দি লাস্ট বেঞ্চার
ইস্কুল জিনিসটাকে আমি দুই চক্ষে দেখতে পারি না। না পারার যথেষ্ট কারণও আছে। জীবনে পয়লাবার যেদিন ইস্কুলে গেছিলাম খোদাতালা তার আগের দিন রাতে শয়তানি করে রেখেছিলেন। নতুন জামা জুতা পরিধান পূর্বক স্ব গর্বে যেইনা স্কুলের সীমানায় পদযুগল রাখলাম ওমনি কাদায় পিছলে ধপাস। এখনো মনে আছে চারিদিকে পোলাপানের সেই হাস্য কলরব। বহু চেষ্টা করেও সেদিন হৃদয়ের রুদ্ধ আবেগটাকে বেঁধে রাখতে পারিনি। নিজের অজান্তেই বেরিয়ে এসেছিল দু-ফোঁটা অশ্রু, সোজা বাংলায় যাকে বলে ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলেছিলাম। পরে স্কুলের আয়া উনাকে আমরা বুবু ডাকতাম আমাকে উদ্ধার করে নিয়ে গেলেন। মেলা আদর টাদর করে ধুয়ে মুছে ক্লাসে পাঠালেন। সেই কবেকার কথা, চেহারাটা ভুলে গেছি অথচ মমতাটুকু আজও মনে আছে। এরপর প্রথম কয়েক দিন প্রথম বেঞ্চে বসে ভাল ছাত্র সাজার প্রাণান্ত চেষ্টা চালালাম। দুই দিনের বুঝে গেলাম ইহা আমার দ্বারা হবে না। পড়া আমার মাথায় কিছুতেই ঢুকে না, যদিও বা কোনমতে ঢুকে তো সেইটা কিছুতে মাথায় থাকে না। ফাস্ট বেঞ্চের সহপাঠিগুলা ঠাকাঠক সব ভাল রেজাল্ট টেজাল্ট করে একসা আর আমি নিরানব্বই জন ছাত্রের মধ্যে আটানব্বই। বেচারা রোল নং নিরানব্বই এর খুব মায়া লাগতে লাগল। আহা তার কেউ নাই। তার দুঃখ সহ্য করতে না পেরে তাকে সঙ্গ দেওয়ার উদ্দেশ্যে তল্পিতল্পা সহকারে পিছনের বেঞ্চে গিয়ে বসলাম। শুরু হল আমার লাস্ট বেঞ্চার জীবন।
লাস্ট বেঞ্চের জীবনে অভিজ্ঞতা কম অর্জিত হয় নাই। লাস্ট বেঞ্চার হিসাবে সকাল বিকাল আড়ং ধোলাই বাঁধা ছিল যা পরবর্তী জীবনের বন্ধুর পথে অনেক সহায়ক ভুমিকা পালন করিয়াছে। এখন আর কোন আঘাতই আঘাত মনে হয় না। তাছাড়া আমাদিগকে দিবা রাত্র নানান অপমান গঞ্জনা সহ্য করতে হত। এখন বুঝি ইহা কত বড় পাথেয় ছিল আমাদের জন্য। বসে ঝাড়ি দিলে হেসে ফেলি, এইটা কোন ঝাড়ি হল? সে যাই হোক, পড়া মাথায় না ঢুকার কারণ আবিস্কার করতে গিয়ে দেখলাম উহা ইবলিশ কর্তৃক প্রিঅকুপাইড। সদা সর্বদা নানান প্ররোচনা দিয়ে চলেছে। এই শয়তানের প্ররোচনায় (আমার দোষ নাই, শয়তানের প্ররোচনা) একবার ক্লাসের সিলিং ফ্যানের উপর বিলাই সুমসুমির রোঁয়া (ভাল নাম জানি না) রেখে ভেগেছিলাম। ফলাফল ভয়াবহ এবং হাস্যকর। সারা ক্লাসরুমের শিক্ষক ছাত্রছাত্রীর সমবেত দলিয় নৃত্য হাস্যকরই হবার কথা। কপাল ভাল ধরতে পারে নাই এই কীর্তি কার ছিল। যারা শহুরে হুর তার বিলাই সুমসুমি (ভাল নাম বিড়াল সম্বর নাকি?)