গল্প: লিহীন
রওশনের মতো বুনো আর হিংস্র মনের ছেলে এ পৃথিবীতে অনেক কম জন্মেছে। যারা জন্মেছে তাদের বেঁচে থাকা সবসময়ই মানুষকে কষ্ট দিয়েছে, কলুষিত করেছে এবং সবশেষে মানুষ বাধ্য হয়েছে তাদের প্রতি নিষ্ঠুর হতে। এদেরকে মানুষের জন্য দুর্ভাগ্যের নিমিত্ত হয়ে পৃথিবীতে আসা একধরনের প্রাণী হয়তো বলা যায় কিন্তু মানুষ বলা যায় না। প্রকৃতি নিজের কোনো এক অদ্ভুত খেয়ালেই এদেরকে মানুষ বানিয়ে পাঠায় না।
চট্টগ্রাম শহরে সিডিএ বলে একটা এলাকা আছে। সেটার ১২ নম্বর রোডের একদম শেষ মাথায় রওশনদের বাড়ি। জায়গাটা খুব ঘিঞ্জিমতো, যেখানে ওদের বাড়ির পাশ দিয়েই চলে গেছে শহরের বড় বড় স্যূয়ারেজ ড্রেনগুলোর একটি। সেটাকে ওরা বড় নালা বলে।
এই রোডে রওশনদের বাড়িটাই নালার আগে শেষ বাড়ি। এরপরে এই রোডের ভাগের নালাটুকু শুধু দেখা যায়। নালার অপরদিকে দেখা যায়, সোনালী ব্যাংক কলোনীর স্যাঁতসেঁতে শেঁওলাধরা সীমানা দেয়াল। ইট-সিমেন্টের দেয়ালের নীচের অংশ থেকে বের হওয়া লম্বা লম্বা কড়া সবুজ রংএর ঘাসের ডগার সারি ধুনকের মতো বাঁকা পিঠ বিছিয়ে আছে অনেকদূর পর্যন্ত। ঘাসগুলোর ভঙ্গি খুব উদ্ধত আর শরীরও খুব লকলকে। দেখলেই ভয় জাগে। মনে হয় এর ভেতর থেকে যেকোন সময় বেরিয়ে আসতে পারে ঢাউস আকৃতির বিষধর কোনো বিচ্ছু বা চ্যলা। এমনকি ঢোঁড়াসাপের মুখোমুখি হয়ে যাবার সম্ভাবনাও যে একেবারে নেই তা বলা যাচ্ছে না। আর তার নিচে শুয়ে আছে নালা।
একটু পর পর এই দেয়ালের গায়ে চৌকোনা ফুটো করে বেরিয়েছে ওপারের মনুষ্য বসতির ময়লা ও পানি নিষ্কাশনে নিয়োজিত ড্রেনগুলোর মুখ। হঠাৎ হঠাৎ জলের তোড়ের মতো ওপারের ময়লা আর পানি এই মুখগুলোর কোনো না কোনো একটা দিয়ে বের হয়ে আসে। এসে বড় নালায় পড়ে। আবার কোনো কোনো মুখ দিয়ে হয়তো একটানা পানি ঝরতেই থাকে সারাদিন ধরে।
রওশনদের মূল বাড়িতে একটা স্যানিটারী ল্যাট্রিন আছে, তবে ও সেটা ব্যবহার করতে পারে না। ওর জন্য আলাদা টানা পায়খানা বানানো হয়েছে খালের ওপর, বাঁশের মাচাঁ জুড়ে। শারীরিক কারণে ও আলাদা টয়লেট ব্যবহার করে।
এই বড় নালাটা ধরে পিছিয়ে আসতে থাকলে আমরা সিডিএ, কাঠের মসজিদ, ব্যংক কলোনীর বাউন্ডারি আর নালাপাড়া বাজার দেখতে পাবো। তারপরে বাজার পার হয়ে নালাটা একটা কালো অজগরের মতো একেবেঁকে ব্যপারী পাড়া দিয়ে যে কই কই চলে গেল, তার হিসাব আছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের কাছে।
সাধারণত সিডিএ’র নিম্নআয়ের মানুষগুলোর ঠিকানা এই নালার ধারে ধারে গড়ে ওঠা পাড়া-মহল্লাগুলোয়। তবে এই নালাকে ঘিরে শহরের যে শ্রেণীটার জীবন, তারা সবাই-ই যে ঠিক বস্তিবাসী, তা কিন্তু নয়। অনেক রকম মানুষ এরমধ্যে অন্তর্ভূক্ত।
এখানে বাস করে শহরের অনেক ভয়ংকর লোক, যাদের ব্যাপারে গলি-মহল্লাগুলোয় অনেক রকম আলোচনা আছে। আবার একেবারে নিরীহ স্কুলের দপ্তরী বা অফিসের এমএলএসএস’টাও হয়তো তার দুই মেয়ে আর স্ত্রী'কে নিয়ে এখানেই কোথাও দুই রুমের একটা টিনশেডে কষ্টে-সৃষ্টে বেঁচে থাকেন। কেউ হয়তো কৃপণ বলে এখানে সস্তার জীবন যাপন করেন। আবার কেউ হয়তো এখানে বাসা ভাড়া নিয়ে দেহব্যবসা চালানোর জন্য থাকেন। এককথায় হরেক পদের মানুষের বাস এটাকে ঘিরে, সবাইকে একটা রেখায় মিলিয়ে রেখেছে এই নালাটা।
রওশনের ঘরটা নালার একটা ঢালমতো জায়গায়, তাই সে এই নালাটাকে অন্যদের চেয়ে অনেক ভালো করে চেনে। এর সঙ্গে ওর যেন হৃদ্যতার সম্পর্ক। ও মাঝে মাঝে এই নালাটার ধারে এসে দাঁড়িয়ে থাকে। নালার কালো ঘন জলপ্রবাহের দিকে গভীর মনোযোগে ঠাঁয় তাকিয়ে থাকে। এই নালা দিয়ে পুরো শহরটা প্রতিদিন একবার করে ভেসে যায়। ও নালার ধারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেটা দেখে।
