ইউজার লগইন

আমাকে ছেড়ে যাওয়ার পর

মাঝে মাঝে গভীর ভাবের কথা ভাবতে হয়। কারণ আর কোনো কাজ থাকে না হাতে। বসার জায়গাটা থেকে ২০ বা ২৫ ডিগ্রি কোণে সামনে তাকালে এক চিলতে ছায়া রংএর কাঁচ ও তারপরে আকাশ দেখা যায়। সাদা-নীল আকাশটি অন্ধকার করে নেমে আসছে একটি গোধূলী। এটাকেই কি সন্ধ্যা বলা যায়? সময়টা কেমন মন উদাস করানো। এমন সময়ে অনেক কথা মনে পড়ে যায়। আমি নিশ্চিত সে কথাগুলো সকালের ঘুম ভাঙা তাড়াহুড়োয় কিংবা দুপুরের কাজের ফাঁকের নিরিবিলিতে মনে পড়ে না। আসলেই সময়গুলো মানুষের মনে কত শক্ত প্রভাব ফেলতে পারে।
সময় কিন্তু নিভৃতে আরো একটা দারুণ কাজ করে যায় সবসময়। সেটা হচ্ছে প্রলেপ দেয়া। গ্রামে মাটির ঘর লেপে দেয়ার একটি বিষয় আছে। সময় হচ্ছে সেই চমৎকার অনুষঙ্গ, যা দিয়ে মানুষ তার জীবনঘরটি লেপে পরিস্কার করে রাখে। সব ক্ষোভ বা ক্ষত, পুঞ্জী পুঞ্জী হতাশা, ভুলে যেতে চাওয়া স্মৃতি কিংবা প্রিয়জনের কাছ থেকে পাওয়া সামান্য সামান্য কষ্টগুলো সময়ের প্রলেপে চাপা পড়ে যায়।
জীবনটাকে নিয়ে কি ভাবছি? সেদিন অনিলদা’র সঙ্গে খুব আলোচনা জমে উঠেছিলো। তার আর আমার একটা জিনিসে হুবহু মিল দেখা গেল। দু’জনেই এসব বাদ দিয়ে গ্রামে গিয়ে ট্রাক্টর চালাতে চাই। ট্রাক্টর বড় বড় খাঁজে নরম মাটি চষে তাকে ফলবতী করে তোলে। সে চষা ক্ষেত দেখে মনে পড়ে ভরাযৌবনবতী কোনো নারীর কথা। যে বীজের অপেক্ষায় মদির হয়ে আছে। অবশ্য এ ধররে উপমা ‘হুমায়ুন আজাদ স্যার কর্তৃক প্রভাবিত’ -এ কথা বলতেই অনিলদা’ বললেন, আরে তিনি না বলে গেলে কি আর আমি বলতাম না?
তাই তো, স্যার কি নতুন বা অজানা কিছু বলে গিয়েছিলেন? তিনি তো যা সত্য, যা অবিচল, যা অটল, যা ভয়ংকর; তাই বলে বেড়াতেন অকপটে। লিখে রাখতেন কালো অক্ষরে।
যা সত্য নয়, তার জন্য বিশ্বাস শব্দটি আনতে হয়। যা সত্য তা বলে ফেললে, মানুষ বিশ্বাস করতে হোঁচট খায়। সক্রেটিসকে হেমলক পান করিয়ে মেরে ফেলা হয়েছিলো, তিনি বিশ্বাসের বাইরে সত্যকে এনে ছেড়ে দিয়েছিলেন বলে। মানুষ হঠাৎ একদিন ঘুম থেকে সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ভয় পেয়ে গিয়েছিলো। যুগে যুগে ভয় পেয়ে মানুষ অনেক মহাপুরুষের জš§ দিয়েছে। অনেক মহাপুরুষকে কালজয়ী করেছে। নিজের অজান্তেই তাকে তুলে নিয়েছে মাথায়। আমি স্যারের আÍীয় নই, তাই তাঁর প্রয়াণে স্বজন হারানোর বেদনায় আক্রান্ত হই নি। তাঁর ও নিজের ওপর অটুট বিশ্বাস জšে§ছে কেবল।
কবি’র সার্ধশতবার্ষিকী উপলক্ষে কলকাতার টিভি চ্যানেল তারা প্রতিদিন মধ্যরাতে রবীন্দ্র গান প্রচার করে। সেখানকার স্থানীয় প্রতিভাবানেরা মাইক্রোফোনে নিজের কারিশমা দেখায়। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনি।
তবে কবি’র গানগুলোর মধ্যে একটি আমার শিশুমনে শিশুবেলাতেই দাগ কেটে গিয়েছিলো। মাঝে মাঝে তব দেখা পাই/ চিরদিন কেন পাই না? -এটা প্রথম শুনেছিলাম কণিকা’র মুখে। সম্ভবত ঈশ্বরের আরাধনার উদ্দেশ্যে তিনি গেয়েছিলেন। তার গলায় প্রেম ছিলো না। কিন্তু যে মধু ছিলো, তা প্রেমের গান গেয়ে খ্যাতি পেয়ে যাওয়া অনেক গলাতেও চোখে পড়ে না। আমি তš§য় হয়ে গানটি প্রতিদিন একাধিকবার শুনতাম, কি করিলে বলো পাইবো তোমারে/রাখিবো আখিঁতে আখিঁতে/এত প্রেম আমি কোথা পাবো না/তোমারে হƒদয়ে রাখিতে।
পরবর্তীতে সমবয়েসী তবে খ্যাতিমান এক রবীন্দ্র গানের গায়িকা, যে ভাবতো আমি বোধহয় কবি’কে চিনিই না। বা চিনলেও তার গানের মহাভান্ডার সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নই, তাকে একদিন এ গানের কথা বলে চমকে দিয়েছিলাম।
ইট-কাঠ-সুড়কি, লোহার পোক্ত ফ্রেম আর দেয়ালের ঘড়ির জীবনে নিজেও এক টুকরো কংক্রীট হয়ে উঠছি দিনকে দিন। আশা করে আছি, কোনো একদিন আমার এ কংক্রীটত্ব ঝরে পড়বে। সিমেন্টের গাঁথুনিগুলো আলগা হয়ে একসময় ঝুরঝুর করে ঝরে পড়বো এবং প্রিয় মাটিতে সবুজ ঘাসেদের সঙ্গে মিশে যাবো। একদিন যাবোই।
উস্তাদ হুমায়ুন আজাদ স্যারের আক্রান্ত হবার দিন পেরিয়ে গেল। খুব মন খারাপ। যেহেতু আপনে কবিতা বুঝেন না; এখানেই পোস্ট করে যাই, একটি প্রিয় কবিতা।

