আমি শুধু চেয়েছি তোমায়@শ্যামলী সিনেপ্লেক্স!
শ্যামলী হলটাকে কে না চিনে, আমি যখন ঢাকায় আসি তখনও শ্যামলী হলে মান্নার ছবি চলে। তার কিছুদিনের ভেতরেই পুরো বিল্ডিংয়ের সামনে রেখে ভেতরে ভাঙ্গা হয়ে গেল সব। সবার ধারনা ছিল আর কোনোদিন এখানে হল হবে না। খালি রিকশাওয়ালাকে বলার সময় সবাই বলবে, শ্যামলী হলের সামনে নামবো। এরকম তো কতই ঘটে, সিনেমা হল ভেঙ্গে শপিং মল হয়ে যায়। লোকমুখে শুধু নামটাই থেকে যায়। আর থেকে যায় সেই হল নিয়ে লোকজনের স্মৃতিরোমান্থন। শ্যামলী হল নিয়েও আমি কত গল্প শুনলাম। একবার নাকি সালমান শাহ আর শাবনূর আসছিল, হল ভেঙ্গে মানুষ নেমে আসছিল সেদিন, বিশাল সংখ্যায় পুলিশ এনে তাঁদের উদ্ধার করা হয়েছিল সেই ভীড় থেকে। মানুষ নাকি আগে এই হলে এত যেত, যে সিট না পেয়ে নিচে বসতো। সিটে বসে ছাড়পোকার কামড় খাওয়াই ছিল নিয়মিত ব্যাপার। প্রভাবশালী মানুষেরা ডিসিতে টিকেট কেটে এক ছবি অনেকবার করে দেখতো। হলের নাকি নিয়ম ছিল যদি আপনে নিয়মিত দর্শক হোন তাহলে আপনাকে অনেক সময়ই টিকেট ছাড়াই সিনেমা দেখানো হবে। আরো কত হাবিজাবি গল্প, শো শেষে মারামারি হতো ডেইলি বেসিসে। তাও লোকজনেরা সিনেমা দেখতে আসতো। আমার এক বন্ধুকে তাঁর বাবা ক্লাস ফাইভে থাকতে 'আগুনের পরশমনি' দেখাতে নিয়ে ছিল হলে। আশে পাশের চার পাঁচটা স্কুলের ছেলেমেয়েদের পাকনামির উদ্বোধন হতো স্কুল পালিয়ে শ্যামলী হলে সিনেমা দেখতে বসে!
যাই হোক আগের দিন বাঘে খায়। বর্তমানের কথা বলি। অথোরিটি তাঁদের কথা রেখেছে, ছোট আকারে হলেও শ্যামলীতে একটা সিনেপ্লেক্সের ব্যাবস্থা রেখেছে। কিন্তু সেই হলটা শুরুই হয়েছে সব পুরানো সিনেমা দিয়ে। অগ্নি, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা এইসব দিয়ে। নতুন ছবি মনে হয় শুরু হয় জোনাকীর আলো দিয়ে। জোনাকীর আলো চ্যানেল আইতেই দেখা গেল, তাঁর দুদিনের মধ্যে ইউটিউবেই। যে ছবি মুক্তির সাথে সাথেই ইউটিউবে মোটামুটি ভালো প্রিন্ট দেখা যায় তা হলে গিয়ে দেখবে কে? বেলায় বেলায় সময় কেটে গেল। আসলো সিনেমা, চিলড্রেন অফ ওয়ার, দেখার আগ্রহ ছিল কিন্তু ফেসবুকে সবার মুখে তীর্যক সমালোচনা শুনে আর দেখি নি। হিন্দীটার কিছু অংশ দেখলাম, যুতের লাগলো না। যুদ্ধের সিনেমা বানাতে বসলেই কেন গুলি আর ধর্ষনের রগরগে সিন দেখাতে হবে কে জানে, এইটা ভালো লাগে না। যুদ্ধে কত মানবিক গল্প থাকে, কত সংকট, কত কষ্ট আপোষের গল্প থাকে তা নিয়ে এই বাংলায় কোনোদিন সিনেমা হবে না।