মাঝে মাঝে অনেক গুরুত্বপূর্ণ জিনিসও রওশনের চোখে পড়ে। সেদিন এই নালায় ও সাদেকের লাল গেঞ্জিটা ভেসে যেতে দেখেছিলো। ওটা ভাসতে ভাসতে কিছুক্ষণের জন্য ঠিক তার ঘরের নিচের অংশটায় এসেই আটকেছিল। সাদেক এই গেঞ্জিটা পড়ে বের হওয়ার দিন বিকেল বেলা ওর সঙ্গে কিছুক্ষণ ঘুরেছিলো, কিন্তু সন্ধ্যার পর কাউকে কিছু না বলে ও যে কোথায় গেলো, জানা সম্ভব হয় নি। ও-ও আর ফিরে আসে নি, জানানোর জন্য।
এই নালা দিয়ে সাদেকের গেঞ্জির মতো শহরের আরো কতো পাপ যে ভেসে যেতে দেখেছে রওশন, তার ইয়ত্তা নেই। সম্ভবত ছোটবেলা থেকে বাসার পাশে নরকের নদীর মতো এই নালাটা দেখতে দেখতে হিংস্রতা ওর রক্তে মিশে গিয়েছিলো।
প্রথম যেবার রওশন এক প্রায়-অন্ধকার-হয়ে-আসা শেষবিকেলে খ্রিস্টান মেয়ে ইরিতাসকে জোর করে গীর্জার স্টোররুমের ভেতরে টেনে নিয়ে গিয়েছিলো, সে সময় অবাক হয়ে দেখেছিলো, তার ভেতর যত না কাজ করছে সাদেক-জিসানদের সঙ্গে লুকিয়ে লুকিয়ে ঐসব ন্যাকেড প্লেইং কার্ডগুলো দেখার উত্তেজনা, তার চেয়ে বেশি কাজ করছে এক লকলকে জিহ্বাওয়ালা পশু।
ও উত্তেজনায় ফুটতে ফুটতে অনুভব করেছে এক নিস্পৃহ কিন্তু অপার্থিব আনন্দ। উপলব্ধি করেছে মানুষকে কষ্ট দেবার, কষ্টের বিষাক্ত বরফছুরি দিয়ে মানুষকে চিড়ে ফেলার চে’ আনন্দের আর কিছু নেই। ও তেরো বছরের ইরিতাসের গায়ের কাপড় জন্তুর মতো করে টেনে টেনে খুলেছিলো। চুলের মুঠি ধরে উল্টো করে ঘুরিয়ে নিয়ে টান দিয়ে খুলে ফেলেছিলো পিঠের চেন। কাঁধের ওপর থেকে টেনে জামাটা কোমরের কাছে নামিয়ে সজোরে খামচেছিলো ওর বুক।
রওশনের পনেরো বছর বয়সী মনে তখন একসাথে চলছিলো মেয়েদের শরীরের প্রতি বিদ্যমান অদম্য আগ্রহ মেটানো আর নিজের পশুবৃত্তি চরিতার্থ করার তাগিদ। ও অবাক হয়ে দেখছিলো, একটা মেয়েকে যতো দলা-মোচড়া করা যায় তত সুখ হয়। তত লালসা মেটে।
প্রথম মেয়েটিকে নির্যাতন করার সময় রওশন যখন এই আনন্দের খোঁজ পেয়ে যায় তখনই ওর মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা পশুটা আড়মোড়া ভেঙে জাগতে শুরু করে। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত এই পশুটাই ওকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে।
সেদিন ইরিতাস নামের ঐ মেয়েটার যন্ত্রণাকাতর অবস্থা দেখতে রওশনের খুব ভালো লাগছিলো। ও সবসময় নিজেকে দুর্ভাগা ভেবেছে, এখন নিজের চেয়েও দুর্ভাগা আরেকজনকে দেখতে পেয়ে ওর ভীষণ আনন্দ হয়েছে। আর দশজন সাধারণ মানুষের পক্ষে সে আনন্দের খোঁজ পাওয়া সম্ভব না।
সেবারই একবার, জীবনে মাত্র একবার, একটা মেয়েকে মানসিকভাবে চিড়েই ক্ষ্যান্ত দিয়েছিলো রওশন। এরপর থেকে শুধু মানসিকভাবে না, শারীরিকভাবেও মেয়েদেরকে চিড়েছে ও। ইরিতাসকে গীর্জার ভেতর ঢুকতে দেখে স্টোরকীপার আব্দুল আলীর ছেলে রওশন গিয়ে স্টোররুমের দরজার উল্টা দিকে রেলিংএর সঙ্গে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়েছিলো। ও নিজেও জানতো না যে মেয়েটিকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে ও এই কাজটাই করবে।
রেলিংএ ঠেস দিয়ে অন্যমনস্ক একটা ভাব ধরে দাঁড়িয়ে ছিলো রওশন। ইরিতাসকে যীশুর বেদীতে যেতে হলে এদিক দিয়েই যেতে হবে। গীর্জায় কেউ নেই। ওর বাবা গেছে বাজারে, একটা চেয়ার সারাই করতে দেয়া হয়েছে, সেটা আনার জন্য। আর গীর্জার ফাদার আছেন বেদীর পেছনে তাঁর নিজের ঘরে, নিদ্রাচ্ছন্ন। উনার ঘরের দরজাটা গীর্জার উল্টোদিকে। তাই তাঁরও কিংবা অন্য কারো টের পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
কি কি সব ভাবতে ভাবতে যেনো ইরিতাস সেদিন উঠে আসলো স্টোররুমের দরজার সামনে। চার-পাঁচটা সিঁড়ির ধাপের ওপর এই ল্যান্ডিংটাই ভেতরে প্রেয়ার হাউসে যাওয়ার একমাত্র রাস্তা। ও ঘূর্ণাক্ষরেও টের পায় নি, পরিচিত ছেলেটা কেন সেদিন ওখানে দাঁড়িয়ে ছিলো। হয়তো মাথা নিচু করে হাঁটার সময় ছেলেটাকে খেয়ালই করে নি। হয়তো অভ্যাসবশেই সিঁড়ির ধাপগুলো ডিঙিয়ে যাচ্ছিলো।
তাল হারানো এক ধাক্কায় প্রথমেই মেয়েটি গিয়ে বাড়ি খেলো সামনের ভেজানো দরজাটার সঙ্গে। হুড়মুড় করে স্টোররুমের জঞ্জালরাজ্যে পড়ে যাওয়ার আগেই, যখন কেউ একজন ওকে জাপটে ধরে ঠেলতে ঠেলতে একটা দেয়ালের গায়ে নিয়ে ঠেসে ধরেছে, ততক্ষণে আতংকে জমে ও চিৎকার করতেও ভুলে গেছে।
