গল্প: কিউব রুট ২৭
ক্যন্টনমেন্ট কলেজ হিসেবে যতই ভালো হোক, এখানকার কিছু টিচার যে নিতান্ত খাটাশ; সেটা একবাক্যে স্বীকার করবে যেকোন কালের, যেকোন ব্যচের তাবত স্টুডেন্ট। এমনকি স্টুডেন্টরা শুধু নয়, ক্যন্টিনের মামা বা দারোয়ান চাচা বা মালিচাচা বা আর যারা স্টাফ আছে সবাই তাই করবে।
এর কারণ আছে। এ কলেজের অধিকাংশ টিচার সরাসরি কেম ফ্রম আর্মি কিংবা আর্মি ফ্যমিলি। মানসিকতাটাই তাই ভিন্নরকম। তবে নিয়ম-শৃংখলা শিক্ষার কথা যদি বলা হয়, ক্যন্ট. পাবলিকের উপরে আর কিছু নাই।
আবার নিয়ম-শৃংখলা আসলে কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ এ নিয়ে তর্ক করতে গেলেও বিপদ, আমার মতো বাউন্ডুলেরা আজীবন নিয়ম-শৃংখলার বাইরেই রয়ে গেল। কই তাও তো একদিনের জন্যও পৃথিবীটা একমূহুর্ত থমকালো না।
যাক সে কথা, এই কলেজটায় ভর্তি হয়েছিলাম অনেকটা ঝোঁকের বশে। ইংরেজীতে 'হুইমজিক্যলি' কথাটা দিয়ে আসলে যা বোঝানো হয়, ঠিক সে কারণে। মেট্রিকে নক্ষত্রসীমার ওপর নম্বর অর্জনের সুবাদে এখানে কোন ভর্তি পরীক্ষার দেয়া লাগে নি। পরীক্ষা ছাড়াই ভর্তি হওয়ার সুযোগ খুলে গেল।
চিরকেলে ফাঁকিবাজ এই আমি চিন্তা করলাম; ভর্তি পরীক্ষার পড়া-শোনা নিয়ে যেখানে কাবিল পোলাপানগুলা রীতিমতো পেরেশান হয়ে উঠছে, সেখানে ওস্তাদ আমার জন্য দেখা যায় স্বহস্তে সৌভাগ্য রচনা করেছেন। এহেন ঘরে আসা লক্ষীকে পায়ে ঠেলা অনুচিত হবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে বাসায় গাঁই-গুই শুরু করে দিলাম।
বাপজান অবাক হয়ে বললেন, আর্রে, এইসব আর্মিদের স্কুলে ভর্তি হয়ে তোর মতো পাগল কি করবে? চুপচাপ ঢাকায় চলে যা। ঢাকা কলেজে ভর্তি হ। ওইখানে পড়লে অনেক কিছু করতে পারবি। তোর যে স্বভাব, ওখানে না গেলে তোর তো ঠিক খোলতাই হবে না রে।
এভাবে যতই তিনি জুলুজুলু চোখে আমাকে লোভ দেখাতে থাকেন, আমি তাতে গলি না। আমার এক কথা, ক্যন্ট পাবলিকেই ভর্তি হবো, ভর্তি পরীক্ষার পড়াশোনা করতে পারবো না। পুত্রের এহেন নিম্নরুচির দর্শন পেয়ে পিতা আমোদিত হলেন। কারণ তিনি নিজেও সবসময় যা ভালো বুঝেছেন, তাই করেছেন। আর মানুষকে বিভিন্ন কিছু বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। তাই পুত্রকে তিনি যখন দেখেন, নিজের বুঝের বাইরে যাওয়ার ধাত পায় নি; তখন তার জন্য মনে মনে খুশি হওয়াই স্বাভাবিক।
শোয়েব আখতার উইকেট পেলে যেমন খুশি হতো, আমি সেরকম খুশি হলাম। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের জ্ঞান অর্জনের লক্ষ্যে নিজেকে ক্যন্ট. পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজের হাতে সঁপে দিলাম। হাতে বলাটা ঠিক হলো না। কলেজের কি আবার হাত থাকে নাকি? বলতে হবে, কলেজের একটা ভবনে সঁপে দিলাম।
শিক্ষাবর্ষের প্রথম মাসটি খুব বেশি বন্ধুর ছিলো না। বিশেষত সিস্টেমগুলোর মধ্যে সবচে' ভালো যেটা ছিলো সেটা হচ্ছে, আ জার্নি বাই বাস্। সেটা এই ঢাকা শহরের বাসে বাদুড় হয়ে ঝোলাঝুলি করাও না, আবার নাইটকোচে করে ঢাকা-রংপুর যাওয়ার বাস জার্নিও না। চোখজুড়ানো গ্রামের দৃশ্য, দুই পাশে দুইটা রেখে, মাঝখান দিয়ে চলে যাওয়া। সেটা ছিলো একটা কিছু অসাধারণ।
আমার অবশ্য তখন সেদিকে মনোযোগ ছিলো খুবই কম। কলেজের বাসে কলেজের একটা ছেলে আশ-পাশের নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্য থেকে আরাম সংগ্রহ করে সেগুলো নিজের চোখের কোলে তুলে দেবে, এমন কমই হয়। যেটা হয় সেটা হচ্ছে, বাসের সামনের দিককার সুন্দরীদের জন্য বরাদ্দ সিটগুলোর দিকে চোখ, মন ও মনোযোগ বিদ্ধ হয়ে থাকে। সবারই তাই থাকতো। পুরোটা সময়জুড়ে।
শুধু এ পর্যন্ত হলে অবশ্য খারাপ হতো না। বাসে উঠতে প্রথম প্রথম তাই ভালোই লাগতো। সমস্যাটা শুরু হলো বকশিবাজার মোড় থেকে মিসিসিপি'র বাসে ওঠা মনের ভেতর দোলা দেয়া শুরু করার পর থেকে। কেন যে সেই মেয়েটিকে আলাদা করে ভীষণ ভালো লেগে গেল, বুঝতে পারলাম না কখনো।
বাসের ছেলেপিলেগুলো হাড়বজ্জাত ছিলো। তবে তাতে আমার কোন সমস্যা হতো না, কারণ আমার হাড়েও এমন কোন ভালো উপাদান ছিলো না। মেয়েদের রো'র পর পরই যেসব ছেলেগুলো বসতো তাদের পৌরুষ নিয়ে ছেলেমহলে নানা ধরনের সন্দেহ করা হতো। তো একদিন তেমনই একটা ছেলেকে দেখলাম আমার পাখিটার দিকে চিকচিকে চোখে তাকানোর চেষ্টা করতে। আর যায় কোথায়, কয়েকদিন ব্যটার ভাবগতিক দেখে আর ভালো হয়ে যাওয়ার সতর্কতাবাণীসহ সুযোগ দিয়ে যখন কাজ হলো না, কলেজের প্রথম গন্ডগোলটা করলাম। তিনজন মিলে কাঠের বাটাম দিয়ে আচ্ছামতো পেটালাম ছোঁকড়াকে। বাসের মধ্যেই, ফেরার সময়।
