ইউজার লগইন

হে দারিদ্র...

পরীক্ষার হল-এ পরিদর্শকের দায়িত্ব পালন করছিলাম। ক্লাসে আমি যতটা আমুদে, পরীক্ষার হল-এ ঠিক ততটাই কড়া। ছাত্ররা মাথা নাড়তেও ভয় পাচ্ছিল। ইলেকট্রনিক্সের জটিল পরীক্ষা। কক্ষজুড়ে পিনপতন নীরবতা। এরই মাঝে দেখলাম এক ছাত্র পাশের জন থেকে ক্যালকুলেটর নিচ্ছে। আমি দুজনকেই সতর্ক করে দিয়ে বললাম, কেউ কারো কাছ থেকে যন্ত্রপাতি নিয়ে বিরক্তির সৃস্টি করবে না। সাবধান করে দিচ্ছি।
একটু পরে ছেলেটি আবার একই ঘটনা ঘটাল।
আমি ছেলেটিকে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম- তুিম আমার নির্দেশ অমান্য করলে কেন? সে কাচুমাচু ভঙ্গিতে বলল, ভুল হয়ে গেছে স্যার। আমি বললাম- এটা ভুল নয়, অসদাচরণ। তোমার পরীক্ষা দেওয়া লাগবে না, যাও বেরিয়ে যাও। আমি তার খাতা নিয়ে নিলাম।
ছেলেটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল। দশ-পনের মিনিট পর সে আমার কাছে এসে করজোড়ে আবার বলল, স্যার ভুল হয়ে গেছে।
আমি বললাম- ভুল তো অবশ্যই হয়েছে। ইলেকট্রনিক্সের পরীক্ষা আর তুমি ক্যালকুলেটর আনোনি। কেমন পরীক্ষার্থী তুমি?
মাথা নিচু করে রইল সে।
ধমক দিলাম- কী হলো, আনোনি কেন?
মিনমিন স্বরে সে বলল, নেই স্যার।
নেই মানে? একশ টাকায় ক্যালকুলেটর পাওয়া যায়।
সে বলল, সায়েন্টিফিক ক্যালকুলেটর স্যার। অনেক দাম।
আমি এবার চেঁচিয়ে বললাম- কত দাম? পকেটে তো দামি মোবাইল রাখো।
ছেলেটি বলল, আমার মোবাইল নেই।
এবার আমি একটু চিন্তায় পড়ে গেলাম। এ যুগে ''আমার মোবাইল নেই'- এটা মেন কথা! জানতে চাইলাম- তোমার বাবা কী করেন?
সে বলল, বাবা দর্জির কাজ করেন। গ্রামে ছোট্ট একটা দোকান আছে।
ছেলেটি আরও কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারল না। সে শুধু কাঁদছিল।
এই প্রথম আমি তার চেহারা ও বেশভুষার দিকে ভালো করে তাকালাম। দারিদ্রে যেন জীর্ণ-শীর্ণ হয়ে আছে সবকিছু। আমার গাম্ভীর্য, পরীক্ষার হলের আইন-কানুন... সবকিছুকেই যেন ভেংচি কাটছিল ছেলেটির অবয়বে জীবন্ত হয়ে ওঠা এই দারিদ্র!
আমি কী করব? ভাবছিলাম, কক্ষভর্তি ছেলেমেয়ের সামনে এই ছেলেটাকে অপমান কেন করলাম? একটা অনুশোচনাবোধ আমার বিবেককে কষে থাপড় দিয়ে যাচ্ছিল।
কিন্তু না। আমি নিজেকে বাঁচালাম এই ভেবে যে- ছেলেটাকে তো আমি অপমান করিনি। করেছে ওর দারিদ্র।
হে দারিদ্র, তুমি মোরে...

পোস্টটি ১২ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

ভাঙ্গা পেন্সিল's picture


Sad ঘর হতে দুপা ফেলিয়া না দেখা শিশিরবিন্দুর মতো আমাদের আশেপাশেই ওরা থাকে

তানবীরা's picture


মনটা খুবই খারাপ হলো আপনার লেখাটা পড়ে। ধুর, সন্ধ্যেটাই মাটি

বাতিঘর's picture


বন্ধুব্লগে ভাইটিকে সুস্বাগতম Big Hug Party ....প্রত্যেকটি আচড়ণের পেছনের ঘটনা না জেনেই আমরা এমন কিছু করে ফেলি, যা সময়ে বোবা করে ফেলে আমাদের! পরে কী ঐ ছাত্রের খাতা ফেরৎ দিয়েছিলেন? আপনার ঐ ছাত্র একদিন যখন অনেককক সফল একজন মানুষ হবেন, তখন এই ঘটনাটি হেসে হেসে বলবেন তার পরিচিতজনদের...তাই মন খারাপ করবেন না। আরো লেখুন ভাইটি। শুভেচ্ছা নিরন্তর।

নীড় সন্ধানী's picture


ঘটনাটা মনে ছাপ ফেলার মতোই।

অরিত্র's picture


মন খারাপ করা লেখা
ধন্যবাদ

নাহীদ Hossain's picture


দুঃখ কষ্ট তো থাকবেই ... কিন্তু অন্যের দুঃখ অনুভব করার ক্ষমতা কয়জনের থাকে ... ভাল লাগলো।

মমিনুল ইসলাম লিটন's picture


মাইনুল এইচ সিরাজী, অবশেষে প্রতীক্ষার প্রহর কাটলো। স্বাগতম।

রশীদা আফরোজ's picture


সিরাজীর লেখা পড়ার পরই তমার ফোন এলো, তমা ভাদুড়ি আমার ছাত্রী।কলেজে প্রত্যেক শিক্ষকের প্রিয় ছাত্রী। ...যেদিন তমা আমাকে তার যাপিত জীবনের গল্প বলেছিল, আমি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। সুন্দর পরিপাটি পোশাকে কলেজে আসে, পড়াশোনায় বেশ ভালো, বোর্ডের চেয়ারম্যান ওকে দোয়া করেছেন এই বলে, একদিন তুমি বোর্ড চেয়ারম্যান হবে। সেই মেয়ে প্রায়দিন না খেয়ে কলেজে আসে, সকাল-বিকাল টিউশন, ছোট বোনের অসুস্থতা, বাবার মাথার ওপর দেনার দায়, কালো বলে মায়ের গঞ্জনা...তমা এবার অনার্স সেকেন্ড ইয়ার ফায়নাল দেবে। নিজের চেষ্টায়, শিক্ষকদের সহযোগিতায় ওর এগিয়ে চলা। (আবেগের বশে অনেক কথা বলে ফেল্লাম)

নীড় _হারা_পাখি's picture


ভাল লাগল আবার কষ্টও। তবে মন টা খারাপ হয়ে গেল। ভাল থাকুন ।আর নতুন নতুন লিখা দিন।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মাইনুল এইচ সিরাজী's picture

নিজের সম্পর্কে

আমি এক স্বপ্নবাজ তরুণ। স্বপ্ন দেখতে দেখতে, ভালোবাসতে বাসতে হাঁটছি বার্ধক্যের দিকে...