এরপরে যখন গলার ওপর একটা ধাতব হাত যমের মতো এঁটে বসে নিঃশ্বাস আটকে দিচ্ছিলো তখন মেয়েটি প্রথম টের পেল ছেলেটা ওর পিঠের জামার চেন খুলে ফেলছে। একসময় সালোয়ারের ভেতরেও চোখা নখের খামচানি টের পেল সে। কিছুক্ষণ পরই গালে এত জোরে দু’টো থাপ্পড় পড়লো যে ভয়ে আর ব্যথায় কান্না চলে আসলো ওর। থাপ্পড়ের সপাং সপাং শব্দ’ ওর মনের ভেতরে বিষাক্ত ছুরির মতো গেঁথে গিয়েছিলো। মুখভর্তি গোঙানি নিয়ে ও হাত জোড় করে মাটিতে বসে পড়ে। ওর সারা শরীর তখন ব্যথায় জ্বলছে। আর তখনই সাপের মতো একটা হিসহিসানি কণ্ঠ শুনে একদম ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিলো ইরিতাস, ‘চুপ। এক্কানা শব্দ গড়িবি তো মারি ফালাইয়ুম।’ সেই হিসহিসানি ওর মনের ভেতর এমন একটা ভয়ের পাহাড়ের মতো চেপে বসেছিলো যে, পরে এ ঘটনা কাউকে জানানোর মতো সাহসও করে উঠতে পারে নি মেয়েটি।
এই রওশনই কিন্তু অন্য সময় পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে লেলু-চারা খেলে, টেপটেনিস বলে ক্রিকেট পেটায় এবং সবকিছুই করে। স্কুলে যায়, ক্লাসের ছেলেদের সঙ্গে মারপিট করে, বন্ধুত্ব করে, ক্লাস ফাঁকি দিয়ে ফুটবল খেলতে যায় বন্ধুদের সঙ্গে।
আবার এই রওশনের ভেতরেই নিরন্তর ফুঁসতে থাকে এক পশু, যার পোশাক ছেলেটা নিজেই। মেয়েদের যন্ত্রণা দেয়া যে পশুর একমাত্র কাজ। যন্ত্রণা দিয়ে সে নিজের ক্ষোভ মেটায়। যে ক্ষোভ অবদমিত কামের মতো প্রতিনিয়ত কামড়ায় ওকে। সে কাম-অতৃপ্ত মানুষ। তার শরীরভর্তি যন্ত্রণা। যন্ত্রণায় একেক সময় সারা শরীর খিঁচ ধরে থাকে।
গীর্জার ঘটনার কয়েক মাস পরই ও আবার একটা মেয়েকে বাগে পেয়েছিলো। সিডিএ ১১ নম্বর রোডের মাথায় একটা বড় মুদি দোকান আছে। মেয়েটা সন্ধ্যার মুখে মুখে সেই দোকানে গেছে প্যাকেট ময়দা কেনার জন্য। দোকানের সামনে কোন কারণ ছাড়াই দাঁড়িয়ে ছিলো রওশন। গীর্জার ঘটনার পর থেকে ও সঙ্গে একটা ধারালো ড্যাগার রাখতো সবসময়। যদিও তখনো পর্যন্ত এটার সেরকম কোনো ব্যবহার হয় নি, শুধু বন্ধুদের দেখিয়ে আত্মপ্রসাদ লাভ করা ছাড়া।
রওশন দেখলো মেয়েটার পেছন পেছন এসেছে দুইজন বৃদ্ধ স্বামী-স্ত্রী, যারা ট্র্যাকস্যূট পড়ে বের হয়েছে। বোঝা যাচ্ছে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য এরা এখন জগিং করবে। ওরা মেয়েটাকে বলছিলো, 'আমরা তাড়াতাড়িই ফিরে আসবো, তুই গিয়ে ময়দাটা মাখিয়ে রুটি বেলতে থাক। খবরদার কেউ বেল টিপলে দরজা খুলবি না।' বলতে বলতে দুইজনে এগিয়ে গেল। ১৩ বছরের বাড়ন্ত মেয়েটি দোকান থেকে ময়দা নিয়ে বের হওয়ার সময় রওশন, ওকে খুব খুঁটিয়ে দেখছিলো।
ও নিজেও জানতো না এরপর ও মেয়েটির পেছন পেছন নিঃশব্দে হাঁটা শুরু করবে। ও জানতো না মেয়েটি এক গেট-খোলা বিল্ডিংয়ের নির্জন দোতালায় উঠে একটা দরজার লকে চাবি ঢুকিয়ে ক্লিক করার সঙ্গে সঙ্গেই পেছন থেকে একটা রওশনের হাত মেয়েটির মুখ আর নাকে চেপে বসবে লোহার আংটার মতো। আরেকটা রওশনের হাত মেয়েটির শরীরটাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে ঢুকে যাবে দরজা খোলা ঘরের ভেতরে। ঢোকার সময় পা দিয়ে ঠেলে নিঃশব্দে ভেজিয়ে দেবে দরজাটা।
মেয়েটিকে নিয়ে ডাইনিং টেবিলের ওপর আছড়ে ফেলে রওশন। টেবিলের ওপর একটা গ্লাসদানি ছিলো। সেটায় কাঁচের তৈরী দুইটা দামি গ্লাস ছিলো। সেগুলো মেয়েটির শরীরের ধাক্কায় মেঝেতে পড়ে ঝন ঝন করে ভাঙে। এ সময় রওশন মেয়েটির গলা টিপে ধরে দুই সেকেন্ডের একটা বিরতি নেয়। কান খাড়া করে বাইরে কি হচ্ছে শোনে। এরপরে নিশ্চিন্ত হয়ে একহাত দিয়ে পিঠের পেছনে গুঁজে রাখা লম্বা ড্যাগারটা বের করে মেয়েটির গলায় চেপে ধরে শুধু একবার বলে, ‘একদম চুপ।’
