শর্টপিচ
টানা অবরোধের দিনগুলো কাটছে এই ক্রিকেট নামের কলংক 'শর্টপিচ' খেলে খেলে। মাঠ মোহাম্মদপুরে সংখ্যায় কম না, কিন্তু পাওয়া যায় না খালি, আর যা খালি পাওয়া যায় তা টাকা দিয়ে ভাড়া নিতে হয় নয়তো ক্ষমতাসীনদের লবিংয়ে পেতে হয়। তাই সোসাইটি ১১র প্লটে আমার নিজেরা নিজেদের মতো খেলি, ছোট সীমানায়, ছয় মারলে আউট, চার পাঁচ ম্যাচ খেলা যায়, হাত না ঘুরিয়ে বল করার শর্ট পিচ। খেলতে নেহায়েত মন্দ না। মাঝে মাঝে ম্যাচ খেলি ক্লাস নাইন টেনের ছেলেদের সাথে। আমাদের মতো এমেচার বড় ভাইদের সাথে তারা পেরে উঠে না। আমি- পুলক- আবির- শারান- অনিক- রাসেল, দারুন টিম। যত বার ক্রিকেট খেলে গায়ে একগাদা ধুলো নিয়ে বাসায় ফিরি, ততবার মনে হয় বয়স সেই ষোলো সতেরোতেই আটকে আছে, মাঝখান দিয়ে ১০ বছর কোন পথ দিয়ে নিমিষে হারিয়ে গেল টেরই পাই না। বিএনপির অবরোধে দেশ পুড়ছে, আমাদের কাজ একটাই সকাল বিকাল খেলা আর সন্ধায় বারেকের দোকান চাপা পিটানো।
অবরোধের ভেতরে যাবার তেমন জায়গা নেই। তাও সকাল সকাল আমি একা একা কতদুর চলে যাই। ঘুম থেকে উঠি, ফ্রেশ হয়ে কেডস পড়েই হাঁটা শুরু করি। ঘড়ি দেখি না, কারন ঘড়ি দেখলে আমার হাঁটতে ইচ্ছে করে না। নয়টার সময় কেইবা হাঁটতে যায়। অলরেডি সবাই তখন ফিরে গেছে বাসায়, সবাই ছুটছে অফিসে, অল্প কয়জন আছে যারা দেরি করে আসছিলো। পেপারওয়ালা, ডাবওয়ালা সব চলে গেছে, নতুন দিনে আসছে ঝালমুড়ি বিক্রেতা আর ফ্লাস্কে চা বিক্রেতা। স্কুল পড়ুয়া প্রেমিক প্রেমিকারা বসা, ফকির, পেপার বিক্রেতা ও মেডিসিন বিক্রেতা, শরবত বিক্রেতা- সবাই গুনছে টাকা কত হলো সকালের রোজগার। এই ফাকা ফাকা সময়ে আমি হাঁটি দৌড়াই, কিন্তু আগের মতো বসে থাকি। হেঁটে হেটে সরাসরি বাসা চলে যাই। গোসল দেই, নাস্তা করি আর পিসিতে বসি। হেঁটে উপকার হয় কি না জানি না, তবে এই সতেরো দিনে অভ্যাসটা করে ফেলছি। ঘুম থেকে উঠেই আমার কাজ একটাই। আশা করি অভ্যেসটা টিকে থাকবে। মধ্যে অবশ্য আরেক অভ্যাস করে ফেলছিলাম, চায়ের দোকানে যাবো কিন্তু বাইরের চা খাবো না, রাখতে পারি নি, পাচদিনের মাথায়। সে চার পাচ দিন হায়রে রিকোয়েষ্ট, সবাই বলতে বলতে ও অনুরোধে ফেনা তুলে ফেলছে। মনে হয় দেশের এই দুর্দশার জন্য দায় আমার, আমি চা পান করলেই সব সমস্যার সমাধান। চা ছাড়া থাকা খুব একটা সহজ না, বাসাতে এসেই চা বানাতাম। শেষে তা ভাঙলাম মুলত দোকানদার বারেক সাহেবের ঠেলায়। উনি ইট এনে বলতেছেন, এইটা আমার মাথায় মারেন নয়তো একটা চা খান। এত