়ে প্রাক্টিসে মনোযোগী হতে বলবো। বাংলাদেশ এখন আর ছেলেখেলা খেলে না। এই বিষয়টা মাথায় রাখতে হবে প্লেয়ারদেরকে।
আমার মনে হইসে, আমরাই জিতসি...
এইডা তো হার না...
বহুত হইসে!
এখন থিকা আমরাই জিতুম!
মন্তব্য করুন