এরপরে ঠিক ১৫ মিনিটের মাথায় সে মেয়েটার গলার ওপর ড্যাগারটার তীক্ষ্ণ বিন্দুটা ঠেসে ধরে আস্তে আস্তে দু’হাতে চাপ দেয়া শুরু করে। প্রথমে সুক্ষ্ম একটা লাল বিন্দু দেখা দেয়। এরপরে সেটা বড় হওয়া শুরু করে আর গল গল করে রক্ত বের হতে থাকে। সোয়া দুই ইঞ্চি প্রস্থের ড্যাগারটা মেয়েটির গলার ওপর থেকে ঢুকিয়ে নিচে টেবিলের কাঠের ভেতর গেঁথে দেয় রওশন। মৃত্যূযন্ত্রণা অনুধাবনের প্রথম পর্যায়েই ভোকাল কর্ডের মাঝখানটা চিড়ে ফাঁক হয়ে যাওয়ায়, মরার আগে একটা চিৎকারও দিতে পারে নি বেচারী।
মরা শরীরটা ওখানেই রেখে রওশন নিঃশব্দে দরজার নব ঘুরিয়ে বের হয়ে আসে। সিঁড়িতে একটু দাঁড়িয়ে বাইরের আঁচটুকু অনুধাবনের চেষ্টা করে। পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হয়ে তবেই ও নেমে আসে রাস্তায়। মুক্ত হাওয়ার মাঝে।
ওকে এখানে কেউ চেনে না। কিছুক্ষণ আগে এখানে একটা দোকানের সামনে ও দাঁড়িয়েছিলো ঠিকই। হয়তো একটা সিগারেট কেনার ধান্দাও ছিলো মনে। কিন্তু সে এগুলোর কিছুই করে নি। সে একটা কাজ করে এসেছে যেটা এখনও কেউ জানে না।
তবে জানবে। অবশ্য সেজন্য ওর কোন দুশ্চিন্তা নেই। বরং জীবনে প্রথমবার মানুষ খুন করে ওর ভালোই লাগছিলো। কাজটা নিপুণভাবে হয়েছে। এমনকি ওর শার্টেও যে রক্তের দাগ, সেটা এই অন্ধকারে প্রায় বোঝাই যাচ্ছে না। ওর দিনটা আজ আসলেই ভালো। ম্যাজেন্টা রংয়ের শার্টটা পড়ে আজ যখন ও ঘর থেকে বের হচ্ছিলো, তখনই এ কথাটা মনে হয়েছিল।
ভাবতে ভাবতে রওশন দোকানটার সামনে এসে দাঁড়ালো। একটা সিগারেট কিনলো। একটা ম্যাচ কিনলো। ও সাধারণত দোকানে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরায় না। এমনিতে ও সিগারেট খায়ই খুব কম, দিনে তিন-চারটা যা খায় তার জন্য ছোট-বড় কোন ধরনের লোককেই ও বিরক্ত করতে চায় না। ওর মতো বয়েসী একটা ছেলে, কিছুটা শক্ত সমর্থ হলেও; কারো সামনে ফস করে সিগারেট ধরালে সেটা দেখতে খারাপ লাগবেই।
ও সিগারেট আর ম্যাচ নিয়ে রাস্তার একবারে শেষ মাথায় গিয়ে দাঁড়ায়। এই রোডের আগেরটার শেষ মাথায় ওর বাসা। ও দেখে ওর বাসার পেছন দিয়ে আসা বড় নালাটা এখানে যেন আরো একটু বড় হয়েছে। হয়তো এখানে ওটার প্রস্থ খানিকটা বেড়েছেও। নালা দিয়ে একটা কুকুরের পেটফোলা মরা শরীর ভেসে যেতে দেখল রওশন। যতক্ষণ সেটা ওর সামনে দিয়ে ভেসে গেল, ও তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলো।
কিছুক্ষণ পর ও প্রথমে তীক্ষ্ণ একটা আর্ত চিৎকার শুনতে পায়। এর পরপরই আরো দু’টো। সম্ভবত বুড়ো-বুড়ি ফিরে এসে নিজেদের চাবি দিয়ে দরজা খুলে দৃশ্যটা দেখেছে। ডাইনিং টেবিলের ওপর একটা উলঙ্গ শরীর, টেনে টেনে ছেড়া জামার টুকরোগুলো এদিক-সেদিক ছড়ানো-ছিটানো, গলায় আমূল বসানো একটা চকচকে বাঁকানো হাতলের ড্যাগার।
চিৎকার শুনে রওশন যেখানে দাড়িয়ে ছিলো সেখান থেকে ইউটার্ন নিয়ে হাঁটা দিলো। একদম সোজা বাসায়। অন্য কোনদিকে গেল না। বাসায় এসে ও নাস্তা করলো এবং পড়তে বসলো। ওর বাবা অবশ্য রাতে কথা না শোনা আর একটা বেয়াদবি করার জন্য চিকন এক লাঠি দিয়ে বেশ খানিকক্ষণ পেটালেন। ওর গায়ে একটুও ব্যথা লাগলো না। ওর মনটা সেদিন ভরে ছিলো একটা জলজ্যন্ত মানুষকে চিড়ে ফেলার পর পাওয়া অপার্থিব আনন্দে।
এর এক বছর পরে একদিন সুযোগ পেয়ে কলেজের একটা মেয়ের সাথেও ও একই কাজগুলো করেছিলো। কলেজের ভেতরেই, ক্লাসরুমের পেছনে নির্জন এক জংলামতো ঝোপের ভেতরে। এই কাজটা করার সময় ও পরিচিত আনন্দের পাশাপাশি খোলাখুলি পরিবেশের আলাদা উত্তেজনাও টের পাচ্ছিলো।
লাশটা কলেজ থেকে সরিয়ে দিতেও রওশনকে কোনো কষ্ট করতে হয় নি। ও দেখেছে এ ধরনের কাজের সময় ভাগ্যও ওকে সাপোর্ট দেয়। ঝোপের ভেতরেই একটা ময়লাভর্তি বিশাল চটের ব্যাগ পাওয়া যায়। ব্যাগের সব ময়লা ঝোপের পাশে ঢেলে দিয়ে ও মেয়েটার শরীর ভাঁজ করে চটের ব্যাগটায় ঢোকায়। ঢুকিয়ে মুখে গিট্টু মেরে দেয়। রক্ত-টক্ত খুব বেশি বোঝা যাচ্ছিলো না। কলেজের পেছনে মোটামুটি উচুঁ দেয়ালটার ওপর দিয়ে ব্যগটা ছুড়ে মারে অন্যদিকের ব্যস্ত রাস্তার ফুটপাথের ওপর।