এক্সট্রিম ভালোবাসায় ইমোশনাল হয়ে গেলাম। কি আর করার। মোহাম্মদপুরে সুজুকি নামের এক কফিশপ হয়েছে, খুব নাকি ভালো। গেলাম একদিন একা একা। ব্ল্যাক কফি খেলাম, সেই ভাব। টাকা পয়সা হলে আগামীতে কফি শপে দিন পার করবো। গ্লোরিয়া জিনসের সামনে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ভাবি, বিজ্ঞাপনের ভাষায়- একদিন আমি হবো ডাক্তার, অসুখ সারাবো সবার।
যাওয়ার ভেতরে এখন যাওয়া হয়, শুধু পারভীন আপুর বাসায়। উনি বলে আসতে, আমি হাজির হই। রিকশা দিয়ে যাই, হেটে আসি আর খেয়ে আসি একগাঁদা খাবার। যে পরিমান খেয়েছি ওই বাসায়, তা ভুলে যাওয়া অসম্ভব। সেদিন গিয়ে খেয়ে আসলাম প্রায় হাফ একটা গ্রিল চিকেন আর নুডুলস। খেয়েদেয়ে আর নড়তে পারি না। জ্যোতি আপু আর অদিতি আপু গেলে খুব মজা হয়। কত কি নিয়ে আড্ডা জমে। অদিতি আপুর মুখে সিনেমার গল্প শোনা এক অসাধারণ আনন্দের ব্যাপার। উনার স্মরনশক্তি চাচা চৌধুরীর চেয়েও প্রখর। কত মানুষ নাম যে হরগর করে বলে চলে, মাঝে মাঝে দু একটা সার্চ দেই, বর্ণে বর্ণে মিলে যায়। আর পারভীন আপুর বাসায় আরেক কাজে গেলে উপকার, বাসা ভর্তি বই, টান দিয়ে নিয়ে আসি যা ইচ্ছে করে তাই। এরচেয়ে উপকারী আড্ডা আর আছে নাকি এই দেশে?
দেশ নিয়ে খুব চিন্তিত হিজবুত তাহরীর ওয়ালারা। মসজিদে নামায পড়ার সুত্রে কয়েকজন পূর্বপরিচিত, আমাকে দেখলে জিগেষ করে, পরিচিত কোনো আর্মি অফিসার আছে নাকি, থাকলে তাঁদেরকে দাওয়াত দিবে, তাঁরা আর্মি দিয়ে ক্ষমতায় যাবে। নবীজিও নাকি তাই করতেন। আমি এখন মাথা ঠান্ডা রাখা শিখে গেছি, নয়তো মনে হয় লাগাই এক মাইর। কথায় কথায় নবীজির রেফারেন্স দিয়ে, ইসলামের নাম ভাঙ্গিয়ে, ষড়যন্ত্র মাফিক মসনদের ধারে কাছে যাওয়া যাদের লক্ষ্য, তাদের থেকে দূরে থাকাই ভালো। তাও চোখে পড়ে যায়, সমবয়সী এক ছেলের সাথে দেখা হলো, হিজবুত করে। অনেক আগে চিনতাম। জিগেষ করলো, কি খবরাখবর। বললাম। আমি জিগেষ করলাম তাঁর খবর, বললো- বিয়ে করেছে, সংগঠনে একটিভ, প্রসিদ্ধ এক ইংরেজী স্কুলের টিচার। চেহারা ছবিতেও চাকচিক্য ও দামী জামা কাপড়। বিদায় নিলো, আর আমি মনে মনে ভাবলাম কি করলাম জীবনে? এরা পরকাল- ইহকাল- জিহাদকাল- ক্যারিয়ারকাল সবকালেই সিষ্টেম করে ফেললো। আর আমরা দিন কাটাইলাম সিষ্টেম লসে। তাও ভালো আছি ইসলামের ইউনিপেটু ইউ খুলি নাই।
