ডায়েরীর একটি খালি পাতা ও অন্যান্য কথকতা..
আমি ডায়েরী লিখি, ছয় বছর হল কয়েকদিন আগে। কলেজে থাকতে ইন্টার লাইফে হঠাৎ খেয়ালে শুরু। ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০০৬-এ লেখা শুরু করে আর থামা হয়নি এই পাগলামির। আস্তে আস্তে দিনে দিনে পুরোই নেশার মত হয়ে গেছে আমার এই ডায়েরী লেখা। নিতান্তই সাধারণ, বিন্দুমাত্র সাহিত্যের ছোঁয়া ছাড়া একঘেয়ে প্রতিদিনকার দিনলিপি - মনের অজান্তেই কবে থেকে যেন আমার প্রতিদিনকার ধরাবাঁধা জীবনের অবিচ্ছেদ্দ অংশ হয়ে গিয়েছে। সকালে বা প্রায়-দুপুরে ঘুম থেকে উঠার পর থেকে রাতে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত, কিছুই লেখার বাকি থাকেনা তাতে। এতটাই লম্বা বৃত্তান্তে ধুলো জমা ডায়েরীর গায় জমা থাকে আমার দিনগুলি, যে যখনি পড়তে ইচ্ছে হয় নিমেষে চোখের সামনে ভেসে উঠে এই কটা বছরে আমার জীবনের স্বপ্নের মত সুন্দর অথবা তীব্রতম কষ্টের একেকটা দিন। ডায়েরী ছাড়া কোথাও বেড়াতে গেলেও দিনগুলো জমা থাকে মুঠোফোনের নোট হয়ে অথবা কোন ছেঁড়া পাতায়, পড়ে ডায়েরীতে টুকে নেবো বলে। এতটা লম্বা সময় ধরে লিখছি কিন্তু ডায়েরীর একটি পাতাও খালি নেই! যত ঝড় ঝাপ্টাই থাকুক, একেকটা দিনের শেষে এখন আর ডায়েরী না লিখে ঘুমাতেই পারি না!
#
থাক, এখন আর আমার ডায়েরী নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছে করছে না।
বেশ কয়েকদিন ধরেই ভাবছিলাম এশিয়া কাপ নিয়ে একটা কিছু লিখবো, তাই বরং লিখি যা হয় হাবিজাবি।
গত পাকিস্তান সিরিজে টিকেট পাই-ই নি বলা যায়। তাই এশিয়া কাপের টিকেট যেদিন ছাড়ল, ভোরে উঠে লাইনে গিয়ে দাড়াতে এবার আর ভুল করিনি। বাংলাদেশ ছাড়া আর কারও খেলাই আজকাল টিভিতেই দেখা হয় না, আর মাঠে গিয়ে নিজের দেশ ছাড়া আর কাউকে সমর্থন দেয়ার তো প্রশ্নই আসে না।
আগেই ঠিক করে রেখেছিলাম, বাংলাদেশের তিনটা ম্যাচই মাঠে বসেই দেখব। ভেবে রেখেছিলাম বাংলাদেশ হয়তো একটা ম্যাচ ঠিকই জিতে যাবে এইবার, ভারতের সাথে। দুইটা ম্যাচ জেতা ছাড়া ফাইনালে উঠার কথা চিন্তাও করা যায় না তাই একবার কিন্তু কিন্তু করেও ফাইনালের টিকেট কেনা হয়নি। মাত্র ৪/৫ ঘণ্টা লাইনে দাড়িয়েই বাংলাদেশের সব ম্যাচের টিকেট পেয়ে আমার তখন 'সাত রাজা ধন পাওয়া আমার হয়ে গেছে' অবস্থা! আহা! তখন যদি জানতাম, মন যখন কিছু বলে তখন প্র্যাকটিকালি না ভেবে ইমোশনালি ভাবাই উত্তম!
১১ তারিখ পাকিস্তানের সাথে প্রথম ম্যাচ, বহু দিনের আরাধ্য পাকি-বধ হতে হতেও হ্ল না। ১১ মার্চ ২০১১'র চট্টগ্রাম জহুর ইসলাম চৌধুরী স্টেডিয়াম একটুর জন্য ফিরল না মিরপুরের হোম অফ ক্রিকেটে! তাও টাইগার দের খেলায় কি যেন একটা আমূল পরিবর্তন; খেলার ধরন, মানসিকতায় আর শরীরী ভাষায় তো বটেই।
মাত্র একুশ রানের হারের ময়নাতদন্ত করতে করতে ফেরার পথে শুধু বারবার মনে পড়ে যাচ্ছিল, আমাদের পাগলা মাশরাফির সেই ঐতিহাসিক মন্তব্য 'ধরে দেবানি'!