সেদিন সন্ধ্যাতেই নানান উড়ো খবর পাচ্ছিলাম। ওই ছেলের বাবা না কি কলেজের শিফট্-ইন-চার্জ স্যারকে ঘটনা জানিয়েছেন, কলেজের প্রিন্সিপাল যিনি পদমর্যাদাবলে মেজর, তিনি নাকি আগামীকাল বন্দুক নিয়ে কলেজে আসবেন; এরকম আরো নানান উড়ো খবর পাচ্ছিলাম। তাতে আমার মজা কম লাগছিলো না। একেকজন বন্ধু একেকটা খবর নিয়ে আসছিলো আর আমি পুলকিত হচ্ছিলাম। হতে হতে সাজুর গেমসে বেনিমারু নিকাইডো, সী কেনসু আর মাই শিরানুই-এর টীম নিয়ে গেম খেলছিলাম।
তবে পরদিন সকালে কলেজে গিয়ে আসলেই ঝামেলায় পড়তে হলো। আমাদের শিফট-ইন-চার্জ সুরঞ্জিত স্যার, সত্যি সত্যি এসেমব্লী'র পর ভরা মজলিসে নাম, হাউস আর শ্রেণী উল্লেখ করে আমাকে তার সঙ্গে সাক্ষাতের আমন্ত্রণ জানিয়ে বসলেন। জানের পানি শুকিয়ে গেল।
গেলাম তার রুমে। দাঁড়ালাম সামনে। দেখি তিনি তাকিয়ে আছেন অন্যদিকে। কিছুটা হকচকিয়ে গেলাম। এই ফাঁকে কথা নাই, বার্তা নাই সপাং সপাং জালিবেতের বাড়ি পড়তে থাকলো শরীরের বিভিন্ন জায়গায়। তখনো ভদ্রলোক তাকিয়ে আছেন অন্যদিকে।
বাড়ি দেয়া শেষ করে তিনি শুধু একটা কথাই বলেছিলেন, মারামারি ক্যন্টনমেন্টের ভেতরে চলবে না। এই কথা মানলে ভালো, না মানলে আরো ভালো। বলার সময় তিনি তার জালিবেতটার গায়ে আদর করতে করতে হাত বুলাচ্ছিলেন। আমি সবই বুঝলাম, শুধু অন্যদিকে তাকিয়ে থাকার কারণটা বুঝলাম না।
পরে জেনেছিলাম, ভদ্রলোক ট্যারা। মোটা চশমার কাঁচের সেটা ঠাহর করে না দেখলে টের পাওয়া যায় না। তবে এমন মাত্রায় ট্যারা যে, সেটা বরং তার জন্য ভালো হয়েছে। তাকিয়ে থাকেন একদিকে কিন্তু বেত চালান আরেকদিকে, শত্রু ঘায়েলের মোক্ষম ব্যবস্থা।
ভদ্রলোককে আমার সেদিনই ভালো লেগে গেল। মুভিগুলোতে বোধহয় এরকম খলচরিত্র দেখা যায়। তিনি হাসতেনও মুভির ভিলেনদের মতো করে খ্যল খ্যল করে। পান খাওয়া এবড়ো-খেবড়ো দাঁতগুলো বের হয়ে থাকতো।
কলেজের বাস থেকে নামার পর সেদিন বিকেলে ঐ ছোঁকড়াকে আবার আটকালাম। বললাম, তোমারে একদিন মারছি, তাই আর মারবো না। কিন্তু একটা কথা মনে রাইখো, ঐ কলেজটা এই শহর থেকে অনেক দূরে। এত দূরে যে বাসে চড়ে যাইতে হয়। এইটা মনে রাইখো সোনার চান।
বেচারা আসলে সেদিন বাসে মিসিসিপি'র সামনে পেটন খেয়ে যতোটা না শারীরিক কষ্টে পতিত হয়েছিলো, তারচে' বেশি পেয়েছিলো মানসিক কষ্ট। মনে তার খুব ব্যথা। আমি সেইটা বুঝতে পারি। একটা বিষয় হচ্ছে, ছেলেরা কিন্তু ছেলেদের সবকিছু বুঝতে পারে। তবে অনেক বেশি বাস্তবমুখী চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হওয়ার কারণে অধিকাংশ সময় আপ্লুত হয় না। চেপে যায়।
আমি ছোঁকড়াকে নিয়ে সেই রাতে গণকটুলি গেলাম। মাটিতে মাদুর পেতে বসে বাংলা খেলাম। এটা আরেকটা মজার একটা জিনিস ছিলো। জামাই-বউ চানাচুর আর বাংলা। গ্লাসে গ্লাসে ফিলীংস্ চড়তে থাকে। দ্রুত সে ফিলীংস্এর মাত্রা আর গতি পরিবর্তন হয়।
একটা তিব্বত পমেটের কৌটায় দেখলাম, লবণ-মরিচের গুড়া রাখা। গলার ভেতরে ঢালার সময় যদি উল্টায় বাহির হয়ে আসতে চায়, আঙ্গুলের মাথায় এক চিমটি নিয়ে জিহ্বায় ঠেকালেই হলো। গালের মাংস ধরে আসা গলা উপচানো নোনতা পানি আবার গুটিয়ে যাবে।
আমরা কয়েকজনে প্রায় দুই লিটার বাংলা টেনে গেমসে আসলাম। তখন এই গেমসটাই ওয়ার্ক স্টেশনের মতো ছিলো। যা কিছু করার, করে-টরে সন্ধ্যায় সবাই এখানেই চলে আসতাম। এখানে আসলে কাউকে না কাউকে পাওয়া যেতই। আর কেউ না থাকলেও সমস্যা ছিলো না। একটা সিগারেট ধরিয়ে এক কয়েনে মোস্তফা গেম ওভার বা কিং অফ ফাইটার প্র্যকটিস্ শুরু করলে সময় কাটানো কোনো ব্যপারই না।
সেদিনও এসব করতে করতে রাত দুইটা বাজার পর সাজু ভাই বললো, বন্ধ করবো। আমরা হৈ হৈ করে রাস্তায় নেমে আসলাম। রাতে বাসায় ফিরে আব্বুর চোটপাট শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়লাম।
পরদিন মিসিসিপি এসে জিজ্ঞেস করলো, মেয়েটা লাইফে প্রথম আমার সঙ্গে যেই কথাটা বললো সেটা হচ্ছে; তুমি কি বাংলা খাও?
