খালিদের জন্য কয়েক প্রস্থ
খালিদ কত বড় স্টার ছিল এটা এখন বোঝানো অসম্ভব। এখন স্টারদের মাপা হয় ভিউতে ও রেলিভ্যান্ট থাকা না থাকায়। খালিদ ছিল সেসবের ওপরে। কোনো অখ্যাত গায়ে হলুদের প্রোগ্রামে কেউ একটু দরদ দিয়ে খালিদের গান গাইলেই ভাবতাম আমরা, কি সিরিয়াস শিল্পীরে বাবা। তখন অনিবার্য ভাবেই গাইতে ও শোনাতে হতো খালিদের গান। আমার এক বন্ধু ছিল যে সরলতার প্রতিমা গানটা টানা মাসের পর মাস শুনে গেছে। আমাদের প্রধানতম অভিযোগ ছিল তার প্রতি, 'গানটাকে গোবর বানায় ছাড়লো'। তখন 'সে যে হৃদয় পথের রোদে একরাশ মেঘ ছড়িয়ে হারিয়ে গেল নিমিষেই', এই লাইনের চেয়ে ভালো লাইন আর মাথায় আসতো না। রেডিও এফএম আমলে খালিদের গান অন্য লেভেলে বাজানো হতো। 'ঘুমাও তুমি ঘুমাও গো জান', রাত হলেই এ গানের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হতাম। আমি চাইমের শ্রোতা তেমন নই, তবুও খালিদের কারণে চাইমও শুনেছি। ফোক আঙ্গিকে ব্যান্ডের গান আমাদের ঐতিহ্য এটা মেটাল লাভাররা ভুলে যায়। ফিরোজ সাই থেকে খালিদের চাইম সবাই ছিল সেই যাত্রায় সফল। তবে শহুরে মন আমাদের কোনো কিছুই, 'যদি হিমালয় হয়ে দুঃখ আসে গানটার কাছাকাছি হতে পারেনি'। এই গানটা শুনলেই মনে হয় আমাদের জন্য লিখিত জীবনরক্ষার গান। গানটার একটা অখ্যাত ফ্যান ভিডিও আছে, আমেরিকার রাস্তায় গাড়ি চালাতে চালাতে বাজে। আমার তা দেখলেই মনে হয় দুঃখের সীমানা ছেড়ে সেই নর্থ আমেরিকায় খাবি খাচ্ছি। খালিদ ভাইও মোহাম্মদপুর ছেড়ে আমেরিকায় গিয়েছিল। খালিদকে আমি নানান চায়ের দোকানে দেখেছি এলাকার। লুঙ্গি পরে আসতো, অন্যরা বলতো উনি শুনতো। কখনও কথা বলা হয়নি। অডিও ইন্ডাস্ট্রি ধ্বংস হয়ে যাবার পর খালিদ ভাইদের করারই আর কি ছিল? জীবন যুদ্ধে গানের বাজারের মূল্য লোকসানী কৃষকের বিষণ্ণ দৃষ্টির মতোই বিবর্ণ। খালিদের শেষ দিকের একটা গান আমার খুব প্রিয় ছিল, গানটা অনেক বার শুনলেও, তেমন চলতো না কোথাও, 'এক মহাকাল ব্যথা রেখেছে যে বুকের পাজরে/ ব্যথা কি বোঝাও তুমি তারে।' এক মহাকাল ব্যথা দিয়েই খালিদ ভাই চলে গেলেন অকালে। আপনার কথা কম বেশি মনে পড়বেই এটুকু গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি।
বৃষ্টি হয় এখন জামালপুরে। পেপার কিনতে গেছি জীবন যুদ্ধে পরাজিত এক লোক বকবক করছিল, আমি শুনছিলাম। হঠাৎই আমার মনে পড়লো, খালিদের গান- যতটা মেঘ হলে বৃষ্টি নামে/ততটা মেঘ রেখেছি হৃদয়ে পুষে/ কিভাবে আমায় তুমি কাঁদাবে বলো? মানুষকে কাঁদানো সবচেয়ে সোজা। হাসানো কঠিন। তবুও খালিদ চ্যালেঞ্জ দিয়েছে। পরের অন্তরায় তো আরো চ্যালেঞ্জ দেয়া, যতটা তাপ পেলে হৃদয় গলে ততটা আগুন বুকে রেখেছি জ্বেলে/ কিভাবে আমায় তুমি পোড়াবে বলো? এ-তো আসল সামার লাভারদের আলাপ। পুরোনো শিবলী ভাই আসলেই এক জিনিয়াস। এখনকার ব্যায়ামবীর শিবলী ভাই ততটাই বুলশিট।
