ইউজার লগইন

ক্ষরণ

বাবা-মা কেন যে আমার নাম রেখেছিলেন মহাত্মা, তা আমি কখনো ভেবে-চিন্তে বের করতে পারি নি। কখনো মহৎ কোনো কাণ্ড না ঘটিয়েই জীবনের ঝাড়া ৩০ টি বছর পার করে এলাম। মহৎ হওয়ার সুযোগগুলো মাঝে-সাঝে আশপাশ দিয়ে ঘুরে গেলেও, আমাকে তার ভেতরে পুরোপুরি প্রবেশ করতে দেয় নি কখনো। হয়তো সেটা ছিলো সাহসের ঘাটতিজনিত সমস্যা। কখনোই আমি খুব বেশি সাহসী ছিলাম না। যে কারণে মহৎ হবার আশঙ্কা দেখা দিলেই আরো বেশি করে গুটিয়ে যেতাম নিজের ভেতর। এটা যে ইচ্ছে করতাম, তাও না। নিজে নিজেই হয়ে যেতো। তারপরও কেউ নাম কি জানতে চাইলে, আমি বলতাম মহাত্মা। বলার সময় মনে মনে বলতাম, আসলে নামটা হওয়া উচিত ছিলো স্বল্পাত্মা।

তবে রহিম-করিম-আবদুল-মোতালেব ইত্যাদি নাম হলেই যে আমি খুব সাহসী হয়ে উঠতাম এমন কখনো মনে হয় না। আমি যে দেশটায় বাস করি, সেদেশে বসবাস করাটা আসলে খুব বেশি সহজ না। আরামদায়কও না। তারপরও আমরা প্রায় সতেরো কোটি মানুষ ছোট্ট দেশটিতে গাদাগাদি করে বাস করতাম। নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ার কারণে আমাদের উৎপাদনক্ষমতা ছিলো ঈর্ষণীয়। বছরান্তে আমাদের জনসংখ্যা যেন খুব বেশি না বাড়ে, সেজন্য সরকারকে নানা ধরনের পরামর্শ বিলি করে বেড়াতে হতো। সেসব দেখলে বোঝা যায়, জাতি হিসেবে আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অভাব ছিলো ভবিষ্যত পরিকল্পনার।

এই সমস্যা সম্ভবত দেশের প্রতিটি মানুষই আক্রান্ত ছিলো। কারো মাঝেই খুব বেশি পরিকল্পিত হবার লক্ষণ কখনো দেখি নি আমি। বরং 'যায় দিন ভালো, আসে দিন খারাপ' নীতিকথাটি এ দেশের মানুষ মেনে নিতে অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতো। আমিও তার ব্যতিক্রম ছিলাম না। এ সুযোগে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত সামাজিক সংকটগুলোর অধিকাংশই আমাদের দেশে জেঁকে বসেছিলো বেশ ভালোভাবে। বিভিন্ন ধরনের গ্রুপ পিপল, তার সীমার ভেতরে যেসব সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারতো, সেসব সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে থাকতো।
সব মিলিয়ে আমরা ভালো ছিলাম। কষ্টে-সৃষ্টে দিন পার হতো। সন্ধ্যা ও রাতগুলোতে খুব বেশি উচ্ছৃংখল যেন আমরা না হয়ে পড়ি, সেজন্য ছিলো অজস্র সামাজিক বিধি-বিধান। অনুন্নত সমাজে এগুলো থাকার সুবিধা হচ্ছে, মানুষের মনোজগতে এর একটা প্রভাব থাকে। যে কারণে একক ব্যক্তি খুব বেশি উচ্ছৃংখল হলেও, সে গোষ্ঠীবদ্ধভাবে তা চর্চায় যেতে পারে না। সবমিলিয়ে সমাজটা তাই একটু হলেও লাগামবদ্ধ থাকে। আর অশিক্ষাজনিত অনুন্নত অবস্থায় এ ধরনের লাগামের আসলে প্রয়োজনও আছে খানিকটা। নাহলে সম্ভাবনা দেখা দেয় ধ্বংসের।