আমি বুঝতে পারলাম। আগের দিন সাধুভাব ধরতে গিয়ে ফেঁসে গেছি। পাঁড় হারামীটা সকালে এসে সব ফাঁক করে দিয়েছে। মেজাজটা খুব খারাপ হলো। ঠিক করলাম, বিকেলে আবার বউয়ের ভাইপো'কে পেটাবো। ব্যটার কপালটা ভালো, সেদিন আর আমাদের বাসে চড়ে নি। অন্য বাসে করে বাসায় ফিরেছিলো।
এদিকে আমার তো সেদিন আর গেমস খেলতেও ভালো লাগে না, সিগারেট খাইতেও ভালো লাগে না, কিছু করতেই ভালো লাগে না। অতিরিক্ত মন খারাপ দেখে বন্ধুরা গেমসেই মাল নিয়ে আসলো। সেটার সঙ্গে ভার্জিনকোলা মিশিয়ে সবাই মিলে খেলাম। খেয়ে এসপি'র ব্রীজের ওপর অনেক রাত পর্যন্ত চিল্লায় চিল্লায় গান গাইলাম, 'শোনো ববি রায়ের সাথে চলে যেও না, ফেলে আমায়।'
এর ঠিক পরের দিন সকাল বেলা দেখা হয়ে গেল আরেক ভুবনমোহিনীর সঙ্গে। কলেজে তখন মাত্র মাস পেরিয়েছে। সেদিন সকালে বাস থেকে পুকুর ঘাটের দিকে গিয়ে এসেম্বলী ফাঁকি দিচ্ছি, আমার সঙ্গে ছিলো রেজা শাহ পাহলবী। এটাই ছিলো মোটকু আর চারকোণা শেপের ছেলেটার নাম। এসেম্বলী শেষে দেখি পুকুরের যেদিক দিয়ে কলেজ ভবনে ঢুকে দো'তলায় উঠতে হবে সেখানে দাঁড়িয়ে মিয়া স্যার পাহারা দিচ্ছেন। কোনো এক বিচিত্র কারণে আমার নামটা এই ভদ্রলোকের মোটেই পছন্দ ছিলো না।
তিনি আবার আমাদের ফর্ম টিচার। তাই প্রত্যেকবার আমার নাম ডাকার সময় জিজ্ঞেস করতেন, তুমি মুসলমান? বলতাম, হ্যাঁ। তিনি আবার জিজ্ঞেস করতেন, তাহলে তোমার নাম সিদ্ধার্থ কেন? এই কেন'র জবাব ছিলো না আমার কাছে। তাই চুপ করে থাকতাম। তিনি সন্দেহ করতেন, নামটা বোধহয় বানানো।
এটা ভেবে আরো ক্ষেপে যেতেন। কলেজের লগ-বুকে আমার বাসার কোন কন্ট্রাক্ট নাম্বার দেয়া ছিলো না। কারণ তখন হাতে হাতে মোবাইল ছিলো না। আর টিএন্ডটিও ছিলো সোনার হরিণ। কোন নাম্বার থাকলে মিয়া স্যার নিশ্চই ফোন করতেন বাসায়, নাম নিশ্চিত হওয়ার জন্য।
ভদ্রলোককে সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আমি আর রেজা ভাবলাম, সকাল সকাল ঝামেলায় জড়িয়ে লাভ নেই। তারচে' ঘুরে ছেলেদের কমন রুমে চলে যাই। প্রথম ক্লাসটা করবো না। যেমন ভাবনা তেমন কাজ।
কমন রুমে ঢুকে দেখি টেবিল টেনিসের টেবিল খালি। দুইটা ব্যট আর একটা কমলা রংএর বলও টেবিলের ওপর সাজানো। সকালে কমন রুমের মামা সব সাজিয়ে দিয়ে গেছেন, কিন্তু এখনো কেউ আসে নি। একটা-দুইটা ক্লাস শেষ হওয়ার পর আস্তে আস্তে আসা শুরু করবে।
আমি আর রেজা শুরু করলাম বল নিয়ে টেবিলের ওপর পিটাপিটি। ঐ চেষ্টা করাটাই পরবর্তীতে কাল হয়ে দাঁড়ালো। সেদিন সারাদিন ক্লাসে গেলাম না। চারটা টেবিলের একটা দখলে নিলাম আমরা দুইজন। এরপরে টানা তিন দিন আর ক্লাসে যাওয়া নাই।
চতুর্থ দিন সকালে বাস থেকে নেমেই আমি আর রেজা কমন রুমের দিকে হাঁটা দিয়েছি সোজা, আগের দিন কে কয় গেম জিতসি, সেটা নিয়ে ঝগড়া করতে করতে। তখনও এসেম্বলী শুরু হয় নি, সামনে এসে দাঁড়ালেন ফর্ম টিচার। তার সঙ্গে কিছু বাক্য বিনিময় হলো, সেদিন আর কমন রুমের দিকে যাওয়া হলো না।
ভদ্রছেলের মতো এসেম্বলী করে ক্লাসে গেলাম। একটা কথা বলে নেয়া ভালো, বাইরে যতই দুষ্টামী করি না কেন, টিসি সংক্রান্ত ভীতি আমার ভেতরে ভালোভাবেই ছিলো। আর পেশায় দুষ্ট ছেলে না হওয়ার কারণে আল্টিমেটলি আমাকে যে পড়া-শোনা করেই বাবা-মা'র মুখ উজ্জ্বল করতে হবে, সে জ্ঞানও আমার ছিলো।
চতুর্থ ক্লাসের পর টিফিনের ঘন্টা পড়লো। নামেই এটা কলেজ, আসলে একটা পেইন টাইপ হাই স্কুল। মেজাজ গরম করে ঘুরে বেড়াচ্ছি। একবার কমনরুমে ঢুকলে আর বের হতে পারবো না, এটা জানি তাই ওমুখো হচ্ছি না। রেজাকেও দেখলাম মুখ শুকনো করে এককোণায় বসে চিকেন বার্গার চাবাতে। দেখতে দেখতে আমার আরো মেজাজ খারাপ হচ্ছিলো, এমন সময় মিসিসিপি এসে জিজ্ঞেস করলো, আবার; তুমি কি বাংলা খাও?