প্রয়াত মীজানুর রহমান সাহেবের এক বই পড়ছি, ঢাকা পুরাণ। অসাধারণ এক গ্রন্থ। একবার পড়া শেষ আবার পড়ছি। উনি ব্লগ লেখার মতো করে ঢাকা কে নিয়ে লিখছেন, নিজের স্মৃতিকথার সাথে ঢাকার সেইসময়কে মেলাচ্ছেন। পঞ্চাশ ষাট বছর আগে ঢাকা কেমন ছিল তা নিয়ে রসাত্মক ভঙ্গিতে আলোচনা। ঢাকা নিয়ে পড়তে আমার সেই ভালো লাগে। আমি কিন্তু নিজেকে মোটেও ঢাকাবাসী মনে করি না। তবুও সবার মতোই যাওয়ার জায়গা নেই বলে- এই আপদমস্তক এক জঘন্য শহরে বেঁচে থাকি সবাই। পুরানো দিনে ঢাকার গল্প পড়ে আমাকে এই শহরকে ভালোবাসতে অনুপ্রেরনা দেয়। কিছুদিন আগেই কি অসাধারণ এক জনপদ ছিল এই ঢাকা।
টানা অবরোধে একমাত্র এই ঢাকা শহরের অবস্থাই ভালো। অন্য সব জেলায় জঘন্য অবস্থা। বাস দুয়েকটা যে আসে যাত্রীদেরকে এখন বলে মাথা নিচু করে বসে থাকতে। কোন সময় ঢিল আসবে, তা কেউ জানে না। আর ট্রেনে আসলে তো ইতিহাস, আমার বন্ধু আদনান রংপুর থেকে আসছে তেইশ ঘন্টায়। ট্রেন ছিল ৮ ঘন্টা লেইট। মোটামুটি দেড় দিন লাগছে। তালগাছবাদী দলকানারাই ভালো আছে, এক পক্ষ যুক্তি দেখাচ্ছে গনতন্ত্র রক্ষায় এই জিহাদ। আরেক গ্রুপের যুক্তি মানুষ মেরে কয়লা করা হচ্ছে, গুলি মেরে খতম করো এদের। এর শেষ যে কোথায় তা আমার কিংবা আমাদের জানা নাই। আমরা বসে থাকবো শুধু কোনটা মন্দের ভালো তা নির্ধারণে। অলরেডি নানান মানুষ আমাকে আওয়ামীলীগের দালাল ভাবে। আমি অবাক হই, সারাজীবন আওয়ামী লীগের সমালোচক হয়ে,এখন খেলাম এই ট্যাগ। তখন ভাবলাম রাজাকারদের ও বিএনপি টকশোজীবিদের গালাগালি করলেই সবাইকে আওয়ামীলীগের দলে ফেলে দেয় মানুষ। সত্যিই, আজব এক দেশ।





শেষবার কবে ক্রিকেট খেলছি ভুলেই গেছি। আফসুস।
সকালের হাঁটার অভ্যাসটা ধরে রাখ, কাজের জিনিস।
পারভীন আপু আর তোমারে মাইনাস। ভালো খাবারের কথা এইভাবে কইতে হয় নাকি? >)
ইংরেজী স্কুলের টিচারাও তাইলে হিজবুত করে? খাইছে!!!
ঢাকা দিনকে দিন একটা গিঞ্জি বস্তিতে পরিনত হচ্ছে।
রাজাকারদের কিছু কইলে বাই ডিফল্ট তুমি আওয়ামীলীগার।
চানকু পানকু খানকে দেখলেই শান্তি লাগে। আহা কি দিন ছিল আগে আমাদের, ব্লগে আসলেই কত কি করতে হতো, পড়তে হতো। এখন সব কিছুই শুধু স্মৃতি!
অনেক দিন পর এই টাইমে লিখলেন মনে হয়?
পকেটে পাত্তি কেমন? ভাই ভাবি দিছে কিছু? বইমেলা তো আইসা পড়তেছে, আপনেরে কুপামু ভাবতেছি এইবার!
সমস্যা নাই। আল্লাহই করিবে ব্যবস্থা। মন দিয়ে পড়ো। মেলায় দেখা হবেই!
ভাল আছো ভাল থাকো
মোহাম্মদপুর মাঠে ক্রিকেট খেলো
ভাল বরাবরের মত।
থ্যাঙ্কস এ লট!
চা বস্তুটা যার মাথায় একবার গেঁথেছে তার ভুলে থাকাটা অসম্ভব। যাক ভালো থাকেন, ক্রিকেট খেলেন আর দৌড়াতে থাকেন !
ঠিক
মন্তব্য করুন