চিনবেন না। এইটা দেখতে খানিক তেঁতুলের মতো, গায়ে কাঁটার মতো রোঁয়া থাকে। যার গায়ে একবার ঐ রোঁয়া লাগবে তার সারাদিন তুর্কি নাচ নাচতে হবে।
আমাদের এক স্যার ছিলেন, নাম বলা যাবে না। উনার প্রধান পেশা ছিল ছাত্র পিটানো এবং নেশা ছিল পান চিবানো। ক্লাসে ঢুকেই উনি টেবিলে দুই টাকা রেখে বলতেন, যা বাবা জর্দা দিয়ে একটা পান নিয়ে আয়। যদি কেউ ভেবে থাকেন পিতৃ স্নেহে উনি ছাত্রদের বাবা সম্বোধন করছেন তবি আপনি ভুল। বাবা একটা জর্দার ব্র্যান্ডের নাম। তো আমাদের এই স্যার আবার কানে কম শুনতেন। উপর ক্লসের লাস্ট বেঞ্চার বড় ভাই বুদ্ধি শিখিয়ে দিল ক্লাসে পড়া মুখস্থের দরকার নাই, কোন একটা বাংলা সিনেমার গান গড়গড় করে বললেই হবে। টেস্ট ড্রাইভ দিয়ে হাতেনাতে ফলাফল পেলাম। পরবর্তী জীবনে পড়ার জন্য আর এই স্যারের হতে মার খেতে হয়নি। এই স্যারের হাতেই একবার এক টিকিটে দুই সিনেমার হলে (খোদার কসম ভাল সিনেমাটা দেখাই আমাদের উদ্দেশ্য ছিল) দিয়াশলাই চাইতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা খেয়েছিলাম। এরপর থেকে স্যার আমাদের দেখলেই লুকিয়ে পড়তেন।
আরও শত শত ঘটনা আছে, লিখতে গেলে মহাভারত হবে। স্কুল পালানো, পুলিশের ঠেঙানি খাওয়া, ধুপ করে প্রেমে পড়ার কত কত কথা। রেজাল্ট শিট নিয়ে মেলা দুই নম্বুরিও করেছি। লাস্ট বেঞ্চে বসে পড়ার বইয়ের ফাঁকে চটি থেকে চর্যাপদ সব ধরণের বই লুকিয়ে লুকিয়ে পড়তাম। যত কঠিন শাসন ছিল মন ততটাই দুরন্ত ছিল। এখন বাঁধনও নাই বাঁধন ছিঁড়ার উল্লাসও নাই। রঙচটা জীবন।
মেলা দিন না লিখতে লিখতে হাতে জং ধরে গেছে। চেষ্টা করছি আবার ব্লগে ফিরার। শব্দগুলোকে বাঁধতে হবে। শব্দরা ঠিক দাঁতের মতো, ঠিকঠাক সময় মতো বাঁধাতে না পারলে টুপ করে খুলে পড়ে হারিয়ে যায়। এই অকাল বয়সে ফোকলা হতে চাই না।





এই বোধটা খুব টের পাই আজকাল।
স্মৃচিচারণ খুব ভালো লালো মানু। আমরাও চাই তুমি আবার ব্লগে ফিরে এসো। রঙচটা জীবনে এতটু রঙের ছিটেফোঁটা লাগুক।
বিলাই সুমসুমি কে বিলাই চিমটি নামে চিনি।
লাইনটা মন ছুয়েঁ গেল।
অ-সা-ধা-র-ণ!