চট করে বলে ফেললাম, হ্যাঁ খাই, তো?
মেয়েটা আর কোনো কথা না বলে চলে গেল। মনের ভেতর সেদিন এত দুঃখ পেয়েছিলাম যে, প্রথমে ঝাল মিটিয়েছিলাম এক রিকশা ওয়ালার উপর। অবশ্য রিকশাওয়ালারও দোষ ছিলো। ন্যায্য ভাড়া মেটানোর পরও ব্যটা পেছন থেকে স্লেজিং করতে ছাড়ে নি।
এরপরে রাতে বাসায় গিয়েও খানিকটা চিল্লাচিল্লি করলাম আম্মুর সঙ্গে। আমি ক্লাস-ট্লাস ঠিকমতো করছি কি না এটা জানতে হলে, সরাসরি জিজ্ঞেস করলেই হয়। না তিনি পেচানো শুরু করলেন। একটা সময় আর ভালো লাগলো না। পড়া-শোনা করবো না ঘোষণা দিয়ে ডিনার টেবিল থেকে উঠে হাত ধুয়ে ফেললাম।
আমার রুমের জানালা খুলে একটা বিশেষ শীষ দিলে পাশের বাড়ির রিফাত ওদের ছাতে উঠতো। টুক-টাক জরুরি আলাপ থাকলে সারা হতো। এরকম একটা বিশেষ সিস্টেম ছিলো, তবে সেজন্য রাতে ঘরে ঢোকার আগেই বলে-টলে নেয়া হতো। আজকে বলা নাই, কওয়া নাই; শীষ দিলাম। দেখি একটু পর রিফাত ছাতে উঠেছে। বললাম, মেজাজ খুব খারাপ। বের হ।
দুই বন্ধু সুত্রাপুর থেকে গাঁজার পোটলা কিনে আনলাম। রিফাতদের ছাতে বসে সেই গাঁজা বেছে, তাতে সিগারেটের শুকা মিশিয়ে স্টিক বানালাম। ছাতের নিরাপদ কোনায় বসে বসে মনোযোগ দিয়ে টানলাম কিন্তু তবু মিসিসিপি'র কথা ভুলতে পারলাম না।
কয়েক দিন পর থেকে আবার পুরোনো অবস্থায় ফিরে গেলাম। দিনের আশি পার্সেন্ট ক্লাস মিস্ দিয়ে টেবিল টেনিস খেলি। মাথার নিউরণগুলোর ভেতর সারাক্ষণ চাপ-স্পিন-ফোরহ্যন্ড-ব্যকহ্যন্ড ঘুরতে থাকে। পড়াশুনায় কোনো মনোযোগ নেই। যে দুএকটা যে ক্লাস করতাম, সেগুলোতে বোকার মতো বসে থাকা আর দুষ্ট ছেলেদের সঙ্গে ফিচকেমি করা ছাড়া আর কিছু করার ছিলো না। মাঝে মাঝে ধরা পড়ে যাবার জন্য শাস্তিও পেতে হতো।
কলেজ লাইফের শাস্তিতে শারীরিক আঘাতের চেয়ে মানসিক আঘাত করার চেষ্টা থাকতো বেশি। কেবল কৈশোরোত্তীর্ণ আমার কাছে সে শাস্তিগুলো ভয়ানক ছিলো। ক্লাস থেকে বের করে দেয়া হলে খুব অপমান বোধ করতাম। কিন্তু টেবিল টেনিসের টেবিলে গেলেই সবকিছু হাওয়া। এমনকি ভুলেও যেতাম সবকিছু। আশে-পাশে কে কি বলছে, কি করছে; খেয়াল থাকতো না মোটেও।
এরইমধ্যে সায়েন্সের সাবজেক্টগুলোর প্র্যকটিক্যল ক্লাস বেশ কয়েকটা হয়ে গেছে। আমি সেগুলো বলা যায় মিস করেছি। একদিন প্র্যকটিক্যল ক্লাসে গিয়ে আকাশ থেকে পড়লাম। আমাকে একটা কুটিল জিনিসের সাইজ মাপার জন্য আরেকটা জটিল জিনিস ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। আমি দুইটার কোনোটারই ভাব-গতিকের সঙ্গে পরিচিত নই।
ফলাফল, মিয়া স্যারের ভালোরকম দৌড়ানি। বলে রাখা ভালো, তার সম্পর্কে জনশ্রুতি আছে তিনি ক্যান্টনমেন্ট থেকে হাঁক ছাড়লে সেটা অনেক মাইল দুরের বগুড়া শহরের সাতমাথা এলাকা থেকেও শোনা যায়। দিন দিন ক্লাসগুলো আমার কাছে বিভীষিকাময় হয়ে উঠতে লাগলো। এরমধ্যে একদিন মিসিসিপি এসে বললো, (এই মেয়েটা একদিনও আমাকে ভালো কোন কথা বললো না); নিয়মিত ক্লাস না করলে কলেজ থেকে বের করে দেয়া হয়।
আমি খুব চিন্তিত হয়ে পড়লাম। আমার অধিকাংশ স্কুলের বন্ধু-বান্ধব, সাজুর গেমসে যাদের সঙ্গে ওঠা-বসা হয়; তারা শহরের অন্য একটা কলেজে পড়ে। সেটা একটা সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ। সেখানে এইসব সমস্যা নাই। খোলা-মেলা কলেজ জীবন। পার্সেন্টেজ-য়ের তো কোনো ঝামেলাই নাই। আমার যদি ওখানে ভর্তি হওয়া লাগে, সেটা খারাপ না যদিও, তাও আব্বু-আম্মুকে কথাটা কিভাবে বলবো; ভেবে চিন্তিত হয়ে পড়লাম। কারণ উনাদের আমি খুব ভয় পাই। ভীষণ মন খারাপ হয়ে গেল।
কিন্তু মিয়া স্যার আমার জন্য একটা মহাখারাপ পরিবেশই তৈরী করে রেখেছিলেন। তিনি কোনমতেই আমার নাম মেনে নিতে রাজি না। এবং সে সূত্র ধরে আমাকেও মেনে নিতে রাজি না। উনার ইচ্ছা আমার বাবা-মা'কে কলেজে ডেকে এনে, আমার নাম সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার। কলেজের প্রিন্সিপাল এ বিষয়ে অনুমতি দিলেই তিনি কাজটা করবেন বলে ঘোষণাও দিয়ে দিলেন।
এ সমস্যার একটা সমাধান ছিলো। ক্লাসের বন্ধুদের মারফত জানলাম, তার কাছে যারা প্রাইভেট পড়ে তাদের তিনি আলাদা দৃষ্টিতে দেখেন। সে দৃষ্টির সঙ্গে কৃপা মিশ্রিত থাকে।