কতদিন হলো খালিদ মরে গেছে, জানি না। তবে আমার মাঝেসাঝেই মনে পড়ে ভীষণভাবে। কাভার পিকচারে সুমন দত্তবাবুরা থাকলেও আমাদের সবারই একটা বাচ্চু খালিদ মন আছে। খালিদের ছেলে, জেনজি হুজুর, হারাম গান গাইতে অস্বীকার করলেও আমার খুব মনে পড়ে খালিদের অনুরোধ, 'আমায় যদি পরে মনে/ কবিতায় কবিতায় মগ্ন থেকো/ আসেনা যেন জল চোখের কোনে।' চোখে জল আসতেই আসতেই ক্রিঞ্জ প্রথম কমেন্টে এক চিলতে হাসি এসে যায়। কি সেই লাইন, তবুও লাশটা তার খুনীকে ভালোবাসে কিংবা তোমাকে পেয়ে গেলে এত সুন্দর গানটা শোনা হতো না। এক বিখ্যাত অভিনেতা বলেছিল, যেদিন আমি মারা যাবো সেদিন যেন লোকজন আমাকে চিনতে পারে। লাশ হয়েও মানুষের সুতীব্র আকাঙ্খা, খুনীর ভ্যালিডেশন।
চাইম ব্যান্ডের খালিদ আবার আলাদা। অন্যরকম এক ভাইব তাদের। ফোকের মর্ডান ভার্সন গাচ্ছে, জীবনমুখী গাইছে, পপ গান করছে। নয়তো কালো মেয়ের দুঃখ নিয়ে কেন তারা এত উতলা বা বেকারদের জন্য গান- পড়ালেখা শেষ করে বেকারত্বে ধুকে মরা এ কেমন অভিশাপ বলো ? এসব গান কিন্তু নচিকেতার আগেই খালিদরা গেয়ে ফেলছে। তবে চাইম আর খালিদ মিশে একাকার হয়ে যায় যখন তিনি প্রিন্স মাহমুদের সুরে গেয়ে উঠেন আমাদের জন্য- হয়নি যাবার বেলা/ শুরুতেই সবকিছু শেষ করে কেন চলে গেছ? অনেক বছর আগে আমার এক ছোটভাই ছিল হুট করে ছ্যাকা খেয়ে এই গান ডেইলী একশো বার শুনতো। এখন তার দাঁড়ি বুক সমান, সে ও বোধ হয় ভুলে গেছে তার সেসব দিনের কথা।
তবে খালিদের গানের আমার সবচেয়ে ইনট্রিগিং লাইন লাগে, দল বেঁধে সব দুঃখ আসে মৌন প্রেমের সর্বনাশে, প্রেম অপ্রেম বাদ দিলেও দুঃখ তো আসেই এমন ভাবে। বাসে একজন গতকাল আমাকে বলছিল, ইরানের মানুষের কথা চিন্তা করলে কিছুই আর ভালো লাগে না। আমিও একমত হয়ে জানালাম, দুনিয়ার নিপীড়িত ভাগ্যপীড়িত যেকোনো মানুষের কথা ভাবলেই তো ভালো লাগে না, কিন্তু আমাদের ভাবনায় আর হচ্ছেটাই কি? যারা সুখে আছে তাদের সুখ উপভোগেরও সময় নাই। যে গালকাটা আকবর গতবছর ঝড়ে বিদ্যুতায়িত হয়ে মারা গেল তার কথাও বা কে ভাবে? আকবর একটা সময় ছিল এলাকার শীর্ষ রিকশা চোর। তারপর জেল খেটেখুটে তাবলীগে যেয়ে ভালো হয়ে গিয়েছিল, ইজি বাইক চালিয়ে সংসার চলতো। সলিল চৌধুরী গেয়ে গেছেন, আমি ঝড়ের কাছে রেখে গেলাম আমার ঠিকানা। আমরা যারা ভাগ্যপরীক্ষায় অকৃতকার্য তাদের ঠিকানা হয়তো এভাবেই ঝরঝর মুখরিত রাতেই কোনোদিন শেষ হয়ে যাবে। খালিদরা হলেন লিজেন্ড, তারা ঝড়ের কাছে হারাননি, বরং যতবার কারো বিষাদে মুখ মন মলিন হবে ততবার মনে পড়বে- 'সে যে হৃদয় পথের রোদে একরাশ মেঘ ছড়িয়ে হারিয়ে গেল নিমিষেই।'





মন্তব্য করুন