হাড় কালা অন্তর কালা
নানা কারণে একটা খুব খারাপ সময়ের ভেতর দিয়ে যেতে হচ্ছে। কোনকিছুতেই বিশেষ আনন্দযোগ খুঁজে পাচ্ছি না। যে বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করছি সেটা হচ্ছে, কেন সবসময় আমার চারপাশেই মেজাজ খারাপ করার বিভিন্ন উপাদান ছড়িয়ে থাকবে? আমি একটু নড়তে চড়তে চাইলেই কেন সেগুলো আমার শরীরে ভাঙা কাঁচের টুকরার মতো ফুটবে? এটা কি জন্মদাগের মতো কোন কিছু? যেটা থাকবেই এবং কোনো ব্যাখ্যা ছাড়া যেটাকে মেনে নিতে হবেই।
আমি চেষ্টা করেও বিষয়টা পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারি না। আমাদের অফিসের বস্-কে আমরা সাধারণত বিগ বস্ বলি। সে যদি কিছু করতে-টরতে বলে তো সেটাকে আমরা বলি, বিগ বস্ এইটা করতে বলছে -এরকম আর কি। তো তিনি সম্প্রতি ইউনিয়নের নির্বাচনে সভাপতি পদে দাঁড়িয়ে ভরাডুবির স্বীকার হয়েছেন। আমরা মোটামুটি সবাই তাকে বিশেষ মাত্রায় ভালো পাই বলে এ ঘটনায় অত্যন্ত বিমর্ষ হয়ে পড়লাম। নির্বাচনের দিন সন্ধ্যায় যখন আমরা সবাই বিমর্ষ মুখে অফিসে বসে আছি, তখন তিনি এসে অফিসে ঢুকলেন। পরাজয়ের সংবাদ নিশ্চিত করে তিনি বাসায় চলে গিয়েছিলেন। দেখলাম ফ্রেশ শাওয়ার নিয়ে শার্ট-টার্ট পাল্টে ব্যপক একটা ভাব নিয়ে অফিসে এসেছেন। তার রুমে বসেই সবার জন্য ডিসন্টের সিঙগারা আর হীরাঝিলের চা আনতে পাঠালেন ইউসুফ আর মান্নানকে। ওগুলো খেতে খেতে তিনি বললেন, ভরাডুবির জন্য সিঙগারা খাচ্ছি। নাহলে বিরানী আর মিষ্টি খেতাম। আফসোস, করুণাময় আমাদের কপালে ওসব সুখাদ্য বরাদ্দ করেন নি। যাক্, সে নিয়ে দুঃখ করে লাভ নেই। আসুন আমরা সবাই সামনের দিকে তাকাই এবং কাজ শুরু করি।
বিগ বস্-এর এই কথার ওপর আর কোনো কথা চলে না। সবাই যার যার কাজে আবার নাক ডুবিয়ে দিলাম। কিন্তু আমার মনে ঐ প্রশ্নগুলো চলতেই থাকলো। মেজাজ খারাপের উপাদানগুলো কেন আমার আশে-পাশেই সবসময় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকবে?
এর মধ্যে রাতে বসলাম ফুটবল খেলা দেখতে। আহা মেসি-ভিয়া-জাভি-ইনিয়েস্তা যে খেলা দেখালো পুরা দিলদুরস্ত্ অবস্থা। রিয়ালের জালে গুনে গুনে পাঁচখানা গোল দেয়া দেখার পর আমার মনে হলো -এনাফ ইজ এনাফ। রিয়ালের মান-ইজ্জত যেহেতু কখনোই ছিলো না, তাই ওটা নিয়ে আর টানাটানি নিরর্থক। এবার কাতালানদের উচিত ক্ষ্যান্ত দেয়া। সেটাই ঘটলো। ওরা ক্ষ্যান্ত দিলো।
আমি দেখলাম বিএনপি'র ডাকা ৩ নম্বর হরতালটা নিয়ে দেশে বেশ একটা গৃহযুদ্ধের আবহাওয়া তৈরী হয়েছে। সরকারও বিষয়টা বেশ সিরিয়াসলি নিয়েছে এবং হরতালের আগের দিন রাতে ব্যপক ধরপাকড় চালিয়ে মাঠ পুরো শূন্য করে ফেলেছে। যথারীতি পরদিন খালি মাঠেই গোলের মহড়া দেখতে হলো। সন্ধ্যায় দেখলাম বিডিনিউজ হেডিং দিয়েছে, মাঠেই নামতে পারে নি বিএনপি। আহা প্রিমিয়ার লীগের সঙ্গে আমাদের কত মিল!