এরপর সে পেছনে তাকিয়ে ভালো করে দশদিক দেখে নেয় কেউ দেখলো কি না, কোথাও থেকে। কলেজ ভবনের পেছনটা খুঁটিয়ে দেখে। দেয়ালের অপর পাশ থেকে একটা হই-চইয়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। লাভ নেই, এই দেয়াল সাধারণ মানুষের পক্ষে চট করে টপকানো সম্ভব না। তবুও সে তাড়াতাড়ি কলেজ ভবনের পেছন দিয়ে দ্রুতপায়ে হেঁটে খেলার মাঠে চলে আসে।
মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই ঘটনা জানাজানি হয়ে যায়। মাত্র কিছুক্ষণ আগে কে এই মেয়েটিকে এইভাবে মারলো তা কেউ বুঝে উঠতে পারে না। মেয়েটির ছেঁড়া জামা-কাপড় দেখে কেউ কেউ পরিচিত একটা কথাই ভেবে নেয়; যেটার খবর পত্রিকা খুললে প্রতিদিন ডজনখানেক চোখে পড়ে। কিন্তু ঘটনার বিশ মিনিটের মাথায় পুলিশবাহিনীর স্পটে পৌছানোর পরও ওই ঘটনার কোন কুল-কিনারা করতে পারলো না কেউ।
এর কিছুদিন পরেই রওশন আরেকটা শিকার পেয়েছিলো। মেয়েটিকে ও জীবনে প্রথমবার দেখতে পেয়েছিলো ওদের বাড়ির পেছনে। ওটাই ছিলো ওকে শেষবার কারো দেখা। কারণ এরপরে মেয়েটিকে আর জীবিত দেখা যায় নি।
রাতের বেলা কেন সে ওখানে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলো, কার অপেক্ষায়, সেসব কেউ জানতে পারে নি। কারণ মেয়েটির লাশ পাওয়া গিয়েছিলো বড় নালাটা গিয়ে যেখানে খালে মিশেছে সেখানটায়। যে যুবকের অপেক্ষায় সেদিন রাতের অন্ধকারে আশপাশেরই কোনো রোডের যেকোন বাড়িতে থাকা মেয়েটি রওশনদের বাড়ির পেছনে এসে দাঁড়িয়েছিল; সে যুবকও পরে যখন টের পেয়েছে কেউ ওর কথা জানে না, তখন আর এ বিষয়ে মুখ খোলে নি। সম্ভবত মেয়েটি বাসা ছেড়ে পালিয়ে আসার সময় কোন চিঠি বা চিরকুট লিখে আসে নি। কিংবা সে তার গোপন প্রেমের কথা কাউকে জানায় নি। যদি কাউকে জানিয়ে যেতো তাহলে ঐ যুবক ফেঁসে যেতো। সবাই জানতো, ওর সঙ্গে পালিয়ে যাবার জন্যই মেয়েটি সেদিন বাড়ি ছেড়েছিলো।
তবে যুবক যে একেবারেই ভন্ড ছিলো তা না, সেও বাড়ির দশ হাজার টাকা চুরি করে বাড়ি ছেড়েছিলো সেদিন, মেয়েটিকে নিয়ে রাতের ট্রেনেই ঢাকা চলে যাবার জন্য; কিন্তু সেই রাতে অনেকক্ষণ পর্যন্ত অপেক্ষা করেও সে মেয়ের দেখা পায় নি ছেলেটা। সেদিনের মতো ভগ্নমনে বাড়ি ফিরে গিয়েছিলো এই ভেবে যে, হয়তো পালানোর সময় বাবা-মা’র হাতে ধরা খেয়েছে তার প্রেমিকা। পরদিন সকালে ঘটনা দেখে আর অবস্থা বুঝে চুপ-চাপ থাকার সিদ্ধান্ত নেয়া ছাড়া আর কিছু করারও ছিলো না ওর।
এরপর রওশন আট-ন’ বছরের একটা মেয়েকে মেরেছিলো। মেয়েটি সন্ধ্যার পরেও নিজেদের বাসার দরজার সিঁড়িতে বসে খেলছিলো। ভেতর থেকে ওর মা’র তাড়া দেয়ার শব্দ ভেসে আসছিলো। কিন্তু মেয়েটি কেন যেন সেই সন্ধ্যায় এক অশুভ হাতছানির মোহ ভেঙে বেরিয়ে আসতে পারছিলো না কোনক্রমেই।
রওশন ওকে কথায় কথায় বিবশ করে তোলে। ওর বাবা অফিস থেকে এখনো আসে নি, মা রান্না করছে, এক্ষুণি ভাইটা আসবে। ভাই দুই বছরের বড়। ক্লাস ফাইভে পড়ে। ফেলটুস ছাত্র। ও থ্রিতে পড়ে। ও ফেলটুস না। এইরকম হরেক রকম কথার তোড়ে প্রথম আজিজ মিল্ক চকলেটটা শেষ হওয়ার আগেই আরেকটা চকলেট কেনে রওশন। তারপরে সেটা ছোট্ট মেয়েটিকে দেখিয়ে দেখিয়ে নিজের পকেটে ঢোকায়।
ভেতর থেকে আসা তাড়ার শব্দ অনেকক্ষণ ধরে আসছে না। হয়তো নিম্নবিত্ত সংসারের প্রবল ঘানি টানায় ব্যস্ত মা’ও সেদিন ক্ষণিকের জন্য ভুলে গিয়েছিলো তার অবুঝ মেয়ে শিশুটির কথা।
পিচ্চি মেয়েটির গল্পের ট্রেন তখন ফুলস্পীডে চলেছে। রওশনের হাত ধরে পাড়ার এই গলিতে-সেই গলিতে হাঁটতে হাঁটতে আব্বু কত খারাপ, কত বকা দেয়, আম্মু কত মার দেয়, সব কথা সে বলে ফেলে একসময়।
কথা বলতে বলতে মেয়েটি কখন যে নিজের বাসার কথা ভুলে গেছে জানে না। রওশন ততক্ষণে ওকে আরেকটা চকলেট বের করে দিয়েছে। এবং আস্তে আস্তে নিজের ঘরে নিয়ে এসেছে। ঘরটা মূল বাড়ি থেকে বিচ্ছিন্ন আর তখন চারিদিকে সন্ধ্যার পরের অন্ধকার জেঁকে বসার কারণে সেদিন কারো চোখে পড়ে নি এ ঘটনা।