কাল হুট করেই দেখতে গেলাম 'আমি শুধু চেয়েছি তোমায়। বিতর্কিত যৌথ প্রযোজনার ছবি। আমি জানতাম শো বারোটা ত্রিশ থেকে শুরু। যেয়ে দেখি শো বারোটায়। বাসা থেকে খুব কাছেই। ২০ টাকা রিকশা ভাড়া কিংবা হাঁটা পথে ১২-১৪ মিনিট। পুলক টাকা আনতে ভুলে গেছে, তাই পকেটে থাকা বাজার করার টাকা দিয়েই টিকেট কাটলাম সিনেমার। টিকেটের দাম বেশী, ডিলাক্স ১৫০ আর প্রিমিয়াম ২০০ টাকা, কাটলাম প্রিমিয়ামেরটাই। যারা নিয়মিত বাংলা সিনেমা দেখে তাঁদের জন্য বেশীই। বলাকাতে যেখানে ৬০-১০০ টাকায় সিনেমা দেখা যায় সেখানে শ্যামলী এত বেশী থাকার কারন খুঁজে পেলাম না। তবে টিকেট বিক্রেতাকে জিগেষ করলাম কেমন চলে সিনেমা? বলে উঠলো শ্যামলী হলের ফাস্ট সুপারহিট মুভি নাকি এইটা। খুব দেখতেছে লোকজন। হলের এন্ট্রি পথটা খুব ঝকঝকে তকতকে পরিবেশ। লোকজনের ভীড় নাই। দোতলায় উঠে দারুন এক সিট পেলাম। কিন্তু পেছন থেকে শুনি, আংকেল কিছু মনে না করলে আরেকটু পরের সিটে বসবেন। হাউ সেলুকাস কলেজ পড়ুয়া মেয়ে আমাকে ডাকে আংকেল। এই ছিল কপালে! যাই হোক মাধুরী দীক্ষিত বলেছে বয়স শুধু একটা সংখ্যা মাত্র। আমরা বসতে বসতে সিনেমা মিনিট পচিশেক শেষ।
সিনেমা আর কি দেখবো, এসির হাওয়াতে নাক দিয়ে পানি পড়ে পড়ে ভাব। সিটও আরামদায়ক, আসে খালি ঘুম। আর আমি ও পুলক প্রচুর ভারতীয় দক্ষিণী সিনেমা দেখা লোক। তাই যেখান থেকে সিনেমাটা মেরে দিছে সেই 'আরিয়া টু' আমার ভালো মতো দেখা। 'আমি শুধু চেয়েছি তোমায়' সেখানে শুধু কিছু চেঞ্জ নিয়েছে, অফিসের জায়গায় দেখিয়েছে কলেজ, ওদের গ্রামের জায়গায় দেখিয়েছে বাংলাদেশ, আর তেলেগু সিনেমায় থাকে দুই বন্ধু, এখানে বন্ধুত্ব নাই কোনো, আছে প্রেমের প্রতি প্রতিজ্ঞা। সিনেমার কাহিনী অতি সাধারন এক কঠিন প্রেমিক সে নায়িকার প্রেমে অন্ধ। নায়িকার কাছেই সে ব্যাডবয় আর সবার কাছে মিস্টার পারফেক্ট। নায়িকাকে নানান ভাবে বিরক্ত করে, সব বারই হ্যালুসিনেশন বলে সবাই চালিয়ে দেয়। শেষে নায়িকাকে প্রেমের জালে আটকায়। নায়ককে স্বীকার করায় যে সে মিস্টার পারফেক্ট না, এতদিন সেই নায়িকাকে নানা ভাবে বিরক্ত করেছে, নায়িকা ভালোবাসে আরেকজনকে। নায়িকা শর্ট নোটিসে বাড়ীতে চলে যায়, দুদিনের মধ্যেই নাকি নায়িকার বিয়ে। নায়িকার বাড়ী দেখানো হয় বাংলাদেশের এক ভয়াবহ অঞ্চলে। তবে কেন তা নারায়নগঞ্জ বা সাতক্ষীরা দেখালো না -তাই বুঝলাম না। যাই হোক মিশা সওদাগর নায়িকার বাবা শত্রুর ছেলের সাথে বিয়ে দিয়ে তিনি মিল মোহাব্বতের দুনিয়া বানাতে চান। নায়ক