Newton(2017)
'নিউটন' সিনেমার ট্রেলারটা ছিল চমক জাগানিয়া। এত ভালো হিন্দি ছবি ট্রেইলার শেষ কবে দেখেছিলাম মনে পড়ে না। আমি বলিউড নিয়ে খোঁজ খবর রাখলেও প্রযোজক আর অভিনেতা ছাড়া আর কাউকে চিনলাম না। পরে খোঁজ নিয়ে দেখলাম, অমিত মাসুরকারকে আমি চিনি। তার প্রথম বানানো ইন্ডিপেন্ডেন্ট কমেডি মুভি- 'সোলেমানি কিড়া'। সিনেমাটা সীমাবদ্ধতা থাকার পরেও অসাধারণ, বলিউড আর এর বিভিন্ন সিস্টেমকে ট্রল করা এত ভালো সিনেমা আর হয় নি। আর সীমাবদ্ধতা সিনেমার এন্ডিংটা। বলিউডকে ট্রল করে শেষে তারা বলিউড মার্কা এন্ডিংয়েই চলে গিয়েছে। তবে নতুন পরিচালক হিসাবে অমিতের কাজ সেইসময় চোখে লাগার মতো। ভাগ্যিস অমিত ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ড্রপ আউট হয়েছিলেন সিনেমা করবেন বলে। নয়তো তিনি 'নিউটন' বানাতেন কিভাবে আর তিনি যে বড় মাপের এক পরিচালক তা জানাতেন কিভাবে?
নিউটন একটা সাংঘাতিক রকমের ভালো সিনেমা। এরকম ভালো সিনেমা সাম্প্রতিক ইতিহাসেই বিরল। সবার মতো আমি জেনারেলাইজে যাবো না, যে বলিউডে ভালো সিনেমা হয় না। অবশ্যই বলিউডে প্রচুর না হলেও উল্লেখ করার মত ভালো সিনেমাও হয়। কিন্তু নিউটন দেখে মনে হলো এটা ভালো সিনেমার চাইতেও বেশী কিছু। যেহেতু সিনেমা আমি পিসিতেই দেখি, আর ভারতের সিনেমা ঢাকায় আসে না তাই আমাকে অপেক্ষা করতে হয় ভালো প্রিন্টের জন্য। অবশেষে আজ পেলাম ভালো প্রিন্ট, দেখে ফেললাম ছুটির দুপুরে।
‘নিউটন’ সিনেমাটা অসাধারণ এক এক্সপেরিয়েন্স। ব্ল্যাক কমেডির আড়ালে তা দেখাতে চেষ্টা করে সব চেয়ে বড় গনতান্ত্রিক দেশের ভেতরে কি চলছে। রাষ্ট্রের সিস্টেমের সাথে ব্যক্তির সংঘাত। সিনেমাটা দেখতে গিয়ে আমার প্রথমে মনে হয়েছে ইরানি সিনেমা ‘সিক্রেট ব্যালট’ এর কথা। সিনেমাটা সেই সুত্রেই শুরু, এক সরকারী কর্মকর্তাকে প্রিজাইডিং অফিসার বানিয়ে পাঠানো হয় ছত্তিশগড়ে, ইলেকশন করার জন্য। সে ইলেক্ট্রিক ভোটিং মেশিন আর টিম নিয়ে সে গিয়ে দেখে জায়গাটা মাওবাদী অধ্যুষিত এলাকা। সেখানে অদ্ভুত সব পরিস্থিতি। সেনাবাহিনীর ভয়ে ঠটস্থ জনগন চলে যায় গ্রাম ছেড়ে, সবাই ভয় পাই সরকারী লোকজনকে। অতি নিম্নবিত্ত এইসব মানুষের কাছে ভোটের কোনো গুরুত্ব নাই, প্রচার প্রচারণা নাই। সাদা চামড়ার ইলেকশন পর্যবেক্ষক আসবে বলে জোর করে ধরে আনা হয় গ্রামবাসীকে, ইভিএমের সাথে রিলেশন নাই বলে তারা জানে না এইটা কি? নিউটন কুমার যিনি প্রিজাইডিং অফিসার বোঝানোর চেষ্টা করেন, ভোট কিভাবে দিতে হবে, ভোট দিলে কি কি উপকার, তা নিয়ে। স্থানীয় জনগন কিছুই