মেয়েটিই হঠাৎ প্রথম খেয়াল করে, ওর লাল হাফপ্যান্টটা ছেলেটা টেনে খুলে ফেলেছে, ও ভ্যা করে কেঁদে ফেলে। রওশন একবার হিসহিসে গলায় চুপ করতে বলে, কিন্তু বাচ্চা মেয়ে সেই গলার ভয়ংকরতা সম্পর্কে অজ্ঞ। ওর কান্নার শব্দ আরো বড় পর্দায় চড়ে বসতে যাচ্ছে দেখেই, সেটা বের হওয়ার আগেই; রওশন ওর ভোকাল কর্ডের মাঝখানে ঘ্যাচ্ করে ড্যাগারটা ঢুকিয়ে দেয়।
নিজের ঘরে এরকম একটা কাজ শুরু করে দেয়ার জন্যই সম্ভবত ও নিজেও খানিকটা আতংকিত অবস্থায় ছিল। নাহলে মেয়েটিকে কোনো যন্ত্রণা না দিয়ে জাস্ট মেরে ফেলার ইচ্ছা রওশনের কখনোই ছিল না। ও দেখতে চাচ্ছিলো অবুঝ বাচ্চাগুলোর ওপর নির্যাতন করতে কেমন লাগে, সেটা হলো না।
ড্যাগার সরাসরি গলা ভেদ করে নিচের বালিশে গিয়ে গেঁথে যায়। বালিশ, কাঁথা, তোষক আর বিছানা রক্তে ভিজে ওঠে। ও তোষকসহ সবকিছু গোল করে রোল বানিয়ে ফেলে। মেয়েটাকে ভেতরে রেখেই। ঘরের এক কোণা থেকে মজবুত দেখে কয়েক তাড়া পাটের দড়ি টেনে বের করে। সেগুলো দিয়ে রোলটা খুব শক্ত করে বাঁধে, যাতে মাইলখানেক পানিতে না ভেসেই ওটা খুলে না যায়। এরপরে সন্ধ্যার অন্ধকারে সে নিজের টাট্টিখানার ওপর থেকে রোলটা ফেলে দেয় নালার মাঝখানে। ওটা আস্তে আস্তে কালো কুচকুচে ময়লা পানির মধ্য দিয়ে ভেসে যায়।
এই মেয়েটাকে বেশি অত্যাচার না করতে পারার কারণেই ওর মনে একটা বিরক্তি জন্মায়। এই অনুভূতিটার সঙ্গে আগে পরিচয় ছিলো না রওশনের। বিরক্তি ওর পুরো মাথাকে ব্যথায় অসাড় করে ফেলে। সারা শরীরে খিঁচ ধরে আসে। ওর হিতাহিত জ্ঞান লোপ পায়। নিজের তোষকবিহীন চৌকির ওপর দীর্ঘ সময় পর্যন্ত অচেতন হয়ে পড়ে থাকে সে রাতে।
সকালে অবশ্য মা ওকে তোষকের কথা জিজ্ঞেস করেছিলো। ও বলেছিলো, অনেক ময়লা হয়েছিলো তাই ওগুলো নর্দমায় ফেলে দিয়েছে। সে কি কোনো লাটসাহেবের ঘরের সন্তান কি না- এটা জানতে চেয়ে মা অনেক অসহ্য কটুকাটব্য করে। সেসব শুনে রওশন কিন্তু একটা মূল্যবান শব্দও ব্যয় করে না। একসময় ওর মা চৌকিতে একটা চাদর পেড়ে দিয়ে যায়। দিয়ে যায় একটা কাঁথা এবং আরো একটা বালিশ।
তবে সেই সন্ধ্যায় পুরো সিডিএ এলাকায় ভীষণ হুলস্থুল পড়ে গেলো। লাশটা পাওয়া গিয়েছিলো খালের ঐ একই জায়গাটায়, যেখানে ক’দিন আগে ছেঁড়া-খুড়া জামা গায়ে ২০ বছর বয়েসী আরো একটা মেয়ের লাশ পাওয়া গিয়েছিলো।
স্থানীয় পুলিশের মধ্যে এবারে খানিকটা তোড়জোড় শুরু হলো। আট-ন’ বছরের মেয়েটার লাশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ডাবলমুরিং থানার পুলিশ পুরো এলাকায় একটা রেইড চালালো। কিন্তু তাতে কিছুই ধরা পড়লো না। পড়বেই বা কি করে? পুলিশের ধারণা ছিলো হয়তো কোন দাগী আসামী এ কাজ করে থাকতে পারে। যে কারণে ওরা খুঁজেছেও সেভাবে। রওশনদের পাড়াতেও খানিকটা খোঁজ-তল্লাশ চালিয়েছে। কিন্তু কিছু বের করতে পারে নি। তবে ওরা সেবার একটা কাজ করলো, বড় নালার উল্টাদিকে একজন সার্বক্ষণিক গার্ডের ব্যবস্থা করলো। এবং সেটা কাউকে জানানো হলো না।
এদিকে রওশনের অবস্থা দিন দিন শোচনীয় হয়ে উঠলো। ক্রমে সে অস্থির হয়ে উঠলো। একটা মেয়েকে হত্যা করেও পুরোপুরি তৃপ্ত হতে পারে নি। যে কারণে চারদিন ধরে ওর টানা মাথাব্যাথা করেছে। ব্যথা থেকে ওঠার পরও চোখে অনেক কিছুই ঘোলাটে দেখা যাচ্ছে। সেদিন বেরোনোর সময় সে মনে ভাবছিলো, আজ ওকে কিছু একটা করতেই হবে। ও বেরিয়ে সিডিএ ৪ নম্বর রোডের লোহার পুলের কাছে চলে আসলো। এই পুলের নিচ দিয়ে চলে গেছে একটা খাল। এটায় গিয়ে পড়েছে দুইটা লাশ। সেগুলো পেয়ে পুলিশ আর জনগণ চারিদিকে তল্লাশি শুরু করেছে। চারিদিকে কেমন একটা থমথমে অবস্থা। সবাই কেমন তটস্থ আর সাবধান। কিন্তু রওশনের তো সহ্য হচ্ছে না। মাথার যন্ত্রণা আবারো সবকিছুকে অসহ্য করে তুলতে এগিয়ে আসছে।