কিন্তু আমি অন্য একটা কলেজের স্যারের কাছে পড়তাম। সেখানে অন্যসব বন্ধুদের সঙ্গে হৈ-চৈ'টা পড়ার চেয়ে বেশি করার সুযোগ পেতাম বলে, মিয়া স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়ার ব্যপারে একটা সেকেন্ড থট দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিলো না। আর যে ব্যটার সঙ্গে আমার জমবে না, তার সঙ্গে গুরু-শিষ্যের সম্পর্কে যাওয়া আমার ধাতেও নেই। আমি জানতাম, চেষ্টা করলেও দেখা যাবে অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই মাথা গরম করে একটা গন্ডগোল পাকিয়ে ফেলবো ভদ্রলোকের সঙ্গে।
এরকম বিভিন্ন কারণে যখন আমি টেনশনে হাবুডুবু খেয়ে খেয়ে দিনযাপন করছি, তখন আমার বন্ধুরা সরকারী কলেজের মজা চুটিয়ে উপভোগ করছে। একজনের সিস্টেম ছিলো এমন; সকালে দুই আউন্স বাংলা খেয়ে কলেজে যেত, সারাদিন কলেজের উল্টাদিকে টিএন্ডটি কলোনীর মাঠে বসে দুই টাকা বোর্ড তিনতাস খেলতো, বিকালে এসে বাসায় খেয়ে-টেয়ে সন্ধ্যায় আবার সাজুর গেমসে চলে আসতো। তাকে দেখলে আমার মেজাজটা কি রকম খারাপ হতে পারে, সহজেই অনুমেয়।
এরমধ্যে ভালো যেটা হলো, কলেজের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা এসে পড়লো। আমি আর রেজা টেবিল টেনিস প্রতিযোগিতায় নাম লেখালাম। আমাদের ক্লাসের ক্রিকেট আর ফুটবল টীম অন্যান্য সেকশনের সঙ্গে ন্যক্কারজনকভাবে হেরে সবার মন খারাপ করে দিয়েছিলো। অন্যান্য যে প্রতিযোগিতাগুলো ছিলো, দৌড়-হাইজাম্প সেগুলোতেও সেকেন্ড ইয়ারের ভাই-বোনদের জয়জয়কার।
এর মধ্যে শুধু টেবিল টেনিসেই দেখতে দেখতে আমরা দুইজন ফাইনালে উঠে গেলাম। ফাইনাল ম্যচ ছিলো পুরুস্কার বিতরণীর দিন। সকালে প্রথমে একশ আর দুশ' মিটার স্প্রিন্ট এবং চারশ' মিটার রিলে-রেস হলো। এরপরে শুরু হলো আমাদের খেলা। সেকেন্ড ইয়ারের কমার্স গ্রুপের বি সেকশনের সঙ্গে।
মুন্নাভাই-রায়হান ভাই জুটি এর আগের বারও শিরোপা জিতেছে। টেবিল টেনিসে ফার্স্ট ইয়ারের চ্যম্পিওন হওয়ার ঘটনা বিরল না। কিন্তু আমরা দুইজন সেটা ভেবে ঠিক টেনশন-ফ্রী হতে পারছিলাম না। যে কারণে খেলার ওপেনিং সার্ভটাই টেবিলের বাইরে করে পয়েন্ট হারিয়েছিলাম। রেজারও প্রথম প্রথম চাপ মিস্ হচ্ছিলো। তবে ভেতরে ভেতরে কিসের যেন একটা তাগিদও অনুভব করছিলাম। ধীরে ধীরে দু'জনেই খেলায় ফিরে আসলাম। প্রথমে পিছিয়ে থেকেও টুয়েন্টি-টুয়েন্টিতে ডিউস্ করলাম।
পাঁচ পয়েন্ট পিছিয়ে নিয়ে আবার খেলা শুরু হলো। কলেজের বড় হলঘরে টেবিল বসিয়ে খেলা হচ্ছে, সামনে বিশাল অডিয়েন্স দাঁড়িয়ে কিংবা বসে খেলা দেখছে। এককোণায় আমার পাখিটাকেও দেখা যাচ্ছে। আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে, সেদিন ছিলো একটা স্টেজ শো'র দিন। নিজেকে পারফরমার-পারফরমার মনে হচ্ছিলো।
দ্বিতীয়বারও ডিউস্ হওয়ায় তিন পয়েন্টের খেলা শুরু হলো। প্রথমবারে রেজার সার্ভে পয়েন্ট হারালাম। এরপর আমি সার্ভ করার আগে এক সেকেন্ড থমকালাম।
একটা বছর নষ্ট করেছি এই টেবিল টেনিসের পেছনে। কি পেয়েছি? এ খেলাটা আমাকে কিচ্ছু দেয় নি। ক্লাসে অমনোযোগী ছাত্র হিসেবে দুর্নাম কুড়িয়েছি, এখন পর্যাপ্ত পার্সেন্টেজ না থাকার জন্য ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষায় বসতে পারবো কি না তার নিশ্চয়তা নেই, মিসিসিপির সঙ্গে যে উজ্জ্বল সুযোগটা ছিলো সেটাও নষ্ট হয়ে গেছে; এই সবকিছুই ক্ষতির খতিয়ান। পেলামটা কি? ভাবনাটা মূহুর্তের মধ্যে আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেললো।
সেই অবস্থাতেই পেনহোল্ড-ফোরহ্যন্ডে একটা স্পিন সার্ভ করলাম। আমার কোর্ট থেকে কোনাকুনি এক সরলরেখায় বলটা প্রথমে উল্টো কোর্টে গিয়ে পড়লো, পড়ে প্রায় ষাট ডিগ্রী এঙ্গেলে রায়হান ভাইকে বোকা বানিয়ে টেবিলে ছেড়ে বেরিয়ে গেল। বিদ্যূৎগতিতে। ভাই হতভম্ব চোখে আমার দিকে তাকালেন। তার আর কিছু করারও বোধহয় ছিলো না।
স্পিরিট ভীষণ ছোঁয়াচে জিনিস। তাই আমাকে এহেন একটা কাজ করে ফেলতে দেখে জোশে পড়েই কি না কে জানে; এরপরের সার্ভটাকে আমাদের বোর্ডে একটু ফ্লাই নিয়ে রিটার্ন আসতে দেখেই, রেজা ফ্লোরে ওর জুতার ঠকাশ্ বাড়ির সঙ্গে সপাটে চাপ খেললো। হিসাব ক্লিয়ার। পরপর দুইটা পয়েন্ট পেয়ে আমরা জিতে গেলাম!