বুঝে না। যখন বাহিনীর কমান্ডার ধমক দিয়ে বোঝায়- এইটা একটা খেলার মেশিন, যা মন চায় টিপে আসো। নিউটন প্রতিরোধের চেষ্টা করে কাজ হয় না। এইভাবেই এগিয়ে চলে সিনেমা। নিজের রেন্সপন্সিবিলিটি নিয়ে সচেতন নায়ক আবিষ্কার করে রাষ্ট্র কেমন নিপীড়নবাদী। খনি মালিকদের সুবিধার জন্য আগুন দিয়ে ঘর পুড়িয়ে জায়গা খালি করানো হয়, বানানো হয় ক্যাম্প। নিউটনের সাহস দেখে তার কলিগরা ভাবে সে নিশ্চয় অনেক ক্ষমতাবান কারো ভরসায় চলে। সব চেয়ে কুল থাকে, স্থানীয় এক স্কুল শিক্ষিকা মেয়ে(অঞ্জলি পাতিল)। সে জানায় 'আমি এইসব দেখতে বড় হইছি, আপনি একদিন দেখেই হতাশ' কিংবা স্যার 'কোনো কাজ একদিনে হয় না, অনেক বছর লাগে একটা ফরেস্ট তৈরী হতে'। কিংবা সঞ্জয় মিশ্রা যখন জানায় নায়ককে, তুমি সৎ এইটা সমস্যা না, তুমি চাও তুমি ওনেষ্ট বলে সবাই তোমার প্রশংসা করুক। এইভাবেই এই সিনেমার নানান বাঁকে প্রচুর সারপ্রাইজ। সব মিলিয়ে এক দারুণ সিনেমা।
অস্কারে এই সিনেমা ভারত থেকে গেছে, আর দু চারটা বিশাল এ্যাওয়ার্ড পেয়েছে। মাসালা গান বাজনা না থাকার পরেও এই সিনেমা খুবই ব্যবসাসফল। মুখে মুখে এই সিনেমার কিংবদন্তী ছড়িয়ে পড়েছে সব খানে। এই সিনেমার সব কিছুই পারফেক্ট। একচুয়াল মাওবাদীদের ঢেরা ছত্তিশগড়ে শ্যুটিং, প্যারামিলিটারী ট্রেইনিদের দিয়ে শুটিং, বিশাল ক্রু নিয়ে জঙ্গলে কাজ করা সব মিলিয়ে সিনেমাকে দিয়েছে এক ইউনিক ফিলিং। পরিচালক এখানে চাইলেই শাইনিং ইন্ডিয়ার সাইডে থাকতে পারতো, বামপন্থী সিমপ্যথাইজার হয়ে মাওবাদীদের সাইডেও থাকতে পারতেন কিন্তু গিয়েছেন নিপীড়িত সাধারণ মানুষের সাইডে। যারা হোক সরকারী কর্মকর্তা, হোক নিম্নবিত্ত, সৎপথে থাকলেই তারা অসহায়। তাও কাজ করে যেতে হবে, কারন সিনেমাতেই আছে কারন, নায়ক জানায়- যতক্ষণ কিছু না শুরু করছি ততটা সময় কিচ্ছু আসলে বদলাবে না।





এ সপ্তাহেই দেখে ফেলবো
আশাকরি ভালো লাগবে!
দেখেছি - লাস্ট সীনটা বেশি ভাল লেগেছে
একদম!
রিভিউটা ভাল্লাগসে। অনেককিছু বলেও যেন কিছুই বললেন না। পাঠককে সিনেমা দেখেই বুঝে নিতে হবে সকল ঘটনা। শুধু একটা হাই রেঞ্জের অ্যাবস্ট্রাক্ট আউটলাইন টানা থাকলো।
ধন্যবাদ ব্রাদার। এত মন দিয়ে পড়েছেন!
স্বাগতম। আপনার সব লেখাই আমি মনোযোগসহ পড়ি। কমেন্ট করা হয় না, কারণ বেশিরভাগ সময় শুধু ভাল হয়েছে কিংবা ভাল লেগেছে ছাড়া আর কিছু বলার থাকে না। ওইটুকুর জন্য তো লেখা পছন্দ করার সিস্টেম আছেই
আপনার ব্যাপারেও আমার সেইম। নতুন করে আর কি বলবো! তাও কমেন্ট দেখলে শান্তি লাগে।
মন্তব্য করুন