এরপর আমি মিলিয়ে যেতে পারি, কোনোদিন ফিরে আসবো কিনা জানি না!
হুমায়ুন আহমেদের একটা বই ছিল নাম 'তুমি'। সেই বইয়ের ভুমিকায় লেখা ছিল নাম 'তুমি' নাম দিতে ইচ্ছে হলো তাই দিলাম, উপন্যাসের সাথে কোনো মিল নেই শিরোনামের। সেরকম এই পোষ্টের শিরোনামের সাথেও আমার পোষ্টের বক্তব্যের কোনো মিল নেই। তাও দিয়ে দিলাম নাম অযথাই, ইচ্ছে হলো তাই। তাহলে এই নামের উৎপত্তি কোথা থেকে? 'ছায়ামানুষ' নামের ভারতীয় বাংলার এক সিনেমার গানের লাইন। চন্দ্রানী আর রুপমের গাওয়া, গানটা গতকাল থেকে খুব শুনছি তাই কানে বেজে চলছে। আজ সকাল বেলা ইউটিউবে কলকাতার পরিচালক সৃজিতের একটা ইন্টারভিউ শুনছিলাম। সেখানে কলকাতার প্রয়াত পরিচালক ঋতুপর্ণের প্রসঙ্গ আসলো। মারা যাবার দুইদিন আগেও নাকি কত কত সিনেমা করবেন, কি কি প্রজেক্ট নিয়ে সামনে নামবেন তা নিয়ে সারা দিন রাত নানান মানুষের সাথে কথা বলতে বলতেই পার করেই, হুট করে মরে গেলেন। তাই সৃজিত খুব দামী কথা বলে ফেললো-- সময় খুব কম, যা করার এখনি করে ফেলতে হবে। এখন না করলে আর কোনোদিন সেই কাজ করা হবে না। কারন একই সময়ে সারা দুনিয়ায় একই প্লট ১০০০ জনের মাথায় আসে, আজ যদি না শুরু করি তাহলে ৯৯৯ জনের কেউ সেই কাজটা করে ফেলবে আর আমার কাছের বন্ধুরা বলবে, আমি নকল করেছি। তাই আমিও আজ এই প্রচন্ড ক্লান্তি নিয়েও ব্লগ লেখতে বসে গেলাম, কারন আজ না কাল করতে করতে আর লেখাই হয় না!
বইমেলা গত দুই দিন টানা গেলাম। ভালোই পায়ের উপর দিয়ে ধকল গেল। কারন আমি রিকশা নেই নিউ মার্কেট পর্যন্ত। তারপর হাটতে হাটতে যাওয়া। বুধবার ছিল সব চাইতে খারাপ অবস্থা। এক ঘন্টা রিকশায় বসে থাকতে হলো, নেমে হাটার জায়গা নেই। খালি মানুষ আর যানবাহন। ফুটপাতে এত দোকান পা রাখার জায়গা নাই। আমি আবার আস্তে হাটতে পারি না। তাই অন্যের পায়ে পা লাগে, মানুষ হয়তো গালি দেয় মনে মনে, এছাড়া এই শহরে আর কি বা করার আছে। কম দূরে তো না, নিউমার্কেট থেকে টিএসসি হয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। হাটতে হাটতে সন্ধ্যাই নেমে যায়। মেলায় ঢুকেই মাওল পাবলিশার্সের স্টলের সামনে দাড়াই, কিনি না কিছুই স্রেফ দেখি। কারন মাওলার কেনার মতো যা পুরান বই সবই আমার পড়া। সেই বইগুলোর চেহারা দেখতে খুব ভালো লাগে। নস্টালজিয়ায় পেয়ে বসে। আগাই অনেক অখ্যাত সব নাম দেখি চারপাশে। এদের সবারই নীলক্ষেত স্টাইলের কিছু পাইরেটেড বই আছে। বাংলা একাডেমীর চেয়ারম্যান বললেন টিভিতে, মেলায় প্রবেশের রাস্তায় কোনো পাইরেটেড বইয়ের দোকান থাকবে না। আমি তো দেখি দিস্তায় দিস্তায় সুনীল সুচিত্রা সমরেশদের বই হাফদামে বেচতেছে। লোকজন কিনতেছেও, গতকাল এক লোকের সাথে কথা হলো উনি বলে উঠলেন মেইন মেলার চেয়ে দাম কম তাই কিনতেছি, আর এইসব বই পড়তেও অনেক সময় লাগে ও দামাদামি করা যায়। আমি আর কিছু বলি নাই। বললে আর কি বলতাম, এইসব বই নীলক্ষেতে আড়তের মত করে রাখা আছে সেখান থেকেই কিনতেন, মেলায় আসার কি দরকার।
