আমার নয় কিছু
একটা ঘটনা ঘটেছে। সেদিন রাতে ফ্লাক্সের পানি শেষ হয়ে গেলে ডাইনিং টেবিলে পানি আনতে গিয়েছিলাম। এই সামান্য কাজের জন্য লাইট জ্বালাতে ইচ্ছে করে না কখনোই।
সুন্দর পরিপক্ব একটি নিঝুম রাত, এরমধ্যে একটা টিউবলাইট জ্বালিয়ে চারিদিকে কৃত্রিম আলো ঢেলে দেয়ার কি অর্থ হতে পারে? এই ভাবতে ভাবতে অন্ধকারে ফিল্টার থেকে পানি ভরছিলাম। হঠাৎ দেখলাম, ফ্লাক্সের তলা অলৌকিকভাবে ফুটো হয়ে পানি নিচে আমার পাএর ওপর গিয়ে পড়ছে। ঠিক সে সময় আমি ঘরের ভেতর বেশ কয়েকটা নিঃশ্বাস পড়ার শব্দ শুনলাম। এবং একটা অসমাপ্ত শব্দ, নান্।
এরপরে স্বাভাবিক বুদ্ধিতে যা মাথায় আসে তা হলো, ভয়ে একটা চিৎকার দেয়া। মনে হচ্ছিলো এখনো মুখের পেশীগুলো বিবশ হয়ে যায় নি। সর্বশক্তিতে একবার আপনজনদের আমার বিপদের কথা জানিয়ে দিতে পারলেই আমি বেঁচে যাবো। চিৎকার দিলাম কিন্তু শব্দ হলো না। বুঝতে পারলাম, গলা দিয়ে আর স্বর বেরুচ্ছে না।
এবার ঘরের ভেতর কিছু অসম্পূর্ণ বাক্য শুনতে পেলাম, যেগুলো আস্তে আস্তে পরিস্কারতর হচ্ছিলো। নাকটা চেপে ধরো, বন্ধ করে দিতে পারলে খেল খতম, নিঃশ্বাস যেন না নিতে পারে।
দৃশ্যটা দেখে আমি প্রবলভাবে ধড়ফড়িয়ে উঠলাম। কয়েকটা দীর্ঘ সেকেন্ড হার্টবীট আটকে ছিলো। তারপর সব ঠিকঠাক। দেখলাম ফ্লাক্স উপচে পানি আসলেই আমার পায়ের ওপর পড়ছে। ঘটনার কোনো ব্যাখ্যা নেই। জীবনে প্রথম হেলুসিনেশনকে অনুভব করলাম।
বস্তির সঙ্গে পরিচয় ছোটবেলা থেকে। কত বস্তি দেখেছি, বস্তির আমার বয়েসী ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে খেলেছি, তার ঠিক নেই। কিছু কিছু বস্তির পোলাপানের চুলগুলো ছাইবর্ণ এবং শনের মতো থাকে। হাত-পাএর নখগুলো থাকে ময়লা এবং এবড়ো-খেবড়ো। সেদিন গুলিস্তানে ডিভাইডারের ওপর দুইটা বস্তির ছেলেকে দেখলাম। আমি যখন জায়গাটা পার হচ্ছি, ওরা তখন বোধহয় কেবল ঘুম থেকে জেগে উঠছে। চোখের কোণে হলুদ পিচুটি বিশ্রীভাবে লেপ্টে আছে। শরীরময় এমন নিদর্শন আরো ছিটিয়ে থাকলেও সেগুলোর বর্ণনা দিতে ইচ্ছে হচ্ছে না।
ওরা মনে হয় চোর ছিলো। একটাকে দেখলাম পকেট থেকে একটা আতরের শিশি বের করতে। আরেকটা যেটার আকৃতি একটু বড়, সে পকেট থেকে দুইটা টাকা বের করে ছোটটার দিকে এগিয়ে দিলো। বিনিময়ে শিশিটা নিয়ে গেল।
ঘুম থেকে উঠে দুইজন হাঁটা দিলো দুইদিকে। আমি বুঝলাম এরা দুই ভাই। বস্তির ছেলেরা ভাই ছাড়া আর কারো পাশে রাতে ঘুমায় না। ভাই না থাকলে একা বা সমবয়সী বন্ধুর সঙ্গে ঘুমায়। এর কারণ অবিশ্বাসের ফ্যন্টাসী।
আমি নিজেও একটা বস্তির ছেলে, যার অনুভূতিশক্তি খুবই কম আর চুলগুলো শনের মতো। তবু সবকিছুকে অনুভব করার চেষ্টা করি প্রাণপনে। সদরঘাট এলাকায় একটা পিচ্চি ছেলে লেদের কারখানায় পিস্টন চকচকে করার কাজ করে। নাম রাশা। ফরসামতো ছেলেটা দিব্যি স্কুল যেতে পারতো। বই-খাতার সঙ্গে সখ্যতাপূর্ণ কোলাহলময় একটা জীবন পেতে পারতো। তা পায় নি। ও সারাদিন ওর ছোট্ট ভাগের কাজটুকু করে যায়। এভাবে শুরু হয়েছে রাশার জীবন। এটা যদি আমার জীবন হতো তাহলে কেমন হতো?