জীবনে সেটা একটা দিনই ছিলো, শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত যেটা ছিলো অদ্ভুত। ততদিনে আমাদের বাসায় নতুন টিএন্ডটি'র লাইন বসেছে। আমাদের বাসার নাম্বার ক্লাসের একমাত্র যে মেয়েটার কাছে ছিলো সে হচ্ছে তিশা। বন্ধু রুশোর সে সময়কার বউ।
ওরা যে বিয়ে করবেই এ বিষয়ে তখন আমরা কেউ সন্দিহান ছিলাম না। রুশো পরবর্তীতে ঢাকা ইউনিভার্সিটির শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে সাত বছর একটা মেয়ের সঙ্গে প্রেম করেছে আর পড়েছে। ওকে মাস্টার্সের শেষের দিকে একদিন তিশার কথা জিজ্ঞেস করেছিলাম। সে বলেছিলো, তিশাকে আজো ঠিক আগের মতোই ভালবাসে। কিন্তু বিয়ে করতে চায় এখনকার মেয়েটিকে।
আমি সম্ভবত এ কারণেই প্রেম বিষয়টা নিয়ে জীবনের শুরু থেকেই খানিকটা সন্দিহান ছিলাম। কেননা মিসিসিপি'কে আমার ভালো লাগতো ঠিকই, কিন্তু আমি কি ওকে আসলেই সত্যিকারের ভালোবাসতাম? আমি ঠিক বুঝতে পারতাম না।
সেদিন রাতে বাসায় ফিরে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে জানলাম, মিসিসিপি ফোন করেছিলো। আম্মুর কাছে আমার কথা জানতে চাওয়ায়, আম্মু আমি বাসায় নাই বলে, ফোন করার কারণ জানতে চেয়েছিলেন। মেয়েটি জানিয়ে দিয়েছিলো, আমি কলেজের টেবিল টেনিস খেলায় চ্যম্পিওন হয়েছি।
এটা শুনে তিনি খুবই বিরক্ত, কারণ তিনি চান আমি যেন শুধু পড়া-শোনা করি এবং ভালোভাবে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করি। আব্বু অবশ্য 'সাবাস ব্যটা' বলে খুব খানিকটা পিঠ চাপড়ে দিয়ে গেলেন। আমি এমন একটা আনন্দের উপলক্ষ্য পেয়ে খুশির ওপর খুশি হয়ে গেলাম।
পরদিন মিসিসিপি আগের চেয়ে একটু ভিন্ন একটা লাইন বললো, তবে খুব বেশি ভিন্ন না; তোমার এখন থেকে আর একটা ক্লাসও মিস্ দেয়া যাবে না।
আমি জানতাম, এখন থেকে সবগুলো ক্লাস করেও শেষরক্ষা হবে কি না তার নিশ্চয়তা নেই, কিন্তু ক্লাস না করলে যে ফাইনাল পরীক্ষায় বসতেই পারবো না, তার সাক্ষাৎ নিশ্চয়তা আছে। টুক-টাক ক্লাস করা আসলেই শুরু করে দিলাম। কিন্তু ক্লাসে যাওয়ার চেয়ে রাতের বেলা চেয়ার-টেবিলে বসে বসে পড়াও অনেক ভালো মনে হলো আমার কাছে।
এতদিনের পড়া-শোনার অনভ্যাস আর ঠিক সেই জটিল সময়টায় অকারণেই রাতে নেশাজাত দ্রব্য সেবনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায়, নানারকম উপসর্গ দেখা দিতে থাকলো। ইতোমধ্যে মিয়া-সুরঞ্জিত আর অংক টিচার মফিজ স্যার গং আমার বিষয়ে প্রিন্সিপালকে প্রায় কনভিন্স করে ফেললেন।
প্রিন্সিপাল স্যার একদিন আমাকে তার কক্ষে ডেকে বাবা-মা'র খোঁজ-খবর নিলেন। আমার পরিবারের কি অবস্থা, বাবা কি করে -এসব জানলেন। তারপর খুব মিষ্টি সুরে এক সপ্তাহ পরের একটা তারিখে বাবা'কে নিয়ে কলেজে আসতে বলে দিলেন।
তখনো আমি একেবারে হাল ছেড়ে দিই নি। আমাদের ক্লাসের বায়োলজি টিচার এবং একজন ম্যডাম আমার পক্ষে ছিলেন। তারা চেষ্টা করছিলেন। সায়েন্সের দুই সেকশন মিলিয়ে আমিসহ আরো দু'জন ছিলাম, যাদের একইরকম অবস্থা হয়েছে।
মিসিসিপি'কে দেখছিলাম, বিষয়গুলো জানা স্বত্তেও আমার সঙ্গে কোনো কথা বলতে আসতো না। আর আমার তো কখনো নিজে থেকে কথা বলার সাহসই হয় নি। সে সময় এমনকি টেবিল টেনিস খেলতেও আমার ভালো লাগতো না।
টেবিল টেনিসের খপ্পর থেকে সে সময় মুক্তিলাভ করেছিলাম। যে কারণে জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে এ খেলাটি আমার কোনো সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে নি। তবে এরপরে খেলাটিকে মিস করেছি সবসময়।