==============================
কত্তো বড় ক-এর মানু আবার ফিরে আসুক।
স্কুল জীবনটা অনেকেরই আনন্দময় হয় না। ক্লাস সেভেনে ওঠার আগ পর্যন্ত ভীতিকর অনুভুতিতে কাবু ছিলাম। নাইনে উঠে মোটামুটি সহজ। সবচেয়ে আনন্দময় সময় ক্লাস টেনের শেষভাগে। ফেয়ারওয়েলের দিনে রীতিমত কেঁদে দিয়েছিলাম স্কুল জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে বলে। এই আনন্দগুলো আগে আসেনি কেন? আনন্দ পাবার সময় আসতে আসতে স্কুল জীবন শেষ। খুব অপচয় মনে হয় সেই সময়গুলো।
এতবছর পরে ভাবি, এর কারণ প্রত্যেক ক্লাসে বেত হাতে সম্মানিত শিক্ষক ক্লাসে প্রবেশ করতেন। এবং কারো না কারো পিঠে সেগুলো ব্যবহৃত হতো। সেই ভীতিটাই স্কুলের আনন্দ ঠেকিয়ে রাখতো।
অসাম লেখা মানু'দা। পড়ে স্মৃতিকাতর হলাম। ব্যকবেঞ্চারদের কল্যাণেই মনে হয় জীবনটা এত চমৎকার। ফার্স্ট বেঞ্চা'রা বেশিরভাগ সময় কি অবস্থা করে সেটা তো এই ক'দিন আগেও একবার দেখলাম। অবশ্য বিনোদনের বিষয়টা বিবেচনায় রাখতে হবে।

যাক্ কোপালটা ভালো, ওস্তাদ ফার্স্ট বেঞ্চার বানায় নাই।
আপনার লেখার স্টাইলটাই আলাদা।
লেখা তো ঠিকই আছে...মনে হয় বাম হাতে জং ধরছে
দারুণ লাগলো।
ভাল লাগলো । এমন আরও চাই ।
কান মলা খাইতেন সেইটা লিখলেন না?
সিরিজ হোক মানু
হ, কান মলার কথা লিখলেন না কেন??
আমার এক শিক্ষক ছিলেন ীনি সব সময় বলতেন, ঐ যে দেখি পেছনে বসা কিছু বান্দর আমারে নিয়ামজা করছে , বইসা বইসা গল্পের বই পড়ছে বা ঘুমানোর চেস্টা করে। বিশ বছর পর দেখা যাবে ঐ বান্দরগুলাই সামনে চইলা আসছে নিজ যোগ্যতাবলে, ধান্দাবাজী না কইরাই। বিশ বছর পার হতে আর বেশী নাই। সেই ব্যাক বেন্চাররা কিন্তু সামনে চলে আসছে খুব ভালো ভাবেই।
জাবর কাটার মধ্যে বেদনার চেয়ে আনন্দটাই বেশি (অবশ্য এটা আমার একান্ত নিজের ধারনা)।
মাঝে মাঝে লিখলে কী এমন ক্ষতি, মানু ?
পোষ্টে লাইক।
লাষ্ট বেঞ্চে থেকেই মানু এতো দূর চলে এসেছো? ফার্ষ্ট বেঞ্চে থাকলে না জানি কি করতা। আমিও অনেক বার লাষ্ট বেঞ্চার হয়েছি জীবনে পারপাসলি। অসম্ভব আনন্দও উপভোগ করেছি।
জটিল লেখা
অনেকদিন পর.....কেমন আছেন ??
আমাদের স্কুলে (উদয়ন) বেঞ্চ রোলিং হৈতো, মানে আজ যে প্রথমে কাল সে শেষে-------লাস্ট বেঞ্চার সবাইরেই হৈতে হৈতো , আলাদা কৈরা ঐটা আর আমার গায়ে লাগে নাই
বিলাই সুমসুমির রোঁয়া চিনি না
মন্তব্য করুন