ভাষাচিত্র-০১১ : সাধারণ মানুষের সংলাপ
স্থানীয় বাজারের একটি চায়ের দোকানে বসেছি চা খেতে। চায়ের অর্ডার দিলাম। দোকানের ২০ ইঞ্চি কালার টিভিতে একটি বেসরকারী চ্যানেলে চলছে প্রজন্ম চত্বরের সরাসরি সম্প্রচার। ব্লগার ও অনলাইন এক্টিভিটিস্ট ফোরামের আহবায়ক ইমরান এইচ সরকার ঘোষনা করছেন- একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের বিচারে ফাঁসির রায় হওয়া রাজাকার দেলোয়ার হোসেন সাইদী ও অন্যান্য রাজাকারের ফাঁসি কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত আমরা ঘরে ফিরে যাবোনা। আমাদের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।.. সম্ভবত ক্যাবল কানেকশানে কোনো ত্রুটির কারনে সম্প্রচারে বিঘ্ন ঘটলো।
দোকানের সামনের বেঞ্চিতে বসে টিভি দেখছিলেন ৭/৮ জন মধ্যবয়স্ক লোক আর একজন প্রবীন। প্রবীন লোকটিকে আমি চিনি। তিনি সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন মানে সরাসরি অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেননি। মুক্তিযোদ্ধাদেরকে নানা প্রয়োজনীয় জিনিস সরবরাহ করতেন। তারা কথা বলছেন টিভির খবরটি নিয়েই..
(আঞ্চলিক বাংলায় বলা তাদের সংলাপগুলো আঞ্চলিক ভাষাতেই প্রকাশ করলাম)
মধ্যবয়স্ক ক: এইগুলা তো দেহি ভালাই সুবিদা পাইয়া লইছে..
মধ্যবয়স্ক খ: সুবিদা ত পাইবোই। তিনবেলা বালা বালা খাওন পাইতাছে।
মধ্যবয়স্ক গ: খালি খাউন নিহি..হুনচি টেহাও নাহি দিতাচে।
মধ্যবয়স্ক ক: তাইনি!? কেডা ট্যাহা দে?
মধ্যবয়স্ক গ: আমগোর দুই বাতিজা ঢাকা কলেজে পড়ে। তারা ওইহানে বেশ কয়বার গেচে। ২/৩ গন্টা ওইহানে আছিলো। হের পরদিন কলেজে ছাত্রলীগের পোলাপাইনে তাগোরে কইছে হারাদিন আন্দোলনে থাকলে ৫০০ টেহা দিবো আর রাইতে থাকলে ১০০০ টেহা কইরা দিবো। আমার ভাতিজারা কইছে আমরা সময় পাইলে এমতেই যামু, টেহা লাগবো না।
প্রবীন লোকটি: আচ্ছা টাকাগুলা দেয় কেডা? সরকারের লোকজন দেয় নাকি?
মধ্যবয়স্ক ক: ছাত্রলীগের পোলাপাইন ত সরকারের লোকঅই।
প্রবীন লোকটি: শোন মিয়ারা সরকারের লোকজন যদি ওদেরকে টাকা আর খাবারদাবার দিয়াও থাহে এইডার মইধ্যে খারাপ কী দেহো? এতোগুলান মানুষ এতোদিন ধইরা এইখানে পইড়া আছে সরকারের ত দায়িত্ব আছে।
মধ্যবয়স্ক ক: তা ত বুজলাম। কিন্তুক সরকার তাদেরে বুজাইয়া হুনাইয়া গরে পাডায়না ক্যেন? এইযে কইলো ফাঁসি কার্যকর না হআ তরি তারা আন্দোলন চালাইয়া যাইবো এইডা কিমুন কতা অইলো? বিচার শেষ অইতে অইতে ত অনেক দিন লাইগা যাইবো। অতোদিন এইত্তানে এই রাস্তায় পইড়া থাকবো এইডা কিমুন কতা? সবসম যেকুনু বিষয় লইয়া যারাই আন্দোলন করে সরকার হেগোরে বুজাইয়া কি লাগে পতিশশতি দিয়া গরে পাডায়। এহন সরকার এইডা করেনা কেন?
মধ্যবয়স্ক খ: ভাইরে এইডাই ত রাজনেতি। রাজনেতি দ্যাশটারে খাইছে।
এতোক্ষন আমি চুপচাপ তাদের কথাগুলো শুনছিলাম আর চা খাচ্ছিলাম। এইবার আমি বললাম: আপনারা ব্যপারটাকে এভাবে দেখছেন কেনো? ৭১ সালে যারা এইসব অপরাধ করেছিলো আপনারা তাদের বিচার চাননা? নিশ্চয়ই চান?