মহাত্মা নাম নিয়ে স্বল্পাত্মা এই আমি কিছুটা নিভৃতে নিজের জীবনটা পার করে দেবো বলে ঠিক করেছিলাম। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পাশ দিয়ে তাই সরকারী একটা অফিসে কেরানীর চাকুরী গ্রহণ করলাম। অন্যরা বলতো আমার নাকি আরো ভালো কোনো চাকুরী করার কথা ছিলো। কিন্তু কথাটাকে আমি বিশ্বাস করতাম না। কারণ কথা থাকলে তো সেটাই করতাম। চাকুরীর সুবাদে আমার যেটা সুবিধা হলো, সেটা হচ্ছে নিভৃতচারী হবার নিভৃত ইচ্ছেটা বাস্তবায়নের সুযোগ হয়ে গেলো। সকাল করে ঘুম থেকে উঠতাম। বাজার করে গোসলখানায় ঢুকতাম। সেখান থেকে বের হলেই মা নাস্তা দিতেন। সেটা খেতে খেতে তিনি টিফিন ক্যারিয়ারটা সাজিয়ে দিতেন। আমি সেটা হাতে ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়তাম রাস্তায়। এখানে আমাকে যেসব সমস্যার সম্মুখীন হতে হতো সেগুলোর একটা তালিকা ছিলো। বাজারে ঢোকার আগ পর্যন্ত দিনের কোনো সমস্যাতেই আমাকে পড়তে হতো না। আমাদের ছিলো ছোট পরিবার। সেই পরিবারে বাবা-মা ছাড়া আমার ছিলো আর একটি ছোট বোন মাত্র। তারও বিয়ে হয়ে যাওয়ায় পরিবারটা আরো ছোট হয়ে গেলো। তিনজনের সংসার সামলানোর মতো শক্তি মা রাখতেন। যে কারণে সকালে উঠে কখনো কলে পানি নেই, টুথপেস্টের টিউব ফাঁকা কিংবা পায়জামাটা ধোয়া নেই- এসব দেখতে হতো না।

তবে বাজারে গিয়ে প্রতিদিনই আমি খানিকটা দিশেহারা বোধ করতাম। আমাদের পরিবারের সাকুল্যে আয় ছিলো হাজার পচিশেক টাকা। সরকারী চাকুরী করি বলে, এর বাইরে টুক-টাক ঘুষজনিত আয় ছিলো। তবে সেটা আবার ছোট চাকুরী করি বলে খুব বেশি ছিলো না। তাই সংসারের খরচে সেটাকে আমি যোগ করতাম না। মাসশেষে ব্যাংকে পাঠিয়ে দিতাম। থাকুক, যদি কখনো কাজে লাগে। তো পচিশ হাজারের দশ হাজার চলে যেতো বাড়িভাড়ায়। দুই হাজার যেতো পানি-কারেন্ট-গ্যাস-ডিশ-ইন্টারনেট ইত্যাদিতে। খুব চিপে চিপে খরচ করতাম সবকিছু, আমরা তিনজনই। বাকী টাকাটার চারভাগের একভাগ খরচ হতো নানা ধরনের ওষুধ-পত্রের পেছনে। বাকী যে দু'ভাগ থাকতো তা দিয়ে মেটানো হতো সারামাসের বাজার খরচ। এর বাইরে আর কিছুতে টাকা খরচ করার মতো সামর্থ্যও ছিলো না আমাদের।
কিন্তু দু'ভাগের টাকায় সারামাস বাজার করাটা দিনে দিনে কঠিন হয়ে উঠছিলো। আমি একসময় চাল কিনতাম ২০ থেকে ২২ টাকা কেজি দরে। সে সময় সারামাসে ২০ থেকে ২২ কেজি চাল প্রয়োজন পড়তো আমাদের। খরচ হতো সর্বসাকুল্যে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা। এরপরে সেই চালের দাম যখন ৫৫ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে গিয়ে পৌঁছুলো তখনও আমাদের ২০-২২ কেজিই লাগতো। সেটা কিনতে প্রয়োজন হতো প্রায় বারো-তেরোশ' টাকা। যা আমার মোট বাজার খরচের সাত ভাগের এক ভাগ। একইভাবে ডাল-তেল-চিনি-মাছ-মুরগী-গরুর মাংস ইত্যাদির দাম তিনগুণ হয়ে গেলো, তখন আমি বুঝতে পারলাম আমার আসলে দশদিনের বাজার করার মতো সামর্থ্য আছে। কিন্তু আমাকে ত্রিশদিন বাজার করে খেতে হয়। এই কাজটা তখন কতখানি অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়, সেটা যে এটা না করেছে কোনোদিন সে ছাড়া আর কেউ বুঝবে না।

পোস্টটি ৩ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মীর's picture

নিজের সম্পর্কে

স্বাগতম। আমার নাম মীর রাকীব-উন-নবী। জীবিকার তাগিদে পরবাসী। মাঝে মাঝে টুকটাক গল্প-কবিতা-আত্মজীবনী ইত্যাদি লিখি। সেসব প্রধানত এই ব্লগেই প্রকাশ করে থাকি। এই ব্লগে আমার সব লেখার কপিরাইট আমার নিজেরই। অনুগ্রহ করে সূ্ত্র উল্লেখ না করে লেখাগুলো কেউ ব্যবহার করবেন না। যেকোন যোগাযোগের জন্য ই-মেইল করুন: bd.mir13@gmail.com.
ধন্যবাদ। হ্যাপি রিডিং!