১৬ তারিখ এলো। টার্গেট ভারত। আবারও একবার, স্বপ্ন হল সত্যি। লিটল মাস্টারের অবিস্মরণীয় কীর্তি শততম সেঞ্চুরিও ফিকে হয়ে গেল আমাদের টাইগারদের সামনে। আবারও আরও একবার, সারাদেশের ১৭ কোটি মানুষকে এক করে দেওয়া এক জয়। শহরের প্রতিটি রাস্তায়, অলিতে গলিতে যেন আনন্দের মেক্সিকান ওয়েভ!
আমার জীবনে দেখা সবচাইতে ম্যাচিওর জয়, এনে দিল নতুন স্বপন!
আরে!
শ্রীলঙ্কা কে কোনমতে টেনেটুনে হারিয়ে দিতে পারলেই তো আমরা ফাইনালে!
এলো সেই ২০ তারিখ! কিসের টেনেটুনে, দিব্যি হেসে খেলে ভারতের বাড়া ভাতে ছাই ফেলে টাইগাররা ফাইনালে!
কি অবিশ্বাস্য ব্যাপার! কে ভাবতে পেরেছিল আমরা ঘরের মাঠে উঠে যাবো এশিয়া কাপ ফাইনালে?!
ফাইনালে যখন উঠেই গেলাম, আরেকটু স্বপ্ন দেখতে তো ক্ষতি নেই কোন!
তার উপর
সামনে আবারও পাকিস্তান, ক্রিকেটের মহা অনিশ্চিয়তার জলজ্যান্ত প্রতিক!
মার্চের প্রতিশোধ যদি এই মার্চেই নিয়ে ফেলা যায় - তাইলে আমাদের আর পায় কে!
এই ম্যাচ যদি মাঠে বসে না দেখতে পারি তাইলে আর ক্যাম্নে কি!
২১ তারিখ পুরোটা দিন গেল টিকেটের খোঁজে,
সবাই কেবল আশা দেখায় আর শেষে এসে স্বপ্নভঙ্গ!
শেষমেশ রাত সাড়ে এগারোটায় স্টেডিয়াম এলাকায় গিয়ে এক অন্ধকার গলিতে দেখা দিল 'সোনার হরিণ'!
বেশ কয়েক গুন বেশি দামে, তাতে কি! মাঠে গিয়ে গিয়ে জান দিয়ে চিল্লায়ে ফাইনালে তুললাম, এই কাপ রাখতে হব না?!
তারপর আর কি!
২২ই মার্চ, ২০১২।
এশিয়া কাপ ফাইনাল, বাংলাদেশ বনাম পাকিস্তান।
ধরা দিবে স্বপ্ন? নাকি হবে স্বপ্নভঙ্গ? নিদারুণ হতাশা?
৩ দিনের ঘামে ভেজা লাল সবুজ জার্সিতে আরও একটা দিন, লাকি চার্ম ধুয়ে না যায়!
কোটি প্রানের প্রার্থনা, গ্যালারী জুড়ে মুক্তির গান আর ক্ষণে ক্ষণ গর্জন।
যা যা হতে পারতো, সব-ই হল তার!
শেষে এসে রয়ে গেল, কেবল কোটি প্রানের একটাই দীর্ঘশ্বাস 'মাত্র ২ রান'!
পাওয়া হল না বহু আরাধ্য সেই কাপ,
তবুও কেন জানি কিছু না পাওয়ার চাইতে পাওয়াগুলোই বেশি চোখে পড়ছে।
কে কবে দেখেছে,
ফাইনালে হেরে যাওয়া দলের জন্য গ্যালারী জুড়ে
অশ্রু ভেজা চোখে ভাঙ্গা গলার জয়োল্লাস- দৃপ্ত কণ্ঠের চিৎকার?!
'বাংলাদেশ..বাংলাদেশ..বাংলাদেশ'!