সপ্তাহ পুরো হবার আগের দিন জহির স্যার, নিজের অপরাগতা এবং মিয়া-মফিজ গংএর সঙ্গে পেরে না ওঠার কথা আমার কাছে অকপটেই স্বীকার করলেন। সেই দিনটা আমার জন্য ভালো একটা দিন ছিলো, কারণ সেদিন যখন আমি আব্বুকে কলেজের পরিস্থিতি জানালাম; তিনি খুব সহজভাবে সবকিছু মেনে নিলেন।
আমার নিজের কান দুটোকেই বিশ্বাস হচ্ছিলো না, যখন তিনি বলছিলেন; আমার কলেজে যাওয়ার দরকার নাই। তুই একটা ছাড়পত্র চেয়ে আবেদন কর। আমি সই করে দিচ্ছি। কলেজের প্রিন্সিপালকে বলবি, বিশেষ কারণে আমি আর তোকে ওই কলেজে পড়াবো না; ব্যস্।
বাবারা বোধহয় এমনই হন। পুত্রদের যেকোন সমস্যায় সবার আগে পাশে এসে দাঁড়ান। আমার চোখ ভিজে আসলো। নির্বাক নতমস্তকে দাঁড়িয়ে মনে মনে তাঁকে লক্ষ ধন্যবাদ দিলাম।
পরদিন ছাড়পত্র নিয়ে যাওয়ার পর খুব বেশি কষ্ট করতে হয় নি। কলেজও বোধহয় এটাই চাচ্ছিলো। আসলে জহির স্যারের চেঁচামেচিতে অনেক শিক্ষকের মনেই আমার জন্য কিছুটা খারাপ লাগা তৈরী হয়েছিলো। বিশেষ করে টেবিল টেনিসের বিষয়টা অনেকের ভেতরেই আমার পক্ষে একটা যুক্তি তৈরী করে দিয়েছিলো।
কিন্তু মিয়া-মফিজ গংএর কারণে তারা কেউই বেশিকিছু বলতে পারছিলেন না। ওই দু'জন কলেজের অনেক সিনিয়র টিচার। সেই আদ্যিকাল থেকে আছেন। তাদের মুখের ওপর কথা বলা সহজ নয়।
যে কারণে আমার ছাড়পত্র চেয়ে লেখা আবেদনপত্র, যেটায় বাবা সই করে দিয়েছিলেন; সেটা পেয়ে সবপক্ষই যেন খানিকটা গ্লানিমোচনের সুযোগ পেলো। জহির স্যার জোর করেই পরদিন সকাল থেকে তার বাসায় গিয়ে বায়োলজি পড়বো, এ স্বীকারোক্তি আদায় করে ছাড়লেন। আমাদের কেমিস্ট্রি ম্যডাম খুব বন্ধুসুলভ একজন মানুষ ছিলেন। তার সঙ্গে ক্লাসে টুক-টাক দুষ্টামি করতে ভালো লাগতো। তিনি আমার খারাপ লাগাটা কমানোর জন্যই কি না কে জানে, আমি কোন্ কলেজে ভর্তি হতে চাই সেটা শুনে আমাকে বললেন; চিন্তা করো না, তুমি এখন যে কলেজে ভর্তি হবে সেখানে ফাইনালের সময় এক্সটার্নাল থাকবো আমি।
মিসিসিপিও দেখলাম সেবারই প্রথম কোনো ভয় ধরানো কথা বললো না, ঠান্ডা-নিস্পৃহ কিন্তু খুব ছুঁয়ে যাওয়া গলায় বিদায় দিলো; যাও সিদ্ধার্থ, ভালো থেকো। যোগাযোগ থাকবে। মেয়েটির সঙ্গে যদিও এরপরে আর কখনো কোন বাক্যালাপ হয় নি, কিন্তু মনের মধ্যে ওর স্মৃতিটা রয়ে গেছে আজো।
কিউব রুট ২৭ সমান যদি তিন হয়, তবে কলেজ লাইফের ফার্স্ট ইয়ারে আমার জীবনে বাবা, টেবিল টেনিস ও মিসিসিপি -এই তিনের ভূমিকা ব্যপক। পাওনার খাতা ভরেছি এই তিন দিয়েই। নাহলে ক্যন্ট. পাবলিককে সেই কবেই ভুলে যেতাম।
---





গল্প দেখি না ক্যান?
আমিও
ভুত ভুত ভুত...
অদৃশ্য গল্প লিখছে
আমি এইভাবে লিখি নাই। এডিটও করতে পারছি না। কি মুসিবত!
আপনে এখন এডিট করলে মনে হয় ঠিক হইবো...
মডুতো টেক্সট ফিরাইয়া দিলো মনে হয়। আর হ্যা, নিজের নামে উৎসর্গিত গল্প দেইখা যারপরনাই আনন্দিত হইলাম...
এইটাতে অন্য পোস্ট গুলার মতো এডিট অপশনও পাইতেসি না বস্। ওয়েটিংএ আছি, হয়তো কোনো টেকনিক্যল সমস্যা হয়ে থাকতে পারে। লেখাটা এই অবস্থায় পড়লে একবিন্দুও মজা পাওয়া সম্ভব না। বরং এরকম একটা কিছুর শেষে নাম জুড়ে দেয়ার কারণে আপনার আমাকে দৌড়ানি দেয়ার কথা।
বগুড়া ক্যান্ট পাবলিক
সাতমাথা দেইখা বুঝছেন
সুত্রাপুর- বকশিবাজার - বাস জার্নি
দেখে বোঝা সহজ
বস্ গণকটুলি তো বগুড়ার জায়গা না। সেইটা কি?
আর ইয়ে, আপ্নে দেখে দেখে কিভাবে চিনছেন? এসপি'র ব্রীজ কই বলেন তো।
সেটাও বগুড়ায়, করতোয়ার উপরে, শহরের পাশে।
আর্রে, সুমন ভাই দেখি সব চিনে। আপ্নের বাড়ি কৈ?
বগুড়া আমার জন্মস্থান।
ঠাকুরগাঁও।
পোষ্টে ঢুকে দেখি বিরাট গল্প। আজ রান্নার দিন।গ্যালারীতে সিট রেখে গেলাম। রান্না -বান্না শেষ করে এসে পড়বো।
আপনার সিটে আমি বইসা পড়ছি। মডুমামা লেখারে এমন অবস্থা করছে যে আমি নিজেই এখন ইন দ্য গ্যলারি। দেখি আপনার পপকর্ন কই?