সৈয়দ আশরাফকে দেখলাম, ধরপাকড়কে ব্যাখ্যা করেছেন পরিস্থিতি সামলানোর জন্য নেয়া স্ট্যান্স হিসেবে। বাহ্, আমাদের পল্টিশিয়ানরা আজকাল হিন্দী মুভি প্রচুর দেখছেন বলে মনে হচ্ছে।
কিন্তু সরকার বাহাদুরের ভুলে গেলে চলবে না, ওদের ডাকা ১ম হরতালে এসবের কোনকিছুরই দরকার হয় নি। ২য় হরতালেও কোন রকম গ্রেফতার না করে পরিস্থিতি সামলানো গেছে, কোন অসুবিধা হয় নি। যত নষ্টের গোঁড়া এই ৩য় হরতালে এসেই কাঁছা আলগা হয়ে গেল। পুলিশ বাহিনী যে নির্বাচিত সরকারের জন্য কত বড় একটা 'অস্ত্র' সেটা আরও একবার প্রমাণিত। দুই বছর না যেতেই যদি এই অবস্থা হয় তাহলে আরো তিন বছর তো বাকিই আছে। আর ওরা আজ যেসব কাজ করছে সেগুলো যেদিন ওদের সঙ্গেও করা হবে, সেটা সহ্য করা সম্ভব হবে তো? প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়।
আসি ম্যাংগো গোত্রীয় মানুষের কথায়। জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ যতই ইনফো লিক করুক তাতে এই গোত্রীয় মানুষের কিন্তু কিছু আসেও না, যায়ও না। অথচ বিশ্বের বড় বড় রাষ্ট্রনায়ক, সংস্থাপতিরা, যাদের গায়ে ''জনমানুষের নেতা' কথাটি ট্যাগ করা থাকে; তারা কিন্তু ঐসব ইনফো নিয়েই ব্যস্ত। ম্যাংগো তথা জনমানুষের কি হচ্ছে, সেটা দেখার সময় তাদের হাতে কোথায়?
ঢাকা শহর এই শ্রেণীর মানুষের জন্য দিন দিন কত অসহনীয় হয়ে উঠছে সেটা কি ঐ উপরের প্যারার 'পল্টিশিয়ানরা' জানে? বলা হচ্ছে, যাত্রাবাড়ী-গুলিস্তান ফ্লাইওভার হলে শহরের একটা দিকের যানজট সমস্যা পুরোপুরি মিটে যাবে। এই আশ্বাস দিয়ে ডেভেলপাররা গুলিস্তান, টিকাটুলী, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী মোড়ে রাস্তার মধ্যেই নীল টিনের বেড়া দিয়ে কন্সট্রাকশনের কাজ চালাচ্ছে।
রাস্তার ওপর ফ্লাইওভার তৈরী হবে কিন্তু ডানে-বামে কোনদিকে রাস্তা বাড়ানো হবে না। কারণ উপায় নেই। রাস্তার ধারে দোকান-পাট তারপরে বাসা-বাড়ি তারপরে আবার আরেক রাস্তা -এইভাবে চলে গেছে যতদূর পর্যন্ত যাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে যাত্রাবাড়ী রোডের কথাই যদি বলি, ফ্লাইওভারের নিচের ডিভাইডার আর স্প্যামকে জায়গা দেয়ার জন্য যে জায়গা দরকার তা বাদ দিলে এই রাস্তা কি আর যান চলাচলের উপযোগী থাকবে? মানুষ চার-পাঁচ বছর পেইন খাওয়ার পর যখন একটা ফ্লাইওভার পাবে তখন দেখা যাবে সেটা আসলে উপকারের চেয়ে অপকারে আসছে বেশি। যেমনটা ঘটেছে খিলগাঁও ফ্লাইওভারের ক্ষেত্রে। এখনই এ রাস্তায় দুর্ঘটনা, জনদুর্ভোগের সংখ্যা বেড়ে গেছে। শুক্রবারের পত্রিকায় নিউজ দেখলাম, যাত্রাবাড়ী মোড়ে প্রাইভেট কারের ধাক্কায় মারা পড়েছে মধ্যবয়সী এক নাগরিক। গাড়ি আটকানো হয়েছে, চালককে গ্রেফতার করা হয়েছে; কিন্তু যে মারা গেল তাকে কি ফিরিয়ে আনা গেছে?
এই ঝরে যাওয়া প্রাণটির মূল্য কি হবে? সে মূল্য কে দেবে? এখানে কি সরকারের কোন দায় নেই?