১১ টা বাঘের বাচ্চার চোখের জল যখন ১৭ কোটি হৃদয়ের সাথে মিশে যায়,
তখন আর কি-ই বা বলার থাকে?!
একটা কাপ ই তো, নাই বা পেলাম এইবার।
১৭ কোটি মানুষের অশ্রুস্নাত ভালবাসার ধাঁরে কাছেও কি আর কিছু আসতে পারে!
মাঝে মাঝে,
হেরে গিয়েও জিতে যাওয়া যায়।
ডিয়ার টাইগারস্,
টেক এ বিগ বিগ বাউ!
দ্যা হোল ওয়ার্ল্ড ইজ লুকিন এট দেয়ার নিউ 'পিপল'স চ্যাম্পিয়ন!
কাল রাত থেকে কেন জানি একটা গানই শুনে যাচ্ছি বারেবার,
মিফতাহ জামান এর 'অতঃপর'।
আসলে কোন দুঃখই কখনও মুছে যায় না, কেবলি সইয়ে নেওয়া।
গত সপ্তাহ দেড়েকের মাঝে লাল সবুজের জার্সি বাদে আর কিছু পড়া হয়নি।
অভ্যাসের বশে আজও তাই পড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি।
দুয়েকটা কমেন্টও পাচ্ছি ভাল মন্দ।
তবে আজ সারাদিনে কিছু কিছু মানুষ আসলেই মন কিছুটা ভাল করে দিয়েছে।
মানুষ মাঝে মাঝে কিচ্ছুটি না বলে -
এক দুই পলকের নিস্পলক দৃষ্টিতে অনেক কিছুই বলে দিতে জানে!
বেশ ভালই আছি এখন।
তবুও মাঝে মাঝে কোন কারন ও পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই
একেকটা মুহূর্ত চোখের পলকে দৃষ্টি ঝাপসা করে দিয়ে যাচ্ছে হুট করেই!
কি বিচিত্র এই বেঁচে থাকা, আজব মনের মানবজীবন!
#
..কাল রাতে আমার ডায়েরী লেখা হয়নি। ..লিখতে পারিনি কিছু, কিছুতেই।





বাংলাদেশ সারাজীবন
এইটাই আসল কথা
হ..
অনেকরে দেখসি, ফাইনালের দিন আগের দুইদিনের পড়া গেঞ্জি-শার্টগুলা পড়ে ঘুরতে। সেগুলা নাকি লাকি! এই কুসংস্কারটা মানুষের মধ্যে কেমনে ঢুকলো বুঝলাম না!
এরকম আরও অনেক কিছুই আছে,
কোন মানে নাই তবুও মানা হয়।
আপনি কি এমন কোন কিছুই করেন না,
যাতে লজিক নাই?!
হাবিজাবি লেখাতেই ভরা থাক্তো পাতার পর পাতা। ডাইরী লিখে নতুন বছর এলে পড়তাম, তারপর একে একে ছিড়েঁ ফেলতাম সেগুলো! জানি না কেন করতাম, আবার দু'এক্টা পাতা সযত্নে রেখেও দিতাম! এক্তা সময় লেখা বাদ দিয়ে দিলাম। এখন খারাপ লাগে কেন করতাম ওমন, সেই রেখে দেওয়া পাতাগুলো পড়লে খুবই মজাই লাগে।
আপনার লেখাটা পড়তে অনেক ভালো লেগেছে। দারুন করে লিখে আপনি
পড়ার ও মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ, আপু।
আসলে, নিয়মিত ডায়েরী লেখার মজাই আলাদা।
এখন যেহেতু নিয়মিত লেখার ৬ বছর হয়ে গেছে,
মাঝে মাঝে কিছু করার না থাকলে এগুলা নিয়া বসা যায়।
যে কোন একটা তারিখ ধরে গত ৬ বছরে ওইদিন কি কি করছিলাম পড়ি।
নিজের চোখের সামনে নিজের চিন্তাভাবনার ধরনের পরিবর্তন টা দেখতে খুবই মজার লাগে।
মোবাইলে ইমোটিকন কাজ করেনা,
এক কেজি ধন্যাপাতা রান্না করে খেয়ে ফেইলেন!
আমাকে প্লিজ তুমি করে বলবেন,
আমি আপনার অনেক অনেক ছোট।
মন্তব্য করুন