কাগজ কুড়োনো ছেলেগুলো নিজেদের কুঁড়ের ভেতর জমিয়ে রাখা কাগজের স্তুপেই শুয়ে থাকে, ঘুমায়। আমিও তেমনই শুয়ে ঘুমাতাম। হয়তো অনেক রাত পর্যন্ত সদরঘাটের লঞ্চে-নৌকায় দৌড়াদৌড়ি করে, ভোরের আযানের সময় ঘুমের কোলে ঢলে পড়তাম। এদের জীবনের প্রধান নেশাদ্রব্য কি আমি জানি। এদের জীবনের প্রধানতম ডিজায়ার কি আমি জানি, কেন এরা এ্যরোগ্যন্ট আমি জানি, কি পেলে এরা খুশি হয় তাও জানি। আমি যদি এদের একজন হতাম, বিন্দুমাত্র কোনো সমস্যা হতো না। একজন হই নি, তাতেও কোনো সমস্যা হয় নি।
হাতিরঝিল বস্তিতে দেখলাম টিনের ঘরগুলো বেঁকে-চুরে এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে, যেন অল্প ভূমিকম্পতেই ঝুর ঝুর করে ঝরে পড়বে নিচে। সেদিন দুপুরে একটা ভালোরকম ভূমিকম্প টের পেয়েছিলাম। সে ঝাকিটা এ বস্তি কিভাবে সারভাইভ করে এসেছে কে জানে!
হয়তো সেই ভূমিকম্পের কারণেই ময়লা স্যূয়ারেজ পানির নালার ওপর দাঁড়ানো একতলা-দোতলা টিনের বাসাগুলোর আজকের অবস্থা হয়েছে। যদি তাই হয়, তাহলে এ ঘটনা ঘটার সময় মানুষগুলোর মনের অবস্থা কি হয়েছিলো? একটা এলাকার মানুষের জীবনকে বোঝার চেষ্টা করছি, যারা সবাই একসঙ্গে প্রায় সলিল সমাধির হাত থেকে বেঁচে যাওয়াকে অনুভব করেছে মাত্রই।
দিন চলে যাচ্ছে দিনের নিয়মে। একটা অনিশ্চিত সময় পেরিয়ে চলেছি। সামনের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে।
---





Yaro Sab dua Karo - Ram Shankar
সাহাদাত ভাই, আপনি আমার ব্যপারে লিখতে ভয় পাচ্ছেন এবং ধারণা করছেন,
কেন?? আমাকে নিয়ে লিখলে কেন আপনাকে ব্যান হয়ে যেতে হবে? এমন কি আপনি লিখে ফেলবেন?
দুঃখ পেলাম।
সবার আগে বোধহয় আপনিই ট্যাগ করলেন। এবং আমি মেনে নিলাম। ধন্যবাদ।
ভুলে গেলে চলবে না, আমি সাধারণ একজন ব্লগারমাত্র। লেখকের সম্মান পাবার যোগ্য নই। সেজন্য চেষ্টাও করছি না।
সার্থক পুনরাবৃত্তি -কথাটা দিয়ে যদি আমাকে কিছু বলে থাকেন, তো আবারো বলছি, আমি তার যোগ্য নই। থ্যংকিউ এগেইন।
আর যদি কথাটা দিয়ে আমাকে চোর হিসেবে আখ্যায়িত করতে চান, তো বলবো আমার ব্লগে আপনার আগমন বাধ্যতামূলক নয়। প্লীজ...
উপরের মন্তব্যটি উলটচন্ডালের মন্তব্যের জবাবে। প্রথম দু'লাইন উত্তরে দেয়া হয়েছে।
গল্প: সেদিনও কিভাবে কিভাবে যেন ঠিকই
মন্তব্য করুন