এসব ভাবনা বেশিক্ষণ মনে জায়গা করে নিতে পারে না। মানুষ সবসময়ই তার নিজেকে নিয়ে ভাবতে পারলে খুশী হয়। আমারো নিজেকে নিয়ে ভাবতে ইচ্ছে হয়, সম্পর্কগুলো নিয়ে ভাবতে ইচ্ছে করে। অবশ্য সম্পর্ক নিয়ে আমি অতো টেনশন করি না। কারণ এগুলোকে ভালবাসতে হলে এগুলোর যত্ন নিতে হয়। আর যত যত্ন নেয়া হয়, সম্পর্ক তত জটিল হতে থাকে। তারচে' ওরা ওদের মতো থাকুক। টান থাকলে ঠিকই এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরবে আর টানাপোড়েন থাকলে ওরা চাইবে অক্টোপাসের মতো আষ্টে-পৃষ্টে চেপে ধরে দম বের করে নিতে।
মাঝে মাঝে মনে হয় সম্পর্কের যে প্যাটার্নগুলো আমাদের জন্য ঠিক করে দেয়া হয়েছে সেগুলো অন্যরকম হলে কেমন হতো? আরো স্পেসিফিক্যালি বলা যায়, টানাপোড়েন যদি না থাকতো তাহলে কি হতো? কারো সঙ্গে কারো কোন সম্পর্ক নেই। শুধুমাত্র ফিজিক্যাল ইন্টারএকশন ছাড়া একটা মানুষ আরেকটা মানুষের সঙ্গে কোন কিছু শেয়ার করছে না। যার যেমন ইচ্ছা থাকছে এবং নিজের নিজের মতো যা খুশী করছে। তাহলে কেমন হতো?
রাষ্ট্রের মতো কোন প্রতিষ্ঠান না থেকে যদি পুরো পৃথিবীটাই প্রত্যেকটা মানুষের আবাসস্থল হতো তাহলে মনে হয় ভালো হতো। সন্তান পালনের আনন্দ না থাকলে এর উৎপাদন হারও কমে যেতো। শিক্ষা-চিকিৎসা-বিজ্ঞান -এগুলোর যার যখন যেটা দরকার হতো, সে সেটা নিজে নিজে করে নিতো। ঝামেলা কি? একটা কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা থাকতো শুধুমাত্র শিশু পালনের জন্য। বাকি যা কিছু সেটা হিজ হিজ হুজ হুজ।
এইরকম হইলে এ্যরিস্টটল নিশ্চই তেড়ে-ফুঁড়ে আমাকে মারতে আসতেন। তার এত সাধের প্রতিষ্ঠান 'রাষ্ট্র' থাকবে না? এও কি হয়? আশাবাদীদের প্রতি নিরাশ হতে হতে আমি নিজেই এখন আশাবাদী হয়ে উঠছি। এমন দিন হয়তো বেশি দূরে নেই। নাহলে আমার মতো একজন নিতান্ত ম্যাংগো'র মাথায় এ চিন্তা আসবে কেন? আর কেনই বা সমাজ-সংসার-রাষ্ট্র এরা আমার চারপাশে শুধু মেজাজ খারাপের উপাদানই ছিটিয়ে রাখবে?
আমার চিন্তারাশির শ্রীযুক্ত চেহারাখানা যে এরকম হয়ে গেছে, সেটা আগে টের পাই নি। আসলে কি, পড়ে থাকলে যেমন লোহাতেও জং ধরে যায় তেমনি চিন্তাশক্তিটাও বিপথগামী এবং অকেজো হয়ে পড়ে। আমি ঝাঁপিভরা বিরক্তি নিয়ে বসে থাকি, কী-বোর্ডে খুটখাট করি, সিগারেট ধরাই, কাথাঁ মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকি, রাস্তায় রাস্তায় ঘুরি, গান শোনার চেষ্টা করি।
আমার হাড় কালা করলাম রে, আরে আমার দেহকালার লাইগা রে
ওরে অন্তর কালা করলাম রে দুরন্ত পরবাসে।
তাই কি? এতে কি খুব সুখ হয়? নাহলে মানুষ এত আনন্দ করে এটা গায় কেন? জানি না। সেদিন সাইকেল নিয়ে ট্রাকের চাকার নিচে পিষে যাবার ঠিক আগের মুহূর্তটাতে আমিও ভাবছিলাম, ঈশ্বর কবে শেষ হবে?





মন্তব্য করুন