মেলাতেও ভালো কিছু নীলক্ষেত স্টাইলের প্রকাশনাও আছে। যেমন একটা হলো গতিধারা। তাদের বেশীর ভাগ বই ই নিখাদ কর্মমুখী। ফ্রিল্যান্সে আয় থেকে শুরু করে আমদানি রপ্তানী বানিজ্য পর্যন্ত। আরেকটা প্রকাশনীর নাম ভুলে গেছি তাদের ওইখানে অনেক বিখ্যাত বইয়ের পাশে নায়িকার ছবি দেয়া প্রচ্ছদে উপন্যাস। মেলায় প্রচুর কার্ড বিলি করে তওহিদুর রহমানের। সম্ভবত সময় প্রকাশনী থেকে, তার বই দেখলাম, পুরাই গুপ্তকেশ। এক লোককে দেখলাম সেই বই কিনছে। আমার ধারনা জন্মালো বই বিজ্ঞাপনে কাজ হয় ভালোই। আমি অবশ্য সব সময় দুর থেকে বই দেখি, যে বইটা ইন্টারেস্টিং মনে হয় পাতা উল্টিয়ে সূচী দেখি আর ভুমিকা দেখি। দাম দেখি না, কারন দাম দিয়ে বই কেনা যায় কিন্তু বইয়ের তাৎপর্য টের পাওয়া যায় কম। তাই বেশী ভীড় দোকানে যাই কম, কারন সেখানে কন্টেন্ট দেখার সুযোগ নাই। আর অন্যপ্রকাশের স্টলের সামনে দিয়ে হেটে গেলেও ২০০৭য়ের পর থেকে কখনো কিছুই কেনা হয় নাই। কারন জামালপুরের পত্রিকা দোকানে গেলেও ঐ বই গুলো পাওয়া যায় সেইম দামে, এত ভীড়ে কেনার কি দরকার? গতবার নাকি তার আগের বার এক লোকের কথা মনে পড়ে, তাঁর সাধের মোবাইল সেট খুইয়ে এসেছিল অন্যপ্রকাশের ভীড়ে, মেয়ের জন্য বই কিনতে গিয়ে। উনি হাসতে হাসতে বলছিলেন বই মেলায় পকেট থেকে সেট খোয়াবেন তা জীবনে ভাবেন নাই। যাই হোক বিদ্যা প্রকাশ নাকি অন্য কোথাও গিয়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর পুরা সমগ্রের দাম শুনে আমি অবাক হলাম খুব। কারন পাঁচ বছর আগে দাম ছিল এর হাফ, টাকা ছিল তাও কেনা হয় নাই। সেখানে গিয়ে এক কমবয়সী ছেলের মোহিত কামালের বই কেনা দেখলাম। কত লেখক লিখে যায়, কত পাঠক তা আবার কিনে যায়। এবারের বই মেলায় প্রথম বই আমার কেনা বদরুদ্দীন ওমরের একটা থিসিস, যা ৭৫ য়ের একদম শেষে পাবলিশড। ইন্টারেস্টিং লাগলো দাম খুবই কম মাত্র ৪৫ টাকা। এখন ছাপালে বইটার দাম হবে ২৪৫ টাকা। স্টুডেন্ট ওয়েজ থেকে মুহাম্মদ আবদুল হাইয়ের 'বিলেতের সাড়ে সাতশো দিন' কিনলাম ঝোকের বসেই। কারন ১৯৫০এর দিকে লন্ডন ও বিলেত কেমন ছিল তা পড়ার সাধ জাগলো অকস্মাৎ। আর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর লেখায় বইটার অনেক প্রশস্তি শুনতাম। আশি নব্বইয়ের দশকে বিটিভি কেমন ছিল তা নিয়ে ভাবার জন্য খুরশীদা হকের বইটা কিনলাম। তবে উনার বর্ননাভঙ্গী কেমন যেন আমার ব্লগ লেখার মতোই কাঁচা কাঁচা। আনিসুজ্জামান কে দিয়ে তিনি বইয়ের ভুমিকা লেখিয়েছেন। এইসব কাঁচা লেখকদের ভুমিকা লিখে বিদগ্ধ জনেরা কি শান্তি পান তা বুঝি না। যতই ছাত্রী হোক আর যতই কাছের হোক। অনন্যায় গিয়ে দেখি মিলন আংকেল নাই, এক টাকলা লোক বসা। মুনতাসীর মামুনের তিন খন্ডের ঢাকা নিয়ে সচিত্র বইটা কিনে ফেললাম। ৯৭৫ টাকা চলে গেল এক ধাক্কায়। দুই খন্ড আমার আগে থেকে পড়াই, তাও কিনলাম। কারন ভালোবাসার বই কিনতে হয়। একটা গড়পড়তা মানের শব্দ উৎস অভিধান কিনলাম, অল্পদামেই। এক বন্ধু বাংলা একাডেমীতে তার সাথে দেখা করেই হাটা দিলাম। কারন ছবির হাটে বন্ধুরা বসা, বদরুদ্দীন ওমরের বইটা এক বন্ধুকে গিফটও দিয়ে দিলাম সাথে সাথেই। তীব্র জ্যাম রিকশা নেই আবারো দলবেধে নিউমার্কেট পর্যন্ত হেটে ২০ টাকা বেশি ভাড়া দিয়ে রিকশাতে উঠেই হাত পা ছেড়ে দিল। চায়ের দোকানে আসলাম ৫০ মিনিটে। বাসের অপেক্ষায় যদি থাকতাম তাহলে লাগতো ১ ঘন্টা ৫০ মিনিট। টাকা পয়সা সব শেষ করে বাড়ীতে ফিরে শান্তি আর শান্তি, পকেটের সব দিয়ে এমন বই কিনতে পারে কজনা?