আমাকে ছেড়ে যাওয়ার পর

আমাকে ছেড়ে যাওয়ার পর শুনেছি তুমি খুব কষ্টে আছো।
তোমার খবরের জন্য যে আমি খুব ব্যাকুল,
তা নয়। তবে ঢাকা খুবই ছোট্ট শহর। কারো কষ্টের
কথা এখানে চাপা থাকে না। শুনেছি আমাকে
ছেড়ে যাওয়ার পর তুমি খুবই কষ্টে আছো।
প্রত্যেক রাতে সেই ঘটনার পর নাকি আমাকে মনে পড়ে
তোমার। পড়বেই তো, পৃথিবীতে সেই ঘটনা
তুমি-আমি মিলেই তো প্রথম সৃষ্টি করেছিলাম।

যে-গাধাটার হাত ধরে তুমি আমাকে ছেড়ে গেলে সে নাকি এখনো
তোমার একটি ভয়ংকর তিলেরই খবর পায় নি।
ওই ভিসুভিয়াস থেকে কতটা লাভা ওঠে তা তো আমিই প্রথম
আবিষ্কার করেছিলাম। তুমি কি জানো না গাধারা কখনো
অগ্নিগিরিতে চড়ে না?

তোমার কানের লতিতে কতটা বিদ্যূৎ আছে, তা কি তুমি জানতে?
আমিই তো প্রথম জানিয়েছিলাম ওই বিদ্যূতে
দপ ক'রে জ্বলে উঠতে পারে মধ্যরাত।
তুমি কি জানো না গাধারা বিদ্যূৎ সম্পর্কে কোনো
খবরই রাখে না?

আমাকে ছেড়ে যাওয়ার পর শুনেছি তুমি খুব কষ্টে আছো।
যে-গাধাটার সাথে তুমি আমাকে ছেড়ে চ'লে গেলে সে নাকি ভাবে
শীতাতপনিয়ন্ত্রিত শয্যাকক্ষে কোনো শারীরিক তাপের
দরকার পড়ে না। আমি জানি তোমার কতোটা দরকার
শারীরিক তাপ। গাধারা জানে না।

আমিই তো খুঁজে বের করেছিলাম তোমার দুই বাহুমূলে
লুকিয়ে আছে দু'টি ভয়ংকর ত্রিভুজ। সে-খবর
পায় নি গাধাটা। গাধারা চিরকালই শারীরিক ও সব রকম
জ্যামিতিতে খুবই মূর্খ হয়ে থাকে।

তোমার গাধাটা আবার একটু রাবীন্দ্রিক। তুমি যেখানে
নিজের জমিতে চাষার অক্লান্ত নিড়ানো, চাষ, মই পছন্দ করো,
সে নাকি আধ মিনিটের বেশি চষতে পারে না। গাধাটা জানে না
চাষ আর গীতবিতানের মধ্যে দুস্তর পার্থক্য!

তুমি কেনো আমাকে ছেড়ে গিয়েছিলে? ভেবেছিলে গাড়ি, আর
পাঁচতলা ভবন থাকলেই ওষ্ঠ থাকে, আলিঙ্গনের জন্য বাহু থাকে,
আর রাত্রিকে মুখর করার জন্য থাকে সেই
অনবদ্য অর্গান?

শুনেছি আমাকে ছেড়ে যাওয়ার পর তুমি খুবই কষ্টে আছো।
আমি কিন্ত কষ্টে নেই; শুধু তোমার মুখের ছায়া
কেঁপে উঠলে বুক জুড়ে রাতটা জেগেই কাটাই, বেশ লাগে,
সম্ভবত বিশটির মতো সিগারেট বেশি খাই।

পোস্টটি ২ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মীর's picture

নিজের সম্পর্কে

স্বাগতম। আমার নাম মীর রাকীব-উন-নবী। জীবিকার তাগিদে পরবাসী। মাঝে মাঝে টুকটাক গল্প-কবিতা-আত্মজীবনী ইত্যাদি লিখি। সেসব প্রধানত এই ব্লগেই প্রকাশ করে থাকি। এই ব্লগে আমার সব লেখার কপিরাইট আমার নিজেরই। অনুগ্রহ করে সূ্ত্র উল্লেখ না করে লেখাগুলো কেউ ব্যবহার করবেন না। যেকোন যোগাযোগের জন্য ই-মেইল করুন: bd.mir13@gmail.com.
ধন্যবাদ। হ্যাপি রিডিং!