সেখানে যায় বিয়ে ভাঙ্গতে, বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বিয়ে ভেঙ্গে দেয়। লগ্ন মিস হবে বলে মিশা সওদাগরের মান ইজ্জত রক্ষায় নায়কের সাথেই বিয়ে হয়ে নায়িকার। কিন্তু নায়িকাতো ভালোবাসে সেই অন্য ছেলেকে। তাঁর আগমন ক্লাইমেক্স একশন সব কিছু ছাপিয়ে সিনেমার শেষ দৃশ্যে নায়ক নায়িকার মিলন আর বাকী সব চুদির ভাই হয়ে শেষ হয়ে যায়। সিনেমাটা যেখান থেকে মেরেছে সেই আরিয়া টুয়ের মত হয় নি। কোথায় সাউথের সুপারস্টার আল্লু অর্জুন আর কোথায় দেবের কপি অংকুশ হাজরা। তবে শুভশ্রীর অভিনয় চলে যায় কোনো মতে। মিশা সওদাগর ও সিরিয়ালে অভিনয় করে বিক্রমও ভাল অভিনয় করেছে। সিনেমাতে হৃদয় খানের দুটো গান ভাইটাল সময়ে, চিত্রায়ন নানা জায়গা থেকে মেরে দিয়ে ভালোই। 'বাংলাদেশের মেয়ে' নামের এক গান আছে ব্যাবসায়িক বুদ্ধি মাথায় রেখে তা মন্দ না শুনতে। নায়ক নায়িকার ক্যামেস্ট্রি সবার পছন্দ হয়েছে দেখলাম। কিন্তু সিনেমাটা শেষমেষ আমার মনে ধরে নি। আর বাংলাদেশকে টেনে আনা অযথাই। পরিচালক অনন্য মামুনও সহ পরিচালক হয়ে কার হিন্দী চুলটা ছিড়ছেন তাই বুঝলাম না। তবে এই সিনেমাকে টাইম পাস হিসেবে দেখলে আনন্দময়। সিনেমার প্রিন্ট দুর্দান্ত চকচকা। হলের সাউন্ড সিস্টেমও মারকাটারি, তাই বন্ধু বান্ধব নিয়ে দেখতে গেলে খারাপ লাগবে না। কারন ব্রেকে শাকিব খানের এক বিগ বাজেটের সিনেমার ট্রেলার দেখালো, নাম ফাঁদ, খালি টাকাই খরচ করছে কামের কিছু নাই। সেই তুলনায় কলকাতার এইসব সিনেমা ভালো, এরা নকল করে হলেও এন্টারটেইনিং কিছু দেখায়। এই সিনেমাকে আমি দিবো পাঁচে আড়াই! এই সিনেমা ব্যাপক ব্যাবসা করছে দুই বাংলাতেই। ইন্দো বাংলাদেশ সার্কিটের সব রেকর্ড ভেঙ্গে দিয়েছে। এই চান্সে বাংলাদেশী সিনেমার বাজারে ঢুকে পড়লো মারোয়ারী আর শিখ প্রডিউসারদের হাতে থাকা কলকাতার মেইনস্ট্রীম সিনেমা!





পুরনো শ্যামলী হলে অনেক সিনেমা দেখেছি। সর্বশেষ ছবি ছিল সম্ভবত নার্গিস আক্তারের মেঘলা আকাশ। সব বন্ধুরা মিলে একসাথে দেখেছিলাম।
কতদিন সিনেমা হলে গিয়ে বাংলা সিনেমা দেখা হয়না!
রিয়াসাকে নিয়ে আইসেন, মজা পাবেন!
আমি খুব ছোটবেলায় একবার কিশোরগঞ্জ সিনেমা হলে আমার ফুপাত ভাই- বোনদের সাথে দেখসিলাম “রাগ- অনুরাগ”।
আমি জামালপুরের কোনো হলে সিনেমা দেখি নাই, ইচ্ছা আছে সামনে!
রিভিউ সেইরকম, সিনেমা না দেখলেও চলে। হাসতে হাসতে গড়াগড়ি যাচছি
দিনে দিনে দেখি বিশাল সমালোচক হিসেবে প্রতিষ্টা পাচ্ছি!
মন্তব্য করুন