আজ মেলায় যাবো কিন্তু পকেট গড়ের মাঠ। এক বন্ধুর কাছে ইয়ার্কি করেই টাকা চাইলাম সামান্য, সে এক সেকেন্ড ভাবার আগেই দিয়ে দিল। কি করা তখন তো বইমেলায় আসা ফরজ হয়ে গেল। ছটায় রিকশা নিলাম। মোহাম্মদপুরের এদিকে প্রচুর জ্যাম। নিউমার্কেটে নেমে হাটতে হাটতে মেলায় ঢুকলাম সাড়ে সাতটায়। বাংলা একাডেমীতে ঢূকলাম দেখি কেউ নাই। লিটল ম্যাগে খেয়াপু গল্প করে, ছিন্ন ছিন্ন মানুষ। পুরো লিটল ম্যাগের আবহটা নস্ট হয়ে গেল এই মেলায়। প্রকাশকদের অঞ্চলে ঢূকলাম। কামাল ভাইয়ের বই আসছে, নান্দনিকে। দারুণ প্রচ্ছদ ও খুব সুন্দর হয়েছে বইটা। সুচীতে গল্প দেখলাম। কিছু গল্প আগেই পড়া। প্রথমে ভাবলাম বইটা কিনবো না, কেউ না কেউ তো কিনে দিবেই। পরে ভাবলাম মুনতাসীর মামুনের পড়া বই যদি এত দাম দিয়ে কিনতে পারি আর এর দাম তো মাত্র ২০০ টাকা। ভালোবাসার টানেই কিনে ফেললাম। আর কামাল ভাই লেখেই কম, প্রিয় মানুষের সামান্য একটা দুইটা বই এক মেলায় না কিনলে কেমন পাঠক হলাম? সবার মুখে খালি মিহির সেন গুপ্তের নাম শুনি, উনার একটা বই কিনলাম 'মধদিনের গান'। এরপর হাটছিলাম, দেখা হয়ে গেল কামাল ভাইয়ের সাথে, তারপর আসলো রাসেল ভাই কিছু সময় ছিলেন লীনা আপুর ভাই ও ভাবী। মেঘ না চাইতেই সব বৃষ্টি হাজির। মেলায় হাটলাম, দাঁড়িয়ে থাকলাম, কামাল ভাই রাসেল ভাইদের কথা শুনছিলাম। প্রশান্ত দা আসলো। কামাল ভাইয়ের কথা শুনতে অত্যন্ত আনন্দ। পা ধরে আসছিলো, তাও মনে হয় আরো দু চার ঘন্টা শুনে যাই সাহিত্য নিয়ে আলাপ। মেলা শেষ হয়ে যায় সাড়ে আটটাতেই। তাও কথা চললোই। কামাল ভাইকে বিদায় দিয়ে আমি, রাসেল ভাই, প্রশান্ত দা হাটছিলাম শাহবাগ পর্যন্ত বই নিয়ে কত ইন্টারেস্টিং আলাপ হলো। রাসেল ভাই আর আমি থাকলাম, একটু পর আমি বিদায় নিলাম বাসে উঠার জন্য। কি অসাধারণ কেটে গেল আজ বই মেলার সন্ধ্যটা!





বইমেলা এখনও গেলামই না, তোমার পোষ্ট পড়ে মন টানছে আরো।
কামাল ভাইয়ের বই পড়ে রিভিউ লিখো ।
হাতে অনেক বই জমানো, শেষ হচ্ছে না আপু!
হুম। বইমেলায় যাইতে হবে । আর আগের বছর আমিও তৌহিদুর রহমানের অনেকগুলা র্কাড পেয়েছিলাম।
যান ঘুরে আসেন, সেই এক্সপিরিয়েন্স নিয়ে একটি গল্পের প্লটও মাথায় চলে আসতে পারে
আজও বলে যাই, ছোট ছোট পর্যবেক্ষণগুলো ভাল লেগেছে।
ধন্যবাদ ভাইয়া, আপনাকে নিয়মিত এই ব্লগে পেয়ে খুব ভালো লাগছে!
শিরোনামে কী আসে যায়!
আমারতো যখন যেটা মন চায় তখন সেটাই শিরোনামে দিয়ে দেই।
"তুমি" আমার ভালো লেগেছে
পড়ছিলেন 'তুমি'? আমি ভুলে গেছি পড়ে, কাহিনী মনে নাই!
মেলা ভালো যাক ভাইয়া
থ্যাঙ্কস ভাইয়ু!
মন্তব্য করুন