মডুমামা শুক্রবারে মনে হয় ডেটিং এ যায়।
পপকর্ণ তো নাই। কাবাব ভাজলাম। এই নেন...দেখেন তো ঠিক আছে কিনা!
ঠিক-ঠাক আছে। ধইন্যবাদ।
চিন্তা কর্লাম আপ্নারে একদিন মোস্তাকিমে নিয়া কাবাব খাওয়াবো।
আরে কয় কি?কবে ?আর তো দেরী সহ্য হচ্ছে না। মুস্তাকিমে কাবাব খাওয়ার কথা বললেন আর মনে পড়লো ৫/৬ বছর আগে নিয়মিত যেতাম কাবাব খেতে বন্ধুদের সাথে।
গতকাল আমি আর জেবীন ঘুরলাম কারওয়ান বাজার, বি সিটি, আপনাকেও মনে মনেও খুঁজলাম।কিন্তু...
কাবাব দিয়ে আপ্নেই তো আগে আমাকে মোস্তাকিমের কথা মনে করায় দিলেন। অনেক দিন যাই না।
জেবীনআপু জব্বর একটা জুক্স শুনাইসে কালকে রাত্রে। আপ্নে এইবার চরম একটা পোস্ট দেন। বহুদিন আপনার নতুন লেখা পড়ি না।
মোস্তাকিমের অবস্থা খারাপ হইয়া গেছে। ভাল্লাগে না। তাছাড়া এক বৃষ্টির দিন গেছিলাম, পানি জমছে দোকানের সামনে। দেখি মোস্তাকিম-মুসলিম এসব কাবাবের দোকানের বয়গুলা রান্না করার খুন্তি দিয়ে ম্যানহোল খোঁচাইতাছে পানি বের করার জন্য। ঐটা দেখার পরে ঘেন্নায় আর যাইতে মন চায় না।
বসুন্ধরার উপ্রে ঢাকাইয়া নামে একটা খাবারের দোকান আছে, ঐখানে চাপ ভাল আছে। দামও মোটামুটি নাগালের মধ্যে।
লেখাটা এডিট করতে পারছি না। অন্য লেখাগুলোর মতো এটার উপরে দেখুন' আর এডিট' বাটন দেখাচ্ছে না।
গল্প ট্যাগ...অথচ মনে হচ্ছে আপনার গল্প
ঝাতি ঝানতে চায় আইভি কুথায় কেমন আছে
হ আমারই লেখা।
দারূণ লাগলো...
বৃত্তভাই, ধন্যবাদ। কয়েকটা টাইপোও দেখতে পাচ্ছি লেখায়। সেগুলো এডিট' অপশন ফেরত পাইলে ঠিক করে দেবো। তখন কিন্তু আপ্নারে আরেকবার পড়তে হবে পুরাটা
আপনে তো মিয়া জায়গামতো গল্প উৎসর্গ করছেন। আমার স্কুল-কলেজ জীবন অলমোস্ট এমনই কাটছে। আমি কলেজ পাল্টাই নাই আর টেবিল টেনিস খেলতাম না এই খালি পার্থক্য। আর ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার আগে একবার আইভি নামের এক মেয়ের উপর ক্রাশ খাইছিলাম। লোল।
রিয়ের থ্যংক্স ব্রো
আত্মকাহিনী লাইক্কর্লাম। কিচ্ছা দেখি বেশি মড না, আমগোকালের মতোই
খানিকটা ভয়ে ছিলাম আপু। গল্পের নানারকম কন্টেন্টের কারণে। আপনি লাইক করেছেন জেনে চিন্তামুক্ত হলাম।
গল্প তো গল্পই । বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হয় । গল্প বলবার ধরনটা দারুন! ভাল লাগল ।
আমারও ভালো লাগলো।
আত্মকাহিনী লাইক্কর্লাম।
এডিট বুতাম কৈগেছে? শার্টে লাগাইছেন নাকি?
আপ্নে কৈ? আমি আপ্নারে খুঁজতেসি। এমনকি কমেন্টে গল্পটা লেইখা পোস্ট করলে সেই কমেন্টও দেখায় না।
ডেভু কমেন্টগুলা কৈ গেল? অমি ভাইরে বিয়াপুক ধইন্যা, হেল্পানের লিগা।
বেশ!
ভালো লাগলো।
আইভির জন্য সমবেদনা। কি একটা অকাল কুষ্মান্ডকে প্রথম প্রেম নিবেদন করছিলো
(
চিন্তা করেন

বাই দি ওয়ে, সে কি টেবিল টেনিসের পাশাপাশি ব্লগিংও করতো
বান্দর।
আহ।
অনেকদিন ব্লগীং করিনা, লেখা পড়িনা ঠিকঠাক মত।
বড় লেখা হৈলে তো সালা মালাইকুম।
আজকা এইটা পড়লাম।
এত্ত বেশি ভালো লেখা যে, ঠিক মত প্রশংসাও করতে পারতাছিনা।
শেষ দিকে টেবিল টেনিসের অংশে আইসা মনে হৈলো, একটা দূর্দান্ত পরিচালক, একটা সিনেমায় দর্শকরে পিক অভ ক্লাইমেক্সে নিয়া একটা পরিপূর্নতার সাধ দিলো।
হ্যাটস অফ।
লেখা প্রিয়তে।
(আপনার লেখার হাত ড্রামাটিকাল উন্নত, মাঝখানে বেশ কিছু লেখা বাদ পড়ায়, ক্রম উন্নতি টা টের পাইলাম না।)
চুপচাপ পড়ে যেতে চাইছিলাম পুরা শেষ করেও আমার মাথায় বাজছিলো, কিছু টিচার যে নিতান্ত খাটাশ!
মন ভুলোর কারনে আমাদের সময়কার অনেক টিচারকে ভুলে গেছি। আমার ছেলের স্কুলের টিচারদের কথা শুনি এখন, মনে হয় কিছু টিচার নিতান্ত খাটাশ। কেন বললাম, পরে বলব। আরো জানি ওদের!
আপনার গল্পের নামগুলো আমার বেশী ভালো লাগে ।
মন্তব্য করুন