মানুষের কষ্ট দেখতে ও ভালবাসে। কতদিন মানুষকে কষ্ট পেতে দেখে না, একদম সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যথার কষ্টে কোঁকাতে দেখে না। ওর নিজের আশপাশের চারদিকের ওপর ঘেন্না ধরে যায়। নিজের ভেতরে অবদমনের যন্ত্রণা এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে সারা শরীর ব্যাথায় কুঁকড়ে ওঠে। পৃথিবী, মানুষ, জগৎ, সংসার সবকিছু অসহ্য মনে হতে থাকে। লোহার পুলের রেলিং ধরে ও কাঁপতে থাকে অল্প অল্প।
সেদিন রাতে ও সাদেকের বাসায় যায়। সাদেকের মা-কে সে বড় নালা দিয়ে গেঞ্জিটা ভেসে যেতে দেখার কথা বলে। শুনে সাদেকের মা ও বোন ডুকরে কেঁদে ওঠে। পরদিন সকালবেলা যখন সাদেকের মা থানায় গিয়ে পুলিশকে জানাচ্ছিলেন যে, সাদেকের এক বন্ধু তার পরনের গেঞ্জি ভেসে যেতে দেখেছে বড় নালা দিয়ে; তখন রওশন চলে গেছে সাদেকদের বাসায় এবং ওর মা নেই দেখে সাদেকের বোনকে জোর করে নগ্ন করে ফেলেছে।
পুলিশ যখন মহিলাকে পরামর্শ দেয়, রওশনকে নিয়ে আসার জন্য এবং তাকে মামলার সাক্ষী হিসেবে বয়ান দিতে রাজি করানোর জন্য; ততক্ষণে সে মেয়েটির পায়জামার ভেতর নখ দিয়ে আঁচড়ে-খামচে রক্তাক্ত করে তুলেছে। কামড়ে কামড়ে ছিড়তে শুরু করেছে ওর শরীরের চামড়া। মেয়েটি অসহ্য যন্ত্রণায়ও কোনো শব্দ করতে পারছিলো না, কারণ ওর মুখের ভেতর রওশন একটা ময়লা ন্যাকড়া ঠেসে দিয়েছে।
মেয়েটি যখন সরল বিশ্বাসে রওশনকে ‘আম্মু থানায় গেছে’ বলতে বলতে বাসার দরজাটা খুলছিলো, তখনই যে সে জীবনের শেষ কাজটি করে ফেলেছে এ কথা ঘূর্ণাক্ষরেও টের পায় নি। এরপরে সেই বিভীষিকাময় সময়টুকু পার হওয়ার পর; রওশন যখন ওর গলায় বাঁকানো ড্যাগারটা বসিয়ে দিয়েছে, রক্তের ফোয়ারা ছুটেছে ফিনকি দিয়ে, বেশ খানিকটে ছিটকে ছিটকে রওশনের শার্টটাকেও বিশ্রী রকম লাল করে তুলেছে; তখন সাদেকের মা বাড়ির পথে পা দিয়েছেন।
থানা থেকে তাদের বাড়ি হাঁটাপথে পাঁচ মিনিটের রাস্তা বলেই হয়তো তিনি দূর থেকে রওশনকে বাড়ির পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে দেখতে পেয়েছিলেন। তাড়াতাড়ি তাকে ডাকতে গিয়েও কি মনে করে যেন ডাকলেন না। মাএর মন কি মনে করে যেন দুলে উঠলো। সবার আগে বুকের ধন মেয়েটিকে দেখার জন্য আকুল হয়ে উঠলেন। এবং ভদ্রমহিলা সেই অবস্থায় ঘরে ঢুকে মেয়েকে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখলেন। গলায় আমূল বিদ্ধ ড্যাগার। সাথে সাথে এক তীব্র চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন, ঐ মেঝেতেই।
পড়শীরা, প্রথমে ভেবেছিলো মা-মেয়ে দু’জনেই বোধহয় একসঙ্গে মরে গেছে। তারা মায়ের চিৎকার শুনে সঙ্গে সঙ্গেই দৌড়ে এসেছে বলা যায়। একজন ততক্ষণে থানায় খবর দেয়ার জন্য ছুটেছে। হৈ চৈ-চেচাঁমেচিতে সাদেকের মা একবার উঠে বসলেন। বসে দ্বিতীয়বার মেয়ের ঐ দৃশ্য দেখে আবার মূর্ছা গেলেন। সবমিলিয়ে পনেরো মিনিট সময় লেগেছিলো পুলিশের ঘটনাস্থলে আসতে। তারা ক্রিমিনাল প্লেস তদন্ত করলেন। মেডিক্যাল টীম এসে ময়নাতদন্তের জন্য লাশটা তুলে নিয়ে গেল।
দ্রুতই পুলিশের ওসি ও আঞ্চলিক কমিশনার সাদেকদের বাসায় চলে আসলেন। স্থানীয়রাও সবাই জড়ো হয়ে গেল। রওশন অবশ্য ততক্ষণে বাসায় চলে গেছে। কোন কারণ ছাড়াই সে দিনের বেলা নিজের ঘরে গিয়ে চৌকিতে উঠে কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়েছে। আসলে ওর মনে ও শরীরে তখন খুব আরাম হচ্ছিলো। আরামে বুজে আসা চোখ মেলে ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতে ও তলপেটের নীচের জায়গাটায় আস্তে আস্তে হাত বুলাচ্ছিলো।
গত কয়েক মাস ধরে চলে আসা একই রকম কিছু খুনের ঘটনায় পুরো শহরের মানুষই তখন উন্মাদের মতো হয়ে উঠেছে। এলাকার স্থানীয়দের তো কথাই নেই। সাদেকদের বাসায় একথা-সেকথার ফাঁকে একজন বললো, সকালে একবার সাদেকের কোন্ এক বন্ধুকে যেন বাসার দরজায় দেখা গেছে। যে বললো সে নিজের কথায় ততোখানি শক্তভাবে বিশ্বাস করতে পারছিলো না। শুধু বললো, ওর মনে হয়েছিলো সাদেকের সঙ্গে ঘুরতে দেখেছে এমন কেউ যেন সকালে বাসার দরজার সামনে দাঁড়িয়েছিলো। এ কথা শুনেই বিলাপরত সাদেকের মা হঠাৎ দশদিক কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠলেন, রওশন।