প্রবীন লোকটি: বিচার ত চাই। রাজাকাররা যুদ্ধের সময় কী করছিরো হেইডা ত আমরা নিজ চুখে দেকচি। তাদের বিচার ত চাই। অবশ্যই চাই।
আমি: হুম আচ্ছা তাহলে আপনি সেইসব অপরাধীদের বিচার চান। যারা তাদের পরিবারের আপনজন হারিয়েছে তারা বিচার চায়। যাদের বাড়ি পুড়িয়েছিলো তারা বিচার চায়। যারা দেশের স্বাধীনতা চেয়েছিলো তারা বিচার চায়। এখানে তো আওয়ামী লীগ বিএনপি জামায়াত জাসদ বলে কোনো কথা নাই। অপরাধীদের বিচার হবে। কিন্তু বাস্তব সত্যটা হলো ৪১ বছর ধরে কেউ বিচারটা করেনি। ৪১ বছর পর যখন বিচারের প্রক্রিয়া শুরু হলো, সেখানে নানা মত নানা জটিলতা দেখা দিলো। তবু শেষ পর্যন্ত সরকার বিশেষ ট্রাইবুনাল গঠন করে অভিযুক্তদেরকে বিচারের মুখোমুখি করলো। কিন্তু সন্দেহ দেখা দিলো কাদের মোল্লার বিচারের রায় ঘোষনার পর। আওয়ামীলীগ সরকারও যে বিচারটাকে সঠিকভাবে শেষ করতো কীনা সেখানেও সংশয় দেখা দিয়েছিলো। এই সংশয় থেকেই তো ব্লগাররা আন্দোলনে নেমে এলো..
এরমধ্যে আরো একজন এসে হাজির হয়েছিলেন সেখানে। তিনি একজন শিক্ষিত লোক যিনি এলাকার একটি স্কুলের শিক্ষক।
শিক্ষক বললেন: ভাতিজা তোমার কথা ঠিক। আন্দোলনটা কিন্তু প্রথমে সরকারবিরোধী আন্দোলন ছিলো। কিন্তু এখন কী হচ্ছে সেটাতো দেখবা?
আমি: স্যার আমি বুঝতে পারছি আপনি কী বলছেন। কিন্তু আমি এখনো ভাবতে চাইনা এই আন্দোলনটা এখন আর সরকারবিরোধী আন্দোলন নাই। এখনো আন্দোলনটা সরকার বিরোধী আন্দোলনই আছে।
শিক্ষক: হ্যাঁ ঠিক আছে। কিন্তু এই আন্দোলনের কারনে বিচার প্রক্রিয়াটা কি সুষ্ঠু হবে? আদালত কি প্রভাবিত হবেনা?
মধ্যবয়স্ক ঘ: তাইলে সরকার এদেরে ধইরা ধইরা ফাঁসি দিয়া দিলেই পারে। বিচারের কী দরকার?
আমি: এভাবে বললে তো হয়না। বিচার তো আদালতই করবে। কিন্ত আমরা তো আদালতের কাছে বিচার দাবী করতে পারিনা। আমরা তো সঠিক বিচার সরকারের কাছেই দাবী করবো। সরকার বিচার প্রক্রিয়াটাকে সঠিকভাবে সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপ গ্রহন করবে এটাই তো দাবী। এজন্যই তো আন্দোলন।
এই বলে আমি বিদায় নিয়ে চলে আসলাম সেখান থেকে। অবশিষ্টরা তখন কী কথাবার্তা বলছিলো কে জানে। হায়রে বাংলাদেশ। বিক্ষোভকারীদের ত্যাগ আর কষ্টটা তারা দেখছেনা। এমন নয় যে এরা সবাই আওয়ামীলীগ বিরোধী লোক। এমন নয়যে এরা সব বিএনপি’র সমর্থক। এমন নয় যে এরা জামায়াতকে সমর্থন করে। তবু তাদের এরকম মনোভাব কেনো?
----------------------------------------------------------
শব্দবিভ্রাট (সংলাপে প্রকাশিত আঞ্চলিক শব্দগুলোর চলতি বাংলা সমার্থক শব্দ):
[দেহি= দেখি] [সুবিদা= সুবিধা] [বালা বালা= ভালো ভালো]
[খাওন= খাবার] [নিহি= নাকি] [হুনচি= শুনেছি] [টেহা+ ট্যাহা= টাকা] [দিতাচে= দিচ্ছে] [কেডা= কে] [আমগোর= আমাদের] [বাতিজা= ভাতিজা] [তাগোরে= তাদেরকে] [হারাদিন= সারাদিন]
[এমতেই যামু =এমনিতেই যাবো] [লোকঅই= লোকই]
[বুজলাম= বুঝলাম] [বুজাইয়া হুনাইয়া= বুঝিয়ে শুনিয়ে] [গরে= ঘরে]
[পাডায়না ক্যেন= পাঠায়না কেনো] [না হআ তরি= না হওয়া পর্যন্ত] [পতিশশতি= প্রতিশ্রুতি]
প্রকাশ:
http://imonreza.wordpress.com/2013/03/05/ভাষাচিত্র-০১১/





ভালো বলছেন। আরো এই টাইপের পোষ্ট চাই!
ভালো থাকবেন!
ভালো বলছেন। আরো এই টাইপের পোষ্ট চাই!
ভালো থাকবেন!
প্রোফাইলটা ভাল লেগেছে
মন্তব্য করুন