তখনই একটা গুঞ্জন বাতাসে ভেসে উঠলো। অনেকে অনেক কিছু বলা শুরু করলো। আচমকা যেন কিছু কিছু হিসাবও পরিস্কার হয়ে আসা শুরু করলো। রওশন তাহলে সকালে এই বাসায় এসেছিলো। সাদেকের মা জানালেন, আগের দিন ও বাসায় এসে সাদেকের গেঞ্জি খালে ভেসে যেতে দেখতে পাওয়ার কথা জানিয়েছে। আজ সকালে যে তিনি থানায় যাবেন এবং কখন যাবেন, সেটাও সে জানতো। এবং তিনি থানা থেকে ফেরার সময় বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়ে ছেলেটাকে বাড়ির সামনে দিয়ে হেঁটে যেতে দেখেছেন।
কমিশনারের সঙ্গে থাকা একজন গোয়েন্দা পুলিশ সদস্য জানালেন; ওদের হাতে আসা খুব সাম্প্রতিক একটা তথ্যমতে, গত কিছুদিনে বাজারের নিমাই কামারের দোকান থেকে যে ছেলে পর পর চারটা ড্যাগার কিনেছে তার সঙ্গে এই রওশনের বর্ণনা মিলে যাচ্ছে। তথ্যটা তিনি নীচু গলায় কমিশনারকেই শুধু বলেছিলেন, কিন্তু উৎসুক জনতাও কিভাবে কিভাবে যেন সেটা শুনে ফেললো।
ভীড়ের মধ্যে এক যুবক একটা কথা বাতাসে ভাসিয়ে দিলো। নীলা নামের যে মেয়েটির লাশ খালের কিনারায় পাওয়া গিয়েছিলো সেও উধাও হয়েছে রওশনের বাসার পেছন থেকে। ভীড়ের মানুষ এটা চিন্তা করে দেখার মতো অবস্থায় তখন ছিলো না যে, এই যুবক কিভাবে সে কথা জানলো। টুকরো টুকরো খবরগুলো তখন মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের স্তুপে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে।
কেন অন্ধের মতো মানুষ কোনো আইন-আদালতের তোয়াক্কা না করে সেদিন এত খেপে উঠেছিলো, সে কথার জবাব কিন্তু কারো কাছ থেকে পরে পাওয়া যায় নি। কলেজের মেয়েটার লাশ বা খালের শেষ মাথায় দুইটা মেয়ের একই রকম লাশ বা বছর খানেক আগে ১১ নম্বর রোডের ১৩ বছরের এক কাজের মেয়ের লাশগুলোর কথা মানুষের মনে এক ধরনের আতংক তৈরী করে রেখেছিলো আগে থেকেই। সর্বশেষ সাদেকের বোনের মৃত্যূর পর তাৎক্ষণিক হিসাব-নিকাশে বসে হঠাৎ রওশনের নামটা বের হয়ে আসতেই, বিষ্ফোরিত হয়েছে ঐ গণ-আতংকের বোমা। দুর্ভাগা ছেলেটার কিছুই করার ছিলো না।
ঘটনা রাষ্ট্র হতে সময় নেয় নি এক মুহুর্তও। একটা ছেলে সদম্ভে ঘোষণা দিলো, 'সে রওশইন্যার বাসা চেনে।' সাদেকের বাসার সামনে জড়ো হওয়া হাজারখানেক বিক্ষুব্ধ জনতা হুড়-মুড় করে ছুটলো রওশনদের বাসার দিকে।
রওশনের মা কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখলেন এক দঙ্গল লোক লাঠি-সোটা নিয়ে তার ছেলের ঘরে ঢুকে ওকে পেটাতে পেটাতে ঘর থেকে বের করে আনছে। লাঠির একেকটা জোরালো আঘাত ছেলেটার মাথায়, কানে, নাকে, গালে পড়ছে। আঘাতের টাস-টাস শব্দ তার কানে-মাথায় হাতুড়ির আঘাত হানছিলো।
কিন্তু তিনি নড়লেন না। দূরে স্থির বসে থাকলেন। এমনকি কাউকে থামানোর চেষ্টাও করলেন না। ছেলেটার যে একদিন এ পরিণতি হবে, সেটা তিনি জানতেন। তার এই ছাই দিয়ে পোষা ছেলেটার জন্মের সময় থেকেই জানতেন। রাগে-ক্ষোভে-শোকে পাগল হয়ে যাওয়া মানুষগুলো লাঠি আর রড দিয়ে মারতে মারতে রওশনের শরীরটা একটা কাঁচা মাংসের দলা বানিয়ে ক্ষ্যান্ত দিলো।
প্রাণ বেরিয়ে যাবার পরও রওশনের শরীরকে আঘাত সহ্য করতে হয়েছে বেশ খানিকক্ষণ পর্যন্ত। ওর কাপড়-চোপড় ছিড়ে, চামড়া ছিলে সারা শরীর উলঙ্গ হয়ে গেছে। রডের আঘাতে একটা হাতের হাঁড় ভেঙ্গে কনুইএর কাছ থেকে সাদা রস বের হয়ে এসেছে। থেতলে গেছে মুখের একটা পাশ। সেখানে গালের ওপর থেকে চামড়া উবে গেছে। কংকালের মতো দাঁতের পাটি বেরিয়ে পড়েছে। আর ডান চোখটা কোটর থেকে অনেকটা বাইরে বেরিয়ে এসে চিকন একটা নালি ধরে কোনমতে ঝুলে আছে।
সবাই যখন থেমেছে তখন, ঝুলে থাকা চোখটা আরো কিছুক্ষণ অনিশ্চিতভাবে ঝুলে থাকার পর হঠাৎ টুপ করে ধূলার মধ্যে পড়ে গেল। তখন সবাই গোল হয়ে লাশটাকে ঘিরে হতবাক বিস্ময়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিলো, ছেলেটার তলপেটের নিচে কোন লিঙ্গ নেই। জায়গাটা নিশ্ছিদ্র আর সমান।
---





মন্তব্য করুন